পোশাকশিল্প শ্রমিকের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও দক্ষতা

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চলঃ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও দক্ষতা দুটি ভিন্ন শব্দ হলেও যে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, তা জানা জরুরি। প্রথমে আলোচনা করি কর্মঘণ্টা অর্থ কী? কর্মঘণ্টাকে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে বিভিন্নভাবে লেখা যায়, যা কমবেশি আমরা সবাই জানি। যেহেতু এখানে পোশাকশিল্প শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নিয়ে লিখছি, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ উল্লিখিত সংজ্ঞাটি উল্লেখ করাই যথোপযুক্ত মনে করি। শ্রম আইনে বলা আছে, আহার ও বিশ্রামের বিরতি ছাড়া যে সময়ে কোনো শ্রমিক কাজ করার জন্য মালিকের এখতিয়ারাধীন থাকেন, তা-ই হলো তার কর্মঘণ্টা। এই সাধারণ কর্মঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় যখন একজন শ্রমিক কাজ করেন, তা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা হিসেবে বিবেচ্য হয়।

একজন শ্রমিকের দক্ষতা বলতে সময়ের অপচয় কম করে সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে একটি কাজ সমাপ্ত করার ক্ষমতাকেই মূলত বোঝানো হয়ে থাকে, যা আরেক অর্থে তার কর্মক্ষমতা বা যোগ্যতা। পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে একজন কর্মীর দক্ষতা নির্ণয় করা হয় কোনো একটি দিনে (নির্ভর করে নির্দিষ্ট সংখ্যক পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা সময়ের ওপর) তার গুণগত মানসম্পন্ন সর্বমোট উৎপাদন, সেই নির্দিষ্ট পণ্যের প্রতি একক উৎপাদনে প্রমিত সময় ও পণ্যগুলো উৎপাদন করতে সেই কর্মী কত সময় ব্যয় করেছেন, তার দ্বারা। এটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুসারে সাধারণত দৈনিক আট কিংবা ১০ কর্মঘণ্টা হারে বিবেচনা করে নির্ণয় করা হয়।

কর্মঘণ্টা ও দক্ষতার সংজ্ঞা নিয়ে কথা হলো। এখন জানবো, শ্রম আইন একজন শ্রমিকের কর্মঘণ্টা সম্পর্কে কী নির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১০০-তে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণত দৈনিক আট ঘণ্টার অধিক সময় কাজ করিবেন না বা তাহাকে দিয়া কাজ করানো যাইবে না ঃ তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ১০৮-এর বিধান সাপেক্ষে কোন প্রতিষ্ঠানে উক্তরূপ কোন শ্রমিক দৈনিক দশ ঘণ্টা পর্যন্তও কাজ করিতে পারিবেন।” আর ধারা ১০৮-এ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার কথা উল্লেখ করা আছে। যার সারমর্ম দাঁড়ায়, একজন শ্রমিক অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাসহ দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবেন না। আমরা যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্রেতার আচরণবিধি লক্ষ করি, তাতেও সাধারণ কর্মঘণ্টা ও তৎসহ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাযোগে একদিনে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা কাজের সময় অনুমোদিত, যে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা করতে হলে নির্দিষ্ট শ্রমিকের অনুমতি নেওয়া অত্যাবশ্যকীয়।

উল্লিখিত বিষয়ে কিছু ব্যতিক্রমও আছে, যেমন বছরের যে সময় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ক্রেতাদের কাজের চাহিদা বেশি থাকে, তখন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেয়। আবার অনেক ক্রেতাও ফ্যাক্টরিকে কর্মঘণ্টা উন্নতির ক্ষেত্রে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সুযোগ দেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্রেতাই তা মেনে নেন না।

