চাকরি লাভে প্রথম ইমপ্রেশন গুরুত্বপূর্ণ

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল:

রাকিব সাহেব একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন নির্বাহী। সোহেল সাহেব তার সহকর্মী। পদবি বিবেচনা করলে রাকিব সাহেব অনেক ধাপ ওপরে। কিন্তু তিনি মুক্তচিন্তার মানুষ, অধীনস্থদের সহকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। একদিন হুট করে সোহেল সাহেব বললেন, ‘স্যার, কাল আমার মেয়ের জন্মদিন, আপনাকে অবশ্যই গরিবের বাসায় একটু পদধূলি দিতে হবে।’ রাকিব সাহেব ভেবেচিন্তে সায় দিয়ে দিলেন। তার সম্মতিতে সোহেল সাহেব আহ্লাদে গদগদ হয়ে কয়েকবার ধন্যবাদ দিয়ে তার কক্ষ থেকে প্রস্থান করলেন।

গল্পটা এখানেই শেষ নয় আর শেষ হবেও না, কারণ সোহেল সাহেবের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে রাকিব সাহেব তাকে অনেক স্নেহ করতে শুরু করেছেন! নিশ্চয়ই ভাবছেন এর কারণ রাকিব সাহেবকে সোহেল সাহেব ভালোভাবে আপ্যায়ন করিয়েছেন, কিংবা মণ্ডা-মিঠাই খাইয়েছেন সেজন্য। আরে ভাই, সবাই কি আর আপ্যায়নে তুষ্ট হন? আর যদি হন রাকিব সাহেবের মতো ব্যতিক্রমী মানুষ! ভালো লাগাটা তার শুরু হয়েছে তখনই যখন তিনি সোহেল সাহেবের বাসার বৈঠকখানায় (শহুরে ভাষায় ড্রইং রুম) প্রবেশ করলেন। তার মানে এই নয় যে, সোহেল সাহেবের ড্রইং রুমে দামি ও দুর্লভ অনেক জিনিসপত্র ছিল, যা রাকিব সাহেবের ভালো লেগেছে। জ্ঞাতার্থে জানাই, রাকিব সাহেবের ড্রইং রুমে অনেক কম জিনিসই ছিল একটি সোফাসেট, একটি বইয়ের আলমারি, একটি টিভি, সেন্টার টেবিল (যেখানে ফুলদানিতে রাখা সতেজ কিছু গোলাপ) আর দু-তিনটি পেইন্টিং। তাহলে রাকিব সাহেবের মন কীভাবে আন্দোলিত হলো? এর মূল কারণ ছিল জিনিস কম বা বেশি থাকুক, যত দামি হোক আর কম দামি হোক, ড্রইং রুমটা পরিপাটি করে সাজানো ছিল, কোনোকিছু অগোছালো ছিল না। ঠিক যেন কেউ ড্রইং করেছে! যদিও সোহেল সাহেবকে রাকিব সাহেব বেশ কিছুদিন হলো চেনেন, কিন্তু তার বাসায় এই তার প্রথম যাওয়া। সোহেল সাহেবের ড্রইং রুম দেখেই তার পছন্দ হয়েছে। এটাই হলো প্রথম ইমপ্রেশন (কিছু বাংলা শব্দ যেমন ইংরেজিতে অনুবাদ করলে শুনতে ভালো লাগে না, তেমনি কিছু ইংরেজি শব্দও আছে, যা তার মতোই রাখা ভালো)।

প্রশ্ন উঠতেই পারে মানুষ কেন ড্রইং রুম সাজিয়ে রাখে। নিশ্চয়ই অতিথিকে আকৃষ্ট করতে,  অতিথির যেন তার সম্পর্কে ভালো ধারণা হয়। সোহেল সাহেবের ড্রইং রুম অগোছালো হলে রাকিব সাহেব সেটিকে কেমন চোখে দেখতেন? সোহেল সাহেবের মেয়ের বয়স সবে তিন বছর হওয়ায় তার ড্রইং রুম অগোছালো থাকার যৌক্তিক কারণ ছিল বৈকি। তবুও তিনি তা পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছিলেন। কারণ তিনি ঊর্ধ্বতনকে কদর করেন, সম্মান করেন। হয়তো তিনি চান মানুষ যেন তার ব্যাপারে ভালো ধারণা রাখেন। সেজন্য তিনি ড্রইং রুমটাকে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে একজন মানুষ প্রথম দেখায় যে কোনো মানুষের প্রতি যে ধারণা পেয়ে থাকেন, সেটি তিনি দীর্ঘদিন মনে রাখেন। সুতরাং প্রথম ইমপ্রেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জব মার্কেটে অনেক জ্ঞানীগুণী প্রশিক্ষক, ক্যারিয়ার কনসালট্যান্ট, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির কর্মকর্তা, প্রফেশনাল সিভি রাইটার রয়েছেন, যারা হয়তো অনেক ভালোভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারবেন। আমি সাধারণ মানুষ, নিজের মতো করেই ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছু টিপস দেওয়ার চেষ্টা করব। নিশ্চয়ই কাজে লাগবে পাঠকদের।

