বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের অচ্ছুৎ হারকিউলিসেরা

ওয়ালিদুর রহমান :

পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি তাজমহল। স্ত্রী (আসলে প্রণয়িনী) মমতাজের প্রেমে অন্ধ শাহজাহান তার স্মৃতি রক্ষার্থে (আমার ধারনা এই মৃত্যু উপলক্ষে নিজেকে অমর করার ধান্দায়) তাজমহল নির্মাণ করেন। দুর্মূখেরা তবু বলে সম্রাটের এই খেয়াল পূরণে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন গেছে, রক্ত ঝরেছে কত মানুষের, তাজমহলের প্রতিটি শ্বেতপাথর আসলে রক্তস্নাত। তবে কে তার খবর রাখে বলুন। মানুষ কিন্তু সেই কারিগর (প্রেমিক শাহজাহান যাদের আঙুল কেটে দিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে যাতে তারা আরেকটা তাজ বানাতে না পারে। ভালবাসার জন্য যদি শাহজাহান তাজ বানিয়ে থাকতেন, তবে এই কারিগরদের প্রতি সে ভালবাসা কই?), সেই শ্রমিক, সেই দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ’র ফলে মৃত মানুষদের মনে রাখেনি। রেখেছে তাজমহল আর তার স্রষ্টা শাহজাহানকে। ওই যে বলে না, বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা? যাহোক, তাজমহল বা শাহজাহানকে নিয়ে গল্প বা ইতিহাস চর্চার জন্য আজ বসিনি। লম্বা একটা পটভূমিকা বললাম পরের অংশের পট নির্মাণে ।

মূল কথায় আসার আগে আরেকটা সাইড টক বলি। টিভিতে ইদানিং একটা সিমেন্টের বিজ্ঞাপন হয়। যেখানে দেখানো হয় একজন শ্রমিক তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে ফোনে সান্তনা দিচ্ছেন তার প্রসবের সময় বাড়িতে তার পাশে থাকতে পারবেন না বলে। আর অনাগত সন্তানের নাম রাখতে বলেন ”সেতু”। অফিসের বড় কর্তা তাকে ছুটি দেয়া স্বত্তেও সে কেন বাড়িতে যায়নি-জিজ্ঞাসা করায় সে বলে, এতবড় তিনটা সেতুর কাজ চলছে। এমন সময় আমি ছুটিতে কী করে যাই? একটা দায়িত্ব আছে না? তার দেখাদেখি আরো দু’জন নিজেদের ছুটি বাতিল করার অনুরোধ জানায়। থীমটা হল, কাজের সিরিয়াসনেসের কারণে একজন হবু বাবা তার স্ত্রীর পাশে সন্তান প্রসবের সময়ও থাকছেন না স্বেচ্ছায়। জবের প্রতি সিরিয়াসনেস দেখানোর চুড়ান্ত পরাকাষ্ঠা আর কি। এই সিরিয়াসনেস ও জান লড়িয়ে দেবার বিপরীতে তার স্ত্রী ও গোটা পরিবারের মানসিক অবস্থার কী হবে-সেটা বিজ্ঞাপনদাতার ভাবনায় নেই। তিনি কি দেখাতে চাইছেন সবাই এভাবেই নিজের ও পরিবারের ত্যাগের বিনিময়ে অফিসকে ভালবাসুন? প্রয়াত ভারতীয় প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম বলেছিলেন, কাজকে ভালবাস, অফিসকে নয়।

