আরএমজি সেক্টরের ব্র্যান্ডিং: সুদুর পরাহত বাস্তবতা

ওয়ালিদুর রহমান

২০০৬ সাল। সবেমাত্র ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করলাম। আজকালকার মতো সেই একযুগ আগের বাংলাদেশে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন বিপ্লব হয়নি। কম্পিউটার তখনো ধনীর ঘরের শোভাবর্ধক দামী জিনিস। এরই মাঝে এক গতানুগতিক বেকার যুবক, ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েটের চাকুরী পাবার উদয়াস্ত ছোটাছুটি। কারন এইদেশ একজন ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েটকে শেখায়ই চাকরীজীবি হতে। পরম স্রষ্টার মহানুভবতায় কিছুদিন পরই অধরা চাকরী ধরা দিল ভাগ্যে। সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে জয়েন করলাম দেশের সবচেয়ে বড় জব সেক্টর-গার্মেন্টস সেক্টরে। তৎকালীন সময়ে নানা কারনেই এই সেক্টরটির খুব সুনাম শুনতাম না ক্যাম্পাসে। বিশেষত চাকরী সন্ধানী বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট এই আমাদের মাথায় তখন বিসিএস বা ব্যাংক ব্যাতিত আর কোনো তেমন চয়েসই ছিল না। নানাকারনেই ওই প্রিজুডিস কাটিয়ে জয়েন করি আপাতঃ অচ্ছুৎ এই সেক্টরের কেন্দ্রীয় প্লাটফরমে। আজ এই একযুগ পরে এসে পিছনে ফিরে তাকাই। কেমন ছিল সেই সিদ্ধান্ত? অন্তত এতটুকু জানি, সময়ের বিচারে রিলেটিভলি একটি সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল সেটি। তার অবশ্য খুব ডিটেইল ব্যাখ্যা আছে। তবে সংক্ষেপে বললে বলব, দেশের সর্ববৃহৎ জব মার্কেট এই সেক্টর যার মোট কারখানার সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার আর মোট এমপ্লয়মেন্ট ৫০ লক্ষ’র মতো এবং বার্ষিক রপ্তানী ২৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের জিডিপির ১৩% (প্রায়) এই সেক্টর। এমন একটি জব মার্কেটে ক্যারিয়ার গড়া বিভিন্ন প্রেক্ষিতেই একটি সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। আমার মতে পৃথিবীতে যত পেশা আছে সেগুলো ২টি মোটা দাগে বিভক্ত-চাকরী নয়তো ব্যবসা। ব্যাবসার আবার কয়েকটি ধরন আছে-পণ্য বিক্রি আর সার্ভিস বিক্রি। ওইসব পন্য আর সার্ভিস কয়েকটি ক্যাটেগরীর যেমন:-র’ প্রোডাক্ট বিক্রি-চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি; ইন্টেলেকচুয়াল সার্ভিস বিক্রি-উকিল, ডাক্তার, আর্কিটেক্ট ইত্যাদি; ক্রিয়েটিভ মেকারস-গায়ক, নাচিয়ে, আঁকিয়ে ইত্যাদি। পৃথিবীর যাবতীয় ব্যবসায়ের একটি মৌলিক ও অভিন্ন প্রবাহ আছে। সেটি হল, প্রায় সবখানেই বিজনেসটি সাপ্লাইয়ার ড্রাইভেন। অর্থাৎ ম্যানুফ্যাকচারার বা সাপ্লাইয়াররা নিয়ন্ত্রণ করে ওই পণ্য বা সার্ভিসটির বাজার। যেমন, বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার, দাম, প্রবাহ, গতি, প্রকৃতি নির্ধারন করে ওপেক্স অর্থাৎ উৎপাদকদের গ্রূপ। গাড়ির বাজার বা