নিজেই নিজেকে ব্যবহার করুন

অধ্যক্ষ  নূরে . খান

আমরা প্রায়:শই অনেককে বলতে শুনি এটা কোন জীবন হলো?; ওমুকে এটা করেছে, তমুকে এটা করেছে আর আমি. . . .  . . . . . ! এমন নানা ধরনের আফসোসের কথা বহুল প্রচলিত, যা কারোরই কাম্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এসব চলছেই বা চলবেই। এখন প্রশ্নটা হল আমার ক্ষেত্রে কি হবে বা কি করা উচিৎ? ধরুন; সকলেই জানি গাড়ীর নীচে চাপা পড়লে মানুষ মারা যায়; এমন সত্যটি প্রমাণ করার জন্য কি নিজেকেই গাড়ীর চাকার নীচে নিতে হবে?  নাকি অন্যান্যদের দেখে জানার পরে সাবধান হতে হবে? প্রচলিত একটা শব্দ আছে, মানুষের নাকি ‘ঠুশ খেলে হুশ হয়’ অর্থাৎ কোথাও ঠেকলে তারপর শেখে! অথচ মানুষের এই দীর্ঘ জীবনে অনেক সুযোগ আসে যা কাজে লাগানোর অভাবে হাতছাড়া হয়ে যায় নিজের স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ।

যেকোন উন্নতিকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে উন্নয়ন বলতে নারাজ কেননা একটা টেকসই উন্নয়ন না হলে বা যথেষ্ট উপকারে না এলে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। আমি এটা এজন্যই বলছি যে কোনরকমে একটা কিছু হয়ে গেলেই আমরা যেন সেটাকেই উন্নতি মেনে পুরোপুরি তৃপ্ত না হই সে দিকে খেয়াল রাখাটা খুবই জরুরী। আর কোন ব্যর্থতার জন্য নিজের ভুল গুলিকে না ভেবে বাকী সবাইকে দোষারোপ করাটা হচ্ছে একধরনের অসুস্থতা। মনে রাখতে হবে, আজকের সেরা সিদ্ধান্তটি আগামীকাল নিজের কাছেই “ভুল সিদ্বান্ত”, মনে হতে পারে। এমন অবস্থায় ঘাবড়ানোর কিছু নেই। বুদ্ধি খাটিয়ে সব সময় চলতে পারলেই ভুল কম হবে। আমাদের সমাজে চালাক মানুষকে কেউ বিশ্বাস করে না বা ভালো জানে না। আবার বোকা মানুষদের কেউ মূল্য দেয় না; ব্যাপারটা বেশ ঝামেলার মনে হচ্ছে তাই না? সেজন্য সবসময় নিজেকে নিপুনতার সাথে চালনা করতে হবে। নিজের জন্য একটি শক্ত অবস্থান তৈরী করতে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হবে আর এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক:

১. লক্ষ্য স্থির করুন:

জীবন ততটাই সাজানো থাকবে যতটা পরিকল্পনার সাথে মিল রেখে আপনি সাজাতে পারবেন। পরিকল্পনাকে বয়স অনুযায়ী কিছু পর্বে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। যেমন ০-২৫ বছর, ২৬-৩৫ বছর, ৩৬-৪৫ বছর, ৪৬-৫৫ বছর এবং ৫৫- মৃত্যু পর্যন্ত। তবে এক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩২ বছর বয়সের মধ্যে নিজের জন্য একটি স্বাস্থ্যবান লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। মনে রাখবেন জীবনের এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে যদি লক্ষ্যটাই ঠিক না করা যায়; তাহলে পরে বাকী জীবনে লক্ষ্য পূরণের আশাটাই অনেক ক্ষীণ হয়ে যাবে। জীবনের মূল্য বুঝে লক্ষ্য  ঠিক করুন। সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক অবস্থান ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে লক্ষ্য ঠিক করে ফেলুন। মনে রাখা জরুরী, লক্ষ্য পরিবর্তন করতে হতে পারে, কারন Life is all about betterment

২. ক্ষতিকর মানুষদের এড়িয়ে চলুন:

সঙ্গ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কিন্তু কোন সঙ্গ উপকারী, কোনটি ক্ষতিকর; এ বিষয়ে দ্রুত চিন্তা করে সিদ্বান্ত নিন। ক্ষতিকর মানুষদের এড়িয়ে চলুন। তারা আপনার জন্য প্রয়োজনীয় কিংবা শক্তিশালী হলেও এড়িয়ে চলুন। যাদের দায়িত্বজ্ঞান নেই, কথা ও কাজের মিল নেই, আত্মকেন্দ্রিক জাতীয় লোকদের ১০০% এড়িয়ে চলবেন। ভালো মানুষদের সাথে একটা সুষ্ঠু যোগাযোগ গড়ে তুলুন।

৩. অযথা অর্থ ব্যয় করবেন না:

আমরা অপ্রয়োজনীয় অনেক বিষয়ে ব্যয় করে যা অবশিষ্ট থাকে তা থেকেই সঞ্চয় করে থাকি। এখানে আমি মনে করি সঞ্চয় করার পর যা থাকবে তাই দিয়ে চলার চেষ্টা করা সমীচীন। বিষয়টি খুব কঠিন হয়ে গেল, তাই না? তাহলে অন্তত প্রতিটি খরচের আগে ভাবুন আর ভেবে তারপর খরচ করুন। ঠিক এই ভাববার বিষয়টি সঞ্চয় এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কেননা সব সঞ্চয়ই কিন্তু কাজে আসে না। তাই বিনিয়োগে প্রাপ্তি কি হবে তা ভালভাবে বুঝেই সঞ্চয় করুন। মনে রাখবেন একটা সময় আসবে যখন আপনার জমানো অর্থই আপনাকে সবার আগে সহযোগিতা করবে।

