ইন্টারভিউ ও সংশ্লিষ্ট নানান হ্যারাসমেন্ট

ওয়ালিদুর রহমান :

দীর্ঘদিন ধরে ক্যারিয়ার ও প্রোফেশন নিয়ে লেখালেখি করি। বিশেষভাবে ইন্টারভিউ ও জব হান্টিং সংক্রান্ত লেখাগুলো পড়ে প্রচুর পাঠক অভিযোগ করেন ইন্টারভিউ’র অসারতা আর নিয়োগকর্তাদের অসততা নিয়ে।

আমি তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমার নেটওয়ার্কে থাকা যত এমপ্লয়ার আছেন, এইচআর প্রোফেশনাল আছেন, জব লিংকার, জব পোর্টালের মালিক/কর্মীরা আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে এই লেখাটি লিখছি। আপনারা নিজের নিজের প্রতিষ্ঠানের এইচআর সিস্টেম, ইন্টারভিউয়িং, রিক্রূটিং, সিলেকশন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে একটু খোঁজ নিন।

আমি জানি, হয়তো সেগুলো নিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত, হয়তো খুব মানসম্পন্ন প্রক্রিয়া অনুসরন করে আপনার প্রতিষ্ঠান, হয়তো আপনার এইচআর নিয়ে আপনি খুবই কনফিডেন্ট। তবু একবারটি ঢুঁ মারুন। তাদের সাথে বসুন। ইন্টারভিউইদের সাথে বসুন। তাদের ফিডব্যক নিন। অনলাইনে আপনার এইচআর নিয়ে লোকে কী বলে, ইন্টারভিউ এসেসমেন্ট চেক করুন, প্রক্রিয়া চেক করুন, নিজের ওয়েবসাইটে, ফেসবুক পেজে আপনার এখানে ইন্টারভিউ ফেস করা মানুষদের প্রতিক্রিয়া নিন।

তাতে আপনি সত্যিকারেরর অবস্থাটা জানতে পারবেন। আমি বিগত ৬ মাসে বেশকিছু অনিয়ম, অসততা, অস্বচ্ছতা, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অদক্ষতা, ইন্টারভিউ’র নামে হ্যারাসমেন্ট, অন্যয্যতার খোঁজ পেয়েছি। সেগুলো নিচে বলছি। দেখবেন, আপনার প্রতিষ্ঠান এতে আক্রান্ত হয়ে বসে আছে কিনা?

১.সকাল ১০ টায় ইন্টারভিউ ডাকে। ইন্টারভিউ হয় দুপুর ২ টায়। মাঝখান হতে যেসব রানিং চাকরীজীবি শর্ট লীভ নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন, তারা হয় প্রচন্ড হতাশ বা বিরক্ত হয়ে চলে যান, আর তা না করলেও, বাইরে গিয়ে দশ যায়গায় আপনার প্রতিষ্ঠানের বদনাম করেন।

২.ভাত ছড়ালে কাকের অভাব নেই-হয়তো তা সত্যি। কিন্তু এই মেন্টালিটি নিয়ে কাজ করে একটা বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও বিশেষত এইচআর। আমি নিজে দেখেছি। কিন্তু মুশকীল হল, ভাত ছড়ালে কাক হয়তো পাবেন, কোকিল পাবেন না। আপনাকে কাক নিয়েই সন্তুুষ্ট থাকতে হবে। পজিটিভ ও ডায়নামিকে এপ্রোচের এইচআর থাকাটা খুব জরুরী। তা না হলে তাদের থেকে প্রার্থীরা অন্যায়ের শিকার হবেন।

৩.সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হল, প্রার্থী আগে হতেই ফাইনাল করে রাখে। শুধু লোক দেখানোর জন্য সার্কুলার ডাকে কিংবা ইন্টারভিউয়ের নামে প্রহসন করে। আমি এই অভিযোগের সত্যতা ১০০ ভাগ না হলেও ৬০ ভাগ সমর্থন করি। অনেক প্রতিষ্ঠানই দেখা যাচ্ছে স্রেফ জব মার্কেটে অস্তিত্ব জানান দিতে, কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনী বাধ্যবাধকতা রক্ষা করতে জব পোর্টালে কিংবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। বিশেষত বিদেশী কর্মী নিতে হলে সার্কুলার দেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ওই সার্কুলার দেয়া আর না দেয়া সমান।