এটোমিক ওয়ারহেড এমনকি সামান্য পেঁয়াজের বাজারও নিয়ন্ত্রণ করে এর নির্মাতা বা সরবরাহকারীরা। কোথাও ক্রেতা বা ভোক্তারা এর বাজারের সামান্য নিয়ন্ত্রণও পায়না। তারা শুধুমাত্র এসব ব্যবসায়ীর হাতের ঘুঁটি। এর একমাত্র ব্যতিক্রম (হয়তো) গার্মেন্টস ব্যবসা। এটি একমাত্র ম্যানুফ্যাকচারিং বিজনেস যেখানে বাজার ও মোড নিয়ন্ত্রণ করে ভোক্তা-হয় সরাসরি ভোক্তা কিংবা মধ্যস্বত্বভোগী বা বিদেশী ইমপোর্টাররা যাদের আমরা সাদাচোখে বায়ার বলে চিনি। বায়ার হিসেবে আমরা বড় বড় ব্রান্ডকেই চিনি। যদিও সত্যিকারের বায়ার আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার ধনী দেশগুলোর খুচরা ক্রেতারা। এই যে, পৃথিবীর সবরকম ব্যবসার বিপরীতে এই শিল্পটি মেকার বা সাপ্লাইয়ার নির্ভর না হয়ে বায়ার নির্ভর হয়ে চলছে, এর অনেক রকম তাৎপর্য আছে। কী রকম? বলছি। ম্যাক্রো, মাইক্রো-এরকম জটিল অর্থনীতির মারপ্যাঁচ একদম বোঝেন না, এমন একজন মানুষও বুঝবেন, বাজারের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, তার মর্জিতেই নির্ধারিত হয় পণ্য ও ব্যবসার যাবতীয় রীতিনীতি, আইন, সরবরাহ চ্যানেল, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থ বিনিময়, আর্থিক সুবিধাদি, শর্তাবলি ইত্যাদি। পেঁয়াজের বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের দাপটে দু’দিন আগেও দেখলেন না, কী ধুন্দুমারটা লেগে গেল বাংলাদেশে। নিয়ন্ত্রকের স্বার্থ ও ইচ্ছাতেই ওই ব্যবসার যাবতীয় কিছু পরিচালিত হয় তখন। ক্রেতার স্বার্থ, সামর্থ, ইচ্ছা, রুচী তখন মার খেয়ে যায়। একই অবস্থা বাংলাদেশের চালের বাজারে। জানেন তো, একটা কথা প্রচলিত আছে-বাংলাদেশে সরকার নির্ধারন করে চালের দাম। কারনটা হল, চাল হল মানুষের বেঁচে থাকার প্রতীক। তাই এমন সুপার ভাইটাল প্রোডাক্টের দাম ও সরবরাহের ব্যাপারে সরকার সবসময় দৌড়ের ওপরে থাকে। বাংলাদেশের ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যেটাই বলি, গার্মেন্টস সেক্টর হল দেশের অর্থনীতির বৃহত্তম একটি অংশ যার জিডিপিতে ভাগ ১৩% আর রপ্তানী আয়ে ৮৩%। এমন ভয়াবহভাবে একটি দেশ যখন একটি একক সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আর সেই সেক্টরটির ব্যবসার মূল ফ্লো ম্যানুফ্যাকচারার তথা সাপ্লাই ড্রাইভেন না হয়ে বায়ার বা ডিমান্ড ড্রাইভেন হয় তখন বিপদটা সহজেই অনুমেয়। বিদেশী বায়ার বা ইমপোর্ট জায়ান্টদের মর্জিতে নির্ধারিত হয় এই দেশের গার্মেন্টস শিল্পের ও এর ৫০ লক্ষ সরাসরি কর্মী, প্রায় ১ কোটি পরোক্ষ স্টেকহোল্ডার, ৫০০০ এর মতো কারখানা, ২৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানী আয়ের ভাগ্য। কিভাবে? বলছি। খুব সংক্ষেপে যদি বলি, তবে বলব, একটি ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প হিসেবে গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল-সুতা, বাটন, কাপড়, প্যাকিং, পলি, কেমিক্যাল, লেবেল, রং, ট্যাগ কেনাসহ প্রিন্টিং, এমব্রয়ডারী, শিপিং, কার্গো, কুরিয়ার, ফ্রেইট ডিল করতে হয় বায়ারদের নির্দেশিত বিদেশী বা স্বদেশী সাপ্লাইয়ারদের সঙ্গেই। ওয়াশ করতে হয় তাদের নির্দেশিত প্ল্যান্টে। এই সুপার কন্ট্রোল বা মনোপলিকে নানা নামে তারা চালায়-নমিনেশন/কমপ্লায়েন্সের গ্যাড়াকলে ফেলে। প্রায় ৯০% (আনুমানিক) ক্ষেত্রেই ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠান বা গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানটির নিজের কোনো চয়েস থাকে না। ব্যবসা বের করার যতরকম পয়েন্ট আছে-তার বেশিরভাগটাই বায়ার নিজেই নির্ধারন করে দেয়। সবশেষ থাকে CM (Cost of Manufacturing) নামক একটি আয়। ওই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ও ব্যবসার চলকটিও নির্ধারিত হয় বায়ারদের মর্জিমতো। আপনি বলবেন, ও মা! আপনি বানাবেন। আপনিই না বলবেন, কত দামে ওটি বানিয়ে দেবেন। না রে ভাই, ওই যে বললাম, এটি বায়ার বা ডিমান্ড ড্রাইভেন বিজনেস। তাই প্রতিযোগীতার বাজারে ব্যবসা ধরে রাখতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়ারের দয়ায় দেয়া রেটেই কাজ করে কূল পায়না। আপনার প্রাথমিক ধারনা আছে কিনা জানিনা। বাইরের মানুষের ধারনা, গার্মেন্টস মানেই কাঁচা টাকা। এখানে প্রতিটি পিস গার্মেন্টসে কারখানা প্রচুর লাভ করে। নারে ভাই, ভুল। গার্মেন্টস শিল্পের মুনাফা হিসাব করতে হয় প্রতিটি স্টিচ, প্রতিটি পিস গার্মেন্টস, প্রতিটি সেন্টকে মাথায় রেখে। প্রতিটি প্রসেস হতে পয়সা বাঁচিয়ে এখানে ব্যবসা করতে হয়। সেখানে যদি বায়ার নিজেই সবকিছু নিজের স্বার্থমতো ঠিক করে দেয় তবে ব্যবসার ক্ষেত্রটি স্বাভাবিকভাবেই সবসময় নির্মাতার প্রতিকূলে থাকে। তার উপরে আছে মজুরী, ওভারহেড, ক্যাপিটাল মানি, ওয়েস্টেজ এর উচ্চ হার ও লো ইফিশিয়েন্সি। সবমিলিয়ে শনৈ শনৈ মুনাফা করা এখানে হয় না। যাহোক, বায়ারদের মর্জিতে দিন দিন ওই CM ও কমে যাচ্ছে যার বিগত ৫-১০ বছরে নিম্নগামিতার হার আনুমানিক ৩০-৪০%। এবার বুঝতে পারছেন, ডিমান্ড ড্রাইভেন সেক্টর হওয়ায় কী ধরনের ভালনারেবলিটিতে আছে এই শিল্প? এবার বলি, আমাদের এই ৪০ বছরের পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত জায়ান্ট শিল্পটির ব্র্যান্ডিং কেন করা দরকার। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বের ২য় প্রধান সাপ্লাইয়ারের পজিশনে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে। আমাদের উপরে আছে শুধু চীন। বছরে আমাদের রপ্তানীর পরিমান ২৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু মুশকীলটা হল, এই শিল্পের পণ্য মানে পোষাকের ক্রেতা দেশগুলোতে আমাদের নামে কোনো প্রোডাক্ট বিক্রি হয়না। ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়ার বিশাল বিশাল আউটলেটে বড় ব্র্যান্ডের শো রুমে বাংলাদেশের কোনো নির্মাতার নাম থাকে না। কোনো তৈরী পোশাকের পরিচয়ে বাংলাদেশ বা এর ওই নির্মাতা কারখানার কোনো নামগন্ধও থাকে না (শুধুমাত্র লেবেলে একটি ট্র্যাকিং কোড ব্যতিত)। আমাদের কষ্ট ও ঘামের বিনিময়ে তৈরী একেকটি পণ্য ওখানে বিক্রি হয় বিশ্বের নামকরা বিদেশী ব্র্যান্ডের নামে। সোজা ভাষায় বললে, আমরা শুধু ওই ব্র্যান্ডের দর্জির ভূমিকা পালন করি। তৈরীকৃত পোশাকের জন্য আমরা পাই সামান্য ম্যানুফ্যাকচারীং কস্ট যেটাকে গার্মেন্টসের বাইরের লোকেরা পোষাকের দাম বলে জানে (আসলে দাম না, মেকিং চার্জ)। ওই পোশাকের প্রতিটি পিস বিদেশী শোরুমে বিক্রি হয় আমাদেরকে দেয়া অর্থের (আনুমানিক) ৫ থেকে ৬ গুন দামে (প্রথম এক-দেড় সপ্তাহের লেবেলড প্রাইস অনুযায়ী, যেটা অবশ্য পরের দিকে কমে যায়)। ফলে ওই ব্র্যান্ডের মালিকরা হন ফুলে ফেঁপে একাকার। অথচ ওই একই পোষাকের নির্মাতা আমাদের কারখানাগুলো পায় বিদেশে বিক্রি হওয়া প্রতিটি পিস পোষাকের বিক্রি দামের মাত্র (আনুমানিক) ১০-২০% মূল্য। এমনকি ওইসব বায়াররা আমাদেরই তৈরী করা পোষাকে এমন তীর্ব বৈষম্য ও বঞ্চনাপূর্ণ ব্যাবসায়িক শোষণ আমাদের উপহার দিয়ে ধনী হবার পাশাপাশি সম্প্রতি এমনকি ওইসব পোষাক আবার আমাদেরই স্থানীয় বাজারে আউটলেট খুলে বিক্রী করে আরেক দফা আমাদের মুদ্রা বাগানোর পরিকল্পনা করছে। এক দফায় আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আবার আমাদের পাশের দোকানেই আমাদের ঠকিয়ে বানানো পোষাক আমাদেরই কাছে কয়েকগুন দামে বিক্রী করে আরেকদফা আমাদের নিংড়ে পয়সা নিয়ে নেবে। এর একমাত্র কারন, আমরা মূলত এসেম্বলিং শিল্প মানে (৯০% ক্ষেত্রে) বায়ার আমাদের সবরকম ম্যাটেরিয়াল ও প্রোসেসিং চার্জ ও প্লেস ফিক্সড করে দেয়। ফিক্সড করে দেয় আমাদের টোটাল সিএম। আর আমরা শুধু তাদের মনমতো তাদের দেয়া র’ ম্যাটেরিয়াল দিয়ে, তাদের ঠিক করে দেয়া বিভিন্ন ভ্যালু এডিং সেগমেন্টে (প্রিন্ট, ওয়াশ, এমব্রয়ডারী ইত্যাদি) সেগুলো প্রসেস করে, তাদের ঠিক করে দেয়া শিপিং চ্যানেলে সেগুলো তাদের পাঠিয়ে দিই। যদিও আমরা বলি যে, আমরা পোষাক রপ্তানী করি, কিন্তু আমাদের তৈরী পোষাক রপ্তানীর ধরনটি এমনকি সামান্য লাউ তরকারী রপ্তানীর মতোও নয়। আমরা আসলে রপ্তানী করি না (সেই অর্থে)। আমরা বায়ারদের অর্ডারকৃত তৈরী পোষাক তাদের দেখানো পথে জাহাজে তুলে দিই। রপ্তানী তো হয় তখন যখন আমি একজন নির্মাতা হিসেবে আমার মনের মতো করে প্রোডাক্ট বানিয়ে সেটা বিদেশ পাঠাব। বায়ারদের এই একচ্ছত্র ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রন আমাদের শিল্পটিকে আমাদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ খুব কমই তৈরী করতে দেয়। কারন একটাই। আমাদের কোনো ব্রান্ড ভ্যালু নেই। আমাদের কোনো ব্র্যান্ড নেই। সোজা