বাংলাদেশে বহু ঘাত প্রতিঘাত, বহু সমালোচনা, বহু নাক সিটকানো, বহু ষড়যন্ত্র’র পরেও আজ গার্মেন্টস একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলাদেশের লাইফলাইন। গার্মেন্টস এখন এমন একটি সত্য যে কারনে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরকে নিয়ে প্রত্যেকদিনই একটা না একটা খবর, আর্টিকেল, ফিচার কোনো না কোনো মাধ্যমে থাকবেই। গার্মেন্টস এখন আমাদের সমাজে, পরিবারে, রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। অনেকের ভাল লাগুক বা না লাগুক গার্মেন্টস শিল্প এদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। গার্মেন্টসকে নিয়ে প্রচুর উন্নাসিকতা, প্রচুর নাক সিঁটকানো থাকলেও, এটি এখন এমন একটি শিল্প যেটি দেশের সর্ববৃহৎ একক কর্মসংস্থানদাতা, সরাসরি ৫০ লক্ষ আর পরোক্ষভাবে ১ কোটি মানুষের। গার্মেন্টস সেক্টরের নানারকম নেতিবাচক দিক থাকা স্বত্বেও আজ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য, এটি দেশের আশা। গার্মেন্টস বাঁচলে দেশ বাঁচে-এমন অবস্থা। না, আমি গার্মেন্টস সেক্টরের গুণগান করতেও বসিনি। শুধু বোঝাতে চাইলাম, দেশে গার্মেন্টস সেক্টরের অবস্থান কোথায়। দেশে বিদেশে সর্বত্র আজ বাংলাদেশের ইকোনোমি নিয়ে ব্যাপক উচ্ছাস যার পেছনে বড় অবদান গার্মেন্টস’র (আর হ্যা অবশ্যই আমাদের কৃষক ও প্রবাসীদের)। সবার মুখে মুখে গার্মেন্টসের অবদানের স্বীকৃতি। তবে এই সুখছবির আড়ালে একটি বিপরীত ছবি আছে। ওই যেমন শাহজাহান ও তাজমহলের সপ্তাশ্চর্যের শৌর্যের আড়ালে এর প্রাণ হারানো কারিগরদের করুন দিকটি চাপা পড়েছে তেমনি গার্মেন্টস সেক্টর এবং এর শৌর্যবীর্য, মহিমা, গর্ব এসবের আড়ালে আরেকটি না বলা অধ্যায়ও রয়েছে। সেটি হল সেইসব গার্মেন্টস কারিগরদের জীবনগাঁথা যাদের ঘাম, শ্রম, রক্ত, অশ্রু এই শিল্পকে সৃষ্টি, নির্মান, পত্তন, অগ্রগমন, উত্থান ও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে এবং করে চলেছে। ওরা হল গার্মেন্টস সেক্টর তথা গার্মেন্টস মেকিং, টেক্সটাইলস, স্পিনিং, নীটিং, ডাইং, ওয়াশিং তথা টোটাল গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত লক্ষ লক্ষ কর্মী। তাদের জীবন, জগত, ত্যাগ, তিতিক্ষা, প্রাপ্তি, আনন্দ, তৃপ্তি, গর্ব, অপ্রাপ্তি, বেদনা, বঞ্চনা-এসবের একটা না বলা দিক নিয়ে কথা বলব আজ যেই অংশটা নিয়ে খুব কথা বলা হয় না।

গার্মেন্টসকে নিয়ে আজকের বাংলাদেশের গর্বের পেছনে আমাদের মতো কর্মীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর সামাজিক ত্যাগ স্বীকারের আবেগঘন ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সেই ত্যাগ সময়ের, সেই ত্যাগ ছোট ছোট মুহুর্তের, সেই ত্যাগ জীবনের এক একটি ক্ষুদ্র আনন্দ মিস করার। সেই কাকডাকা ভোরে সবাই যখন স্বাস্থ্যচর্চা বা রাতের ঘুমের ঘাটতিটুকু আয়েশি ভঙ্গিতে পুষিয়ে নিতে বিছানায় পড়ে থাকেন, তখন আমাদের দিন শুরু হয়। নাকে মুখে কোনোমতে কিছু একটু গুজে দিয়ে যাত্রা শুরু হয় আমাদের কামলা জীবন বা সেমি কর্পোরেট জীবনের। সূর্যাস্ত আইন দেশে না থাকলেও আমাদের জন্য সূর্য আইন আজও আছে। সূর্য উঠলে শুরু, সূর্য ডুবলে শেষ- সারাবছরই একই রুটিন আমাদের। রাত নামলে ছুটি হয় আমাদের প্রিয় কর্মক্ষেত্রে। লেট শীপমেন্ট থাকলে সেটা গভীর রাতেও গড়ায়। রাতে ফিরে আবার জীবন চালানোর সাংসারিক দায়িত্ব। রোবট লাইফ বলে যদি কিছু থাকে সেটা এই জগতে পাবেন। সারাদেশ যখন রমজানের শেষের দিকে কেনাকাটার মহোৎসবে মাতে তখন আমাদের লক্ষ লক্ষ সহকর্মী কবে বেতন পাবেন সেই অপেক্ষার প্রহর গোনেন। আমাদের সন্তানেরা রোজার মাসেও পথ চেয়ে বসে থাকে বাবা/মা কবে তাদের সাথে ইফতার করতে পাবেন। চাতকের মতো অপেক্ষা চলতে থাকে বোনাসের অপেক্ষায়। তাও অনেকে হয়তো প্রতিবছর সেটা যথাসময়ে পান না। হয়তো ঈদের আগের দিন। তখন সবার বাজারে পরিত্যাগ করে রেখে আসা জামাকাপড় আমরা কিনি। ঈদের ছুটিতে কবে বাড়িতে যাব কেউ জানে না তাই বাস ট্রেনের টিকিট কাটার ব্যাপার আমাদের নেই। প্রতিবছরই আমরা বাসে ট্রাকে অন্যের দয়ার বাহনে বাদুড়ঝোলা হয়ে বাড়িতে ফিরি ঈদ করতে।

ভ্যালেন্টাইন আসে, ফাল্গুন আসে, নববর্ষ আসে। আমাদের কাছে শুধু একটা জিনিসই আসে-জরুরী শীপমেন্ট। শীপমেন্ট টাইম ধরতে পারাটাই আমাদের এই সেক্টরে একমাত্র ধ্যান, একমাত্র উৎসব। শীপমেন্টের শিডিউল সুরক্ষা করার নিরন্তর ইঁদুর দৌড়ে আমাদের ঈদ, পুজা, জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে-সব উৎসবই থমকে দাড়ায়। সবই কুরবান শিডিউল রক্ষার দৌড়ে। বাড়িতে স্ত্রী হয়তো সেজেগুজে অপেক্ষা করেন বিবাহবার্ষিকীতে প্রিয় পতীদেবকে নিয়ে একটু ফুসকা খাবেন, হাত ধরাধরি করে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বাদাম খাবেন। অপেক্ষা পথ চেয়েই ক্লান্ত হয়। পতীদেব তখন ফ্যাক্টরীর ফ্লোরে ত্রস্তে হাত চালান দ্রুত-যদি কিছুটা আগে তাহলে বাসায় ফেরা যায়, তাতে যদি একটি গোলাপের দোকানও খোলা পাওয়া যায়। একটি সূর্যাস্তের বিকেলে প্রিয়ার হাত ধরে নদীর পাড়ে বসে আনমনা হবার ইঁদুর কপাল কখনো হয়তো জোটে না এই সেক্টরের ভাগ্যের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমানো স্বপ্নবাজদের।

সবার চেকইন আছে, থাইল্যান্ড ট্রিপ আছে, পুরোনো বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক ঝালাই আছে, রাত বিরাত আড্ডা আছে। আমাদের আছে একটাই জিনিস-”মাল” ও ”শিপমেন্ট”। শিপমেন্ট ধরবার অমানুষিক প্রেশারে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত শিডিউল মেইনটেইন করা হয়না, সময়মতো বাসায় ফিরে সন্তানের বার্থ ডে কেক কাটা হয় না, বউয়ের প্রেগনেন্সির সময় নিয়মিত চেক আপ করতে সঙ্গ দেয়ার সুযোগ হয় না, অলস দুপুরে বারান্দায় বসে শহরের জীবন দেখার সময় হয় না। গ্রামে বাবা-মা কে দেখতে ইচ্ছে করলেই দৌড় লাগানো যায় না।