আপনি হয়তো মালিক হিসেবে এই নীতি সমর্থন করেন না। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার আস্থাভাজন এইচআর বিভাগের ধান্দাবাজ ও স্বজনপ্রীতি করা কর্মীরা নিজের নিজের বন্ধু, আত্মীয়, শালা, সম্মন্ধি, কাজিনদের চাকরী দিতে যোগ্য লোককে নিচ্ছে না। নানারকম বাঁধা সৃষ্টি করে রাখছে। ইন্টারভিউ ডাকছে আপনাকে দেখাতে। তলে তলে লোক ঠিক করে রাখছে। এটি স্রেফ অভিযোগ নয়। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। এমনটা হচ্ছে।

৪.আমি প্রায়ই বেশ কিছু যায়গা হতে প্রার্থী দেবার অনুরোধ পাই। তাদেরকে প্রার্থীদের সিভি দিই। খুব বিরক্তি ও ঘৃনা নিয়ে আমি দেখেছি, বেশ কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠান সিভি নেবার পরে, কিংবা এমনকি ইন্টারভিউ হয়ে যাবার পরে আমাকে জানিয়েছে, ভাই, ওই পদে লোক নেয়া হবে কিনা-কোম্পানী সেটা আবার ভাবছে। সেটা শেষ পর্যন্ত দাড়ায়, নিয়োগ বাতিলে। মাঝখান হতে বেশ কিছু লোক ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে হয়রানি, অর্থ, সময় ও মেন্টালিটির ক্ষয়। আপনি যদি নিজেই শিওর না হন যে আপনার লোক লাগবে কি লাগবে না, কেন আপনি সার্কুলার দেন?

৫.আপনার এইচআর বিশেষত এর ইন্টারভিউয়াররা নিজেরাই হয়তো যথেষ্ট কোয়ালিটি সম্পন্ন না। তারা নিজেরাই জানে না, কীভাবে একটি জবের জব ডেসক্রিপশন লিখতে হবে, কীভাবে একটি ভাল সার্কুলার দিতে হবে, কীভাবে একটি আধুনিক ইন্টারভিউইং ও এ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়া তৈরী করতে হয়, কীভাবে যোগ্য লোক বাছাই করতে হয়। জানবে কীভাবে? তাদের তো কোনো বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ এই জীবনে দেন নি। তাই তারা অনেক সময় ইনটেনশন না থাকলেও আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য লোক নিতে পারছে না। তাদের অজান্তেই আপনার প্রতিষ্ঠান যোগ্য লোককে দূরে সরাচ্ছে। আর মার্কেটে আপনার প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম ছড়াচ্ছে।

৬.ইন্টারভিউ বোর্ড নিজেই অনেক সময় জানে না, কোন ক্যাটেগরীর প্রার্থীকে কী প্রশ্ন করতে হয়। তাদের উল্টাপাল্টা প্রশ্ন আর অসংলগ্ন ইন্টারভিউ হতেই যোগ্য প্রার্থী আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরূপ ধারনা নিয়ে ফেলে।

৭.কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে আমি দেখেছি কমপক্ষে ২টি হতে ৬টি ইন্টারভিউ করে একজন প্রার্থীকে। আমার বন্ধু এই প্রক্রিয়ার সাক্ষী। এবার আপনি বলুন, কোন যোগ্য ও ব্যস্ত প্রোফেশনালের পক্ষে সম্ভব একটি পদের জন্য ৬টি ইন্টারভিউ ফেস করা।

৮.ইন্টারভিউ দিনের আগের দিন বিকালে ফোন করে বলে, কাল সকাল ১০ টায় ইন্টারভিউ। প্রার্থী হয়তো থাকে চট্টগ্রাম। জানারও চেষ্টা করে না বা বোঝার ধারও ধারে না যে, কীভাবে মাত্র একটি রাতের নোটিশে একজন এনগেজড মানুষ তার অফিস ম্যানেজ করে ইন্টারভিউতে আসবে।

৯.আমি নিজে দেখেছি, মহিলা প্রার্থীকে ডাকা হয়েছে শেষ বিকেলে। ইন্টারভিউ শেষ করে তার বের হতে হতে রাত। কীভাবে একটি মানসম্পন্ন এইচআর এই কাজ করতে পারে? এটি কি ইচ্ছা করে হ্যারাসমেন্ট ও এ্যাবিউসের রাস্তা তৈরী করা না?

