পোশাক শিল্পে কর্মরত একদল যোদ্ধা ও আমাদের মানসিক অবস্থান

ইউসুফ আহমেদ শুভ্র

দৃশ্যপট ১ঃ

সাল ১৯৯০!
হিমহিম বিকেল পেরিয়ে কনকনে ঠান্ডা নিয়ে রাত্রি যখন দ্বিপ্রহর তখন মোটামুটি খেয়ে পরে চলতে পারা এক কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েছে এক শিশু। পরিবারের প্রথম সন্তান, তবুও কোন উচ্ছ্বাস নেই, উল্লাস নেই, নেই মিঠাই মুখ করার কোন তাড়না! কারন শিশুটি যে কন্যা সন্তান!!!

মেয়েটি মায়ের আদরে , বাবার শাসনে বড় হতে থাকে। একদিন মা লক্ষ্য করেন, মেয়েটির ডান হাতটা ঠিক স্বাভাবিক না। একটু সরু, খানিকটা দূর্বল!

একটু বড় হতেই স্পষ্ট হয়ে যায় মেয়েটির বিকলাঙ্গতার ব্যাপারটি। মায়ের কান্না আর প্রতিবেশীদের টিপ্পনী যেনো আর থামেই না। “এমনি এমনি কী আর ল্যাংড়া মাইয়া হয়, এই মাইয়া হইলো পাপের ফল”। মা কাঁদে, মেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে!

মেয়ে বড় হয়, স্কুলে যেতে চায়, বাবা চোখ রাঙায়। মা পাশের বাড়ি থেকে বই এনে দেয়, মেয়ে ঘরে লেখাপড়া করে। এক সময় স্কুলে যায়, এস এস সি পাশ করে। এর মধ্যে বাবা মারা যায়, ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়া আর সংসারের হাল ধরে সে। টিউশনি করায়, নিজে কলেজে পরে। কিন্তু এভাবে আর পেরে উঠে না মেয়েটি। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গাজীপুরের একটি গার্মেন্টসে চাকরী নেয়, আর ভর্তি হয় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সেখান থেকেই এইচ এস সি আর বিএ পাশ করে মেয়েটি এখন জুনিয়র অফিসার।

দৃশ্যপট ২ঃ
জন্ম থেকেই ছেলেটি কানে শুনে না, কথা বলতে পারে না। ক্ষুধা লাগলে দৌড়ে মায়ের কাছে যায়, মায়ের আঁচল ধরে টানে আর নিজের পেট দেখায়, মা খেতে দেয়। ব্যাটারি দেওয়া খেলনা গাড়ি দেখে ছেলেটি লাফায় আর হাততালি দেয় । মুখে বলতে পারে না ক্ষুধার কথা, এমন কি বলতে পারে না আনন্দিত হওয়ার গল্প।

বর্ষার সন্ধ্যা। বাড়ির পাশের এক টুকরো জমিতে চাষ করা তরকারী গ্রামের হাঁটে বিক্রি করে বাবা মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছে আসতেই হোঁচট খেয়ে পরে যান, পা ভেঙ্গে যায়, ভুল চিকিৎসায় পা হারিয়ে ঘরে বসা বাবা। চিকিৎসার খরচ যোগাতে গিয়ে একদম নিঃস্ব অবস্থা।

ছেলেটির মা খোঁজ পায় সিডিডি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের যারা প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে। তাদের মাধ্যমে ছেলেটি চাকরী নেয় একটি পোশাক কারখানায়।

সহস্র মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দুই বছরের মাথায় ছেলেটি আজ সিনিয়র অপারেটর।

হাতে বা পায়ে সমস্যা থাকা মানুষদের কে ল্যাংড়া লুলা বলে তিরস্কার করা এই সমাজ কী প্রতিবন্ধীদেরকে সহকর্মী হিসেবে মেনে নিতে আসলেই প্রস্তুত? সরাসরি উত্তর হচ্ছে, না প্রস্তুত নয়। আমাদের নোংরা মানসিকতা এখনো প্রতিবন্ধিদেরকে সহকর্মী হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

আমি সাইন ল্যাংগুয়েজের মাধ্যমে যখন কথা বলতে না পারা শ্রমিকদের সাথে কথা বলি, তাদের কষ্টের কথা শুনি তখন একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে লজ্জা হয় খুব, ধিক্কার দেই নিজেকে। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা তাদের সহকর্মী কিংবা সমাজের কাছে সম্মান চায়, চায় ভালোবাসা ।

শুনে আশ্চর্যান্বিত হবেন! হয়ত অনেকে নীচের বিষয়গুলি জানেন কিংবা শুনেছেন!

তাদের ইতিবাচক দিকঃ 
প্রোডাকশন রেকর্ড দেখলে স্পষ্টতই বুঝা যায়, তার আর আট দশটা অপারেটরের চেয়ে কোনভাবেই কম প্রোডাকশন দেয় না বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বেশিই দেয়। কথা বলতে পারে না বলে তাদের সম্পূর্ন মনোযোগ থাকে কাজের ক্ষেত্রে ফলে প্রোডাকশন নিয়ে আসলে কখনো সমস্যা থাকে না।

সামাজিকভাবে তাদের প্রতি আমাদের অবস্থানঃ

ক.  যদিও তারা প্রোডাকশন ঠিকঠাক দেয় কিন্তু তবুও মেশিন সমস্যা বা অন্য কোন সমস্যায় প্রোডাকশন কম হলে সুপারভাইজারের রাগটা তার উপরই ঝারে কারন সে কথা বলে তার সমস্যাটা বুঝাতে পারে না।

খ. কথা বলতে না পারার কারনে অনেক সময়েই তুলনামূলক কম বেতন পায় তারা।

গ. আশেপাশের বাজারে আর দশজনের কাছে এক বস্তা চাল যতো টাকা রাখা হয়, তাদের কাছে রাখা হয় তার চেয়ে অন্তত ৫০/১০০ টাকা বেশি। অন্যদের কাছে এক রুমের একটা ঘরের ভাড়া যদি চার হাজার টাকা হয় ওদের ক্ষেত্রে সেটা অবশ্যই নিম্নে সাড়ে চার হাজার টাকা।

ঘ. কথা বলতে না পারায় পরিবার বা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রক্ষায় তার ভিডিও কলে কথা বলে আর এর জন্য প্রয়োজন একটা মাল্টিমিডিয়া মোবাইল সেট। এই নিয়েও তাদেরকে শুনতে হয় কতো শতো কথা, চুরি করা মাল, গার্মেন্টসে চাকরী কইরা আলগা ফুটানি আরো কতো কী!

এই সব যোদ্ধাদের প্রতিবন্ধকতার কথা আসলে বলে শেষ করার নয়। আর সকল প্রতিবন্ধকতাই আসলে তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষের তৈরী। ল্যাংরা, আতুরা, বোবা , কানা নয় বরং যেদিন আমরা এই সব যোদ্ধাদেরকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার মতো উন্নত মানসিকতার হবো সে দিনই তাদের এই দুঃখগাঁথার অবসান হবে।

লেখকঃ মানবসম্পদ পেশাজীবী

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*