সুযোগ এমনিতেই আসেনা, ক্ষেত্র তৈরি করে নিতে হয়

আব্দুস সালাম

জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাল কিছু করতে না পেরে বা করার সুযোগ না পেয়ে আপনি হয়তবা মনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য ভাবছেন যে অন্যেরা আপনাকে সুযোগ দিতে অস্বীকার করছে। এটা নিজেকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। যা কখনই আপনার জন্য সুখকর হবেনা। আমরা হাটতে শিখেছি মায়ের হাত ধরে, আমরা সবকিছু জেনেছি অন্যের কাছে এটাতো অস্বীকার করতে পারবেন না? তার মানে তারা শুরুতেই আমাদের একটি সুযোগ করে দিয়েছে নির্দিষ্ট বিষয়টি শেখার জন্য। আপনি কি বিজ্ঞান স্যারকে বলেছিলেন, ‘না আমি গ্যালিলিওর কথা মানিনা, আমি নিজেই পরখ করে দেখবো পৃথিবী সূর্য্যের চারিদিকে ঘোরে কিনা? আপনি বলবেন না কারণ এটা সম্ভব নয় । সত্যি এটাই যে প্রথমবার একজন কষ্ট করে একটা জিনিস তৈরি করবে, একটি পথ দেখাবে, একটি সুযোগ তৈরি করে দেবে আর পরবর্তীতে অন্যান্যরা সেটাকে অনুকরণ করে সহজেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে । আজকের পৃথিবীতে যারাই কিছু করতে পেরেছেন, কেউ না কেউ একদিন তাদের সুযোগ দিয়েছিল । নিজের আগ্রহ শক্তিটাকে কাজে লাগানোর পথ কেউ একজন অবশ্যই বলে দিয়েছিল । সামনের কেউ একজন অবশ্যই পাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকে সামনে চলার জন্য সাহায্য করেছিল, নাহলে আজ তারা এতটা সামনে এগিয়ে যেতে পারতোনা । কি পারতো? ফ্যারাডের বয়স মাত্র ২১ বছর যখন তিনি একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ করেন। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন আর রাতের বেলা বই পড়তেন । একদিন স্যার হামফ্রির বক্তৃতা হবে তাই দোকানের এক খরিদ্দার এই বিখ্যাত বিজ্ঞানীর চার দিনের বক্তৃতার টিকিট দিয়ে গেল। দোকানের মালিক জর্জ বিজ্ঞান বিষয়ে ফ্যারাডের আগ্রহের কথা জানতেন আর এজন্য সব ক’টি টিকিট তাঁকে দিয়ে দিলেন। বক্তৃতা শুনে তাঁর মনের গভীরে বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি হল। ফলে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর বই বাঁধাইয়ের কাজ নয়, বিজ্ঞানই হবে তাঁর জীবনের কাঙ্ক্ষিত সোপান। তিনি তখন মনের গভীর আকুতি ও আগ্রহের কথা জানিয়ে স্যার হামফ্রির নিকট চিঠি লিখলেন। চিঠি লেখার উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁকে গবেষণার কোনও সুযোগ করে দেওয়া। একদিন অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে স্যার হামফ্রি ডেভির কাছ থেকে চিঠির প্রত্যুত্তর পেলেন যেখানে ছিল সাক্ষাতের আমন্ত্রণ। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি উপলদ্ধি করলেন বিজ্ঞানের প্রতি মাইকেল ফ্যারাডের তীব্র আগ্রহ। তাই তাঁকে তিনি নিজের গবেষণাগারে চাকরি দিলেন। তারপর সেই বইয়ের দোকানের ছেলেটিই একদিন আবিষ্কার করলো যুগান্তকারী তত্ত্ব “আলোকের উপর চৌম্বকত্বের প্রভাব”। যার উপর নির্ভর করেই তৈরি হয়েছে কোনও তারের সংযোগবিহীন যন্ত্র সমূহ যেমন; বেতার, টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ইত্যাদি। আজকের ইলেকট্রিক মটরের মুলনীতি, জেনারেটরের মূলনীতি কিন্তু তারই আবিষ্কার । এই সাফল্যের পেছনে কিন্তু দুজন মানুষের সরাসরি সহযোগিতা ছিল , একজন হলেন সেই বই বাঁধাইয়ের দোকানের মালিক আর বিজ্ঞানী স্যার হামফ্রি । নাহলে হয়ত মাইকেল ফ্যারাডেকেও হয়ত বই বাধাঁই করেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হতো । আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ, যে আমাকে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার জন্য বকাবকি করেন, অপমান করেন, আমি বাধ্য হই শিখে নিতে, তারপর তার হাসিমাখা মুখটা দেখে আমি সব ভুলে যাই । আমি কৃতজ্ঞ এই জন্য যে, নাজানা বিষয়গুলো তিনি আমাকে জানতে কিংবা বাস্তব প্রয়োগ করতে বাধ্য করেন, শেখার জন্য যিনি আমাকে বড় বড় মানুষের সাথে মেশার সুযোগ করে দেন । যে রোজ আমাকে ভয় দেখান, আর সে ভয় আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেয়না, আমার লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য আমাকে রোজ রাতে জাগিয়ে রাখে । আমরা কেউ’ই সারাজীবন এই পৃথিবীতে থাকবোনা, তাই আমাদের যেমন কেউ সুযোগ দিয়েছেন তাই আমাদেরও উচিৎ পাশের মানুষগুলোকে একটু সুযোগ করে দেয়া, বিনিময়ে কিছুই নাইবা পেলাম কিন্তু আত্মতৃপ্তি পাবো , তাই নয় কি? সেটা কেউ কেড়ে নিতে পারবেনা । আর যারা সুযোগ পাচ্ছিনা পাচ্ছিনা বলে গলা ফাটিয়ে দিচ্ছেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই স্যার হামফ্রি কিন্তু শুধু ফ্যারাডের গবেষণা করার সুযোগ দিয়েছেন বাকী পথটা সে নিজেই করে নিয়েছে। আর দোকান মালিকও কিন্তু তাকে সুযোগ করে দিয়েছেন পরোক্ষভাবে। একটু সময় নিয়ে চিন্তা করুন আপনি প্রতিনিয়ত কিন্তু এমন প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষ সুযোগ পেয়েছেন তাই এরপর নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি কিন্তু আপনার হাতে। তাই নয় কি? মনে রাখবেন যিনি আপনাকে কোন কাজ করতে বাধ্য করছেন, আপনি হয়ত তা ভাল ভাবে গ্রহণ করেন নি। কিন্তু এমনওতো হতে পারে যে এই কাজটিতেই আপনার সাফল্য লুকিয়ে আছে? আবার আপনি যখন ভাল অবস্থানে আসীন হবেন, আপনি নিজেও অন্যকে সুযোগ দিতে ভুলে যাবেন নাতো ?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*