ব্যর্থ আসলে কে, যিনি ছাটাই করছেন তিনি নাকি যিনি চাকুরীচ্যুত হচ্ছেন তিনি?

মুহাম্মদ জসীম উদ্দীন

আপনি অনেক বড় কর্মকর্তা।  আপনার আঙ্গুলি নির্দেশে কতজনকে বের করে দেন যখন তখন!  এমনকি যাকে বের করছেন তার পায়ের জুতাটাও নেওয়ার সময় দেননা। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ডেস্ক থেকে নেয়ার সময় দেয়া হয়না। এরপর আপনি মালিকের কাছে মেসেজ বা ফোন করে জানিয়ে দেন অমুককে বের করে দিয়েছি এই এই কারণে। ইনিয়ে বিনিয়ে যা যা বললে মালিক আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মতি দেবে। অনেক সময় বাহবাও যোগ হয়। আর অন্য সহকর্মীরাতো ভয়ে চুপ। মুখে কুলুপ এটে আছেন পাছে কখন আবার কার কি হয়। আপনি মনে করেছেন আপনি সফল। আপনি মনে করতে পারেন এবার অত্যন্ত যোগ্য লোককে আপনি উক্ত পদে বসাবেন। অল্প ক’দিনেই মালিকের কাছে আপনি আরেক দফা বাহবা পাবেন। না জনাব, আপনি যা ভাবছেন জগত তা ভাবছেনা। আপনি সফলতার ধারে কাছেও নাই। যাকে আপনি বের করে দিলেন তার চেয়ে আপনি অনেক বেশী ব্যর্থ। যে অপরাধে যাকে আপনি বের করে দিলেন, অপমানিত করলেন, তাকে নিয়োগের সময় কি উক্ত কন্ডিশনগুলো ছিল? তাকে কি না বোঝা  কাজগুলো কোনদিন হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছেন? ভুলগুলো  সুধরে দিয়েছেন? কিভাবে করলে আরো ভাল হবে এবং ভুল হবে না  সে সম্পর্কে তাকে কোন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন? না দেননি,  করেননি,  শেখাননি!আর শেখাবেনই বা কিভাবে? আর দেখাবেনই বা কিভাবে? আপনি নিজেই ওই কাজ কতটুকুইবা জানেন সে নিয়ে কিঞ্চিৎ শঙ্কা তো হতেই পারে নাকি?  আপনার আদেশ পালনের জন্য সে তার সর্বস্বটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে সে কথা কি আপনি একবারও চিন্তা করে দেখেছেন?  সে কত রাত ভালভাবে ঘুমাতে পারেনি,  আপনার নির্দেশটি কিভাবে পালন করলে আপনি রাগ না করে খুশি হবেন এই ভেবে, সে কথা কখনো অনুধাবন করেছেন? না কখনো নয়, হয়ত  আপনি  তখন পাচতারা হোটেলে বিনোদনে ব্যাস্ত!  একটি বার  চিন্তা করে দেখুন, হয়তো পারিবারিক বা অন্যকোন ব্যাকআপ এর কারণে আপনি আপনার যোগ্য চেয়ারটা ২০ বছর আগে পেয়েছেন!  শুধু একটি ভুলের  জন্য বা কোন এক অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে যাকে বের করে দিলেন তার সামনে বসে আপনি ইন্টার্ভিউ দেন দেখি! তাহলেই আসলে বোঝা যাবে আপনার জ্ঞানের গভীরতা কতখানি, কিংবা আপনি কাজে কতটা সক্ষম। আপনার প্রতিষ্ঠানের এমন অনেক ছোট ছোট কাজ আছে যেগুলো ছোট পজিশনের লোকেরা করে থাকে, যেগুলো সম্পর্কে আপনার কোন ধারনাই নাই। তারাই আপনাকে মালিকের কাছে বড় করে তুলছে প্রতিনিয়ত। আপনি এদের অবজ্ঞা করতে পারেন, কিন্তু তারা আপনাকে যতটা না ভয় করে তার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করে যায়। কিন্তু আপনার  বসসুলভ অতি দাম্ভিক আচরণ হয়ত  তাদের অন্তরে একসময়  ভালবাসা আর শ্রদ্ধার পরিবর্তে ঘৃণা আর ভয় এর সঞ্চার করেছে। আপনি হয়তো আরো কিছুদিন আরো কিছু লোককে বের করে দিয়ে পার পেয়ে যাবেন। কিন্ত জনাব, একদিন