অমরত্ব ও ঐক্যের নামে বিভেদের প্রেক্ষাপটে সংগঠন হতে পেশাজীবিদের ন্যুনতম প্রত্যাশা:

ওয়ালিদুর রহমান :

নামে বেনামে, জানিয়ে, না জানিয়ে, বিভিন্ন অনলাইন গ্রূপ বা পেজে আমার মতো অভাজনকে যখন কেউ সংযুক্ত করে, তখন মানুষ হিসেবে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ন মনে হয়। কিন্তু মুশকীল হল, এরকম (মূলত ফেসবুক কেন্দ্রীক) প্রায় ডজনখানিক প্রোফেশনাল ও সোশ্যাল গ্রূপে যুক্ত হবার পর প্রায়ই পরীক্ষা করে দেখি, ওই গ্রূপগুলোর কয়েকটাতে কোনো লেখা দিলে ৭ দিনেও এপ্রূভ হয় না। অন্যদের পোষ্টেও দেখি পাঠক ২ জন, ৭ জন, ১০ জন। কেউ হয়তো ওখানে কোনো সিরিয়াস প্রশ্ন করেছেন। তার কোনো উত্তর নেই। কেউ কুইজ দিয়েছেন, তার উত্তর পরেছে গোটা দশেক। কুইজদাতার খবর নেই। সদস্যদের কোনো একটিভিটি নেই। গ্রূপ খুলে বসে আছেন একেকজন। যে যেভাবে পেরেছেন খুলেছেন আর মানুষকে জুড়েছেন। গ্রূপ খুলতে তো পয়সা লাগে না।

ফেসবুক কেন্দ্রীক প্রগতি চর্চার একটা বন্যা বইছে দেশে। হাজার হাজার গ্রূপ-প্রোফেশনাল ও সোশ্যাল-দুটোই। কোনো শেয়ারিং, বিনিময়, আলোচনা, তথ্য দান, প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বিনিময়, জ্ঞান শেয়ারিং কিছু নেই-এমন গ্রূপের সংখ্যাও অসংখ্য। খালি প্লাটফরমের পর প্লাটফরম গড়ে উঠছে। কী চাচ্ছি আমরা? একই অবস্থা এইচআর/কমপ্লায়েন্স/এ্যাডমিনের কর্মীদের প্লাটফরমের। কেউ কেউ দৈত্যাকার সংগঠনে রূপ নিয়েছেন, তারা আকার বড় করা আর বছরে কয়েকটা পিকনিক টাইপের গেট টুগেদার কিংবা কনফারেন্স করেই হাত ধুয়ে ফেলছেন। পাশাপাশি বাজার পাচ্ছে “কী নোট স্পিকার” এর চেয়ার দখলের ব্যাপক মহোৎসব আর পদের কাড়াকাড়ি। তাদের সুখে ইর্ষান্বিত হয়ে আরো হাজার হাজার এ্যাসোসিয়েশন, গ্রূপ, ফোরাম, দল, উপদল জন্ম নিয়েছে ও নিচ্ছে। অলিতে গলিতে সংগঠন, সেক্টরওয়াইজ সংগঠন, এলাকাভিত্তিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে সংগঠন, থানা বা সাবজেক্ট সূত্রে পেশাজীবি সংগঠন। সবারই মহৎ উদ্দেশ্য-এইচআর/কমপ্লায়েন্স/এ্যাডমিন প্রোফেশনালদের ভাগ্যোন্নয়ন। এতগুলো এ্যাসোসিয়েশন, হয়তো এত কর্মীও দেশে নেই। আমার সহকর্মীর কাছ থেকে একবার একটা সমিতির নাম শুনে হেসে মরেছিলাম-“উত্তরা বারো নম্বরস্থ লাইসেন্সবিহীন ভ্যানচালক সমিতি।” দেশে এইচআর, কমপ্লায়েন্স, এ্যডমিন নিয়ে যে হারে ‘আমরা নিজেরাই রাজা’ ধরনের ভূড়ি ভূড়ি সংগঠন প্রতিদিন পয়দা পাচ্ছে, তাতে অচীরেই মহল্লা বা গলির ভিত্তিতেও সংগঠন পয়দা হতে পারে। যেমন, “মিরপুর লাভ রোডস্থ চাকরি হারানো বিদগ্ধ এইচআর সমিতি”। পদ পাচ্ছি না, মনের মতো কিছু হচ্ছে না। ব্যস নতুন একটা সংগঠন।

