পোশাক শিল্পে “উৎসব ভাতা” যেন মালিকের দয়া বা কল্যাণমূলক কার্যকলাপ

এম. মাহবুব আলম

শিরোনাম দেখার পর হয়তো অনেকেরই বিরাগভাজন হব, কিন্তু সম্পূর্ণ লেখাটি পড়লে এই শিরোনাম দেয়ার কারণ উপলদ্ধি করতে পারবেন।

উৎসব একটি সার্বজনীন বিষয়, আনন্দ ফূর্তি আর বিশেষ কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যার ব্যাপ্তি। যাই হোক এই উৎসব পালন করতে গেলেই সেখানে ব্যয়ের কথাটি চলে আসে, তাই পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই তাদের নিজস্ব অথবা সার্বজনীন কিছু উৎসবে কর্মরত সকলকেই “উৎসব ভাতা” প্রদান করা হয়। যেটাকে উৎসব বোনাসও বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও সকল সরকারী, বেসরকারী, স্বায়ত্বশাসিত ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সবক্ষেত্রেই উৎসব ভাতা বা বোনাস প্রদান করা হয়ে থাকে। পোশাক শিল্পও এর ব্যতিক্রম নয়।  পোশাক শিল্পের জন্য ২০১৫ সালে প্রণীত শ্রম বিধিমালায় সর্বপ্রথম এই উৎসব ভাতা এর কথাটি সংযোজন করা হয়, এর আগে শ্রম আইনে এটি ছিলোনা তবে অনেক কারখানায় এই ভাতা প্রদান করা হত। আর তখন এটাকে মালিকের দয়া বা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ওয়েলফেয়ার এক্টিভিটিস বা কল্যাণমূলক কার্যাবলী বলে অভিহিত করা হত।

তবে ২০১৮ সালে শ্রম আইনের যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে সেখানে এই “উৎসব ভাতা”র কথা বলা হয়েছে, শ্রম আইনের  ধারা ২ এর দফা (২) এর পর নতুন দফা (২ক) সন্নিবেশিত –

“(২ক) “উৎসব ভাতা” অর্থ কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদেরকে তাহাদের স্ব স্ব ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে প্রদেয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত উৎসব ভাতা;”

খেয়াল করুন বিধি দ্বারা নির্ধারিত, আসুন বিধি কি বলে , “বিধি ১১১এর উপ-বিধি ৫ অনুযায়ী – প্রতিটি কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে যাহারা নিরবচ্ছিন্নভাবে ১ (এক) বৎসর চাকরি পূর্ণ করিয়াছেন তাহাদেরকে বৎসরে দুইটি উৎসব ভাতা প্রদান করিতে হইবে।

তবে শর্ত থাকে যে, প্রতিটি উৎসব ভাতা মাসিক মূল মজুরির অধিক হইবে না,উহা মজুরীর অতিরিক্ত হিসাবে বিবেচিত হইবে”।

খেয়াল করুন বিধি দ্বারা নির্ধারিত আর বিধি শর্ত দিয়ে বলে দিয়েছে “প্রতিটি উৎসব ভাতা মাসিক মূল মজুরীর অধিক হইবেনা” অর্থাৎ কম দেয়া যাবে শুধু বেশি দেয়া যাবে না, এখন যদি কোন মালিক ৫০০ টাকা বা তার চেয়েও কম দেয় তাহলেও সেটা জায়েজ বিধি অন্তত তাই বলে। আসি সেই ২০১৫ সালের আগের কথায়  “শ্রম আইনে এটি ছিলোনা তবে অনেক প্রতিষ্ঠানেই এই ভাতা প্রদান করা হইতো আর তখন এটাকে মালিকের দয়া বা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ওয়েলফেয়ার এক্টিভিটিস বা কল্যাণমূলক কার্যাবলী বলে অভিহিত করা হত”। এখন যেহেতু মালিক কম দিলেও পারেন কিন্তু বেশি দিচ্ছেন তার মানে দয়া করে অথবা কল্যাণ করছেন তাইতো বুঝায়, তবে পরিবর্তন শুধু একটাই হয়েছে আগে না দিলেও সমস্যা ছিলোনা এখন কিছু না কিছু দিতে হবে।

বিধিমালায় এভাবে আসার  সময় অনেকেই বলেছেন যে, এটা এভাবে করা হয়েছে এই কারণে যে সবাই যেন একই রকম দেয় কেননা বিভিন্ন কারখানা বিভিন্নভাবে দিলে সমস্যার সৃষ্টি হয় কিন্তু বিধিমালা আসার পরে কি এ সমস্যার সমাধান হয়েছে? জানামতে হয়নি, যেমন এখন এক প্রতিষ্ঠান দেয় বেসিকের অর্ধেক আরেক প্রতিষ্ঠান দেয় গ্রোস এর অর্ধেক  আরেক প্রতিষ্ঠান দেয় সম্পুর্ণ বেসিক আবার কেউ কেউ ১ বছর হলে দেয় কেউ আবার তার কম হলেও আলাদা হিসেবে দেয়,এভাবে বিভিন্নজন বিভিন্ন রকম দেয়। আইন বা বিধিতে সবসময় সর্বনিম্নটাই বলা থাকে যেমন মজুরী গেজেট কিন্তু উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চটা বলা হয়েছে, কারণ বোধগম্য নয়!

২০১৮ সালের শ্রম আইনে সংশোধনী আসার আগে অনেক জায়গায়ই এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আমরা যারা শ্রম আইন নিয়ে মূলত বাস্তবে কাজ করি তাদেরও একটা পর্যবেক্ষণ ছিলো যে এখানে নির্দিষ্ট করে দেয়া যে “এর কম দেয়া যাবেনা”, এটি থাকলে যে দেয়ার মধ্যে ভিন্নতা থাকতো না তেমনটা নয় তবে অন্তত নির্দিষ্ট একটা অবস্থায় একই থাকতো কিন্তু সেটা করা হয়নি, যার ফলে সেই আইন বিধিমালা আসার আগে যে অবস্থায় ছিলো সে একই অবস্থায়ই আছে, অর্থাৎ মালিক যেভাবে চাইবেন সেভাবেই দিতে পারবেন  ১০০/৫০০ এর বেশি দিলেই সেই “দয়া বা করুণা বা ওয়েলফেয়ার এক্টিভিটিস বা কল্যাণমূলক কার্যকলাপ” তবে আরেকটু ভালোভাবে “ভালবাসার প্রতিদানও” বলতে পারি!

তাই পরবর্তী আইন সংশোধন বা বিধির সংশোধনীর সময় বিষয়টি সবাই খেয়াল রাখবেন বলে আশা করছি।

লেখক- ম্যানেজার (মানব সম্পদ ও কমপ্লায়েন্স), ইউনিফর্ম টেক্সটাইল লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*