কর্পোরেট কালচার ও কর্পোরেট ইমেজ: টেকসই বানিজ্য উদ্যোগের পথে বাঁধা কোথায়?

ওয়ালিদুর রহমান 

আপনি কোনো সদ্য চালু হওয়া শপিংমলে একটা অতি উচ্চমূল্যের দোকান কিনলেন। পয়সা খরচ করে সেটার ডেকোরেশন করলেন, চকচকে ঝকঝকে করলেন, চৌকস বিক্রয়কর্মী নিয়োগ করলেন, দোকানের জন্য বিল, ভাউচার, ক্যাশমেমো ছাপালেন, দোকানের বিজ্ঞাপন দিলেন। কি মূল্যে কোন পণ্য বিক্রি হবে-বিক্রয় কর্মীদের তার ধারনা দিলেন। ভবিষ্যতে কতদিনে আপনার বিনিয়োগ কিভাবে তুলে নেবেন তার হিসাব করলেন। এসব কিছুই হচ্ছে একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান শুরু করতে আপনার পূর্ব প্রস্তুতি। এটা আপনি কেন করেন? নিঃসন্দেহে আপনার মুনাফা<প্রোডাক্টের অধিক বিক্রি<প্রোডাক্টের ক্রেতাশ্রেণী বৃদ্ধি<প্রোডাক্টের আকর্ষণ বৃদ্ধি। প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা (আমরা সাধারনত মালিক বলতে অভ্যস্ত) হিসেবে সবাই তার প্রতিষ্ঠানকে একটি প্রোডাক্টের মতো করে ক্রেতার কাছে তৈরী করে উপস্থাপন করবেন ক্রেতার আকর্ষণ তৈরী করতে। এটা বিক্রির আদিম ও মৌলিকতম নীতি। ক্রেতা নয়, বিক্রেতাকেই প্রথমে তার পণ্য আকর্ষণীয় করে তার ক্রেতাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে তার মুনাফা তথা অধিক মার্কেট এ্যকসেস এর স্বার্থে (ক্ষুদ্র অর্থে “মুনাফা” বা ”বিক্রির চেয়ে আমার কাছে ”মার্কেট এ্যকসেস” কথাটিকে অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হয়)। বিক্রেতারই প্রথম দায়ীত্ব হল তার প্রোডাক্ট/সার্ভিস/কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা। তা দেখে ক্রেতারা আকর্ষণবোধ করবেন সেই বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কিনতে। ক্রেতা নয় এখানে বিক্রেতার ভূমিকা প্রথমে। এই মূলনীতিটি একটি ক্ষুদ্র দোকানের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি তা সমভাবে প্রযোজ্য একটি বড় ফরমাল প্রতিষ্ঠান বা আরও বৃহৎ পরিসরে একটি দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো ক্ষেত্রে। একটি প্রতিষ্ঠানকে স্মার্ট, মডার্ন, এডুকেটেড, ভিশনারী, প্রোএ্যকটিভ-এককথায় সুযোগ্য কর্মীবাহিনী দিয়ে সাজাতে ও তাদের ধরে রাখতে হলে কোম্পানীকেই সবার আগে উদ্যোগী হতে হবে, সম্ভাব্য কর্মীদের নয়। প্রথমে কোম্পানীকেই তার নিজেকে সম্ভাব্য কর্মীদের (যারা জব মার্কেটের দৌড়ে আছে) কাছে আকর্ষণ তৈরী করতে হবে। কোম্পানীকে তার ক্যারিয়ার অপর্চুনিটি/কর্পোরেট স্বরূপকে এমন ইমেজে ক্রেতাদের (চাকুরী প্রার্থী) কাছে উপস্থাপন করতে হবে যাতে ক্রেতারা (জব সিকাররা) আগ্রহ বোধ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ পেতে। অনেক উদ্যোক্তা বলে থাকেন কর্মীরা আনস্টেবল (অল্প দিনেই চাকুরী ছেড়ে যায়) বিধায় তারা প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট প্রাকটিসে তেমন মডিফিকেশনে আগ্রহী নন। আগে কর্মীরা সেটল হোক, প্রতিষ্ঠানকে তারা লাভবান করুক, প্রতিষ্ঠানে নিজেদের নিবেদীত হিসেবে প্রমাণ করুক তারপর প্রতিষ্ঠান প্রতিদানে নিজেকে “মডার্ণ কর্পোরেট” স্বরূপে কনভার্শনে উদ্যোগ নেবে। বিপরীতক্রমে কর্মীদের অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট প্রাকটিস অপছন্দ, ক্যারিয়ারিজম না থাকা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারনে তারা সেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান।