কথায়, আমরা স্রেফ দর্জি, আমরা তৈরীকৃত পোষাকের মালিক বা বিক্রেতা নই। দীর্ঘ ৪০ বছরেও আমরা আমাদের প্রোডাক্টের নিজস্ব কোনো ব্রান্ড নেম অর্জন করতে পারিনি। বিদেশে নিজেদের আউটলেট খুলতে পারিনি। এত বিশাল পরিমানে গার্মেন্টস উৎপাদন করলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে ওইসব ব্রান্ড বায়ারদের মতোই নিজেরা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে আউটলেট খুলে বিক্রি করার সুযোগ তৈরী করতে পারিনি বা করার চেষ্টাও খুব একটা হয়নি। গ্রেটার কনটেক্সটে অনেকটা দর্জির মতো করে পোষাক বানিয়ে তার মজুরী হাত পেতে নিয়ে আর বিভিন্ন প্রোসেসিং ও ম্যাটেরিয়াল সোর্সিং হতে সামান্য অর্থ প্রচন্ড আয়াসে বাঁচিয়ে এই শিল্প চলছে। তাতেই আমরা রপ্তানী আয়ের ৮২-৮৩% মানে ২৮ বিলিয়ন ডলার স্টেক নিয়ে নিতে পেরেছি। তাহলে ভাবুন তো একবার, আমরা যদি কলা, মুলা, সিমেন্ট, ওষূধ, চিংড়ি, ইলেকট্রোনিকস, প্লাস্টিক, জাহাজ এমনকি সামান্য ক্যাটগাট রপ্তানীর মতো করে স্বাধীনভাবে বিজনেস করতে আর রপ্তানী করতে পারতাম, তবে দেশের অবস্থা কেমন হতে পারত? বাংলাদেশের পোষাক শিল্পের ব্র্যান্ডিং এখন সময়ের দাবী। এটা এখন কোনো ফ্যাশন বা প্যাশন কিংবা স্রেফ কথার কথা নয়। এটিই এখন অন্যতম প্রধান সার্ভাইভাল থিওরী-আমাদের তৈরী পোষাক শিল্পের। অবশ্যই সারভাইভালের আরো আরো চ্যালেঞ্জ ও তাকে মোকাবেলার উপায়সহ। নিজস্ব ব্র্যান্ড পণ্যের নির্মাতা ও সাপ্লাইয়ার না হয়ে স্রেফ এখনকার বা বিগত ৪০ বছরের মতোই এসেম্বলার হয়ে কাজ করে গেলে এই শিল্প খুব বেশিদিন আর যথেষ্ট শক্তি নিয়ে সার্ভাইভ করতে পারবে না। তার অবশ্য নানা কারন রয়েছে যা আমার অন্য লেখায় বিস্তারিত বলেছি। ব্র্যান্ডিং একটি বড় কনসেপ্ট। খুব অল্প কথায় ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে আগে বলি। আপনি কোনো সদ্য গজিয়ে ওঠা শপিংমলে একটা অতি উচ্চমূল্যের দোকান কিনলেন। পয়সা খরচ করে সেটার ডেকোরেশন করলেন, চকচকে ঝকঝকে করলেন, চৌকস বিক্রয়কর্মী নিয়োগ করলেন, দোকানের জন্য বিল, ভাউচার, ক্যাশমেমো ছাপালেন, দোকানের বিজ্ঞাপন দিলেন। কি মূল্যে কোন প্রোডাক্ট বিক্রি হবে বিক্রয় কর্মীদের তার ধারনা দিলেন। ভবিষ্যতে কতদিনে আপনার বিনিয়োগ কিভাবে তুলে নেবেন তার হিসাব করলেন। এসব কিছুই হচ্ছে একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান শুরু করতে আপনার পূর্ব প্রস্তুতি। এটা আপনি কেন করেন? নিঃসন্দেহে আপনার মুনাফা=প্রোডাক্টের অধিক বিক্রি=প্রোডাক্টের ক্রেতাশ্রেণী বৃদ্ধি=প্রোডাক্টের আকর্ষণ বৃদ্ধি হল উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে সবাই তার প্রতিষ্ঠানকে একটি প্রোডাক্টের মতো করে ক্রেতার কাছে রেডি করে উপস্থাপন করেন ক্রেতার আকর্ষণ তৈরী করতে। এটা বিক্রির আদিম ও মৌলিক মেথড। ক্রেতা নয়, বিক্রেতাকেই প্রথমে তার