কোন কোম্পানীতে কেন এবং কখন একজন এমপ্লয়ী দীর্ঘদিন কাজ করবে?

জসীম উদ্দীন

আমি যে কোম্পানীতে জব করি সেই কোম্পানী প্রতিমাসে ৮০/৯০ লাখ পিচ এক্সপোর্ট করে। আমাদের কোম্পানী বাংলাদেশের রপ্তানীর ক্ষেত্রে টপ ফাইভে আছে। আমাদের ফ্যাক্টরী স্যুটিং স্পটের মত সুন্দর! টোটাল ম্যান পাওয়ার ৩০,০০০ এরও বেশী! আমাদের ৭০ টা ইউনিট আছে এবং ১ থেকে ১.৫ লক্ষ বর্গফুটের ৮তলা বিশিষ্ট ১০টা বিল্ডিং আছে! আমাদের সব অফিসে এসি আছে, আমার রূমে দুইটা এসি সাথে এটাচটড বাথরুম। আমাদের প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে ডাইরেক্টর আছে। প্রতি বছর পিকনিক হয়। বিদেশী বসও আছে কয়েক ডজন। আর একেকজনের বেতন ১০/১৫ লাখ টাকা। এর ছাড়াও উল্লেখ করার মত আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেগুলো আসলে মালিক বা কোম্পানীর সম্পদ কিন্ত এমপ্লয়ীরা আবেগ আপ্লুত হয়ে নিজের মনে করে। অনেকে আবার মালিকের আত্নীয় পরিচয় দিয়েও গর্ববোধ করে। একটু গভীরে গিয়ে দেখি উপরোল্লিখিত এই বিষয়গুলো একজন এমপ্লয়ীর জন্য আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, নাকি এর বাইরে অন্য কিছু দরকার আছে?

আমার কাছে একজন এমপ্লয়ী হিসেবে যে জিনিসগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা হলঃ-.

১। কোম্পানীতে আপনার অবস্থান কোথায়ঃ আপনি যে কোম্পানীতে যে বিভাগে কাজ করেন সেই বিভাগে আপনার কাজের অবস্থান কেমন? কারণ, আপনার এই অবস্থানই আপনাকে কোম্পানীতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আপনার অবস্থান যদি সাধারণের মত হয় তা হলে আপনি যেকোন সময় দল ছূট হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। প্রাধাণত কাজ গুলো চার প্রকারের হয়ে থাকে। যেমনঃ ক) শেখা সহজ করাও সহজ, খ) শেখা সহজ করা কঠিন, গ) শেখা কঠিন করা সহজ এবং খ) শেখাও কঠিন করাও কঠিন। এখন আপনি যদি প্রথম দুই ক্যাটাগরীতে কাজ করেন তাহলে আপনি যে কোন দিন পজিশন হারাতে পারেন। তাই নিজেকে কমপক্ষে ৩য় ক্যাটাগরীতে নিয়ে যেতে হবে যাতে খুব সহজেই আপনার বিকল্প চিন্তা করতে না পারে।

২। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা আছে কিনাঃ আপনাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেয়া হয়েছে এবং অনেক বড় পজিশন। কিন্তু আপনার ডিপার্টমেন্ট নিয়ে আপনি কোন স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননা বা নিলেও তা টপ ম্যানেজমেন্ট অনুমোদন করেনা। তাহলে আপনি আপনার যোগ্যতা দেখাতে পারবেন না বা বাস্তবে যেই লাউ সেই কদুই ফলাফল হবে।

৩।আপনার বস আপনাকে বুঝে কিনাঃ যে কোন কাজে সাফল্যের জন্য রিপোর্টিং বসের সাথে বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি যে কোন সিদ্ধান্ত নিলে বা কোন পরামর্শ দিলে অথবা বস কোন নির্দেশিকা দিলে তা বাস্তবায়নে আপনি যে পন্থা অবলম্বন করতে যাচ্ছেন তা আপনার বস কিভাবে নিচ্ছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৪। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বসের সহযোগিতা পান কিনাঃ আপনার সফলতার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তা হল আপনাকে দেয়া নির্দেশনাগুলো সঠিক সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেক রকমের জটিলতা থাকে যা রিপোর্টিং বসের একান্ত সহযোগিতা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

৫। আপনার উপর বসের আস্থা আছে কিনাঃ বস আপনাকে তখনই সহযোগিতা করবেন যখন আপনার উপর উনার আস্থা থাকে। ইতিপূর্বে দেয়া সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে যথাসময়ে আপনাকে দেয়া টাস্কগুলো যদি আপনি সম্পন্ন করে থাকেন তাহলেই কেবল বস আপনার উপর আস্থা রাখবেন এবং ধীরে ধীরে বড় দায়িত্ব দিবেন।

