প্রাইভেট সেক্টরে ইউনিফাইড র‌্যাংকিং: একটি সময়ের দাবী

ওয়ালিদুর রহমান :

বাংলাদেশে প্রায় হাজার পাঁচেক গার্মেন্টস কারখানা। ছোট বড় দুরকমই আছে। এই কারখানাগুলোতে সারাবছরই স্টাফ মাইগ্রেশন হয়। তারা এক কারখানা ছেড়ে অন্য কারখানায় জয়েন করেন। এই প্রথায় জুনিয়র হতে শুরু করে সিইও পর্যন্ত আছে।
কিন্তু মুশকীল হল, এই কারখানাগুলো বিভিন্ন বিভাগের কোনো নির্দিষ্ট বা ইউনিফাইড অর্গানোগ্রাম ও র‌্যাংকিং ল্যাডার মেনে চলে না। ফলে দেখা যায়, একেক কারখানায় একেক রকম ডেজিগনেশন। কোথাও টপ হতে বটম মোট ১০ টি ধাপ আবার আরেক কারখানায় ধাপ ১৫ টি। কোথাও আবার ২০টি।
সবচেয়ে অদ্ভূত একটা উদাহরন বলি, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ‘অফিসার’ হিসেবে ২ বছর কাজ করার পর তাকে প্রোমোট করে র‌্যাংক দেয়া হয় ‘এক্সিকিউটিভ’ এবং বলা হয় এতে তার প্রোমোশন হল। কিংবা ৩ বছর ‘সিনিয়র অফিসার’ ছিলেন, তারপর তাকে প্রোমোশন দেয়া হল-‘এক্সিকিউটিভ’। আবার কোথাও তিনি কাজ করতেন এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার পদে, আর কয়েকদিন পরেই তার প্রোমোশন হত ডেপুটি ম্যানেজার। তার আগেই তিনি জব সুইচ করলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন তার ডেজিগনেশন হল ‘সিনিয়র এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার’। তারপরের র‌্যাংক ডেপুটি ম্যানেজার। মাঝখান হতে তিনি একটা র‌্যাংক হারালেন, সময়ও অপচয়।
আপনি বলতে পারেন, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে র‌্যাংকে কী আসে যায়? টাকাই সব। হ্যাঁ, টাকার জন্যই র‌্যাংক দরকার। কেন/কীভাবে? দেখুন: আপনি আপনার প্রতিষ্ঠানের ডিজিএম ও হেড অব এইচআর। আর প্রতিষ্ঠানে সবাই জানে আপনি আসলে এ্যাকটিং জিএম। আপনি যখন ইন্টারভিউ দিতে যাবেন জিএম পদে, আপনাকে জিজ্ঞেস করবেই, আপনি তো জিএম পদে কখনো ছিলেন না, জিএম হিসেবে কীভাবে কাজ করবেন। অনেকে আবার জিএম হিসেবে কখনো কাজ না করে থাকলে, তাকে সেই পদ দেবেনই না। তাকে সেই ডিজিএম হিসেবেই নিয়োগ করবে। আর পদের সাথে মানানসই বেতনের বেশি দেবে না। অথচ তাদের জিএম দরকার আর আপনাকে জিএম দিলে সেই মতো বেতনও দিত। আপনি এক্ষেত্রে পদই শুধু হারাবেন না, হারাবেন বেতনও।