মুশকীল হল, এত এত সংগঠনের জন্য উপদেষ্টার ভান্ডারে টান পড়েছে। ফলাফল, এ্যডহক উপদেষ্টা, ভারপ্রাপ্ত উপদেষ্টা, তাত্ত্বিক উপদেষ্টা, ‘পরে নাম দেয়া হবে উপদেষ্টা’ দিয়ে ব্যানার বানানো হচ্ছে।

উদভ্রান্ত কর্মীরা দ্বিধাগ্রস্থ ও কানাউলায় আক্রান্ত। কোনটা ছেড়ে কোনটার সদস্য হব-ধন্দে পড়ে যাই। কোনটা ছেড়ে কোনটায় গেলে আগেরটার তিক্ততার মুখোমুখি হব না-বুঝতে পারি না। ফলে বারবার ঠোক্কর খেয়ে নতুন আরেকটাতে যাই। দু’দিন যেতে না যেতেই থোড়-বড়ি-খাড়া>খাড়া-বড়ি-থোড়। [হ্যা, অবশ্যই সবাই নন।]

আরেকটা মড়ক শুরু হয়েছে বিগত ৩-৪ বছর ধরে। বাংলাদেশে যে কারনেই হোক, প্রশিক্ষন বিষয়টার বিপুল আলোড়ন শুরু হয়েছে। আলোড়নটি সৃষ্টি হবার বিভিন্নমুখী কারন রয়েছে। তবে বাংলাদেশে যা হয় আরকি? ওই যে, কেউ একজন ফুড বিজনেসে সাফল্য পেয়েছে। ব্যাস, গোটা ঢাকা শহরে শুধু খাবারের দোকান আর দোকান। দেশে আর কোনো ব্যবসা যেন বেঁচে নেই। তেমনি করে, ট্রেইনিং এখন একটি লাভজনক পেশা। প্রতিদিন আমি দাওয়াত পাই অন্তত প্রায় ৫০ টি ট্রেইনিং এর-মেইলে, মেসেঞ্জারে, লিংকডইন মেসেজে, সদস্য আছি-এমন গ্রূপে। অত্যন্ত আশাপ্রদ ঘটনা, যে, মানুষ ট্রেনিং নিতে আগ্রহ পাচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা হল, যত ট্রেনিং হচ্ছে বা আয়োজিত হচ্ছে, তার কতটা মানসম্পন্ন? মান মানে অনেক কিছু, যার মধ্যে বিষয়ের যুগোপযোগীতাসহ অনেক কিছু জড়িত। যোগ্যতা সম্পন্ন ট্রেইনার, ম্যাটেরিয়াল, লজিসটিকস, সময়, ইভ্যালুয়েশন-এগুলোও মানসম্পন্ন ট্রেনিং এর অনুসঙ্গ। আমি একটু সন্দিহান, প্রতিদিন যত যত ট্রেনিং হচ্ছে, তার কতটা সত্যিই মানোত্তীর্ন। যারা ট্রেনিং নিচ্ছেন, তারা আসলে একটি এক পাতার পার্টিসিপেশন সনদ ছাড়া আর কী পাচ্ছেন? ফ্রি বা বিনামূল্যে ট্রেনিং তো অবশ্যই সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে, ট্রেনিং দেবার মূল লক্ষ্য যদি হয় ব্যবসা বা পেশা-তবে সেটা সবক্ষেত্রে ইতিবাচক নাও হতে পারে।

এর পাশাপাশি শুরু হয়েছে প্রোফেশনাল বাহুবলি কে হবেন, কে হবেন বিভিন্ন সেক্টরের মহাদেব-তাই নিয়ে কুরুক্ষেত্র। বিভিন্ন সেক্টরের মহান পিতা হিসেবে অমরত্ব দাবী জমা পড়ছে প্রতিনিয়ত। জায়ান্ট যারা আছেন তারা আখের গুছিয়ে নিয়ে এখন ফিতা কেঁটে দিন কাটাচ্ছেন। আর যারা কাঁটবার মতো ফিতা পাচ্ছেন না, তারা অপরের পাজামার ফিতা খুলে নেবার চেষ্টায় পরস্পরের চরিত্রস্খলন, কাদা ছোঁড়াছুড়ি করে সময় কাটাচ্ছেন।

