প্রতিষ্ঠানে কর্মীর মূল্যায়ন কীভাবে হওয়া উচিত

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল:

( এই লেখাটি গত ৬ মে দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়)

বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বছর শেষে মূল্যায়নের সময় বা বছরপূর্তির ঠিক কয়েক মাস আগে থেকে মালিক কিংবা ঊর্ধ্বতনরা প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকার ভণিতা করেন। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে এটি হরহামেশাই হয়। আর যদি প্রতিষ্ঠানের পূর্বনির্ধারিত গড়পড়তা কোনো নিয়ম থাকে, সেটি ভিন্ন। সেক্ষেত্রে মূল্যায়নের বিষয়টি না আনাই শ্রেয়। দেখা গেলো ঊর্ধ্বতনের রুমের আশপাশে যারা শেষ ২-১ মাস ফাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে বসকে বোঝান আমি কতই না কাজ করি বহুবার, তাদের অন্যদের চেয়ে ২-৪ গুণ বেতন বাড়ে। এক্ষেত্রে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহে রাখার গুরুত্ব অপরিসীম।

একজন ব্যক্তিকে দেওয়া কাজ সম্পাদন কিংবা নির্দিষ্ট কাজে তার অবদান ও গুণগত মান বিবেচনা করে সাধারণত তার মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। এখন মূল্যায়নটা যদি মনে করি টাইপের অর্থাৎ মন থেকে উত্থিত ধারণার ওপর হয়, তা কখনও সঠিক বলা যায় না। যা হরহামেশাই হচ্ছে। একমাত্র সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমেই একজন কর্মীর কাজের সন্তুষ্টি এবং কাজের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব। আর তা হয় না বিধায় প্রায় প্রতিষ্ঠানেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি মেয়াদের ১-২ বছর পেরোলেই কর্মস্থল পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়।

মূল্যায়নের বহুবিধ পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রচলিত নাম বিবেচনায় না এনে একটু ভিন্ন নামে উপস্থাপন করছি।

এসো নিজে করি : যে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কর্মী নিজেই নিজের মূল্যায়ন করে এবং তার পর ঊর্ধ্বতন তার সঙ্গে বসে একটি যবনিকায় আসেন। এ ধরনের মূল্যায়ন বাংলাদেশে খুব কম প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কিংবা বহুজাতিক সংস্থাগুলো এ ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন।

ডান-বাম-ওপর-নিচ : এ মূল্যায়ন পদ্ধতিটাও বাংলাদেশে খুব কম প্রতিষ্ঠানে আছে। দেশের বরেণ্য মানবসম্পদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ যারা পরিবর্তনের মানসিকতা রাখেন, তাদের অনেকেই প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করেছেন। এ পদ্ধতিতে একজন কর্মীকে মূল্যায়ন করেন তার ঊর্ধ্বতন, অধীনস্ত, তার সমান পদের সহকর্মী, অন্যান্য বিভাগের কর্মী যাদের সঙ্গে তার কাজ করতে হয় কিংবা ক্রেতা ও সে নিজে। এ ধরনের মূল্যায়নে যেকোনো এক পক্ষের সঙ্গে বনিবনা না থাকলেও অন্যদের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য একটি ফল পাওয়া যায়।

 

জি হুজুর পদ্ধতি : এক্ষেত্রে শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার মূল্যায়ন করেন, যা বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠানে চলমান। এক্ষেত্রে মনে করি টাইপের মূল্যায়ন হওয়ার সম্ভাবনাটা বেড়ে যায়। আমি মনে করি উনি ভালো কাজ করেছেন, ওনাকে দশে দশ। অমুক কাজ যেই করুক, আমার তাকে পছন্দ নয়; দয়া করে দিলাম দশে পাঁচ। হুজুরের দয়ার শরীর! এ-জাতীয় মূল্যায়নে দুর্নীতির সম্ভাবনা বেশি থাকে।

