কর্মীদের সন্তুষ্টি জরিপ ও এর প্রয়োজনীয়তা

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত  সাফল্য পেতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানকে স্বল্প সময়েই সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং আর প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উন্নতি করতে গেলে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ কিছু কার্যক্রম ও বিষয় রয়েছে, যা সেই প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করে। যেমন যোগ্য নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা, সমন্বয়, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, দলবদ্ধ কাজ, সুস্পষ্ট লক্ষ্য, সৃজনশীলতা প্রভৃতি। আর বাস্তবতা এই যে, প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করছে মানুষ, আর সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যও এনে দিচ্ছে মানুষ, এক্ষেত্রে সবার একযোগে কাজ করা, প্রতিষ্ঠানের মালিকের ইতিবাচক মনোভাব আর কর্মীদের প্রতিটি কাজে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, কর্মীরা স্বাভাবিকভাবে ভালো কাজটা দিয়ে থাকে। এমন মনে হওয়া ভুলও হতে পারে। কারণ একজন সেরা কর্মী কখনোই শুধু প্রতিষ্ঠানের বা ঊর্ধ্বতনের প্রতি ভালোলাগার জন্য সেরা কাজটি দেন না। ভালো কাজ করার পেছনে তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বা স্বপ্নের একটা বড় ভূমিকা আছে। সেই লক্ষ্য বা স্বপ্ন কিংবা তার বর্তমানকে ঘিরে সৃষ্টি হয় চাহিদা।

