মানবসম্পদ বিভাগের দৈনন্দিন কিছু চ্যালেঞ্জ ও আইনি সমাধান!

ইউসুফ আহমেদ শুভ্র

মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত সকলের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে ফ্যাক্টরির মানবকে সম্পদে পরিণত করা।আর সেই লক্ষ্যে কাজ করতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই আমরা কিছু দুষ্ট লোকের মুখোমুখি হই কিংবা হুট করেই সামনে চলে আসে কিছু উদ্ভট পরিস্থিতি।
আচ্ছা শুরুতেই এমন কিছু উদ্ভট পরিস্থিতির কথা ভাগাভাগি করিঃ

ক. ধরুন আপনার সিটিং এরেঞ্জম্যান্ট ফ্লোরে আর আপনি পে রোল সফটওয়্যার এ কাজ করেন। কোন না কোনভাবে কোন একজন কিউসি আপনার পাসওয়ার্ড জেনে গেলো এবং সুযোগ মতো সে কোন একটা তথ্য পরিবর্তন করে দিলো। এখন আপনি কী করবেন?

খ. আপনার কাছে ৪ নম্বর লাইনের লাইন ইনচার্জ অভিযোগ করলো যে তার কানসাই অপারেটর টা প্রায় প্রতিদিনই দেরি করে ফ্যাক্টরীতে প্রবেশ করে আর আপনি জব কার্ড চেক করে তার সত্যতা পেলেন। এবার আপনার করনীয় কী?

গ. আপনার বিভাগীয় প্রধানের কাছে ফিনিশিং ম্যানেজার অভিযোগ করলো যে একজন প্যাকার সিকিউরিটি গার্ডের সহায়তায় প্রোডাক্ট চুরি করে। আপনার বিভাগীয় প্রধান আপনাকে ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করতে বললেন। আপনি কিভাবে কাজ করবেন?

ঘ. আপনার একজন মেকানিক ছুটি না নিয়ে প্রায়ই কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে, এতে করে কাজে অনেক সমস্যা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আপনি তাকে একটি সতর্কীকরণ পত্র প্রদান করলেন কিন্তু সে এটি গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানালো।ব্যাপারটা অবশ্যই আপনার সম্মানে লেগেছে কিন্তু এখন আপনার করণীয় কী?

এমন সহস্র পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা প্রতিনিয়ত হই। কিন্তু এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর কী?

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এ এমন উদ্ভট পরিস্থিতি আর দুষ্টু লোকদের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে!

আসুন এবার আমরা শৃংখলা নীতিমালা নিয়ে কথা বলিঃ
১।বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২৩(১) অনুসারে কোন শ্রমিককে বিনা নোটিশে বা নোটিশের পরিবর্তে বিনা মজুরীতে চাকুরী হতে বরখাস্ত করা যাবে, যদি তিনি- কোন ফৌজদারী অপরাধের জন্য দন্ডপ্রাপ্ত হন;  অথবা  অনুচ্ছেদ ২-এ বর্ণিত অসদাচরণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।

২। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২৩ (৪) অনুসারে নিম্নলিখিত কাজগুলো অসদাচরণ বলে গণ্য হবেঃ-

উপরস্থের কোন আইনসংগত বা যুক্তিসঙ্গত আদেশ মানার ক্ষেত্রে এককভাবে বা অন্যের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অবাধ্যতা;

মালিকের ব্যবসা বা সম্পত্তি সম্পর্কে চুরি, প্রতারণা বা অসাধুতা;

মালিকের অধীনে তার বা অন্য কোন শ্রমিকের চাকুরী সংক্রান্ত ব্যাপারে ঘুষ গ্রহন বা প্রদান;

বিনা ছুটিতে অভ্যাসগত অনুপস্থিতি অথবা ছুটি না নিয়ে এক সঙ্গে দশ দিনের অধিক সময় অনুপস্থিতি;

অভ্যাসগত বিলম্বে উপস্থিতি;

প্রতিষ্ঠানের প্রযোজ্য কোন আইন, বিধি বা প্রবিধানের অভ্যাসগত লংঘন;

প্রতিষ্ঠানে অশৃঙ্খল বা দাংগা হাংগামামূলক আচরণ অথবা শৃঙ্খলা হানিকর যেকোন কর্ম;

কাজে কর্মে অভ্যাসগত গাফিলতি;

প্রধান পরিদর্শক কর্তৃক অনুমোদিত চাকুরী সংক্রান্ত, শৃঙ্খলা বা অসদাচরণসহ, যে কোন বিধির অভ্যাসগত লংঘন।

