কার্যকরী দল ও অকার্যকর দলের বৈশিষ্ট্য

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল

অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্টিভ জবস বলেছেন, ‘ব্যবসার বড় সাফল্য কখনও একজন ব্যক্তির দ্বারা হয় না, এটি এক দল ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়।’

মাদার তেরেসা বলেছেন, ‘তুমি যা করতে পার আমি তা পারি না, আমি যা পারি তুমি তা পার না। একত্রে আমাদের দ্বারা অনেক বড় কিছু করা সম্ভব।’

দলগতভাবে কাজ করা নিয়ে দুজন গুণীর উপরিউক্ত উক্তি সর্বজনস্বীকৃত। এখন হয়তো মনে প্রশ্ন আসতে পারে দল কী, দলবদ্ধ কাজ কী, দল কত বড় হবে, কীভাবে একটি দল কার্যকর হয় ও সফলতা আনে, কীভাবে একটি দল অকার্যকর হয় প্রভৃতি। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যথাসম্ভব লেখার চেষ্টা করব।

প্রথমে আলোচনা করা যাক দল কী? দল সম্পর্কে ছোট-বড় অনেক ধরনের সংজ্ঞা রয়েছে, তবে সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা হলো‘একের অধিক ব্যক্তির একত্রিত হওয়া।’ যদিও মানুষ দিয়ে উদাহরণ দেওয়া হলো, কিন্তু আমরা যদি পশুপাখি বা অন্যান্য জীবের কথা চিন্তা করি তারাও দলবদ্ধভাবে চলে, যেমন পিঁপড়া, বন্যপ্রাণী, শীতকালীন পাখি  প্রভৃতি।

তবে দল থাকলেই যে দলবদ্ধ কাজ হবে, তা কার্যকর হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদের এটা জানা জরুরি যে দলবদ্ধ কাজ কী, কখন একটি দল কার্যকর হয়?

দলবদ্ধ কাজ কী? দলবদ্ধ কাজ হলো কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য এক দল মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রক্রিয়া। যেকোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দলবদ্ধ কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য কর্মরত সবার যেকোনো পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সমঝোতা ও চেষ্টা বড় অবদান রাখে।

একসঙ্গে কাজ বা দলবদ্ধভাবে কাজ করার অর্থ ব্যক্তিরা তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব^ সত্ত্বেও সহযোগিতা করার চেষ্টা করবে তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতা ব্যবহার করে এবং গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া প্রদান করবে। দলবদ্ধ কাজের অনন্য উদাহরণ একটি সংবাদপত্র অফিস, যেখানে অফিসে অবস্থানরত ছোট থেকে বড় পদের সবাই, এমনকি বাংলাদেশজুড়ে সব প্রতিনিধি যার যার কাজ নিজ অবস্থান থেকে করে যায়, যার ফলে তা প্রতিদিন প্রকাশ করা সম্ভব হয়। ধরি এক দিন মতামত ও বিশ্লেষণ কিংবা সম্পাদকীয় বিভাগের যিনি দায়িত্বে আছেন, তিনি কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পাতার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার নিজের কাজটি ঠিকমতো না করেন তাহলে কি সে পত্রিকার পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশ করা আদৌ সম্ভব?

এখন আলোচনা করা যাক কীভাবে একটি দল কার্যকর হয়? একটি দল তখনই কার্যকর হয় যখন সে দলের নিম্নলিখিত  বৈশিষ্টগুলো বিদ্যমান থাকে

এক. ভিন্ন যোগ্যতা ও দক্ষতার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত দল, যারা প্রত্যেকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভূমিকা রাখেন। দুই. প্রত্যেকের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যর ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা ও তারা নিজ দায়িত্ব পালনে সক্রিয়। তিন. প্রত্যেকে নিজ দায়িত্ব জানে এবং পরস্পরকে সাহায্য করে। চার. সময়মতো লক্ষ্য পূরণের তদারকিতে দলে থাকেন একজন সমন্বয়কারী।