১০.একজন প্রার্থীকে একজন ইন্টারভিউয়ার কর্তৃক ইন্টারভিউ করাটাকে আমার কাছে মূর্খতা মনে হয় যদি তারা বাধ্য না হয়ে থাকেন। কারন এতে একজন ইন্টারভিউয়ারের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, দৃষ্টিভঙ্গির একচ্ছত্র শিকার হন প্রার্থীরা। বিশেষত একজন নারী প্রার্থীকে একক ইন্টারভিউয়ার কর্তৃক ইন্টারভিউ করার মান ও ফলাফল নিয়ে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

১১.আদিম কালের মতো এখনো ফোনে ডেকে ইন্টারভিউ শিডিউল দেয়ার চর্চা করছে কেহ কেহ। ধরে নিন, একজন প্রার্থী ফ্লোরে আছেন, কিংবা বাসে, গাড়িতে আছেন। তাকে গরগর করে ইন্টারভিউ তারিখ, লোকেশন বলে দিল। লোকটি ঠিকানা কী করে মনে রাখবে, শুনল কিনা, পারবে কিনা, তার কোনো সুযোগ না দিয়েই কল শেষ। এর শিকার হচ্ছে প্রচুর প্রার্থী। এসএমএস ও মেইলে শিডিউল দেবার প্রথাতো বেশ পুরোনো হয়ে গেছে। প্রচুর ভাল প্রতিষ্ঠানকেও আমি দেখি ওগুলো অনুসরন করতে। কেন ভাই, এখনতো কোম্পানীর নিজস্ব ইআরপি সফটওয়্যার হতে দারুন ম্যানেজড পদ্ধতিতে ইন্টারভিউ ম্যানেজ করা যায়।

১২.আমাদের প্রতিষ্ঠান সিভি পাওয়া মাত্র একটি অটো এনসার দেয় যে সিভি পেয়েছি। ইন্টারভিউ হয়ে যাবার পরে ৪৮ ঘন্টার ভিতরে মেইল ফিডব্যক দিই যে তিনি চান্স পেলেন বা পেলেন না। প্রচুর প্রতিষ্ঠান এই ভদ্রতার ধারও ধারে না। গ্রীন ফ্যাক্টরীতেও আমি একই দেখেছি। গ্রীন মানেই দারুন কোম্পানী না।

১৩.আপনি মালিক হয়ে হয়তো জানেনও না। আপনার এইচআর কখনো কখনো প্রার্থীকে জয়েন করার দিন বলে দেয়, আপনার নিয়োগ বাতিল হয়েছে। আপনাকে আর আমরা জয়েন করাতে পারছি না। আমার সিনিয়র নিজে এই ভয়ানক কাজের ভুক্তভোগী। আপনি হয়তো জানেনই না, আপনার এইচআর এই কান্ড করছে। একজন মানুষ তার সেটেল চাকরী ছেড়ে জয়েন করার বা রিজাইন একসেপ্ট হয়ে যাবার পর যদি তাকে বলেন, আপনাকে জয়েন করতে দিতে পারছি না-এর চেয়ে বড় অন্যায় কী হয়?

১৪.ইন্টারভিউতে একরকম বেতন ও সুবিধা বলে, জয়েন করার পর অন্যরকম করার নজিরও দেখেছি। সতর্ক হোন। নিজের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে পাড়ার মুদি দোকানের সারিতে দেখতে না চাইলে।

যারা ইন্টারভিউ দেন, তারাও সতর্ক হোন, যারা নেন, তারাও একটু ব্যবস্থা নিন। মানুষের চাকরী না হোক, অন্তত তারা যেন হ্যারাসড না হোন। আর তাছাড়া, একটি ভাল ইন্টারভিউ একজন ভবিষ্যত সম্ভবনাময় প্রোফেশনাল হবার রাস্তা তৈরী করে। মার্কেটে আপনার প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়ায় একটি সম্ভাব্য ভাল ইন্টারভিউ।

লেখক : এইচআর/এডমিন পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সিলর, লেখক

1 Comment

  1. স্যার আপপনার প্রতিটিই উদাহরণই বাস্তব এবং যৌক্তিক। আমি নিজেও কয়েকবার হয়রানীর স্বীকার হয়েছিলাম। আশাকরি সবাই আপনার লেখাটি পড়ে নিজেদের সংশোধন করে নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*