গণস্বাক্ষর কর্মসূচি : এ পদ্ধতি হলো একটা ফাইল যেমন নিচ থেকে উপর পর্যন্ত স্বাক্ষর নিয়ে যেতে থাকে, তেমন প্রতিষ্ঠানের নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত গণহারে স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়, অনেকে জানেনও না কিসে স্বাক্ষর দিচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথম ব্যক্তি বেতন বৃদ্ধি করলেন ৫০০০ টাকা, তার ঊর্ধ্বতন কেটে করলেন ৩০০০ টাকা, তার উপরের স্তরের কর্মকর্তা করলেন ১৫০০ টাকা; আর শেষ স্তর পর্যন্ত যেতে যেতে ৫০০০ টাকা যখন ৫০০ টাকাতে গিয়ে ঠেকে সেটা মূল্যায়ন না ছাই! এ পদ্ধতিটি অধিকাংশ বিশেষ করে পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। এমনও দেখা গেছে, ব্যক্তি আপনাকে চেনেন না তিনি অনেক সময় আপনার মূল্যায়ন করছেন। হয়তো সর্বোচ্চ পর্যায়ের কেউ কিংবা বাণিজ্যিক অফিস, যা আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, সেখানকার কেউ যার সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়েছে কিংবা হয়নি।

সবাই যে এভাবে মূল্যায়ন করেন, তা বলছি না। এ দেশে বেশিরভাগ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল্যায়ন কারও হয় শাপেবর আর কেউ ভালো কাজটি করেও নিগৃহীত।

প্রশ্ন আসতেই পারে, তাহলে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করে আমরা কী করতে পারছি?

আমাদের কী-ই বা করার আছে, আপনার হাতে যখন ১০০ টাকা ধরিয়ে কেউ বলবে পাঁচজনকে নাশতা করান, তা আর কত ভালো হবে! তবে হ্যাঁ, আমরা একটা কাজ করতে পারি। যে বাজেটটা পেয়েছি, তা থেকে সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে কমবেশি করে দিতে পারি। মূল্যায়নটা কেমন হবে? কখন ফলপ্রসূ হবে? উত্তর যখন আপনার কেপিআই আর কার্যবিবরণীর মিল রেখে মূল্যায়ন করা হবে, সেক্ষেত্রে মূল্যায়নটা ভালো হয়। তবে হ্যাঁ, কেপিআইগুলো তুলনার জন্য একটি বাস্তব ও ন্যায়সংগত পরিমাপের পদ্ধতি থাকতে হবে। যদি একজন শ্রমিকের ক্ষেত্রে ধরি, তখন ধরুন নিয়মিত উপস্থিতির কথা তার কার্যবিবরণীতে আছে; তবে দেখা হবে তার উপস্থিতির রিপোর্ট, গুণগত মান বজায় রাখার কথা বলা আছে সেক্ষেত্রে তার অলটার-এর শতকরা পরিমাণ, উৎপাদনের কথা লেখা আছে সেক্ষেত্রে তার টার্গেট পূরণ হচ্ছে কি না ইত্যাদি। ঠিক এমনভাবে সব প্রতিষ্ঠানে সব বিভাগে সব কর্মীর মূল্যায়ন সম্ভব। এখন ধরুন আইনে বলা আছে বছরে মূল বেতনের ন্যূনতম ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা। আর আমরা আইনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল, তাই সবার গড়পড়তা ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করলাম! এখন এ কর্মের মাধ্যমে নিরুৎসাহিত হয়ে আমাদের সবচেয়ে ভালো কর্মীটি আর আমাদের প্রতিষ্ঠানে থাকবে না এটা স্বাভাবিক নয় কি? এর মাশুল কিভাবে দিতে হবে, তার হিসাবনিকাশ আমরা করেছি কখনও? ঠিক মূল্যায়ন মাসের আগে দফায় দফায় বৈঠক, লাভ-ক্ষতির হিসাব করে পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিলো, সবার ৫ শতাংশ বেতন বাড়বে; কিন্তু এ সিদ্ধান্তের ফলে কী পরিমাণ দক্ষ জনবল আমরা হারাবো আর তার প্রভাব কিভাবে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সরাসরি ব্যাঘাত ঘটাবে, তার হিসাব কী করি? আমরা বলতে পারি, আমরা দক্ষ ও মানুষ গড়ার কারিগর। যাক, তারা চলে গেলে কাজের উপযোগী লোক তৈরি করে নেবো। তাহলে এক প্রতিষ্ঠান থেকে যখন উচ্চপর্যায়ের কেউ চলে যায়, তিনি তার ডান-বাঁয়ের সবাইকে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান কেন? তার মানে কি তিনি তাদের ছাড়া কাজ করতে পারেন না? তাহলে কি তিনি আসলেই মানুষ গড়ার কারিগর? আর এক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানে এত দিন তার কাজের জন্য তাকে বেতন দিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের কী পরিমাণ ক্ষতি হবে, তার হিসাব কি করি? অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন কর্মী যখন স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেন, তিনি কেন তার ঊর্ধ্বতন কিংবা সহকর্মীদের নতুন কোথায় যোগদান করবেন, তা যোগদানের আগ পর্যন্ত বলেন নাÑবলতে পারবো আমরা? কারণ তিনি ভয় পান, যদি একটি ফোনের কারণে তার নতুন চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি হয়। চমৎকার! আমি ভালো কাজের মূল্যায়নও করলাম না আবার তিনি যেখানে দু’পয়সা বেশি পাবেন সেখানেও যেতে দেবো না। কী বিচিত্র কথা! মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরেকটা মজার ব্যাপার পরিলক্ষিত হয়, অনেক প্রতিষ্ঠানে শুধু ডিসেম্বর