মালিকের অফিসিয়াল রেকর্ডের রদবদল, জালকরণ, অন্যায় পরিবর্তন, উহার ক্ষতিকরণ বা উহা হারিয়ে ফেলা।

৩।অসদাচরণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত কোন শ্রমিককে অনুচ্ছেদ ১-এর অধীনে চাকুরী হতে বরখাস্তের পরিবর্তে, বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, নিম্নলিখিত যে কোন শাস্তি প্রদান করা যাবেঃ-

অপসারণ;

নীচের পদে, গ্রেডে বা বেতন স্কেলে অনধিক এক বৎসর পর্যন্ত আনয়ন;

অনধিক এক বৎসরের জন্য পদোন্নতি বন্ধ;

অনধিক এক বৎসরের জন্য মজুরী বৃদ্ধি বন্ধ;

অনধিক সাত দিন পর্যন্ত বিনা মজুরীতে বা বিনা খোরাকীতে সাময়িক বরখাস্ত;

ভৎর্সনা ও সতর্কীকরণ।

৪। অনুচ্ছেদ-১ এর অধীনে বরখাস্তকৃত অথবা অনুচ্ছেদ-৩ এর (ক) এর অধীনে অপসারিত কোন শ্রমিককে, যদি তার অবিচ্ছিন্ন চাকুরীর মেয়াদ অন্যুন এক বৎসর হয়, মালিক ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রত্যেক সম্পূর্ণ চাকুরী বৎসরের জন্য চৌদ্দ দিনের মজুরী প্রদান করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, কোন শ্রমিককে অনুচ্ছেদ-২ এর (খ) এর অধীনে অসদাচরণের জন্য কোন শ্রমিককে বরখাস্ত করা হলে তিনি কোন ক্ষতিপূরণ পাবেন না।– ধারা ২৩ (৩), বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬

৫। শাস্তির পদ্ধতিঃ অনুচ্ছেদ-১ এর অধীনে কোন শ্রমিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে না, যদি না-

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ লিখিতভাবে করা হয়;
অভিযোগের একটি কপি তাকে দেয়া হয় এবং এর জবাব দেয়ার জন্য অন্তত সাত দিন সময় দেয়া হয়;
তাকে শুনানীর সুযোগ দেয়া হয়;
তদন্তের পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়;
মালিক বা ব্যাবস্থাপক বরখাস্তের আদেশ অনুমোদন করেন।
– ধারা ২৪ (১), বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬

৬। কোন তদন্তে অভিযুক্ত শ্রমিককে, প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত এবং তৎকর্তৃক মনোনীত কোন ব্যক্তি সাহায্য করতে পারবেন।

৭। যদি তদন্তে কোন পক্ষ মৌখিক স্বাক্ষ্য প্রদান করেন, তাহলে যার বিরুদ্ধে এই স্বাক্ষ্য প্রদান করা হচ্ছে তিনি সাক্ষীকে জেরা করতে পাবেন।

৮। কোন শ্রমিক অনুচ্ছেদ-১ এর অধীনে সংঘটিত কোন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে, যদি তার বিরুদ্ধে অনুচ্ছেদ-৩ এর (চ) অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় তবে উক্ত শ্রমিক খোরাকী ভাতা পাবেন।

৯। যদি তদন্তে কোন শ্রমিকের অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তাহলে তিনি সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে কর্মরত ছিলেন বলে গণ্য হবেন এবং উক্ত সময়ের জন্য তার খোরাকী ভাতা সমন্বয় সহ, মজুরী প্রদেয় হবে।

১০। শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে, শাস্তির আদেশের একটি কপি সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে অবশ্যই প্রদান করতে হবে।

১১। যদি কোন শ্রমিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রেরিত কোন নোটিশ, চিঠি, অভিযোগনামা, আদেশ বা অন্য কোন কাগজপত্র গ্রহন করতে অস্বীকার করেন, তাহলে তা তাকে প্রদান করা হয়েছে বলে গণ্য হবে। তবে এ ক্ষেত্রে উক্ত নোটিশ বা চিঠি বা অভিযোগনামা বা আদেশ এর একটি কপি নোটিশ বোর্ডে প্রদর্শিত হবে এবং আরেকটি কপি উক্ত শ্রমিকের ঠিকানায় রেজিঃ ডাকযোগে প্রেরণ করতে হবে।

১২। উপরে বর্ণিত বিষয়সমুহ ছাড়াও সুষ্ঠু তদন্ত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের স্বার্থে প্রচলিত শ্রম আইনে বর্ণিত সকল ধারা এবং উপধারা প্রযোজ্য হবে।

(লেখাটির সকল তথ্য “বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬” থেকে গৃহীত)

লেখকঃ মানবসম্পদ পেশাজীবী

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*