একজন চান্স পেলে অনলাইনে সরাসরি কিংবা ছদ্মভাষায় ল্যাঙ মারছেন। কারো ভাল কাজ দেখলে সেটাকে ইনিয়ে বিনিয়ে পঁচাচ্ছেন। না পারলে নিজের নাক কেঁটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করছেন। আমজনতা প্রোফেশনাল যে কয়জন নিরপেক্ষ এখনো আছেন কিংবা যারা উদভ্রান্ত, দ্বিধাগ্রস্থ বা কানাউলায় আক্রান্ত-তাদের রোজ খন্ড খন্ড করে ভাগাভাগি করে নিজের কোর্টে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। করুন, সেটা তাদের পছন্দ। কিন্তু আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের কী হবে? আমরা যে একটু দু’পয়সা করে খাব, সবার আশির্বাদ নেব, সেটার রাস্তাও তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর বড়দের যুদ্ধের পাটা-পুতায় মরিচ পেষা হয়ে শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা আমাদের। বিব্রত আমরা আমজনতা। দয়া করে সবাই সব ভেদাভেদ/হামবড়ায়ি/দ্বন্দ্ব/মতভেদ স্বত্ত্বেও এক হোন। এক হতে না পারেন নিজেরা চুপ থাকুন। আমাদের দ্বিখন্ড, ত্রিখন্ড না করুন। আপনি যদি সেক্টরের স্বপ্নদ্রষ্টা, আদি পিতা হয়েই থাকেন, আমরা আপনাকে এমনিতেই চিনি, আপনাকে শ্রদ্ধা করি, আপনার পাওনা সম্মানটুুকু দিই। আপনাকে নিজের অমরত্ব নিজে দাবী করতে হবে না। [এমনটা অবশ্যই সবাই নন। যারা নন, তারা এর আওতার বাইরে। আর যারা ভাল কাজ করছেন তারা নমস্যঃ ব্যক্তিত্ব। কেউ ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না দয়া করে।]

আমাদের আরএমজি সেক্টরের বয়স চার দশক হতে চলল। এমন একটি স্থায়ী সেক্টরের জন্য প্র্রফেশনাল সংগঠন তৈরীর স্বপ্ন দেখা, ভিত্তি প্রতিষ্ঠা, কাঠামো দেয়া’র মতো কঠিন কাজটি কিন্তু সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। আমাদের এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হল, সংগঠনকে গোছানো, বড় করা, সুসংগঠিত করা, স্থিতিশীল করা, বহুমুখী করা; আর হ্যা, অবশ্যই, এর সদস্যদের জন্য একটি সত্যিকারের প্রোফেশনাল প্লাটফরমে পরিণত করা। দেশের প্রাইভেট সেক্টর সবমিলিয়ে এখন বিশাল। মোট সৃজিত চাকরীর ৯৫% (আনুমানিক) প্রাইভেট সেক্টরের। তার মানে দেশের চাকরীরত ও রিটায়ারমেন্টে যাওয়া পেশাজীবিদের সিংহভাগই প্রাইভেট সেক্টরের। তার আবার একটা বিশাল অংশ এইচআরের।

প্রায়ই ব্যাঙের ছাতার মতো সংগঠন গড়ে ওঠা নিয়ে আমি লেখালিখি করি। আমি জানি, আমি অনেকের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছি হয়তো এজন্য। অনেকেই আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, এই বিষয়টা নিয়ে কিছু লিখতে। নিজের অব্যক্ত কথা আর জনমানুষের অনুরোধের প্রেক্ষিতে এই বিষয়টি নিয়ে আমার ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন চেষ্টাগুলো সমন্বিত করে এই লেখাটি লিখলাম। একজন সাধারন আরএমজি প্রোফেশনাল হিসেবে আমাদের অসংখ্য গ্রাউন্ড বেজড ও ভার্চুয়াল বেজড সংগঠন ও গ্রূপগুলোর জন্য কিছু আহবান রেখে যেতে চাই:

১.আমি অসংখ্য সংগঠন গড়ে তোলার সমালোচক ও সমর্থক-দুটোই।

সমালোচক, কারন চাওয়া ও পাওয়ার অনেক কথা আছে। স্পেশালাইজড প্রোফেশন বা সেক্টর নিয়ে আলাদা সংগঠন বানাতে যাওয়ায় সার্বিক ঐক্য ভাগ হয়েছে। শক্তি কমেছে অযথাই। বেড়েছে প্রান্তিকতা।

সমর্থক এজন্য যে, সেক্টর ও ট্রেড ভিত্তিক গ্রূপ হলে তৃণমূলের সাথে তাদের সাংগঠনিক সম্পর্ক আরো নিবিড় করার সুযোগ থাকে। তাছাড়া একাধিক সংগঠন গড়ে ওঠার অনেক কারনও আছে। সেক্টরওয়াইজ নিজস্বতাও হয়তো একটি কারন। আন্তঃসেক্টর স্বার্থের সংঘাতও জড়িত। প্রোফেশনাল উন্নয়নে, সদস্যদের ভাগ্য সুরক্ষায় অনেক কিছু করার বিরাট সুযোগ আছে এই সংগঠনগুলোর।

২.আমরা সংগঠনকে তার সদস্যদের পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো সেবা প্রদানের ওয়ান স্টপ সেন্টার হিসেবে দেখতে চাই। আমরা সংগঠন বানাই যে কারনে তার সবচেয়ে বড় কারন-সংগঠিত হওয়া আর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সংগঠনকে কে আমি ও আমার মতো গণমানুষেরা দেখতে চাই, আমাদের পাশে যেকোনো বিপদে দাড়ানোর মতো অভিভাবক হিসেবে। দেশের সাধারন বা প্রান্তিক শ্রমিকরাও আজ যেই ক্যারিয়ার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পায় তাদের বিভিন্ন সংগঠন হতে, এমনকি সরকারী এসটাবলিশমেন্ট হতে, আমরা সেই সেবা বা সুরক্ষাবোধ পেতে চাই সংগঠন হতে। আমরা দেখতে চাই, আমাদের যেকোনো বিপদে সংগঠন আমাদের সাপোর্ট দিচ্ছে। আমাদের হয়ে লড়ছে। দরকারে উকিল দিয়ে হলেও।

৩.প্রতিটি সংগঠনের অবশ্যই একটি সংবিধান ও মেনেফেস্টো আছে। সেটিকে প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য (আসলে পড়ুন, সবার কাছে অর্থবাহী) করতে হবে। আর তার প্রচার করতে হবে। বন্যার সময় ত্রান আর দামী দামী কনফারেন্স করেই কিন্তু আপামর জনগনের সংগঠন হতে পারব না আমরা। সেই সংবিধান শুধু সংগঠনের ভোটে পাশ না হয়ে উন্মুক্ত গনশুনানি বা গণপঠন হতে মতামত নিয়ে করলে আরো ভাল।

৪.চাকরী দাতা ও প্রার্থীদের একটি কমোন হাব হিসেবে সংগঠনকে গড়ে তোলা খুবই দরকার। সময়ে বা অসময়ে চাকরী হারিয়ে অকূল পাথারে পড়াদের বেদনা আরেকজন পেশাজীবি ছাড়া আর কে বুঝবে? আমরা এতটুকু নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে পারি যে, সংগঠনের সদস্যরা যার যার কোম্পানীর যেকোনো জব ওপেনিং সংগঠনের সাইটে বা পেজে শেয়ার করবেন। সংগঠনের একটি সিভি ব্যাংক, ডাটা ব্যাংক, জব পোর্টাল বানাবার দিকে নজর দিতে হবে। নিজস্ব জব পোর্টাল। ওই তথ্য ব্যাংক যেকোনো সদস্যের সাথে (বাইলেটারাল) যোগাযোগের জন্য কাজে লাগানো যাবে।