৪. স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন:

স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যৌবনে আমরা যেভাবে খুশি সেভাবে চলি, এতে করে আমরা জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়ি। নিজের মাঝে যে প্রাণ শক্তি আছে তা যেমন তেমন ভাবে অপচয় করে নিজেকে নিঃস্ব করে ফেলবেন না; তাহলে দেখবেন বার্ধক্যের আগেই নানা অসুখের সম্মুখীন হবেন। তাই সময় থাকতে শরীরের নিয়মিত খেয়াল রাখবেন, রুটিন চেকআপ করাবেন, ভালো খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিত ঘুমের অভ্যাস করবেন।

৫.মনের মত সঙ্গী বেছে নিন:

জীবনে অন্তত একজন মনের মত মানুষ খুঁজে নিন; যার সাথে আপনার সমস্ত আবেগ অনুভূতিগুলো নির্বিঘ্নে ভাগাভাগি করে নিতে পারবেন। সঠিক পরামর্শ নিতে আলোচনা করতে পারবেন। কষ্ট বেশীক্ষণ চেপে রাখবেন না, জানান দিন, নইলে ভালো কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। আগ্রহ ধরে রাখতে সবসময় সতেজ থাকা চাই।

৬. নিজের শখকে গুরুত্ব দিন:

জীবন একটাই, যতটুকু পারেন সব সম্পর্ককে উপভোগ করুন। তবে জীবনের শুরুতে সব বিষয়কে উপভোগের বিষয় হিসেবে নিবেন না! জীবন গড়ার শুরুতে যত্ন সহকারে নিজেকে তৈরী করুন যাতে করে প্রয়োজনীয় শখকে গুরুত্ব সহকারে উপভোগ করতে পারেন। মনে রাখবেন শখকে মেরে ফেলা মানে নিজেকেই মেরে ফেলা।

৭. সুস্থ্য ব্যবহারের অধিকারী হোন:

সবার সাথে সুন্দর ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন পৃথিবীতে কখন, কোন অবস্থায়, কাকে আপনার প্রয়োজন হবে, আপনি তা জানেন না। তাই সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন যাতে করে কেউ আপনার ব্যবহারে কষ্ট না পায়। কেউ হয়তো বলবেন কাজ আদায় করতে গেলে একটু আধটু খারাপ বা রুঢ় আচরণ প্রয়োজন হয়। আমি বলছি প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ব থাকে, আপনি তাকে সে বিষয়ে মনে করিয়ে গুরুত্বটুকু বুঝিয়ে দিন, শুধু শুধু বোকার মত শত্রুতা বাড়াবেন না। কারণ ভালোবাসা দিয়েই সবকিছু আদায় করা সম্ভব আর ভয়ভীতি দিয়ে শুধু ক্ষণিকের কর্তৃত্ব জাহির করা যায় কিন্তু মানসম্মত কাজের নিশ্চয়তা নয়। তাই সব শ্রেণীর মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন এবং সুন্দর ও স্বাভাবিক আচরণ করবেন।

৮. আশেপাশের মানুষের মধ্যে নিজের একটি পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তুলুন:

আপনার নিজের একটি পরিচয় আশেপাশের মানুষের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে দিন। যেন কষ্ট করে আপনাকে চিনাতে না হয়। সবার মনে বা মুখে যেন আপনার নামটি থাকে। মনে রাখবেন আপনার গ্রহনযোগ্যতা যদি আশেপাশের মানুষের মাঝে না থাকে আর যদি এই অবস্থা জীবনের শুরুতেই হয়ে যায় তবে খুবই মুশকিলে পড়বেন। নিজেকে এমনভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করবেন যাতে সবাই আপনাকে ভালোভাবে চেনে এবং তাদের মাঝে আপনার সম্পর্কে সুন্দর ধারণা থাকে। এর ফলে পরে জীবনকে অনেক সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারবেন। আর এ ধরনের সুখ জীবনের অন্যান্য সুখের চেয়ে আলাদা। তাই কখনো মানুষের ক্ষতি করবেন না, যতটুকু পারেন মানুষের উপকার করার চেষ্টা করবেন।

আমাদের জীবনে আমরা নানা ধরনের গবেষণা করে থাকি; কিন্তু আমরা কতজন আছি যে, নিজেকে নিয়ে গবেষনা করি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি! সেজন্য প্রতিটি রাতকে পরীক্ষার সময় মনে করে নিজে সারাদিনের কর্মময়তার হিসাব করুন, ভুলগুলি সনাক্ত করুন। পরের দিন অর্থাৎ নতুন দিনের প্রথম প্রহর থেকেই কৃত ভুল গুলিকে সংশোধনের চেষ্টা করুন, দেখবেন কিছুটা হলেও নিজেকে পরিবর্তন করতে পারছেন। নিজের প্রতি বেশী মনোযোগী হউন, বেশী বেশী কাজে লাগান। একদিন দেখবেন আপনি আপনার সামর্থ্যের উর্দ্ধে।

লেখকঃ ফ্যাক্টরী প্রধান, লন্ড্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ লি: , এনভয় গ্রুপ

4 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*