মাসে সব কর্মকর্তাও শ্রম আইনের আওতায় আসেন সুতরাং ৫ শতাংশ! অন্যান্য সুযোগের ক্ষেত্রে সে স্টাফের ক্ষেত্রে যখন শ্রম আইন প্রযোজ্য নয়!

আশা করি এ অবস্থা থেকে আমরা সবাই  মুক্তি পাবো একদিন।

মূল্যায়নের সময় একজন কর্মীকে আপনার এ কাজটি ভালো হয়নি বা ভালোভাবে করতে পারেননি কথাটা বলা উচিত নয়। এটি পুরোপুরি নেতিবাচক, যার অর্থ আমরা তাকে নিরুৎসাহিত করলাম। আমরা যদি এভাবে বলি, আপনার এ কাজে বা কর্মপদ্ধতিতে কিছুটা উন্নতি করা প্রয়োজন তবে কথাটা কিন্তু সামনের ব্যক্তি ইতিবাচকভাবেই নেবেন। তার সঙ্গে আমাদের এটাও বুঝিয়ে দিতে একজন কর্মীর কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে তার সাফল্য কী ছিল, কাজের মাধ্যমে তার কিংবা প্রতিষ্ঠানের কী লাভ হয়েছে, তার কোন কোন বিষয়ে উন্নতির প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে তার ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়গুলো। তবেই না হলো মূল্যায়ন।

বাংলাদেশের বহু কারখানা ঘুরে অনেক প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ড দেখেছি, অভিভূত হয়েছি। এমনও কারখানা রয়েছে যেখানে মূল্যায়নের জন্য বছর শেষ না হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হয় না।

শেষ দুটি প্রশ্ন আপনার কাছে, আসলে মনগড়া মূল্যায়ন কতটা যুক্তিযুক্ত? আর আপনার কর্মদক্ষতা আছে প্রশিক্ষণ আছে কিন্তু নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি বা পদন্নোতি নেই, সেক্ষেত্রে আপনি থাকবেন না চলে যাবেন?

 

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক, সংগীত শিল্পী, ফ্রিল্যান্স লেখক

 

 

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*