৫.সদস্যদের এ্যকটিভ হতে হবে। সবগুলো ও সবধরনের প্লাটফরম মিলিয়ে বিশাল সংখ্যক একটি পেশাজীবি কোনো না কোনোভাবে যুক্ত আছেন কোনো সংগঠনের সাথে। কিন্তু তাদের মধ্যে নিয়মিত ও সক্রিয় সদস্য খুব কম। নিয়মিত যোগাযোগ, শেয়ারিং, কেস স্ট্যাডি, প্রবলেম শেয়ারিং, গুড প্রাকটিস শেয়ারিং, নলেজ গেদারিং, পরামর্শ দান-এই সেবাগুলো চালু ও চর্চা হওয়া দরকার। শুধু প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী বা বিশেষ দিবসে নয়, সারাবছর এই শেয়ারিং হওয়া দরকার। সদস্যদের একটিভেট করার জন্য কিছু না কিছু করার উদ্যোগ নিতে হবে সংগঠনকে। সদস্যরা শুধু বিভিন্ন ইভেন্টে দল বেঁধে যোগদান করলে কোনো লাভ হবে না। পাশাপাশি ইসি’র সাথে সাধারন সদস্যদের বিষয়ভিত্তিক যোগাযোগটি বাড়াতে হবে।

৬.সংগঠনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, মেইল আইডি, পেজ বা গ্রূপের সুস্পষ্ট রুলস থাকা উচিত। অনলাইন গ্রূপের নিয়ন্ত্রণ ও মডারেশনের জন্য নির্ধারিত মডারেটর থাকা দরকার। “অধিক সন্নাসিতে গাঁজন নষ্ট” যেন না হয়। সবাই যদি শৃঙখলা বিধানে নামেন, তাহলে বিশৃঙ্খলা বরং বাড়ে। অনলাইন ফোরামগুলো যেমন: ফেসবুক পেজ, টেলিগ্রাম গ্রূপ, হোয়াটসএ্যাপ গ্রূপ এগুলোর জন্য বিষয়ভিত্তিক নিয়মিত পোষ্ট, আপডেট দেবার মানুষ ঠিক করা দরকার। সদস্যদের সংগঠনের আরো সমৃদ্ধ করার জন্য আইডিয়া শেয়ার হওয়া দরকার। তবে হ্যা, সব কাজ ইসিদের ঘাড়ে না চাপিয়ে সবারই শেয়ার নেয়া উচিৎ।

৭.সংগঠনের জুনিয়র ও সিনিয়র সদস্যদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক শেয়ারিং, লার্নিং বাড়ানো দরকার। এইচআর নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য অদুর ভবিষ্যতে প্রচুর চ্যালেঞ্জ আসছে। সেগুলোর জন্য নিজেদের তৈরী করতে হলে নলেজ ক্রিয়েটিং ও নলেজ শেয়ারিং এর বিকল্প নেই। প্রতিমাসে একটি এক ঘন্টার টি-সেশন করা যায় যেখানে আমাদেরই একজন সিনিয়র পার্সোন তার অভিজ্ঞতা বা আইডিয়া নিয়ে কথা বলবেন। বাকিরা শুনবেন। তাছাড়া আমাদের স্পেশালাইজড এইচআর ট্রেইনীং দরকার। শুধু লেবার ল বা OHS নয়।

৮.সংগঠনগুলোকে ভার্চুয়াল হতে গ্রাউন্ড বেজড করতে হবে। শুধুমাত্র ফেসবুকে একটি পেজ বা গ্রূপ থাকাটাই যথেষ্ট নয়। তাদের স্থায়ী অফিস থাকা ও অফিসের জন্য কমপক্ষে একজন স্থায়ী সেক্রেটারী নিয়োগ দেয়া দরকার। তার কাজ হবে অফিস চালনা। পাশাপাশি সংগঠনের সমস্ত ঘটনা, প্রোগ্রামের রেকর্ড বানানোও তার কাজের অংশ হবে।

