আমি গ্রুপ ম্যানেজার!

আব্দুস সালাম

একটা গল্প বলি, একটা গ্রুপ ফ্যাক্টরীর পঁচিশটা গার্মেন্টস আছে, আর সাথে একশত মানুষের ছোট্ট একটা প্রিন্টিং ফ্যাক্টরী । ঐ প্রিন্টিং ফ্যাক্টরীতে চাকরী করেন একজন ম্যানেজার, লোকের অভাবে সব দেখেন, নাম ‘ইয়ো ইয়ো হরিপদ’ । এই হরিপদ’কে যদি কখনও জিজ্ঞাসা করা হয়, কোথায় জব করো? সে বলে, আমি ঐ গ্রুপের ‘গ্রুপ কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার’ । স্বভাবত, যারা একটা কারখানার কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার’ হোক সেটা সাত হাজার মানুষের, তারাও তাদেরকে একটু সমীহ করেন । কারণ গ্রুপ কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার বলে কথা, অথচ বাস্তবতাতো ভিন্ন, হয়ত তার দৌড়াদৌড়ি একশ মানুষের কেমিক্যালের গন্ধওয়ালা ছোট্ট একটা ঘরে । আমি তার কাজটাকে ছোট করে দেখিনা। কারন কাজ কাজই। তিনিতো ফ্যাক্টরীর নাম বলে কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার হিসাবে পরিচয় দিতে  পারেন এতে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়, কিন্তু তখনই খারাপ লাগে যখন সে অসত্য তথ্য প্রকাশ করে। তার যেটুকু সম্মান সেতো পাবেই কিন্তু অতিরিক্ত বললে অনেকেই এসব মানুষকে অপছন্দ করা শুরু করে।

নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পরও, আইনস্টাইন নিজেকে পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র বলেই পরিচয় দিতেন । বিজ্ঞানী হওয়া সত্বেও তিনি কখনও বলতেন না, আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গবেষনাগারের প্রধান । কারণ তিনি আমাদের মতো সবজান্তা হরিপদ নন । শমসের মারা যাওয়ার পর, এই হরিপদরাই তার জায়গাটা দখল করে, চাপাবাজীর বাজার চাঙ্গা করে রেখেছেন! যা কাম্য নয়।

আমাদের চাকরীর বাজারটা এতবড় নয় যে, এখানে কেউ নিজেকে ম্যাসেঞ্জার থেকে ম্যানেজার বলে পরিচয় দিতে পারেন । কারণ দৌড়াতে না পারলে, আমরা কমবেশী সবাই জানি, এই মার্কেটে কার অবস্থান কোথায় । আগে এগুলোর প্রচলন ছিল, বিয়ের বাজারে কিংবা ব্যাংকে লোন নিতে গিয়ে, ফটোকপির দোকানে গিয়ে ঘষামাজা করে নিজের পদবীটাকে একটু বাড়িয়ে নিতো । কিন্তু আজও মানুষ এগুলো করে ভাবতে অবাক লাগে!

আপনারা কি কখনও দেখেছন, সোনার খনির উপরে সাইনবোর্ড দেওয়া এখানে মাটির নীচে সোনার খনি আছে? মানুষই তাকে পাহাড় কিংবা সমুদ্রের তলদেশ থেকে খুঁজে বের করে আনে, তার গুরুত্ব ও মূল্যের কারনে । আমরা যদি সত্যিই জ্ঞানী হই, মানুষকে কিছু দেওয়ার মতো যোগ্যতা নিজের ভেতরে তৈরি করতে পারি, তাহলে মিথ্যে বিলবোর্ড টানানোর দরকার পরবেনা, মানুষই আমাদেরকে খুঁজে বেড় করবে ।

আজকাল বড় বড় সেমিনারে, মিটিং এ, ট্রেনিং এ গেলে দেখা যায়, অনেকেই পরিচয় দেয়, আমি ঐ গ্রুপের হেড অব কমপ্লায়েন্স, হেড অব এইচ.আর, গ্রুপ জিএম, গ্রুপ ম্যানেজার । কিন্তু খবর নিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটা নিটিং, কিংবা প্রিন্টিং কিংবা ওয়াশিং ফ্যাক্টরীর হেড । কর্পোরেট অফিসতো দূরের কথা বসেন সাবকন্ট্রাক্ট ফ্যাক্টরীর চীলেকোঠায় । আজও অনেকেই জানেনা, গ্রুপের কটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, অথচ পরিচয় দেয়, গ্রুপ ম্যানেজার, ‘ইয়ো ইয়ো হরিপদ’ ।

বড় হতে হলে বিনয়ী আর পরোপকারী হতে হবে, মানুষই বিজ্ঞাপন দিয়ে আপনাকে বড় করে দিবে, নিজের ঢোল নিজেকে পেটাতে হবেনা ।

আরেকটি বিষয় এটা অজ্ঞানতার কারনেও হতে পারে। এমনও হতে পারে আমি নিজেও জানিনা গ্রুপ কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার অর্থ কি সেক্ষেত্রে সবারই সংশোধনের সুযোগ আছে, কিন্তু নিজের পরিচয়কে জেনেশুনে বাড়িয়ে বলা মিথ্যার সামিল। গার্মেন্টস সেক্টরে যারা কাজ করছেন তাদের প্রায় শতভাগ মানুষ সৎ উপায়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করেন, কি দরকার একটি মিথ্যে বলে মানুষের কাছে আপন ভাবমূর্তি নষ্ট করার।

গ্রুপ ম্যানেজার/ জি এম হল সেই ব্যক্তি যিনি গ্রুপের সকল ফ্যাক্টরীর দায়িত্বে থাকেন। নিঃসন্দেহে একটা সম্মানীয় পদ। কিন্তু ফ্যাক্টরীতে যারা কাজ করছেন তারাই আসল নায়ক। কারণ মাঠের কাজটা তারাই করেন। তারাই অডিট থেকে শুরু করে সকল কর্মকাণ্ড নিজ হাতে পরিচালনা করেন। নিঃসন্দেহে এটিও কম সম্মানীয় নয়। তাই আসুন আমরা গর্বের সাথে নিজের সঠিক পরিচয় সকলকে জানাই।

লেখকঃ সহকারী ব্যবস্থাপক (কমপ্লায়েন্স) , স্নোটেক্স আউটওয়ার লিমিটেড

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*