এখন আমরা কোন পক্ষে যাব? উদ্যোক্তার ভূমিকা আগে না জব সিকারদের? অবশ্যই উদ্যোক্তাদের। সেই যে আদিম তত্ত্ব বলেছিলাম দোকান মালিকের, সেই একই নীতি। উদ্যোক্তাকেই তার প্রতিষ্ঠানকে নিজ উদ্যোগে জব মার্কেটে কর্মীবান্ধব, ভবিষ্যতমূখী, আধুনিক, ডায়নামিক, ফ্লেক্সিবল তথা চমৎকার কর্পোরেট কালচার সমৃদ্ধ একটি আকর্ষনীয় কর্মক্ষেত্র হিসেবে সম্ভাব্য ক্রেতা (জব সিকার)’র কাছে নিজেকে বিক্রির জন্য উপস্থাপন করতে হবে। যাতে ক্রেতারা তাদের ক্যারিয়ার পাথ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে খুজে নিতে পারে, এই প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের ভবিষ্যতের নির্ভরতার প্ল্যাটফরম বলে আস্থায় নিতে পারে। কর্মীদের দিক থেকে রেসপন্স আসবে পরে, আগে বিক্রেতা তথা উদ্যোক্তাকেই এগিয়ে আসতে হবে। কিছু কর্মী সবসময়ই সুইচিং এর মধ্যে থাকবে। তাদের কর্মকান্ডের উপর বিচার করে প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা, কর্পোরেট কালচারের মূলনীতি নির্ধারন করা আধুনিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উচিৎ নয়। আপনি একটি আধুনিক, ফ্লেক্সিবল ও উদার প্রতিষ্ঠানের সওদা নিয়ে জব মার্কেটে আসুন না হে কারবারী, দেখুন যোগ্য, নিবেদীত আর হ্যা অবশ্যই ”লং লাষ্টিং” কর্মী পান কিনা? চ্যালেঞ্জ। কোম্পানীকে কোম্পানী হয়ে উঠতে হলে তার কর্পোরেট কালচারকে প্রমোট করতে হবে। একটি কোম্পানী কতটা ম্যাচিউরড তার অন্যতম নির্দেশক হল কোম্পানীর মৌলিক পরিচালনা নীতিতে আধুনিক কর্পোরেট কালচারের ব্যপক চর্চা। প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট কালচার না থাকলে কী হয়? আমাদের দেশে রাস্তার মাঝে স্পিড ব্রেকার দেখেছেন নিশ্চই? একজন এসে বলে স্পিডব্রেকার দাও, এ্যকসিডেন্ট কমে যাবে। ব্রেকার বানানো হয়। কিছুদিন পর আরেকজন এসে বলে, না, এতে রাস্তার গড় গতি কমে যায়, সুতরাং ভাংতে হবে, ব্যাস ভাঙ্গা হয়। কর্পোরেট কালচার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও প্রাকটিসের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, এটি কোনো আইন পাশ বা অফিস অর্ডার ইম্পোজ করার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কর্পোরেট কালচারের অন্যতম রেডিকেল হল প্রফেশনালিজম।