৯.বিভিন্ন পারপাসে যে নির্দিষ্ট কমিটি করা আছে তাদের এককভাবে একটিভ হতে হবে। কমিটিগুলোকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে, স্বাধীন হতে হবে। সবকিছু একজনের ভরসায় চলতে থাকলে কোনোটাই হবে না। মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ইসি’র ফরমাল মিটিং করা দরকার, ফর্মাল মিটিং যেভাবে হয়, সেভাবে। আমি দেখেছি, নিয়ম রক্ষার মিটিংগুলোও আড্ডায় রূপ নিতে। ট্রেইনীং, ইফতার পার্টি বা পিকনিকের মতো এনজয়মেন্টের পাশাপাশি সিরিয়াস ধরনের প্রোগ্রাম করাটাকেও নিয়মিত করা দরকার।

১০.বার্ষিক চাঁদা না হয়ে মান্থলি চাঁদা হতে পারে সংগঠনের ব্যয় সংস্থানের উপায়। পাশাপাশি ফান্ড বড় করার ফরমাল স্টেপ নিতে হবে। স্পন্সর বেজড প্রোগ্রাম এরেঞ্জ না করে নিজস্ব ফান্ড হতে করতে পারলে নিজেদের প্ল্যানমতো প্রোগ্রাম করা যায়। হ্যা, ওই ফান্ড রেইজিং করার জন্য স্পন্সর নেয়া যায়।

১১.সদস্য বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরী ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ব্যাপারটিকে ইন্সটিটিউশনালাইজ করতে হবে। ”মেহেম্মেদ যদি পাহাড়ের কাছে না যায়, তবে পাহাড় মেহেম্মেদের কাছে আসবে” এই পুরোনো প্রবাদটিকে সংগঠনের অপারেশনাল ম্যনুয়েলের বেলায় প্রয়োগ করতে হবে। মানে, সংগঠনটিকে মানুষের কাছে নিয়ে যাবার চেষ্টা করা। মহিরুহ হোন বা মূসীক, সংগঠনকে জনমানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ইন্টার‌্যাকটিভ, কানেকটেড, কমিউনিকেটেড, প্রোএ্যাকটিভ, ডাইনামিক সংগঠন প্রত্যাশা করি আমরা। “মহান স্বত্ত্বা” হয়ে দূরে দাড়িয়ে থাকা সংগঠন নয়। সংগঠন হতে উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রোফেশনালদের কাছে বা গ্রূপের কাছে যেতে হবে। বিশেষভাবে বিভিন্ন কর্পোরেট ও ইউনিভার্সিটিতে প্রোগ্রাম করতে হবে।

১২.একটি একক সংগঠনের স্বপ্ন যদি যৌক্তিক ও বাস্তব কারনে সম্ভব নাও হয়, আমরা আরেকটি বিকল্প পথে হাঁটতে পারি। তা হল, সব পেশাদার সংগঠনকে নিয়ে একটি সমন্বয় সাধনকারী কেন্দ্রীয় বডি তৈরী। যতগুলো প্ল্যাটফরম এইচআর/কমপ্লায়েন্স/এ্যাডমিন নিয়ে আছে, সবাইকে নিয়ে একটা জোট/কনসোর্টিয়াম/এলায়েন্স গড়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এই ফোরামটি নিজে কোনো স্বত্ত্বায় পরিনত না হয়ে তার মূল লক্ষ্য “সমন্বয়” ও “সংযোগ” সাধন করবে। তাহলেই সে সত্যিকারের একটি অভিভাবক ফোরামে পরিণত হবে। ইতোমধ্যেই একটি প্লাটফরম এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে গড়ে উঠেছে এবং সে কাজও শুরু করেছে। হতে পারে, আমরা সবাই এখানেই মিললাম। সবগুলো ছোট বড় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একত্রে বসে এই ঐক্য প্রক্রিয়াটা এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ শুরু করা জরুরী।

১৩.আর্থিক খাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা, পরিকল্পনামাফিক ব্যয় এবং সদস্যদের কাছে গ্রহনযোগ্য ও চাওয়ামাত্র প্রদেয় একটি হিসাব, অডিট ও উপস্থাপন যদি না থাকে, তাহলে পাড়ার একটি সামান্য ক্লাবও সদস্যদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা হারায়। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংগঠন চালাতে হলে আর্থিক খাতের সুস্পষ্টতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।