প্রতিদিন সকাল হলেই নগরের রাস্তায় সস্তা টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ততোধিক সস্তা কাপড়ে সস্তার স্পঞ্জ চটি পড়া অল্প বয়সি মেয়ে ও ছেলেদের যে লম্বা লাইন পেটের ধান্দায় ফ্যাক্টরীর পানে ছুটে চলে, যাদের নিয়ে ফিচার লিখে আপনারা কামাই করেন, যাদের নিয়ে ধান্দা করে কতিপয় দালাল শ্রমিক দরদীদের ধান্দা চলে, যাদের নিয়ে মায়াকান্নায় ফেসবুক ভেসে যায়-তাদের সত্যিকারের জীবনটা কখনো ভেবেছেন, উঁকি মেরেছেন তাদের হৃদয়ের চৌহদ্দিতে? এই মেয়েদের একটা বড় অংশ তাদের ছোট্ট বাচ্চাদের গ্রামে মা, শাশুরি, নানী বা বোনের জিম্মায় রেখে শহরে আসেন শ্রমিকের চাকরী করতে (এখন অবশ্য ছোট করে ক্রেশ বানানো হচ্ছে)। তাদের নিশ্চই ইচ্ছে করে বাবুটাকে দেখতে, নিজ হাতে খাওয়াতে। চলতি পথে দামী দোকানের কাঁচের শার্শির ওপাড়ে যখন একটা দামী পুতুল বা টেডি বিয়ার অথবা একটা ছোট্ট ফ্রক তারা দেখে তখন নিশ্চই তার বাবুটার কথা একবার হলেও মনে পড়িয়ে তাকে থমকে দেয়। সেলাই মেশিনে যখন সেই ইউরোপ, আমেরিকার বাচ্চাদের জন্য সে তার কড়া পড়া হাতে তরতর করে একটি ছোট্ট লাল ফ্রক সেলাই করে চলে তখন অমন একটা সুন্দর ফ্রক তার বাবুটাকে পড়াবার কথা ভেবে ক্ষণিকের তরে হলেও তার মনটা নিশ্চয়ই থমকে পড়ে? প্লাস্টিকের বাটিতে যখন একটু ভর্তা আর সামান্য তরকারী দিয়ে সাতসকালে রান্না করা ডেলা পাকানো ভাত দ্রুত খেতে থাকে (লাঞ্চ টাইম বাঁচিয়ে একটু বিশ্রামের সময় বের করতে) তখন নিশ্চই সে ভাত তার গলায় একবার হলেও আটকায়। আজকের সুবিশাল গার্মেন্টস সেক্টর এদের সেই ফোটা ফোটা কষ্টের অশ্রুর বিনিময়ে মাথা তুলেছে।

আমি নিজে দেখেছি একজন সিনিয়র স্ট্যাফকে তার ভাঙা পা নিয়ে অপারেশনের ৪/৫ দিনের মাথায় ক্রাচে ভর দিয়ে ফ্লোরে ডিউটি করতে চলে এসেছে। কাজের প্রতি মায়া, সিরিয়াসনেস, চাপে। নতুন বউকে বাসায় রেখে ৩ দিনের মাথায় কাজে হাজির। হানিমুনে গেছেন-সাথে বড় লটবহর যেমন আছে তেমনি ল্যাপটপও সাথে। নতুন বউ নিয়ে বিচে রোমান্সও চলে, ফাঁকে ফাঁকে ”শীপমেন্ট” ও “মাল” এর গতিও করেছে। এ্যক্সিডেন্ট করে বিছানায় পড়ে আছেন। সামনে ল্যাপটপ বসিয়ে সমানে অফিস করে যাচ্ছেন-বহু দেখেছি। স্ত্রী বাসায় লিভারের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। গার্মেন্টস কর্মী স্বামী সারাদিন শিপমেন্ট করে রাতে বাসায় ফিরে বউকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটতে ছুটতে ডাক্তারের ছুটি-এ আমি নিজ চোখে দেখেছি। হরতাল, ধর্মঘট গাড়ি চলে না। গার্মেন্টস কর্মী ট্রাকের পেছনে ঝুলে ঝুলে ঠিকই ফ্যাক্টরীতে হাজির। পেট্রোল বোমার ভয়াবহ দিনগুলোতে আমরা গার্মেন্টস কর্মীরা একদিনও কামাই করিনি। করিনি, কারন ওই একটাই-শিডিউল ধরা, শীপমেন্ট ধরা। আজকের গার্মেন্টস সেক্টরের দেশের লাইফলাইন হয়ে ওঠা আর তাকে ঘিরে আমাদের রাজনীতিবীদদের জোর করে “আমরা সব করেছি” ক্রেডিট নেবার প্রানান্ত চেষ্টা-সবকিছু আসলে এমনই ৫০ লক্ষ কর্মীর জান লড়িয়ে দেয়া আন্তরিকতার দামে কেনা।

আমার লেখাকে অন্যখাতে নেবার চেষ্টা করবেন না। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি গার্মেন্টস সেক্টরের গুনগান করতে আজ যেমন আসিনি তেমনি এই সেক্টরের কোনো সমালোচনা করতেও বসিনি। আমি বরং কৃতজ্ঞ, এই সেক্টরের কল্যানে তবু পরিবার নিয়ে তবু দু’বেলা দু’মুঠো খাবার সংস্থান হয়েছে, এই ২৬ লক্ষ বেকারের দেশে তবু একটু কিছু করে খেতে পাচ্ছি সেটাইতো শুকরিয়া। আমি এই সেক্টরের সমালোচনা করছি না। তবে বলব না যে কোনো সমস্যাই এখানে নেই। তাও আছে। কিন্তু আমার আজকের লেখাটা শুধু আমরা যারা এই সেক্টরের কর্মী তাদের ঘাম ঝরানো শ্রমের না বলা ইতিহাস, তাদের ত্যাগের পরিমান ও ধরন, তাদের না বলা কথা, অসংখ্য কম্প্রোমাইজের অজানা অধ্যায়ের কিছুটা উম্মোচন করা।