পণ্য আকর্ষণীয় করে তার ক্রেতাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে তার মুনাফা তথা অধিক মার্কেট এ্যকসেস এর স্বার্থে (বর্তমানে ক্ষুদ্র অর্থে “মুনাফা” বা ”বিক্রির চেয়ে আমার কাছে ”মার্কেট এ্যকসেস” কথাটিকে অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হয়)। বিক্রেতারই প্রথম দায়ীত্ব হল তার প্রোডাক্ট/সার্ভিস/কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা। তা দেখে ক্রেতারা আকর্ষণবোধ করবেন সেই বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য বা সার্ভিস কিনতে। ক্রেতা নয় এখানে বিক্রেতার ভূমিকা প্রথমে। এই মূলনীতিটি একটি ক্ষুদ্র দোকানের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি তা সমভাবে প্রযোজ্য একটি বড় ফরমাল প্রতিষ্ঠান বা আরও বৃহৎ পরিসরে একটি দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো ক্ষেত্রে। এরই নাম ব্র্যান্ডিং। গার্মেন্টস সেক্টরের ব্রান্ডিং বলতে দু’ধরনের ব্র্যান্ডিং কে বোঝানো হচ্ছে-ব্র্যান্ড সেলারে রূপান্তর আর ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরী। পোষাকের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরী করে আন্তর্জাতিক (দরকার হলে স্থানীয় বাজারেও) বাজারে ওইসব ব্র্যান্ডের মতোই নিজস্ব তৈরী পোষাক বিক্রি করার ব্যবস্থা করা জরুরী। নির্মাতা হিসেবে নয়, সরাসরি বিক্রেতার পজিশনটি দরকার হবে আমাদের। কারন শুধুমাত্র এসেম্বলিং বা দর্জিকর্ম ভিত্তিক এই বিজনেস অচীরেই খুব বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। পাশাপাশি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে যেসব ব্র্যান্ড/বায়ার/ইমপোর্টার আমাদের কারখানা হতে পোষাক তৈরী করিয়ে নিয়ে বিক্রি করে ধনী হয়েছেন, এখন সময় হয়েছে ওইসব ব্র্যান্ডকে এইদেশের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে তাদের ব্যবসার পার্টনার করে নেবার দাবী তোলার। এটি হতে পারে দু’ভাবে। এক; একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা হতে পণ্য বিক্রী পর্যন্ত যাবতীয় ইনভেষ্টমেন্ট ও প্রসেসিংয়ে ওইসব ব্র্যান্ডকে যৌথ পার্টনার হতে হবে। স্রেফ এসেম্বলার হিসেবে আমাদের কারখানাকে মজুরীর ট্রিটমেন্ট দেয়া নয়। বিজনেসের ফর্মাল পার্টনারশীপ নিতে বাধ্য করতে হবে তাদের। তাদের স্রেফ বায়ার নয়, আমাদের কারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানীগুলোর ওভারঅল পার্টনার হয়ে যৌথভাবে বিজনেস চালাতে হবে। ব্যবসার লাভ, ক্ষতি সমানে দায় নিতে হবে। শুধুমাত্র রেডি প্রোডাক্ট শিপ হলে তার দাম পাঠিয়েই খালাস-এমন না হয়ে, ওই অর্ডারের যাবতীয় লাভ/ক্ষতির ভাগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশে আমাদের ব্র্যান্ড নেম যুক্ত হতে হবে সকল স্টোরে। বাংলাদেশকে থাকতে হবে তাদের