কর্পোরেট কালচারের কিছু অত্যাবশ্যকীয় উপাদান: ১. রুল অব ল। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি বিষয় পরিচালিত হবে নির্ধারিত নীতি আর আইনের বলে। কোনো ব্যক্তির মর্জিতে না। ২. গুড গভর্নেন্স। সার্বিক ম্যানেজমেন্টে সুশাসনের ছাপ থাকা। ৩. প্র্রফেশনালিজম। ৪. ইমপার্সোনালিজম। ৫. ইমপার্সিয়ালিটি। ৬. প্রমোটিং মেরিট। ৭. ডিসিপ্লিনড ম্যানেজমেন্ট। ৮. লিখিত সংবিধান এবং সার্ভিস রুলস। ৯. প্ল্যানড ম্যানেজমেন্ট। ১০. কমিটমেন্ট টু এমপ্লয়িজ। আরো অনেক কিছু নিশ্চই আছে। শুধু এগুলোই নয়। কালচার কোনো আইন নয়, এটি একটি প্রাকটিস, একধরনের কমিটমেন্ট। কর্পোরেট জগতে ব্রান্ড প্রোমোশন নামক একটা কনসেপ্টের কথা প্রায়ই বলা হয়। অনেকের ধারনা ব্রান্ড প্রমোশন মানে হল শুধু বিজ্ঞাপন দেয়া আর এটা শুধু তাদের দরকার যাদের প্রোডাক্ট বিক্রীর ব্যাপার আছে আর বিক্রী বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। আসলে ব্রান্ড প্রমোশনের প্রথম কারন হল সার্ভাইভাল বা টিকে থাকা। ব্যবসায়ের তীব্র প্রতিযোগীতার যুগে টিকে থাকতে হল একটি বিজনেস অর্গানাইজেশন সেটা যেধরণের বা সাইজেরই হোক, তার ব্রান্ড প্রমোশন বা কোম্পানী ব্রান্ডিং মাস্ট। হয়তো তরিকা বিভিন্ন তবে প্রমোশন থাকতে হবেই। ব্রান্ড প্রমোশনের যত তরিকা আছে তার অন্যতম কোম্পানীতে কর্পোরেট কালচার প্রতিষ্ঠা। কর্পোরেট কালচার মানেই স্যুট পড়ে অফিস করা বা দেয়ালে অয়েল পেইন্টিং না। কর্পোরেট কালচার অফিস অর্ডার তথা আইন প্রণয়ন করে প্রতিষ্ঠা হয় না। কর্পোরেট কালচার দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। যুগপোযোগী আইন ও আধুনিক সংস্কৃতির সমতাভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমে কর্পোরেট কালচার সৃষ্টি করতে হয়। কর্পোরেট কালচার সৃষ্টিতে দরকার ইচ্ছা, ভাল মানসিকতা আর একদল সুশিক্ষিত, স্মার্ট কর্মী বাহিনী। আর লাগবে গুড গভর্ন্যান্স আর রুল অব ল।কর্পোরেট কালচার থাকলে কী হবে? অনেক কিছুই। সবচেয়ে ভাল যা হবে তা হল, কোম্পানী ব্যক্তি নির্ভর না হয়ে সিস্টেম নির্ভর হবে। ফলে ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও সিস্টেম চালু থাকবে। সিস্টেম ভেঙে পড়বে না।

কর্পোরেট কালচার কী, কেন দরকার আর কিভাবে আসবে সেটা নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছি। এখন দেখুন, কর্পোরেট কালচার গড়ে না ওঠার পেছনে কোম্পানীর কী কী ভুল কাজ করছে বা কিসের অভাব সেই কালচার গড়ে উঠতে দিচ্ছে না। (কোনো পার্টিকুলার প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বা সেক্টর এর উপজীব্য নয়।)

• দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপকতা: প্রায়ই দেখা যায়, কোম্পানীর উদ্যোক্তা নিজেকে কোম্পানীর একমাত্র মালিক মনে করেন। বিধায় তারা বাকি সবাইকে ভাবেন কর্মচারী, স্রেফ কর্মচারী। সেই কর্মচারী যাদের তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে এবং করাতে বাধ্য করতে পারেন। কর্মীদের গুরুত্বপূর্ন বিজনেস পার্টনার ভাবার মানসিকতা এখনো সুদুর পরাহত। ফলে কর্মীরা কোম্পানীকে ওন করেন না। মালিকও তাদেরকে স্রেফ বেতন দিয়েই কর্তব্য শেষ করেন।

• পুরোনো কর্মীদের বাঁধা: কোম্পানীগুলোতে দীর্ঘদিন কাজ করা পুরোনো স্ট্যাফরা কর্পোরেট কালচারের আমদানীতে বড় বাঁধা হয়ে কাজ করেন। নতুন কিছুর আগমনে তারা তাদের কর্তৃত্ব খর্ব হবে আর নতুনের সাথে তাল দিতে না পেরে তাদের কাজ হারাবেন-এই ভয়ে এটা করেন। • সুশাসনের অভাব: গুড গভর্নেন্স এর অভাব কর্পোরেটগুলোকে পিছিয়ে দেয়। যেই প্রাইভেট কর্পোরেটে গুড গভর্নেন্স নেই সেখানে কর্পোরেট কালচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

• আইনের শাসনের অভাব: আমাদের দেশে আইন মানার সার্বিক চিত্রের সাথে মিল রেখে কর্পোরেটগুলোতেও নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের আইন প্রণয়ন, আইনের প্রয়োগ আর আইন মানার ইচ্ছার ব্যাপক অভাব আছে। আইনের শাসন না থাকায় কর্পোরেটগুলোর অফিস পরিবেশে বৈষম্যও ও অসন্তোষও ব্যাপক।