প্রতিষ্ঠানের একজন ভালো কর্মী, যিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে এক বছর অবধি সেরা কাজ দিয়েছেন। হঠাৎই আপনার  মনে হলো আগের মত মানসম্পন্ন কাজ করছেন না তিনি। এর কারণ কী? কারণ হলো তার অসন্তুষ্টি। মনে রাখার বিষয় হবে, কর্মী যে প্রতিষ্ঠানেরই হোন না কেন তার লক্ষ্য বা স্বপ্নপূরণে তার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার সৃষ্টি হয়, যা পূরণ না হলে কাজের ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়। সে অসন্তুষ্টি শুধু অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, কর্মক্ষেত্র প্রভৃতি বিষয়। প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে যারা কাজ করছে, তাদের ভালো রাখাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। তাই এক্ষেত্রে মালিকের ইতিবাচক মনোভাব, সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ জরুরি। প্রতিষ্ঠান বলতে শুধু কোনো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানই নয়, হতে পারে সংবাদপত্র অফিস, কিংবা যে কোন প্রতিষ্ঠান। এখন কোন মালিক যদি কর্মীদের এ অসন্তুষ্টির বিষয়গুলো জেনে তা সমাধান করেন, তাহলে কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। সেই অসন্তুষ্টির বিষয়গুলো জানতে সন্তুষ্টি জরিপ পরিচালনা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জরিপের ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো কেমন হতে হবে? কীভাবে পরিচালনা করতে হবে? কোন বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে? জরিপের প্রশ্ন তৈরি করতে হলে প্রথমে নিয়োগকর্তাকে বিবেচনায় নিতে হবে কর্মী কারা, তাদের চাহিদা কী প্রভৃতি। যেমন কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপকদের কথা চিন্তা করলে তাদের চাহিদা মূলত বেতন, কর্মঘণ্টা, কাজের ব্যাপ্তি, ছুটি, সম্মান, মূল্যায়ন, স্বীকৃতি, উন্নতির সম্ভাবনা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পারিবারিক ভবিষ্যৎ ও অন্য সুবিধা প্রভৃতি। এসব যখন একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকবে, তখনই তার সন্তুষ্টি থাকবে। বেতনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে, কর্মী কি মনে করেন যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন অথবা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন? উত্তর হ্যাঁ হোক আর না হোক, সেক্ষেত্রে তার মতামত জানা প্রয়োজন। কর্মঘণ্টার ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে কর্মী কি কাজের সময় নিয়ে খুশি? ছুটির ক্ষেত্রে, তিনি কি প্রয়োজনে ছুটি পান? ছুটি নেওয়া কি সহজ? কর্মী শেষ কবে ছুটি উপভোগ করেছিলেন? তিনি কি নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি পান? নিরাপত্তার ক্ষেত্রে, কর্মী কি এখানে কাজ করতে নিরাপদ বোধ করেন? এর সঙ্গে একটি প্রশ্ন বিবেচনায় আসিতে পারে কর্মী কি কখনো হয়রানির শিকার হয়েছেন? কর্মক্ষেত্রে সবার আচরণ কেমন? কাজের ক্ষেত্রে, কর্মীকে যে কাজটি দেওয়া হয়, তা কি ঠিক সময়ে সম্পন্ন করতে পারেন? যদি না পারেন, কেন নয়? কর্মী কি মনে করেন তাকে অতিরিক্ত কাজ দেওয়া হচ্ছে? সম্মানের ক্ষেত্রে হয়রানির বিষয়টিও জড়িত, তবুও অন্যান্য প্রশ্ন করা যেতে পারে যেমন, প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কিংবা সহকর্মীরা কি সব কর্মীর কথা গুরুত্বসহকারে শোনে? তারা কি কর্মী মতামতকে গুরুত্ব দেয়? কর্মক্ষেত্রে এমনকি কখনো হয়েছে যে, কর্মী কোনো সমস্যার সমাধান করেছিলেন? কর্মী যখন কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়েন, তা কি গুরুত্বসহকারে সমাধান করা হয়? মূল্যায়নের ক্ষেত্রে, কর্মী কি ভালো কাজ করলে তার মূল্যায়ন বা প্রশংসা পান? স্বীকৃতি, এখানে স্বীকৃতি বলতে সরাসরি আর্থিক অথবা অবস্থানগত উন্নতির কথা বলা হয়েছে। কর্মী কি ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার কিংবা পদোন্নতি পেয়েছেন? উন্নতির সম্ভাবনার ক্ষেত্রে আরও প্রশ্ন আসতে পারে, কর্মী কি কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান (এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সবার মাঝে দলবদ্ধ কাজ করার মানসিকতা আছে কি না, তাও জানা যাবে)? কর্মীকে কোনো কাজ দেওয়ার আগে কি তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়? কর্মী কাজ-সম্পর্কিত কোনো প্রশিক্ষণ কি পেয়েছেন? পেয়ে থাকলে তা কী ধরনের? অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা যেতে পারে, কর্মী কি মনে করেন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় বেতন ছাড়া যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তা এখানেও আছে? হতে পারে পরিবহন, বীমা , প্রভিডেন্ট ফান্ড, চিকিৎসা সুবিধা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের ধরনভেদে নির্ভর করে। উল্লিখিত বিষয়গুলো ইতিবাচক থাকলে একজন কর্মী অবশ্যই সন্তুষ্টিতে থাকবে।

কর্মীর ভবিষ্যতের সঙ্গে পারিবারিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কযুক্ত। তবুও তার কাছে জানতে চাওয়া হতে পারে, আপনি কি মনে করেন এ প্রতিষ্ঠানে থাকলে আপনি ও আপনার পরিবারের সবাই ভালো থাকবে? কর্মী কি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারবেন? এর বাইরেও আরও দুটি প্রশ্ন করা যাবে। প্রতিষ্ঠানের কোন বিষয়টি আপনার ভালো লাগে? প্রতিষ্ঠানের কোন বিষয়টি কর্মী অপছন্দ করেন? নিয়োগকর্তাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কর্মীরা যা বলবে, সেটিই হবে সঠিক মূল্যায়ন। এক্ষেত্রে খারাপ দিকগুলোর পাশাপাশি ভালো দিকটাও জানা যাবে, যা নতুন কর্মীদের পরিচিতি পর্বে বলা যাবে, এতে নতুন কর্মীদের মনে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালো ভাবমূর্তি তৈরি হবে।