কো-ব্র্যান্ড হিসেবে যা এখন নেই। অথবা বাংলাদেশী নির্মাতাদের স্রেফ এসেম্বলার হতে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে নিজেকেই প্রোডাক্ট সেলারের ভূমিকায় নামতে হবে নিজের ব্র্যান্ড নেম নিয়ে। ঠিক যেমন বাংলাদেশের প্লাস্টিক পন্য নির্মাতা প্রাণ-আরএফএল আন্তর্জাতিক বাজার ধরে ফেলেছে নিজের ব্র্যান্ড নেমে। আরেক ধরনের ব্র্র্যান্ডিং এর কথাও বলছি। তা হল, সারাবিশ্বসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও আমাদের দেশের বিশেষত আমাদের তৈরী পোষাক শিল্পের ম্যানুফ্যাকচারার কান্ট্রি হিসেবে ব্র্যান্ড নেম বাড়ানো যাকে সহজ কথায় ইমেজ বিল্ডিং বলা হয়। বিভিন্ন কারনেই আমাদের পোষাক শিল্পের সার্বিক ইমেজ বিদেশে অনেকখানি নেতিবাচক। বিশেষত রানা প্লাজা ও তাজরীনের দুঃখজনক ঘটনার পরে এই ইমেজ আরো নেগেটিভ হয়েছে। মেড ইন বাংলাদেশ ট্রেড মার্ক ভ্যালু দিয়ে আমরা বহু কষ্টে নিজের জায়গা করে নিলেও বাংলাদেশের রেডিমেড গার্মেন্টস শিল্পের সার্বিক ইমেজ দুঃখজনকভাবে যথেষ্ট ইমপ্রেসিভ না। আমাদের নিজেদের অনেক কর্মকান্ড ও ব্র্যান্ডিংয়ের প্রতি অনিহা যেমন এর পেছনে দায়ী তেমনি প্রতিযোগী বিভিন্ন দেশের আগ্রাসী মার্কেটিং স্ট্রাটেজির ধাক্কা, গোপনে/প্রকাশ্যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের নেগেটিভ ইমেজ সৃষ্টির চেষ্টা করে যাওয়া দেশী ও বিদেশী একাধিক শক্তির ব্যপক ইনটেনশনাল কর্মকান্ডও দায়ী। এই দুই ধরনের নেগেটিভ এনার্জির বিপরীতে আমাদের টোটাল সেক্টরের পজিটিভ ইফোর্ট খুব একটা বেশি না। কী এক অদ্ভূৎ কারনে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প শুরু হতেই কিছুটা ইনট্রোভার্ট ন্যাচারের হয়ে বেড়ে উঠেছে। নিজেকে ব্র্যান্ডিং করানোর তেমন কোনো চেষ্টা তেমন একটা এর কখনোই ছিল না। বরং কিছুটা সেল্ফ সেন্সরশীপ এবং রক্ষণশীল নীতিতেই চলেছে এই শিল্প। আমার দৃষ্টিতে, বিগত ৫/৬ বছর ধরে এই সেক্টরেও ব্র্যান্ড ইমেজ বৃদ্ধি নিয়ে কিছুটা নড়াচড়া চোখে পড়ছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হল, দেশের অভ্যন্তরেই এখনো বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী দেশের সার্বিক ইকোনোমিতে গার্মেন্টস শিল্পের ভয়াবহ রকম অবদান জানা স্বত্বেও এই শিল্পের প্রতি বিরূপ ও নেগেটিভ ধারনা পোষন করে। দুঃখজনক সত্য হল, এই দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে প্রতি বছর পাশ করে বেরোনো মেধাবী ছাতছাত্রীদের কাছে এই সেক্টর এখনো চাকরীর প্রথম, দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় চয়েসও নয়। দেশে ২৬ লক্ষ বেকার অথচ সেই দেশেই আবার গার্মেন্টস সেক্টরে ১০ লক্ষ লোকের ঘাটতি। কারন একটাই, বেকার ট্যালেন্টরা গার্মেন্টসে ক্যারিয়ার গঠনের জন্য লালায়িত না। নিজ দেশের মানুষেরই যখন দৃষ্টিভঙ্গীর এমন বিরুপ চিত্র, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী অবস্থা তা বলাই বাহুল্য। মেধাবী কর্মীদের তীব্র অভাবে গার্মেন্টস সেক্টর ব্যপক অপর্চুনিটি লসের মুখে পড়ছে। তাই দেশের ভিতরেও জব সেক্টর হতে সেরা মেধাদের এই সেক্টরে আনার জন্য সেক্টরের ব্র্যান্ডিং জরুরী। আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র গার্মেন্টস সেক্টরের ব্র্যান্ড ইমেজ ও ব্র্যান্ড ভ্যালু সৃষ্টির তাৎপর্য ও সমসাময়িক বাস্তবতা নিয়ে লেখা। ব্র্যান্ড ইমেজ ও ব্র্যান্ডিং ভ্যালু কিভাবে নিশ্চিত করতে হবে তার উপায় নিয়ে আলোচনা আরো দীর্ঘ একটি বিষয়। ওটা নিয়ে আরেকদিন হয়তো লিখব। খুব সংক্ষেপে যদি বলি, তাহলে বলব, ব্র্যান্ড ইমেজ খুব বিস্তারিত আর কমপ্রিহেনসিভ একটি বিষয়। ইমেজ একদিনে গড়ে ওঠে না। তবে ধ্বংস হতে একদিনই যথেষ্ট। আর ইমেজ বিল্ডিং মানে একটা ভিডিও ডকুমেন্টারী বানিয়ে টিভিসি প্রচারকে বোঝায় না। ইমেজ বিল্ডিং দীর্ঘস্থায়ী ইনটেনসিভ একটি মিশন। ওটার জন্য করনীয় কাজের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। এতটুকু আপাতত বলি, ওই মিশনটির সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হতে হবে সরকারকে। এককভাবে গার্মেন্টস কারখানা বা বিজিএমইএ খুব একটা এগোতে পারবে না। কারন গার্মেন্টসের ব্র্যান্ড ইমেজের সাথে জাতীয় প্রস্তুতি ও গোটা দেশের ইমেজ নির্মানও জরুরী। ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী মোদীকে দেখেছেন? দেশকে ব্র্যান্ডিং কীভাবে করতে হয় সেটা তার কাছ হতে শেখা উচিৎ। ভাবতে পারেন? একটা গোটা দেশকে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করছেন একার ইমেজ ও চালাকি দিয়ে। তার সাথে পেয়ে গেছেন গোটা দেশের বড় বড় কর্পোরেট আর ব্যবসা জানা মাড়োয়ারীদের। আর নিজস্ব ব্র্যান্ড নেম/ব্র্র্যান্ড ভ্যালু বিশিষ্ট নিজস্ব সেলিং বিজনেসকে আন্তর্জাতিক বিজনেসে পরিণত করতে হলে যেই মাত্রার ও যেই লেভেলের থিংক ট্যাংক, মুভমেন্ট, এক্সপোজার, এক্সপার্টিজ বিজনেসে দরকার তাতে বাংলাদেশ বহুদুর পিছিয়ে আছে। ইন্ডিয়া বহু আগে হতেই ওই জায়গায় দাঁত বসিয়ে আছে। আমাদের প্রতিযোগী সবকটি দেশ ওতে বহুদুর এগিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক মার্কেটে নিজেদের সেলারের ভূমিকায় দেখার জন্য বাংলাদেশের উদ্যোক্তা পর্যায়ের চেষ্টাটি এখনো তেমন দৃশ্যমান নয়। যতটা এসেম্বলারের ভূমিকায় আমরা সন্তুষ্ট। তবে এরই মাঝে অনেক স্মার্ট শিল্প উদ্যোক্তা আছেন যারা ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করার পথে এগিয়ে গেছেন অনেকটা। সরকার ও BGMEA ও কাজ করছে। নিশ্চই অদূর ভবিষ্যতে আরো ব্যপক আকারে কাজ শুরু করতে পারব আমরা। সেই শুভকামনা বাংলাদেশের RMG সেক্টরের জন্য রইবে সবসময়।

লেখকঃ মানবসম্পদ পেশাজীবী 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*