চাকরির ক্ষেত্রে প্রবেশদ্বার হলো প্রার্থীর সিভি, যা তাকে ইন্টারভিউ বোর্ড পর্যন্ত নিয়ে যাবে। আর সেই ইন্টারভিউটি হলো নিয়োগকর্তার কাছে প্রথম ইমপ্রেশন তৈরি করার সুযোগ। এ সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে হবে। বুঝতে হবে যদি এক্সিকিউটিভ লেভেলের কোনো চাকরির জন্য আবেদন করে থাকেন আর যদি তা হয় ডেস্কনির্ভর জব, যেখানে বহুজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে, মানুষকে পরিচালনা করতে হবে, কোম্পানির জন্য যা হয়তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু, তাহলে তারা আপনার কাছে কী আশা করবেন? নিশ্চয়ই পরিপাটি, মিষ্টভাষী একজন সুবোধ ভদ্রলোককে এই পদের জন্য আশা করবেন, তাই নয় কি? সেক্ষেত্রে প্রার্থীর উপস্থাপন, বাচনভঙ্গি নিশ্চয়ই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সমান গুরুত্বপূর্ণ আপনার বেশভূষা! সুতরাং তেমন করে তৈরি হয়েই ইন্টারভিউ বোর্ডে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে নিজেকে নিজে উপস্থাপন করতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে হবে নিজের যোগ্যতা দিয়ে। প্রথমে নিজের যে ইমপ্রেশন তৈরি করবেন, সেটিই আপনাকে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। টিভি চ্যানেলে প্রচারিত অ্যাডগুলো দেখতে পারেন। এমনভাবে কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্যকে উপস্থাপন করে যেন মনে হয় এখনই গিয়ে কিনে নিয়ে আসি। চাকরির ক্ষেত্রেও প্রার্থী নিজেকে ‘সেল’ করতে হবে, আর সেজন্য সবকিছুই গোছানো হওয়া চাই। বলতে পারেন, আমি ইংরেজিতে বেশি পারদর্শী নই। নিয়োগকর্তা ইংরেজিতে ভালো কথা বলতে পারে, এমন প্রার্থী খুঁজছেন। কিন্তু একবার চিন্তা করুন বাংলাদেশে যেসব শিক্ষিত বেকার বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তারাও তো ইংরেজিতে আপনার মতো এভারেজ, তাহলে তারা চাকরি পাচ্ছেন কীভাবে? মামা, চাচা বা আপনজনের মাধ্যমে দূষণ যে নেই, তা বলব না। কিন্তু সব নিয়োগকর্তা তো একরকম নাও হতে পারেন। নিজেকে প্রশ্ন করুন যার কেউ নেই, তিনি চাকরি পান কীভাবে? আপনি কিন্তু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েননি, তা তারা ভালো করে জানেন। তাহলে আপনার কাছে অবশ্যই ন্যাটিভ ইংরেজের মতো শতভাগ সঠিক বাচনভঙ্গি আশা করবেন না ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যরা। তাদের যদি তা-ই দরকার হতো তবে তারা লন্ডনের ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিত আর আপনাকে ডাকত না। তাহলে আপনাকে ডাকার পেছনে কারণ কী? আর আপনার কাছে তারা কী চান? যেহেতু আপনার সিভি দেখে তারা ডেকেছেন, তার মানে তারা যে স্ট্যান্ডার্ড চাচ্ছে তার সঙ্গে আপনি কমপ্লাই করেন। এক্ষেত্রে আপনার সিভিতে যা যা লিখেছেন, তা নিশ্চয়ই কারও সিভি থেকে কপি-পেস্ট করা নয়? যদি তা হয়ে থাকে, তবে আপনি এই চাকরির জন্য অযোগ্য। আর যদি সিভিটা আপনি নিজে আপনার মতো করে তৈরি করে থাকেন, তবে সেটিতে কী আছে আপনার জানা থাকার কথা। অধিকাংশ ইন্টারভিউয়ে প্রাথমিক স্তরে সিভি থেকেই কিছু না কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়। সুতরাং সিভিতে কী কী লিখেছেন, তা আবার একটু দেখে যান, উত্তর দিতে সুবিধা হবে। আর আপনার উচ্চারণ গড়পরতা মানের হলেও মনে রাখতে হবে, স্পিকিংয়ের ক্ষেত্রে বাক্যগঠনে দক্ষতা থাকা জরুরি। আপনার অবশ্যই এই ছোট দক্ষতাটুকু থাকতে হবে। আর বিশ্বাস রাখুন, একটু অনুশীলন করলে তা রপ্ত করতে পারেন। যদি তবুও সমস্যা হয়, তাহলে অনেক ইনস্টিটিউট রয়েছে, যেগুলোয় স্পিকিং ইংলিশের শিক্ষা দিয়ে থাকে, আজই ভর্তি হয়ে যান সেখানে। নিজেকে তৈরি করুন, কিন্তু কোনো অজুহাত চলবে না। মনে রাখতে হবে চাকরি আপনাকে অর্জন করে নিতে হবে। হতে পারে নিয়োগকর্তা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছে আর আপনার মনে হচ্ছে, এই বুঝি চাকরিটা হলো না। ঠিক যে মুহূর্তে এটা চিন্তা করবেন, আপনার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ কমে যাবে। নিজের প্রতি আস্থা রেখে নিজেকে উপস্থাপন করুন। একটি ছোট দেশের রাষ্ট্রপ্রধান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে যান (যিনি তার একদম অপরিচিত, কখনও দেখা হয়নি) তবে তিনিও কিঞ্চিৎ নার্ভাস হবেন, তাই নয় কি?  