আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব ও চাকুরী সমাচার-বর্তমান প্রেক্ষাপট :

মুহাম্মদ জসীম উদ্দীন

দৃশ্যপট ১- এই বছরের শুরুর দিকে দেশের একটি মধ্যম সারির RMG কোম্পানি ৫০-১০০ জন ফ্রেশ গ্রেজুয়েটকে চাকরি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বায়োডাটা আহবান  করে। প্রায় ৫০০০ এর অধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে ২০০ জনকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রেখে সময় সুযোগ করে প্রয়োজন অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে চাকুরী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্টোর বিভাগে একজনকে ট্রেইনি অফিসার হিসেবে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানালে ভদ্রলোক সরাসরি আপারগতা প্রকাশ করেন। উনার আশা মার্চেন্ডাইজিং কিংবা এইচ আর বিভাগে চাকরী করা।

দৃশ্যপট ২- ছেলে পাশ করে বেকার সময় কাটাচ্ছে। চাকরী না পাওয়ায় বৃদ্ধ বাবা মাকে দেখাশুনা করা বা বিয়ে করতে পারছেনা। অনেক ঘুরাঘুরি করে কয়েক হাত ধরে জানাশুনা একটা গার্মেন্টস এর মহাব্যবস্থাপক স্টোর বিভাগে ট্রেইনি অফিসার হিসাবে নিয়োগ দেন তার বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করতে। ফ্রেশার হিসেবে উনাকে এক সপ্তাহ মালামাল রিসিভিং টিমের সাথে, এক সপ্তাহ স্টোর কোয়ালিটির সাথে, এক সপ্তাহ সরবারাহ টিমের সাথে এবং মাসের শেষ সপ্তাহে রিপোর্টিং শেখার জন্য সুযোগ দেয়া হয়। দুঃখজনক ব্যাপার হল দুইদিন পর ট্রেইনি অফিসারের খবর নিতে গিয়ে বিভাগীয় প্রধান জানতে পারেন, ভদ্রলোক সকালবেলা যোগদান করে কর্মসূচী পাওয়ার পর লাঞ্চ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি।

দৃশ্যপট ৩- অনুরোধের ঢেকি গিলে চাকুরী দেয়া একটা ছেলে খুব আরামে সুইং ফ্লোরে নিডল সরবরাহের কাজ করে। কর্তৃপক্ষ তার ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে স্টোরের বৃহত্তর পরিসরে কাজের সুযোগ দেন যেখানে তার ভবিষ্যৎ হয়তো কিছুটা ভাল হত। এই প্রেক্ষিতে যে কেউ সাধারণত খুশি হবার কথা থাকলেও উনি খুশি হতে পারেনি এবং সেই নিডল সরবরাহের কাজেই ফিরে গেলেন।

 

বিপরীত প্রেক্ষাপট ১- বিবিএ পাশ করা একজন মেধাবী তরুণ বন্ধুর রেফারেন্স এ ট্রেইনি হিসেবে জয়েন করলেন একটা গার্মেন্টস এর স্টোরে। পজিটিভ মানসিকতা, শেখার আগ্রহ এবং পরিশ্রমের ফলে এখন মিড লেভেল পজিশনে ৫০ হাজারের মত বেতন পান। সময়ের ব্যবধান ৮/৯ বছর। এখন তিনি অনেকের কাছে ঈর্ষার পাত্র। বিশেষ করে যারা পছন্দের জবের পেছনে এখনো ঘুরেই চলেছেন।

বিপরীত প্রেক্ষাপট ২- একজন ভদ্রলোক জব চেঞ্জের আশায় ইন্টার্ভিউ দিতে আসেন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। বিভাগীয় প্রধান উনাকে বললেন আপনার ইন্টার্ভিউ হবে বিকালবেলা কিন্তু ততক্ষণ আমার সাথে থাকবেন। উনি তাই করলেন । বিকালে ইন্টার্ভিউ এর জন্য যখন বসলেন তখন চাকুরী প্রার্থী বললেন  যে, তিনি তার বর্তমান চাকুরী ছাড়বেন না। কারণ উনি একবেলা একজন বসের সাথে থেকে বুঝতে পেরেছেন উনার বর্তমান কোম্পানীতেই উনার অনেক কিছু করার এবং দেবার সুযোগ আছে।

বিপরীত প্রেক্ষাপট ৩- বড়লোক আত্মীয়ের ছেলে কোম্পানির যে কোন একটা পজিশনে বসিয়ে দেয়া। গাই গুই করেও কাজ করল কিছুদিন। মনে মনে ফন্দি সুযোগ পেলেই উড়াল দেবে অন্য কোন সোনার হরিণ পেলে। বিধিবাম আপাতত এখানেই থাকতে হবে। একসময় গা ঝাড়া দিয়ে শুরু করল কাজ। শিখে নিল স্টোরের আসল চরিত্র। ফলাফল হাতে নাতে। কয়েক দফা হায়ার এবং প্রমোশন, বেতন ৫০ এর কোটায়।