অনেক প্রতিষ্ঠান আবার নানান নাম দেন র‌্যাংকের। যেমন একই ‘রিক্রূটিং অফিসার’ আরেক প্রতিষ্ঠানে ‘চীফ প্লেসমেন্ট অফিসার’। ফলে বিপদে পড়েন যারা এইচআরে কাজ করেন, তারা। আগত প্রার্থী ঠিক কোন পজিশনে বা প্রোটোকল/স্ট্যাটাসে এখন আছেন তা বুঝতে হিমশিম খান।
কোনো এক প্রতিষ্ঠানে আপনি জিএম-এইচআর হিসেবে কর্মরত আছেন, তো তারা সেটার নাম দিয়েছে “হেড অব এইচআর”। তারা ১০ লাইনের একটি কোম্পানী। এখন আপনি গেলেন ৪০ লাইনের এক কারখানার জবের জন্য। তারা ভাববে, আপনি তো ১০ লাইনের প্রতিষ্ঠানের হেড অব এইচআর ও জিএম। ওনাদের ওখানে হেড অব এইচআরও হল একজন জিএম। কিন্তু তারা আপনাকে জিএম দিতে রাজি না, কারন আপনি তো মাত্র ১০ লাইনের জিএম। ৪০ লাইনের মানে বড় প্রতিষ্ঠানে তো আপনি জিএম হতে পারেন না-ইত্যাদি। অথচ আপনি হয়তো কোনো একটি বিশেষ কারনে ওই ১০ লাইনের ছোট কারখানাতে জিএম পদ নিয়েছিলেন।
আপনার এতদিনের ক্যারিয়ার, যোগ্যতা কোনো মূল্যায়ন পেল না। পদের টাইটেল যাই হোক না কেন, জরুরী কাজ হল, পদের র‌্যাংকিং ল্যাডার ঠিক করা। আমার মতে, সবগুলো গার্মেন্টস কারখানা যদি একটি ইউনিফাইড ডেজিগনেশন সিস্টেম ও র‌্যাংকিং ল্যাডার ফলো করে তবে কেউ আন্ডার প্রিভিলেজডও হবে না, ওভার প্রিভিলেজড হবে না। আমার নিজস্ব মতে, যেকোনো মাপের কারখানাই হোক, ডেজিগনেশনগুলো হতে হবে নির্দিষ্ট র‌্যাংকিং লেভেলের। কেমন হতে পারে সেটি?
এক্ষেত্রে আমার মতামত নিম্নে পেশ করলাম:
১. অফিসার বা এক্সিকিউটিভ যেকোনো একটি টার্ম ব্যবহার করতে হবে। কারন দুটোই এক জিনিস। অফিসারকে প্রোমোশন দিয়ে এক্সিকিউটিভ করাটা একই কুমির ছানা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানোর মতো।
২. অফিসার লেভেলে ৪টি ধাপ থাকবে-র‌্যাংক-১: ট্রেইনী, র‌্যাংক-২: এ্যাসিসট্যান্ট অফিসার/এক্সিকিউটিভ, র‌্যাংক-৩: অফিসার/এক্সিকিউটিভ, র‌্যাংক-৪: সিনিয়র অফিসার/সিনিয়র এক্সিকিউটিভ
৩.তারপরে ম্যানেজার লেয়ার। সেখানেও ৪টি ধাপ থাকবে-র‌্যাংক ৫: এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার, র‌্যাংক-৬: ডেপুটি ম্যানেজার, র‌্যাংক-৭: ম্যানেজার, র‌্যাংক-৮: সিনিয়র ম্যানেজার।
৪.তারপরে জিএম লেয়ার। সেখানে ৩টি ধাপ-র‌্যাংক ৯: এজিএম, র‌্যাংক-১০: ডিজিএম, র‌্যাংক-১১: জিএম।
৫.তারপরে ডিরেক্টর লেয়ার। সেখানে ৩ টি ধাপ-র‌্যাংক-১২: ডিরেক্টর, র‌্যাংক-১৩: এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, র‌্যাংক-১৪: সিইও বা সিওও।
এভাবে যদি ডেজিগনেশনগুলো ইউনিফাইড হয়, কিংবা কমপক্ষে পদবী/ডেজিগনেশনের র‌্যাংকিং লেয়ারটি যদি ইউনিফাইড হয় আর সবখানেই যেকোনো টাইটেলের ডেজিগনেশনেই দেয়া হোক, সেটির ওই ১৪টির মধ্যে যেকোনো একটি মানা হয় (অনেকটা সরকারী চাকরীর গ্রেডের মতো), তাহলে কোনো মানুষের চাকরী বদল করলেও তার পদ/পদবী/স্ট্যাটাস নিয়ে ওভার প্রিভিলেজড কিংবা আন্ডার প্রিভিলেজড হবার সুযোগ থাকবে না। একজন মানুষ ধারাবাহিকভাবে তার ক্যারিয়ার নিয়ে এগোতে পারবেন।

পাশাপাশি একটি র‌্যাংক হতে পরবর্তী র‌্যাংকে যেতে একজন কর্মীকে কমপক্ষে কতদিন একটি পজিশনে কাজ করা উচিৎ তারও একটি সর্বসম্মত নীতি মেনে চললে, একজন লাফিয়ে লাফিয়ে ৫ বছরে জিএম আর আরেকজন ১৫ বছরেও সিনিয়র অফিসার হয়ে পড়ে থাকবেন না।
যারা গার্মেন্টস সেক্টরের এইচআর নিয়ে কাজ করেন, তারা ভেবে দেখতে পারেন। বলতে পারেন, ভাই, আমাদের হাতে কিছুই না, সব মালিক ঠিক করেন। মিথ্যা কথা। সব অবশ্যই তারা ঠিক করেন না। আপনারাই বেশিরভাগ ওই কাজ করেন। তাই আমাদের করনীয়টা করে গেলেও অনেক উন্নতি হয়। আরেকটা কথা। যদিও গার্মেন্টস সেক্টরকে বিশেষায়িত করে বলেছি, কিন্তু যেকোনো সেক্টরই এই সিস্টেমটি অনুসরন করতে পারে। তাতে উপকার হবে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ বেসরকারী চাকুরীজীবির।

লেখক : মানবসম্পদ পেশাজীবী

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*