তাই বলে কি তিনি হাল ছেড়ে দেবেন? হয়তো তিনি দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে কথা বলতে গেছেন, সারা দেশের মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছেন। এক্ষেত্রে এই নার্ভাস অবস্থায়ও কিন্তু তিনি কাজ হাসিল করে নিয়ে আসবেন। চাকরি প্রার্থীকেও ভাবতে হবে চাকরিটা দরকার, হয়তো পরিবার তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাই নার্ভাস লাগলেও সামনে বসা মানুষগুলোকে তা বুঝতে দেওয়া যাবে  না। নিশ্চয়ই জয়ী হবেন। একবার ভাবতে পারেন, এ চাকরিটা যদি না হয়  যারা আপনার সামনে আছেন তাদের সঙ্গে কি আপনার আবার দেখা হবে? নাকি তারা সব ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকবেন? যদি তা না হয়, তবে কিসের ভয়? চাকরি আজ না হয় কাল হবে। ইন্টারভিউ বোর্ডে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, আপনি যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা যেন সামনের মানুষগুলো বোঝেন। আর নিয়ন্ত্রণ যেন আপনার হাতে থাকে। নিজেকে উপস্থাপন করুন, আপনি যেমন ঠিক সেভাবে। ধরা যাক, প্রার্থী একটি প্রশ্নের উত্তর জানেন না, অথচ ধারণা করে একটি উত্তর দিয়ে দিলেন লটারির মতো; এটা ভালো নয়। নিজের প্রতি সৎ থাকুন, তাহলে পরে আফসোস করতে হবে না। সবাইকে সবকিছু জানতে হবে বা সবাই সবকিছু জানে, এটি ঠিক নয়। যা জানেন না, সেক্ষেত্রে সরাসরি ‘না’ বলুন। ওভার স্মার্ট হতে গেলে আরও বিপদে পড়বেন, কারণ সামনে রয়েছে বোদ্ধা ক’জন মানুষ। তারা বহু আগে আপনার অবস্থানে ছিলেন, আজ তারা অভিজ্ঞ। তাই তারা অপছন্দ করবেন এমন কিছু করবেন না। গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদে স্যুট-বুট পরে ঘেমে-নেয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে গেছেন, আর প্রার্থীর গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে, এমনকি এসি রুমেও! তাহলে নিয়োগকর্তারা কী ভাববেন? তারা কি ভাববেন আপনি অনেক স্মার্ট? যদি রাকিব সাহেবের মতো লোক থাকেন তিনি প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘কোন বাহনে ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?’ আপনি উত্তর দেবেন, সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার কিংবা লোকাল বাস! সেক্ষেত্রে তিনি ভেবে নেবেন, আপনার কমন সেন্সের অভাব আছে। ওই যে আগে বলেছি, ওভার স্মার্ট হলে বিপদে পড়বেন! নিজেকে পরিপাটি করে সাজানো মানে আপনার যা আছে, সেটিকেই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে। চুলটা এলোমেলো যেন না থাকে, জুতায় যেন কাদা লেগে না থাকে, শার্টটা যেন ইন করা থাকে। তাই বলে এই নয় যে, অনেক দামি পোশাক পরে আসতে হবে। তারা শুধু দেখবেন, প্রার্থীর পরিহিত পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার আছে কি না, আর প্রার্থী আত্মসচেতন কি না। চাকরিপ্রার্থীকে মনে রাখতে হবে, সামনে যারা আছেন তারাও মানুষ। বর্ষাকালে যেখানেই যান আপনার নিজের গাড়ি নেই, সুতরাং গণপরিবহনে যাতায়াত করবেন। সেজন্য কিছুদূর পথ হাঁটবেন, তা তারাও বুঝতে পারেন। সেক্ষেত্রে জুতোর এক কোণে একটু কাদা লেগে থাকলে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু প্রখর রোদে এমন অবস্থা থাকলে তারা মেনে নেবেন না। প্রথম ইমপ্রেশনটাকে স্মরণীয় করুন, আর অজুহাত থেকে দূরে থাকুন, হতাশাকে দূরে ছুড়ে ফেলুন। আপনাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি আপনার অন্নের কথা ঠিকই চিন্তা করেছেন। কিন্তু তা অর্জন করতে হলে আপনার প্রচেষ্টা, সদিচ্ছা ও পজিটিভনেস খুবই জরুরি বিষয়।

(উল্লেখ্য লেখাটি ২১ নভেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে দৈনিক শেয়ারবিজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়)

লেখকঃ মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*