অবশ্যই আপনাকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে, করতে হবে এবং ইতিহাসে এমনটাই হয়েছে। এরকম অনেক অনেক দৃষ্টান্ত এই আপনার চারিপাশেই আছে। শুধু একটু চোখ কান খুলে খোঁজ নিয়ে দেখুন না! তাই বলি,  এই আপনি বা আপনারা যারা এইরকম ভয়ানক (ক্ষমতার অপব্যবহার অর্থে) ক্ষমতার অধিকারী বা পদে আছেন দয়া করে একটু নিজেদের আত্নসমালোচনা করুন। যেই কর্পোরেটের কালচারের দোহাই দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন তা থেকে বেরিয়ে এসে একবার আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করে দেখুন না কি তার সমস্যা, কেন সে ভুল করছে। খুঁজে বের করুন না  কোথায় তার দুর্বলতা, আর তার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার পর  গুনাগুনগুলোকে বিকশিত করার রাস্তাটা একবার দেখিয়ে দিন না। অথবা তার প্রতিভার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ  কাজগুলো তাকে করতে দিয়ে দেখেন, সে আপনাকে হতাশ করবেনা। একটা প্রতিষ্ঠানে ১০০% লোক যোগ্য হবে এটা ভাবার কোন কারণ নাই। কিন্তু ১০০% লোক সৎ হতে হবে অবশ্যই। তাই আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের কারণে কোম্পানীর নিবেদিত প্রাণ লোকগুলোকে বের করে মালিককে বেকায়দায় ফেলবেন না প্লিজ। কারণ অধিক যোগ্যলোক হয়তো আপনি খুঁজে পাবেন কিন্তু কিন্তু তারা সবাই যে সৎ হবে তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? চালাক লোক হয়তো আপনাকে কোন না কোন ভাবে খুশি করতে পারবে কিন্তু সেই সততা আর নির্ভরতা কি আর ফিরে পাবেন?  যে যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে পদন্নোতি পেতে চায় তাকে সেই সুযোগটা দিয়ে দেখুন, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করুন, তবেই আপনি মহিমান্বিত হবেন।  আপনাকেও  তো কেউ না কেউ সহযোগিতা করেছে, তাই নয় কি?  তা না হলে আপনি হয়তোবা এই পদে আসতে পারতেন না! তাই পদে পদবীতে যত বড় হয়েছেন হৃদয়টাকে তার চেয়েও বহুগুণ বড় রাখুন। ঠিক  যেমনটি আপনি আশা করতেন আপনার বসের কাছে। তাহলেই আপনি হবেন সত্যিকারের বস, যার কথা রেডিও টেলিভিশন এর চ্যানেলে বা টকশোতে না বললেও আকাশে বাতাসে বলে বেড়াবে স্বপ্রণোদিত হয়ে। মিলাদ করে হুজুর ডেকে দোয়া চাইতে হবেনা, শত হাজার দোয়া আপনা থেকেই চলে আসবে।

 

আমার অবস্থানগত বিবেচনায় হয়তো অনেক বড় কথা বলে ফেলেছি, তাই বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু এটাই আমার মনের কথা, অন্তরের কথা, বিশ্বাসের কথা। আপনার ভাল লাগলে আমারও ভাল লাগবে, কিন্তু আপনার খারাপ লাগলে আমার খারাপ লাগবেনা। কারণ এটাই ধ্রুব সত্য । আমার শ্রদ্ধাভাজন এক স্যার বলতেন, “আপনি যে কাজের সমাধান নিজে করতে পারবেন না তা অন্যের কাছে চাওয়ার অধিকার আপনার নাই”। তাই বলি ভাই ভাবুন,  সিদ্ধান্ত নেবার আগে আরো একবার ভেবে দেখুন, আরো একবার……!  অন্যথায়  আপনাকেও যে পস্তাতে হবে এতে কোন সন্দেহ নাই।

লেখকঃ ডিজিএম-ষ্টোর, টেক্সইউরোপ (বিডি) লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*