জরিপের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষ রাখতে হবে। নিয়োগকর্তা যদি কর্মীদের ভালো রাখতে চান, নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্নতি চান, তবে অবশ্যই এ-জাতীয় জরিপ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করাতে হবে, যেটির গ্রহণযোগ্যতা আছে। এমন যেন না হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যে ব্যক্তি কর্মীরা অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করলে কিংবা ছুটি না নিলে খুশি হন, কিংবা যে ব্যক্তি সর্বময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, যেসব সিদ্ধান্ত নেন, যে ব্যক্তি মালিকের বুদ্ধিদাতা হিসেবে কাজ করেন, তাদের প্রতি স্বভাবতই কর্মীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে রুষ্ট থাকেন। এমন কেউ হতে হবে যাকে সবাই পছন্দ করেন, সবচেয়ে ভালো হয় বাইরের কেউ অর্থাৎ কোনো তৃতীয় পক্ষ যদি জরিপ পরিচালনা করে। যদি কাগজে-কলমে জরিপ করা হয় তাহলে অবশ্যই কর্মীদের নাম বা পদবি লেখার কোনো সুযোগ থাকবে না। আর মৌখিক হলেও কোনোভাবেই মতামতের সঙ্গে তার নাম লিখে নেওয়া যাবে না। মোটকথা, জরিপে গোপনীয়তা থাকতে হবে এবং কর্মীর মত নেওয়ার আগে গোপনীয়তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে হবে। জরিপ শেষ হওয়ার পর পর্যালোচনা করতে হবে ভালো দিক ও উন্নতির প্রয়োজন এমন দিকগুলোকে আলাদা করতে হবে। তারপর উত্তরের শতকরা পরিমাণ অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যাগুলো সাজাতে হবে। অতঃপর সমস্যাগুলোর মূল কারণ অনুসন্ধান করে সমাধান করতে হবে। মূল কারণ অনুসন্ধান জরুরি নতুবা একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়ার শঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে জরিপ পরিচালনা করার যৌক্তিকতা থাকে না। আরেকটি বিষয় আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে, প্রশ্ন বা জরিপ পরিচালনার ধরন নির্ভর করবে কর্মীদের ধরন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও তাদের কাজের ধরন প্রভৃতির ওপর, যা একজন দক্ষ মানবসম্পদ কর্মকর্তা খুব সহজেই নির্ণয় করতে পারবেন।

লেখাটি লেখার আগে আমি ব্যবস্থাপকদের নিয়ে অনলাইনে একটি জরিপ কার্য পরিচালনা করি। যেখানে ২৮টি কোম্পানির ২৮ জন ব্যবস্থাপক অংশ নেন। তাদের আমি উল্লিখিত প্রশ্নের আদলে কিছু প্রশ্ন করি, এক্ষেত্রে তাদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উত্তর বিবেচনা করে তার শতাংশ নির্ণয়ের পর দেখা যায় যে ইতিবাচক উত্তর এসেছে ৩২%, নেতিবাচক ৬০% এবং মন্তব্য নেই ৮%।

ওপরের ফলাফলটি  বিবেচনা করলে আমরা খুব সহজেই অনুমান করতে পারবো, বাস্তবিক অর্থে যারা কর্মীদের সন্তুষ্টি, অসন্তুষ্টি কিংবা চাহিদার বিষয়গুলো দেখভাল করবে তাদের নিজেদের মাঝেই অসন্তুষ্টি রয়েছে। আমরা যদি সত্যিকার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি কিংবা সমৃদ্ধি কামনা করি, সেক্ষেত্রে সন্তুষ্টি জরিপের গুরুত্ব কতখানি, তা নিশ্চয় অনুধাবন করতে পারছি।

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*