• ডিসেন্ট্রালাইজেশনের ও এমপাওয়ারমেন্টের অনিচ্ছা: ওনাররা সব কর্তৃত্ব নিজেদের কাছে রেখে দিতে চান। পদস্থ এক্সিকিউটিভরাই বিদেশে কোম্পানী চালান। আর আমাদের এখানে উদ্যোক্তারা সরাসরি ব্যবসার এ টু জেড চালাতে চান। সব ব্যপারে অংশ নিতে চান, সবকিছু নিজের হাতে করতে চান। ফলে যোগ্য ও স্মার্ট কর্মীরা তাদের ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে কিছু করার সুযোগ পান কম। ইচ্ছাটাও হারান ধীরে ধীরে। এতে পার্টিসিপেটিভ ম্যানেজেমেন্ট (যেটা কর্পোরেট কালচারের অংশ) গড়ে ওঠে না।

• মাইগ্রেশন না থাকা: অনেকে বলেন কর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে রাখলে কোম্পানীর জন্য ভাল। কিন্তু এতে আবার আরেকটা সমস্যা হয়। সেই একই কর্মীরা প্রতিষ্ঠানে রয়ে যায় বিধায় নতুন কোনো আইডিয়ার আগমন, ডাইভারশন, ডাইনামিজম-এগুলোর পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়।

• ডাইনামিজমের অভাব: অনেক সময় মালিকরা রক্ষণশীল হন। ফলে প্রতিষ্ঠান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আপডেটেড হয়না। ফলে নতুন দিনের কালচার ওখানে জায়গা করে নিতে পারেনা।

• স্ট্যাডির অভাব: আমরা ব্যবসা চালানোর জন্য সবকিছুই করি। কিন্তু বাংলাদেশের কর্পোরেটগুলোতে সবরকম ব্যবসায়িক উদ্যোগের পাশে কোম্পানীর উন্নয়নের জন্য মৌলিক গবেষনার পেছনে সময়, শক্তি, অর্থ, জনবল ব্যায়ের অনিহা মারাত্মক। একে বরং অপচয় বলে মনে করা হয়। এতে কোম্পানীতে পরিবর্তনের গতি কমে যায়। কোম্পানীর করণীয় কী-সেসম্পর্কে মৌলিক আইডিয়া আসে না।

• পুরষ্কারের অভাব: বাংলাদেশে কর্পোরেট হাউসগুলোতে নিয়মতান্ত্রিক আর ফর্মাল পুরস্কার বলতে বোঝা হয় শুধু প্রমোশন আর ইনক্রিমেন্টকে। কর্মীদের ভাল কাজের পুরস্কারের আরো হাজারটা রাস্তা থাকলেও সেগুলো নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তেমন একটা চোখে পড়ে না।

• স্বজনপ্রীতি: কর্পোরেটগুলোতে উচ্চপদস্থ লোকদের পছন্দের আর রেফারেন্সের অনেক কর্মী থাকে। কোম্পানীর যেকোনো নতুন বিষয় যদি এরা মনে করে যে এদের স্বার্থে কাজে লাগবে না বা স্বার্থের বিপক্ষে যাবে-তখন এরা সম্মিলিতভাবে তার বিরোধিতা করে।

• স্মার্ট কর্মীর অভাব: যা কিছু ভাল কাজ, ভাল উদ্যোগ, ভাল আইডিয়া-সবকিছুর মূলে আছে যোগ্য ও স্মার্ট কর্মীর উপস্থিতি। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের একটা বড় সমস্যা যথেষ্ট সংখ্যক, যথাসময়ে, যথাযোগ্য স্মার্ট, শিক্ষিত, দক্ষ ম্যানপাওয়ার না পাওয়া, পেলেও তাদের সুইচিং টেনডেন্সি, তাদের কাজের জন্য যথেষ্ট স্কোপ না দেয়া বা না পাওয়া। স্মার্ট কর্মী না থাকলে স্মার্ট অফিস কারা সাজাবে?

