চাটুকারের রাজত্বঃ প্রেক্ষিত বাংলাদেশের তৈরী পোশাক কারখানা

মীর আলতাফ হোসেন

-ইসলাম সাহেব, থ্রী স্টার কোম্পানীকে কাজটা দিয়ে দেন, ওদের এ কাজে ভাল অভিজ্ঞতা আছে।

-জি¦ স্যার, আমারও মনে হচ্ছে ওদের কাজটা দিলে ভাল হবে, অনেক ভাল প্রতিষ্ঠান।

-না না থাক, বিশ্বাস কোম্পানী নতুন হলেও ওদের প্রেজেন্টেশান ও আইডিয়াটা অনেক ভালো লেগেছে, ওদেরই কাজটা দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

-হ্যাঁ স্যার, আপনি ঠিকই ধরেছেন, আপনার বিচক্ষণতার জুড়ি মেলা ভার, বিশ্বাস কোম্পানীকেই আমাদের কাজটা দেওয়া উচিত, ওরা নতুন হওয়ায় ওদের আইডিয়াও নতুন হবে।

উপরের কথোপকথনে কারো বুঝতে বাকি থাকেনা যে,ইসলাম সাহেব ভাল-খারাপ বিবেচনা না করে অনায়াসেই বসের দুটো কথাকেই ঠিক বলে যুক্তি দেখিয়েছেন।

আমাদের দেশে অন্যান্য সেক্টরের মত তৈরী পোশাক কারখানায় ও চলছে এখন চাটুকার বা তৈলবাজদের রাম রাজত্ব। এদের চেনার মোক্ষম উপায় হলো, এরা কথায় কথায় জ্বি স্যার, হ্যাঁ স্যার ও ইয়েস স্যার শব্দগুলোর ব্যবহার বেশী করেন এবং নিজ প্রয়োজনে তৈলবাজি করতে করতে এমনকি দেশে তেলের সংকটও সৃষ্টি করতে পারেন!

দেশে পরিচালিত পোশাক কারখানার মালিকরা ব্যবস্থাপনা পরিষদ তৈরী করে সেখানে দক্ষ পরিচালক, নির্বাহী বা কারখানা প্রধানদের নিয়োগ দেন, সে কারখানা প্রধানদের অধীনে দায়িত্বপালন করেন অনেক ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা বা এ ধরনের কর্মী।

আবার যে সকল কারখানার মালিক বা মালিকগণ সরাসরি সে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিষদে যুক্ত, নিজেরাই সবকিছুর দেখভাল করেন, তাদের অধীনেও একইভাবে দায়িত্বভার ন্যস্ত থাকে ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা বা এ ধরনের কর্মীদের উপর।

বেশীরভাগ কারখানায় দেখা যায়, মালিক বা কারখানা প্রধান বা তাদের অধীনস্ত কর্মকর্তাদের নিজের কিছু লোক থাকে (এখানে বলে রাখা ভাল যে, নিজের লোক মানে শুধু আপন নয়, যারা সময়ে সময়ে তাকে তেল মর্দন করে বা কথায় কথায় চাটুকারিতার আশ্রয় নেয়) সে লোকগুলো মালিক বা কারখানা প্রধানদের সাথে থেকে কারখানার বিভিন্ন বিষয় বা ব্যক্তি সম্পর্কে ইনিয়ে বিনিয়ে রসিয়ে নালিশ করে থাকেন এবং অনেক মালিক বা কারখানা প্রধানও তা যাচাই বাছাই না করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে সবার সামনে গালমন্দ করেন-এতে চাটুকারের লাভ হয় দুদিকে, এক ধরনের লাভ হলো, সে বসের কাছে বিশ্বস্ত হয়, বসও মনে করে যে সে সময়ে সময়ে আমাকে কারখানার সব খবরই জানায়, তাই তাকেইতো আমি বেশী পছন্দ করব। আর অন্য ধরনের লাভটি হলো কর্মরত সকলেই তাকে ভয় পায়, কারণ সে বসের অতি আপন মানুষ, পান থেকে চুন খসলেই নালিশ চলে যাবে বসের কানে, আর তাতে গালমন্দ শোনা থেকে শুরু করে চাকুরী চলে যাওয়ার মত ঘটনাও ঘটতে পারে।

এবার আসি চাটুকার বা তেলবাজরা কেন চাটুকারিতার আশ্রয় নেন সে বিষয়ে।  চাটুকাররা বেশীরভাগ বস থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে এ ধরনের কাজ করে থাকেন, আবার কেউ কেউ ক্ষমতা পেয়ে তা অপব্যবহার করার জন্য চাটুকারিতার আশ্রয় নিয়ে থাকেন।