উপরের সব কটাই উদাহরণ, কোন গল্প নয়। শুধুমাত্র সময়ের প্রয়োজনে এবং ইতিবাচক মানসিকতার কারণে কেউ কেউ পেয়ে গেল ভালভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন আর কেউ কেউ হতাশ, ব্যর্থ। প্রশ্ন হল, আমরা কি শিখলাম আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে? কারা শেখাবে আমাদেরকে লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই জীবন? কোথায় আমরা জানব, সামনে যে সুযোগটা আছে তাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলতে হবে? ইতিবাচক মানসিকতা কি করে গড়ে তুলতে হয় তা যদি পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণী পড়ার সময় না জানে তাহলে এরপরেতো আর অসম্ভব না হলেও সহজ না। আমি এমন একজনকে জানি যিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে স্টোরে চাকরির মাধ্যমে এখন একটা কোম্পানির কর্ণধার। এইরকম অনেক উদাহরণ আছে। আসল কথা কিছু গল্প আর কবিতা ছাড়া আর কিছু বীজগণিত এর সূত্রছাড়া সাধারণ ভাবে আমাদেরকে জীবনের জন্য শিক্ষা দিতে ব্যর্থ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ। একটা ছাত্রকে আমরা সার্টিফিকেট দিচ্ছি কিন্তু সে আদৌ জানেনা এটা তার জীবনের জন্য কতটুকু অবশ্যম্ভাবী আর কতটুকু সহায়ক ভুমিকা পালনকারী!

 

ইংরেজ আমলের লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত কেরাণী তৈরীর শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা কবে ভাঙতে পারব? বছর বছর গল্প আর ছড়া পরিবর্তন করলেই কি শিক্ষাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে? একি ডেকোরেশন চেঞ্জের মত হয়ে যাচ্ছেনা?  অবকাঠামোগত পরিবর্তন না হলে আমাদের প্রজন্ম কোনদিনই জানতে পারবেনা চাকরী এবং কাজের পার্থক্য কি? আমাদের সন্তানেরা বড় হচ্ছে পরনির্ভর হয়ে, পানির গ্লাসটাও এগিয়ে দিতে হয় তাদের। আমাদের শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেখায় না আত্ননির্ভরশীলতা কি? স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো ছাত্রকে যখন তারই ডিপার্টমেন্ট এর প্রধান এয়ারপোর্ট এ রিসিভ করতে এসে ছাত্রের লাগেজ টানে তখন আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুল ব্যাগটাও ড্রাইভার কিংবা কাজের লোকের হাতে! তাহলে কিভাবে আমরা পরনির্ভরতা থেকে মুক্তি পাবো? আমাদের প্রায় স্কুলের সামনে যেই ফুট ওভারব্রিজ আছে তার ব্যবহার কি সবচেয়ে বেশী হবার কথা নয়? নিজের জামা কাপড়, নিজ বাথরুম নিজে ধোয়ার উপর স্কুলে ১০ মার্কস রাখলে ছোট বেলা থেকেই আত্ননির্ভরশীল হতে পারত সকলে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষ হতে হলে মানুষের ভিতর ইগো বা অহংকার নামক শয়তানটাকে স্কুল জীবনেই যদি শেষ করা যায় তাহলে সে যেকোন স্থানে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। আর তখনই আমরা গড়ে উঠতে পারব চীন জাপানের মত একটা কর্মঠ জাতি হিসেবে। তখন কেউ আর চাকরী খুজবেনা, খুজবে শুধুই কাজ। আর কাজ পাগল জাতিই পারে এই বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে। আমরা যারা পদে পদে ঠেকে ঠেকে শিখছি এটাতো কাম্য নয়। সবাইকে বিষ খেয়ে বিষের গুণাগুণ প্রমান করতে হলে প্রমাণের সুফল ভোগ করার কেউ অবশিষ্ট থাকবেনা তা নিশ্চয় সবাই স্বীকার করবেন। বিঃদ্রঃ যা কিছু তুলে ধরলাম তা কমবেশি সবাই উপলব্ধি করে, অনুভব করে। কিন্তু কাজের কাজটি করার জন্য কেউ নেই। তাই আমরা পারিবারিকভাবে যথাসম্ভব এই বাস্তবতাগুলোর সাথে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে একাত্ন করে দেই। তাতে আপনি তাদেরকে ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে না গেলেও তারা অভিযোগ করবে না। কারণ তারা একদিন বুঝবে আপনি তাদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ দিয়ে গেছেন যেটা তাদের একদিন অসম্ভব রকমের কাজে লাগবে।

লেখকঃ ডিজিএম-ষ্টোর, টেক্সইউরোপ (বিডি) লিঃ

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*