• পার্টিসিপেটরী ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অভাব: আমাদের দেশের বাস্তবতা হল উদ্যোক্তারা পার্টিসিপেটরী ম্যানেজমেন্টে খুব একটা বিশ্বাস করেন না। কর্মীরাও নানা কারনে (নিরাপত্তা, আত্মীকরনের অভাব, জব ডিস্যাটিসফ্যাকশন, শর্টটাইম অব জব) কোম্পানীর সাথে একাত্ম হতে উৎসাহ পান না। এতে করে অফিস শুধুই কাজের স্থানে পরিনত হয়। কর্মীদের মধ্যে যে বিপুল সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে সেটার খোঁজ প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগই পায় না।

• কমিটমেন্টের অভাব: কমিটমেন্ট একটা খুব বিরাট ও সার্বিক বিষয়। এটি অনেককিছুই মিন করে। কর্পোরেট কালচার প্রমোট করার ক্ষেত্রে মালিকদের সদিচ্ছার অভাব, ইচ্ছা থাকলেও সিরিয়াসনেসের অভাবও দায়ী। যেমন অনেকেই চান তার প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট কালচার থাকুক কিন্তু যখন সেটা সত্যি সত্যি করার প্রশ্ন আসে তখন নানানরকম প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেন। পিছিয়ে যান। এটা হবার কারন হল কর্পোরেট কালচার থাকার এ্যাডভানটেজ আর না থাকার ডিসএ্যাডভানটেজ সম্পর্কে তারা খুব একটা জ্ঞাত নন।

• খরচ ও কর্তৃত্ব হারানোর ভয়: অনেক মালিক ভাবেন, কর্পোরেট কালচার এলে তাদের খরচ বাড়বে আর সেই ভেবে পিছিয়ে আসেন। অনেকে ভাবেন কর্পোরেট কালচার বড় বড় বা বিলাতী কোম্পানীতে চলে। বাংলাদেশে বা তার মতো প্রতিষ্ঠানে এটা চলে না। কিছু উদ্যোক্তা এমনকি কোম্পানীর টপ পজিশনের সিনিয়র, পুরানো, স্বার্থবাদী কর্মকর্তারাও তাদের অন্যায্য কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে কর্পোরেট কালচার প্রতিষ্ঠা করতে চান না।

• কর্পোরেট কালচার সম্পর্কে ধারনার অভাব: কর্পোরেট কালচার কী, কেন দরকার, থাকলে কী হবে-সেই সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারনার অভাবও কাজ করে মালিকদের এটা থেকে দুরে থাকার পেছনে।

• চাকরীর নিরাপত্তা: এখনো বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরে একটা মীথ প্রচলিত আছে। তা হল-”প্রাইভেট চাকরী কচুপাতার পানি, বিয়ানে মধু বিয়ালে হানি (পানি)।” প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্রাচুইটি এখনো প্রাইভেট সেক্টরে সোনার হরিণ। বিধায় কোম্পানীকে নিয়ে কর্মীরা দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন দেখেনা। মালিকও কালচারাল চেঞ্চ নিয়ে ততটা ভাবেন না।

• বিজনেস সাসটেইনেবিলিটি আর এক্সপানশনের অনিহা: বিজনেস গ্রোথতো প্রতিষ্ঠান অবশ্যই চায় কিন্তু সাসটেইনেবল গ্রোথ, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বিষয়গুলো এখনো আমাদের কর্পোরেটে ততটা জনপ্রিয় ও সুপরিচীত না। নির্দিষ্ট একটা ভলিউমে ব্যবসা পৌছে গেলে সেটার আরো এক্সপানশন বা জেনারেশন হতে জেনারেশনে ব্যবসার ব্যাটন হস্তান্তর এখনো এখানে ফর্মাল ও নিয়মতান্ত্রিক না। ফলে নিত্যনতুন কালচার ইনকর্পোরেট করার উৎসাহ স্বাভাবিকভাবেই কম।

• ফর্মালিটি আর লিখিত SOP’র অনুপস্থিতি: বাংলাদেশে কিছু ব্যতিক্রম বাদে ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের একটা বড় অংশ পরিচালিত হয় মৌখিক আদেশ ও নিয়মে। ডকুমেন্ট ও রেকর্ড রাখার প্রবণতা কম বরং সেটাকে এড়িয়ে যাবার প্রবণতাই বেশি। মনে করা হয়, এতে কোম্পানী সবসময় বিপদের ঝুঁকিমুক্ত থাকবে। কিন্তু এত জটিলতা আরো বাড়ে। প্রজন্ম হতে প্রজন্মে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, আইডিয়া হস্তান্তরিত হয় না।

এতক্ষন যা কিছু বললাম, সবটাই সাধারন চিত্র। এগুলো কোনো বিশেষজ্ঞ মতামতও নয়। একজন প্রফেশনালের দৃষ্টি দিয়ে দেখা। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। অত্যন্ত মডার্ন কর্পোরেট কালচারে সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান অবশ্যই আছে। আমি শুধু বৃহত্তর ও সার্বিক পরিস্থিতির একটা ধারনা দেবার চেষ্টা করেছি মাত্র।

লেখক : এইচ আর প্রফেশনাল 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*