অন্যান্য শিল্পের মতোই এখানেও দোষে গুনে মিলিয়ে নানান কালচার, শিক্ষা, ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকেদের নিয়ে আমরা কাজ করি। সবাই যে একই ঘরানার বা একই রকম উন্নত কালচারের অধিকারী সেটা জোর দিয়ে বলার উপায় নেই। তাদের সাথে ঠিক কোন যাদুবলে মানিয়ে নিয়ে, কম্প্রোমাইজ করে, আগুপাছু করে প্রতিদিন আমরা আমাদের কাজ করে যাই-সেটা বলা যায় অষ্টম আশ্চর্য। প্রতিনিয়ত কম্প্রোমাইজ করতে হয়, ছাড় দিতে হয় চিন্তায়, চেতনায়, বিশ্বাসে, ভক্তিতে। কম্প্রোমাইজ করতে হয় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, পছন্দ, চাওয়া পাওয়ার সাথে, কম্প্রোমাইজ করতে হয় সেক্টরের স্বার্থে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যায়তনের একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণের জন্য এই কম্প্রোমাইজ, এই ইন্টেলেকচুয়াল ডাইকোটমী কতটা বেদনার হতে পারে সেটা যারা বাইরে আছেন তারা শুধু বইয়ের পাতায় আর ফেসবুকে দেখেন। দেখে শুধু একটা তাচ্ছিল্লের হাসি হয়তো বড়জোর দেন। অনেকেই তাচ্ছিল্লের পাশাপাশি মনে মনে একটা গালি দেন “শালা গার্মেন্টস”। কিন্তু সত্যিটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন না। আমরা জানি এই কম্প্রোমাইজের বেদনা। আমাদের সেই কম্প্রোমাইজের উত্তাপে পোড়া জীবনের অজানা অধ্যায়ও এই সেক্টরের ভীত গড়েছে-একটু হলেও।

আমার লেখা পড়ে বা অর্ধেক পড়েই গার্মেন্টসকে গাল দিতে নেমে পড়বেন না। আমি আজ সমালোচনা বা প্রশংসা কোনোটাই করতে বসিনি। আমি শুধু আমাদের হৃদয়ের কথাটা পাড়তে বসেছি, আমাদের স্টোরির ব্যকস্ক্রিনটি দেখাতে বসেছি। আপনি গার্মেন্টসের হাজারটা দোষ ধরাতে পারবেন। আমি তবু বলব, তবু এটা আমাদের পেটে ভাত যোগান দেয়। গার্মেন্টসকে গালি দিলে আমাদেরই গালি দেয়া হয়। আমরা, ৫০ লক্ষ লোক যারা বুকের কান্নার রক্তে গড়েছি আপনাদের মতো বাকি ১৬ কোটি ৫০ লক্ষ লোকের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসার যায়গা, রিজার্ভের নিশ্চিৎ ভরসা-তাদের গালি দেয়া কি ঠিক?

আজ রাতে যখন সোফায় বা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে, আপনারা, আপনাদের মতো ”নন-গার্মেন্টস” কর্পোরেটরা আমাদের (ও প্রবাসি ও কৃষকদের) তৈরী রিজার্ভের টাকার উপর ভরসা করে সুলতান সুলেমান দেখবেন তখন না ভাবুন, বিজ্ঞাপন বিরতিতে একটু ভাববেন একবার। আমাদের জন্য এদেশ স্মৃতিস্তম্ভ বা কোনো থ্যাংকস গিভিং ডে আয়োজন করবে না জানি। কিন্তু করাতো যেতো তাই না? আমরাই তো সেই ৮০’র দশকের পশ্চাদপদ বাংলাদেশকে, সেই তলাহীন ঝুড়ি বাংলাদেশকে আজকে ঘাড় উঁচু করে, গলার স্বর ভারি করে নিজের পয়সায় পদ্মা ব্রীজ বানানোর দুঃসাহস দেখানোর পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছি তাই না?

লেখক : মানবসম্পদ পেশাজীবি

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*