চাটুকারিতা মূলত দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, কারখানা মালিক, কারখানা প্রধান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চাটুকারদের চাটুকার হিসেবে মনেও করেন না কারখানা মালিক বা কারখানা প্রধান। তারা চাটুকারকে কারখানার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মনের কোণে স্থান করে দেন।

অবশ্য বিচক্ষণ কারখানা মালিক বা কারখানা প্রধানরা চাটুকারদের আশ্রয়-প্রশ্রয় কখনোই দেননা। তারা সবার মতামতের ভিত্তিতেই কারখানার যে কোন সমস্যার সমাধান করে থাকেন।

আমার পূর্বের এক কর্মস্থলের একটি ঘটনা এই মূহুর্তে মনে পড়ছে, সে কারখানাটি ছিল চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় গ্রুপ অব কোম্পানীর এক পোশাক কারখানা। কারখানাটি পরিচালনা করতেন মালিক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন ডিজিএম, উনার পড়ালেখা, কাজের অভিজ্ঞতা বা অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কারো ছিলনা। তবে তাঁকে সঙ্গ দিতেন অনেকগুলো চাটুকার। আমি অবাক হয়েছিলাম একটি কারণে সে কারণটি হলো, উনার সাথে যে চাটুকারটি সারাক্ষণ খোশ গল্পে মেতে থাকতেন, তার পোশাক-আশাক থাকতো ময়লা, তিনি শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারতেন না, পান খেয়ে যেখানে সেখানে পিক ফেলতেন এবং পড়ালেখায় তিনি প্রাইমারী স্কুলের গন্ডিও পার করেন নি।  তথাপিও তার মত একজন ব্যক্তি কি করে কারখানার সর্বোচ্চ পদের ব্যক্তির সাথে থেকে সবসময় চাটুকারিতা করতে পারতেন! কি করে সময়ে সময়ে ডিজিএমের কাছে ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে নালিশ করার স্পর্ধা পেতেন! উত্তর একটাই, তেল মারা বা চাটুকারিতার আশ্রয় এবং প্রশ্রয়।

এবার আসুন দেখি, চাটুকারদের কারণে কারখানায় কি ধরনের ক্ষতি হতে পারে?

* কারখানার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত  হতে পারে, যার কারণে কারখানা আর্থিকভাবে লোকসান গুনতে পারে।

* চাটুকারের প্রভাবে দক্ষ কর্মী চাকুরী ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারে।

* চাটুকারের কারণে কারখানার সুনাম ক্ষুন্ন হতে পারে।

*চাটুকারের কারণে কারখানার শৃঙ্খলা বা প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি নড়বড়ে হতে পারে।

গত ১৪/০৩/২০১৮ তারিখে “দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক ও নাট্য পরিচালক হানিফ সংকেত চাটুকারিতা বা চাটুকারদের নিয়ে ভবিষ্যতে এর পরিণতি কি হতে পারে এর আশংকা প্রকাশ করে বছরের একটি দিনকে চাটুকার বা চামচামুক্ত দিবস ঘোষণা করার তাগিদ দিয়ে লিখেছেন, “আজকাল বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের অনেক বড় বড় ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে যে হারে চামচামি অর্থাৎ চাটুকারিতা শুরু করেছে তা রীতিমতো দৃষ্টিকটু এবং ক্ষতিকর। সে জন্য প্রয়োজন চামচামুক্ত দিবস। আমাদের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এবং কিছু কিছু মানুষের চারিত্রিক বিকারের কারণে এ ধরনের বিভিন্ন প্রকার দিবস পালন আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। এর ফলে যদি সবার কিছুটা হলেও বেধোদয় হয়,  সেটাই হবে বড় প্রাপ্তি। কারণ বর্তমান সমাজে ভালো মানুষের বড় অভাব। তবে এ কথা ঠিক, মানুষ যদি মানুষ হয়-তবে সে ভালো মানুষই হয়। না হলে তো তাকে বলা হতো অমানুষ। মানুষ আর অমানুষে অনেক পার্থক্য। যারা মানুষ তারা অন্তত এ ধরনের ভন্ডামি, মিথ্যাচার, প্রতারণা-এগুলো থেকে দূরে থাকেন। সে জন্যই আমরা মানুষ চাই, অমানুষ নয়”।

আসুন আমরাও দেশের এবং দশের স্বার্থে তেলের অপচয় রোধ করে চাটুকারদের প্রতিহত করে জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেতের মতোই বলি “আমরা মানুষ চাই, অমানুষ নয়”।

লেখকঃ ব্যবস্থাপক এডমিন, এইচআর এন্ড কমপ্লায়েন্স, স্টিচ টোন এপারেল লিমিটেড

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*