যদি আমরা আদর্শ কর্মঘণ্টা ধরি, সে ক্ষেত্রে প্রথমে আলোচনা করতে হবে বিশ্বস্বীকৃত আদর্শ কর্মঘণ্টা কী? আমরা যদি কর্ম ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যের কথা চিন্তা করি, সেক্ষেত্রে রবার্ট ওয়েন নামের প্রখ্যাত একজন সমাজ সংস্কারক ১৮১০ সালে একটি তত্ত্ব উত্থাপন করেন, যেখানে তিনি একদিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টাকে তিন ভাগ করেন। যার আট ঘণ্টা রেখেছেন কাজের জন্য, আট ঘণ্টা চিত্তবিনোদন ও বাকি আট ঘণ্টা রেখেছেন বিশ্রাম বা ঘুমের জন্য। অপরদিকে আমরা যদি মহান মে দিবসের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, সেখানেও কর্মঘণ্টা সম্পর্কে এই একই দাবি ছিল যা পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে স্বীকৃত। আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আদর্শ ঘুমের সময় সাত-আট ঘণ্টা, যা চিকিৎসাশাস্ত্র স্বীকৃতও বটে।

একজন শ্রমিক বা আমাদের জীবনযাপনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে যদি দক্ষতার বিষয়ে আলোচনা করি, সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে। তা হলো, আমরা কখন দক্ষতা সহকারে কাজ করতে পারি? সাধারণ উত্তর হবে, যখন আমাদের মন কিংবা শরীর ভালো থাকবে তখন। শরীর ভালো রাখতে চাইলে পরিমিত ঘুম যে অত্যাবশ্যকীয়, তা নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবো না। আর মন ভালো রাখার ক্ষেত্রে অনেক বিষয় সম্পর্কযুক্ত, যেমন পরিবার, সমাজ, সামাজিকতা, ব্যক্তিগত ইত্যাদি। পরিবারের কেউ অসুস্থ থাকলে যেমন আমাদের মন ভালো থাকে না, তেমনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে সময় অতিবাহিত করতে না পারলেও আমাদের মন ভালো থাকে না। অপরদিকে সামাজিক কিছু দায়বদ্ধতা, রীতি-নীতি, অনুষ্ঠান, যেমন বিয়ে-জন্মদিন, এগুলোতে নিমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও যখন উপস্থিত থাকতে পারা যায় না। এ সবকিছুর জন্য দরকার সময় আর সে সময়টা কোথা থেকে পাবেন?

ধরি, আপনি একটি পোশাকশিল্প কারখানার একজন ব্যবস্থাপক। আপনার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আপনি সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে অফিসের উদ্দেশে রওনা দেন। অফিসে অধিকাংশ দিন রাত ৮-৯টা পর্যন্ত কাজ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে ১০-১১টা। বাসায় গিয়ে দেখেন, বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে। অতঃপর রাতের আহার শেষ করে বিছানায় যেতে রাত ১টা, ঘুম আসতে রাত ১টা ৩০ মিনিট। পরের দিন আবার ৬টায় উঠতে হবে তো! সেক্ষেত্রে আপনার ঘুম হলো মাত্র ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। এটা কি পর্যাপ্ত? যখন আপনি মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টা ঘুমাবেন, স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী দিবসে তা শারীরিক ক্লান্তির কারণ হবে। অপরদিকে দিনের পর দিন পরিবারের সঙ্গে যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে, তা আপনার মানসিক অবসাদের কারণ হবে।

এখন আসি একজন নারীশ্রমিকের ক্ষেত্রে। তিনি প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে চুলা, টয়লেট কিংবা গোসলখানায় লাইনে দাঁড়িয়ে সব কাজ শেষ করে ৭টার পর অফিসের উদ্দেশে রওনা হন। অফিসে পৌঁছে তাকে যদি রাত ৯টা পর্যন্ত (চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ধরে) কাজ করতে হয়, সেক্ষেত্রে তার বাসায় পৌঁছতে ঠিক আপনার মতো রাত ১০টা বেজে যায়। এরপর বাসায় এসে গোসল কিংবা রান্নাবান্নাসহ অন্যান্য কাজ করতে অন্তত ১২টা বাজে।

ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১টা। পরদিন সকালে তিনি আবার উঠলেন ভোর ৫টায়। এক্ষেত্রে তার বিশ্রাম হলো মাত্র চার ঘণ্টা। এই অপারেটর যখন ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে গেলেন, প্রথম ১/২ ঘণ্টা তিনি ঝিমাবেন। এটাই বাস্তব। সেক্ষেত্রে তার প্রথম দুই ঘণ্টার টার্গেট যদি থাকে ২২০ পিস, তিনি বেশি হলেও ১৫০ পিস উৎপাদন করতে পারবেন। তার ১০ ঘণ্টার টার্গেট ১১০০ পিস (বেশিরভাগ কারখানায় ১০ ঘণ্টার কর্মপরিকল্পনা করেই টার্গেট ধরা হয়, যার ব্যতিক্রমও রয়েছে)। সুতরাং বাকি ঘণ্টাগুলোয় কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হলে দিনের প্রথম ভাগে যে ৭০ পিস ঘাটতি রয়েছে, সেটা পূরণে তাকে আবারও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার আশ্রয় নিতে হবে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা আপনাকে এমন এক চক্রে আবদ্ধ করবে, যা থেকে বেরিয়ে আসতে কখনও এক সপ্তাহ, কখনও এক পক্ষ, কখনও এক মাস লেগে যায়। মনে রাখবেন, আপনি-আমি অর্থাৎ আমরা সরাসরি মেশিন চালাচ্ছি না।

তাই অসুস্থ বোধ করলেও আমরা কাজ যে কোনোভাবে শেষ করতে পারি; কিন্তু একজন শ্রমিক যিনি সরাসরি মেশিন চালান, তিনি অসুস্থ বোধ করলে তার কাছ থেকে কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আদায় করা অবান্তর। অপর দিক বিবেচনা করলে এই শ্রমিক ঠিক আমাদের মতোই তার পরিবারকে সময় দিতে পারছেন না। হয়তো তার বাচ্চাটা গ্রামের বাড়িতে থাকে, সে বেড়াতে এসেছে কিংবা তার বাবা-মা এসেছেন, তাদেরও তিনি সময় দিতে পারছেন নাÑযা তার মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে শরীর ভালো থাকলেও মন ভালো থাকবে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদনে। কারণ উল্লিখিত সবকিছু তার দক্ষতা কিংবা কর্মক্ষমতায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। আমাদের সংস্থা ইমপ্যাক্ট লিমিটেড, ইংল্যান্ডভিত্তিক একটি ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্সি ফার্ম। আমরা ১২৮টি পোশাক কারখানার শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলি। শ্রমিকদের অধিকাংশই দুই ঘণ্টার বেশি (আট ঘণ্টা সাধারণ কর্মঘণ্টার সঙ্গে অতিরিক্ত দুই কর্মঘণ্টা অর্থাৎ একদিনে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা) অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় কাজ করতে চান না। এক্ষেত্রে আমরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সঙ্গেও কথা বলে দেখতে পারি। সবাই জানি, আমাদের কারখানাকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকারী ও উৎপাদনশীল কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক, সংগীত শিল্পী, ফ্রিল্যান্স লেখক,

ইমেইলঃ chanchal@musician.org; chanchal@columnist.com

(এই লেখাটি দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকায় ২৫ এপ্রিল ২০১৭ ইং তারিখে প্রকাশিত হয়)

http://sharebiz.net/%E0%A6%AA%E0%A7%8B%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0/

2 Comments

  1. Chanchal bhai, good one as usual. There’s no alternative to maintain the moderate working hour level for workers for the sustainable growth and business of the RMG. There are lot of things to do for this if we really want it to be. The owners or the mid managements can’t individually ensure this.

    • Many many thanks Walid vai for precious comments. You are right, for make this sustainable it is really important to change the mindset of Owners and Mid managements.

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*