পাঁচ. দলের মধ্যে দায়িত্ব (কী করতে হবে?) ও পদ্ধতির (কীভাবে করতে হবে?) এটা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা; ছয়. দলের মধ্যে সহায়ক ও ঘরোয়া পরিবেশ থাকবে, যেখানে সবাই নিজ নিজ চিন্তাভাবনা, তা কাজে না লাগলেও প্রকাশ করতে পারে। সাত. সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, যা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে দলের সবাই সমাধান বের করে। আট. দলের মধ্যে সমস্যা নিয়ে অনেক আলোচনা করা হয়, যাতে সবাই অংশগ্রহণ করে। দলের সবাই প্রত্যেকের মতামত শোনে। নয়. দলের সদস্যরা ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদ্ধতিতে সমালোচনা করে এবং সবাই আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করে। দশ. দল ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং ব্যর্থতা ও সফলতার মধ্য দিয়ে নিজেদের কর্মক্ষমতাকে পর্যালোচনা এবং উন্নত করে।

আমার মতে, ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো একটি কার্যকরী দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আমরা যদি একটি সফল ফুটবল দলের কথা চিন্তা করি এবং প্রতিটি পয়েন্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, দেখা যাবে অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য সে দলে রয়েছে। যেমন: দলে একেকজনের দক্ষতা একেক রকম কেউ গোলকিপার হিসাবে ভালো এবং কেউ ফরোয়ার্ড। তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে গোল দেওয়া এবং বিজয় অর্জন, যা সবার কাছে স্পষ্ট এবং সবাই সবার দায়িত্ব পালন করে। তাদের সমন্বয়কারী হিসেবে দলে রয়েছেন একজন অভিজ্ঞ অধিনায়ক। তাদের মধ্যে সহায়ক পরিস্থিতি থাকে এবং একে অপরকে সামনে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। তারা সবাই পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

একটি দল কেন অকার্যকর হয়? নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যখন একটি দলে বিদ্যমান থাকে তখন তাকে দল বলা যেতে পারে, কিন্তু সেখান থেকে দলবদ্ধ কাজ আশা করা বোকামি। যেমন: এক. যখন বেশিরভাগ সদস্য শোনার চেয়ে বেশি বলে এবং খুবই অল্প সংখ্যক সদস্য কাজে অবদান রাখে। দুই. কিছু সদস্য নীরব থাকে, কোনো কিছুতে সাড়া দেয় না, কিংবা অবদান রাখতে ভয় পায়। তিন. যখন সদস্যদের ধারণা ও মতামতকে উপহাস কিংবা উপেক্ষা করা হয়। চার. যখন কোনো বিষয় নিয়ে দলের সদস্যরা তর্কে লিপ্ত হয়। পাঁচ. এক বা দুজন সদস্য যখন সবকিছুতেই নিজেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চায়। ছয়. যখন দলে যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ভোটাভুটি করা হয়। সাত. যখন দলের সদস্যদের মাঝে দায়িত্ব, ভূমিকা কিংবা লক্ষ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকে না। আট. যখন একে অন্যের প্রতি বিশ্বাসের ঘাটতি থাকে। নয়. যখন সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ থাকে না। দশ. যখন কাজের ভালো কিংবা ভুল দিকগুলো কেউ তুলে ধরে না, কিংবা দায়সারা গোছের মতামত ব্যক্ত করে।

ওপরের বিষয়গুলো যদি আমরা হেরে যাওয়া কিংবা অসফল কোন একটি দলের সঙ্গে মিলিয়ে নিই তাহলে তার বেশিরভাগ পয়েন্টই আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিমেষেই ধ্বংস করতে যেমন একটি অকার্যকর দলের ভূমিকা থাকে। ঠিক কোনো প্রতিষ্ঠানকে সফল করতেও দলবদ্ধ কাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

লেখক ঃ মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*