১৪.গণতন্ত্র-বহুল উচ্চারিত ও কাঙ্খিত একটি বিষয়। স্বৈরাচারিত্বের প্রতিবাদে নতুন সৃষ্ট সংগঠনও দেখা যায় একসময় নিজেই স্বৈরাচারে পরিণত হয়। সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও নিয়মিত ভোট হওয়া দরকার। এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহনেও গণতন্ত্র চর্চা ও ভোটিং চালু করা উচিত। সদস্যদের ফিডব্যাক ও মতামত নেবার কোনো ব্যবস্থা সংগঠনগুলো কমই রাখে। সদস্য ও শুভাকাঙ্খীদের মতামত, পরামর্শ, আইডিয়া, অনুযোগ, অভিযোগ, চাহিদা জানার কার্যকর ব্যবস্থা সংগঠনকেই নিতে হবে। ফেসবুক পেজ ও লিংকডইন পেজ নিয়ে কার্যকর একটি ইনটারেকটিভ ফোরাম সৃষ্টি সম্ভব।

১৫.একটু বায়াজড মনে হতে পারে, তবু সাহস করে বলছি, দেশের সবচেয়ে বড় সেক্টর আরএমজিকে যেকোনো সংগঠনের বিশেষ নজর/মর্যাদা/স্টাটাস/গুরুত্ব দিয়ে চলা উচিৎ-নিজের স্বার্থেই। মনে রাখতে হবে, আমরা কোনো এলিট ক্লাব দেখতে চাই না। আমরা চাই গণমানুষের সংগঠন বানাতে। মান যেমনই হোক, আরএমজির HR (আসলে HR/এ্যাডমিন/কমপ্লায়েন্স এর একটি সম্মিলিত রূপ) যেকোনো বিচারে, আকারে ও ব্যাপ্তিতে দেশের বৃহত্তম HR। তাদের বাস্তবতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংগঠন এর স্ট্রাটেজিক প্যাটার্ন সাজানো উচিৎ।

১৬.সংগঠনে একটি গবেষনা ও থীংক ট্যাংক সেল করতে হবে যারা মূল গ্রূপকে এ্যাসিস্ট করবে। আর মূল কমিটি/ইসির সাথে ওই সেলকে সিংক্রোনাইজড করতে হবে।

১৭.সরকার কর্তৃক সৃষ্ট ওয়েলফেয়ার ফান্ড এর আদলে সংগঠনের নিজস্ব একটি ফান্ড থাকা দরকার। যেখান থেকে নিয়মিত তার সদস্যদের আর্থিক সাহায্য, লোন, দান এমনকি সম্ভব হলে পেনশন বা এককালীন ভাতাও দেয়ার কথা ভাবা যেতে পারে।

 

আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে সংগঠক হিসেবে খুব ভাল নই। কিন্তু তারপরও সংগঠন নিয়ে আমার এত কনসার্নড হবার একটা কারন হল, দেশে সত্যিকারভাবেই একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বেসরকারী পেশাদার সংগঠন থাকা দরকার। যার সবরকম ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে আছে। বিভিন্ন সংগঠনের উপর অনুযোগ ও আশাহত হবার ঘটনা হতে প্রচুর বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক সংগঠন গড়ে উঠেছে ও উঠবে। যার ফলে প্র্রোফেশনালদের, বিশেষত এইচআরের ঐক্য দিন দিন আরো নষ্ট হবে। তাছাড়া একটি সংগঠন যদি তার কাজটা না করে আর কেউ যদি সেই বাস্তবতা হতেই আরেকটি সংগঠন দাড়া করার চেষ্টা করে, তাকে দোষ দেয়া যায় না। আমি আশা করি, আমাদের সংগঠনগুলো তাদের করনীয়টি এই বাস্তবতা হতেই ঠিক করবে। সংগঠন যেন কোনো বিশেষ ব্যক্তি, দল, ফোরাম, অঞ্চল, পেশা, মুগ্ধতা, কৃতজ্ঞতার সংগঠন না হয়।

সংগঠন যেন হয় বাংলাদেশের সকল ধরনের বেসরকারী প্রোফেশনালদের ভরসার প্লাটফরম।

লেখক : এইচআর/এডমিন পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সিলর, লেখক

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*