৬। আপনার টীমকে আপনি মনের মত সাজাতে পারেন কিনাঃ  বিভাগীয় সফলতার জন্য টিম সাজানো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। টিমের মধ্যে যদি ঘুণে ধরা এবং ফাকি দেয়ার মানসিকতা সম্পন্ন লোকের আধিক্য থাকে অথবা গ্রুপিং করার লোক থাকে তাহলে কখনোই কাংখিত সফলতা আসবেনা। তাই টিম গঠনের স্বাধীনতা থাকাটা কাজের সফলতার জন্য জরুরী। তবে অনেকেই এই স্বাধীনতাটার মিস ইউজ করে যার কারণে কাংখিত সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই দ্রুতগামী হয়।

৭। দক্ষতা বাড়ানো এবং কাজে লাগানোর সুযোগ আছে কিনাঃ কোন মানুষই পরিপূর্ণ নয়। প্রত্যেকেই কাজ শিখতে শিখতে একদিন দক্ষ লিডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই আপনার অফিসে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ থাকাটা অনেক জরুরী। আমাদের দেশে এমন অনেক ম্যানেজমেন্ট আছে যারা জব মার্কেট থেকে বাঘ খুঁজে এনে গাধার ভুমিকায় কাজ করায়। এরপর না আছে ট্রেনিং না আছে অনুপ্রেরণা। অনেকেই মনে করে যে ট্রেনিং করলে বেশী যোগ্যতা অর্জন করলে অন্যত্র চলে যাবে।

৮। আপনার বস কান কথা বা তেল পছন্দ করে কিনাঃ এই বিষয়ে বিস্তারিত বলার দরকার নাই। পাঠককুল আমার চেয়ে ভাল জানেন। তবে এই রকম বস হলে দ্রুতই অন্যত্র চেষ্টা করা উচিৎ।

৯। অহেতুক প্যারা আছে কিনাঃ অনেক কোম্পানীতে কিছু অহেতুক প্যারা থাকে। যেমন অপ্রয়োজনীয় মিটিং, কাজ কম থাকলে কাউকে বসে থাকতে দেখলে খারাপ ব্যবহার। এক বিভাগের ভুলের জন্য আরেক বিভাগকে দায়ী করা, এক বিভাগের কাজ অন্য বিভাগকে দিয়ে নিয়মিত প্যারা দেয়া ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো অনেকে এড়িয়ে যান ঠিকই তবে দীর্ঘমেয়াদে এইগুলো অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় এবং একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয় যা কাম্য নয়।

১০। কর্মঘন্টাঃ কর্মঘন্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একজন এমপ্লয়ীর জন্য। এটা বিস্তারিত বলার কোন প্রয়োজন নেই। অনেক কোম্পানী আছে যেখানে ইন টাইম থাকলেও আউট টাইম নাই। বিশেষ করে কয়েকটা ডিপার্টমেন্টের জন্য এটা খুবই পীড়াদায়ক একটা বিষয় এবং শুধুমাত্র এ কারণেই অনেকেই চাকরী ছেড়ে দেন।

১১। মাসের নির্ধারিত সময়ে বেতন দেয় কিনাঃ একটা ভাল কোম্পানীর জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ন বিষয় হল সঠিক তারিখে বেতন পরিশোধ করা। “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার মজুরী দিয়ে দাও” হাদিসের এই নির্দেশনা পৃথিবীর কর্পোরেট জগতের অন্যতম কোড অব কন্ডাক্ট। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী যে সময় বেতন দেয়ার কথা সেই সময় দেয়াটাই এই হাদিসের মূল উদ্দেশ্য।

১২। প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট হয় কিনাঃ আপনি একটা কোম্পানীতে কত দিন থাকবেন তা নির্ধারণে সর্বাধিক যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ তা হল নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট। কম বা বেশী যাই হোক কোন কোম্পানী যদি তার নির্ধারিত সময়ের অন্তর বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট দেয় তাহলে এমপ্লয়ী তার নিজের মত করে একটা পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন কোম্পানীতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। আমাদের দেশে এখনও এমন অনেক কোম্পানী আছে যাদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট হয় ১৮, ২০ কিংবা ২২, ২৪ মাসে। তাই এইসব কোম্পানীর এমপ্লয়ী মাইগ্রেশণ রেট অনেক বেশী। এইচআর একাউন্টস করে দেখলে দেখা যাবে এতে কোম্পানীর অনেক বেশী লস হচ্ছে।

পাঠকবৃন্দ হয়তো বলবেন আরো অনেক বিষয় উল্লেখ করার আছে যেমন, পিএফ, ইএল , কেন্টিন, ডরমেটরী, টিফিন, ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদি উল্লেখ করিনি কেন? একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবেন এইগুলো হল ফেসিলিটি কিন্তু প্রধান উপাদান নয়, আর এমপ্লয়ীর জন্য মুল্যবান হল সেসব উপাদান যা তাকে সুদীর্ঘ সময় কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক ভুমিকা রাখে। হ্যা, শেষের সুবিধাগুলো থাকলে কর্ম পরিবেশ আরো সুন্দর হয় যেটাকে আমরা বলতে পারি ডেকোরেশন।

লেখকঃ ডিজিএম-স্টোর, টেক্সইউরোপ (বিডি) লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*