পোশাকশিল্প শ্রমিকদের চাহিদা সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে আজ পর্যন্ত যেভাবে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে বিশ্বমাঝে একটি শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে, তা জাতি হিসেবে আমাদের একটি বড় অর্জন নিঃসন্দেহে।

এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় চল্লিশ লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবার। পোশাকশিল্পের কথা চিন্তা করলে এর সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের অবদানকে কেউ অস্বীকার করবেন বলে মনে করি না। তাই তাদের ভালো থাকা না থাকার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের এ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রফতানি খাতের সবকিছু।

 

মানবশিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখনই সে দুনিয়া সম্পর্কে সবকিছু জানবে এটা ভাবা অবান্তর। কিন্তু ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সে অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং তার চাহিদাও বাড়ে, এটাই স্বাভাবিক। উন্নয়নশীল দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি আনুষঙ্গিক চাহিদা পূরণে প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা জরুরি একটা বিষয়। সেদিক বিবেচনা করলে প্রত্যেকের বেতন বৃদ্ধির যাচনা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেসব বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য অনেক গুণী ও বুদ্ধিমান লেখক রয়েছেন। আমাদের জীবনযাত্রা ও শ্রমিক জীবনযাত্রার তুলনা করলে অন্তর থেকে একটি বেদনাসূচক অভিব্যক্তি আসতেই পারে।

ধরা যাক, গাজীপুরে ১৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকি যার মাসিক ভাড়া ১৫ হাজার টাকার বেশি নয়। যেখানে দু-তিনটি শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, দু-তিনটি টয়লেটসহ আরও কিছু সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে একজন শ্রমিক তিন হাজার টাকা দিয়ে ২০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে থাকছে; পাচ্ছে না আলাদা টয়লেট, আলাদা রান্নাঘর। এ সবই অন্য ভাড়াটেদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হয়। আমি ১০ টাকা বর্গফুট হারে অর্থ দিয়ে যে সুবিধা পাই, একজন শ্রমিক কিন্তু ১৫ টাকা দিয়েও সে সুবিধা পাচ্ছে না। সেই বাসস্থান থেকেই কিন্তু প্রথম পাওয়া না পাওয়ার তুলনা আসছে।

অনেকের বদ্ধমূল ধারণা, শ্রমিকরা শুধু বেতনের জন্য কাজ করে। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ বেতন হলো তার পরিশ্রমের ফসল ও ন্যায্য অধিকার। তাই সেটি ভিন্ন কথা। কিন্তু সবসময় তারা শুধু টাকার কথা চিন্তা করে এ ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। একটু ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করলে বিষয়টি খোলাসা হবে। আমাদের সবারই সাধারণ চাহিদা ও প্রয়োজন মোটামুটি একই ধরনের নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি, সম্মান, পরিবারের ভবিষ্যৎ, চাকরির স্থায়িত্ব, চিকিৎসা প্রভৃতি। তাহলে আপনার-আমার চাহিদা যদি এ-ই হয়, তবে মানুষ হিসেবে একজন শ্রমিকের চাহিদাও একই। সবকিছুতে যদি আমরা নিজেদের ভাবনা কিংবা চাহিদাগুলো দিয়ে তুলনা করি, তবে এ সবকিছু আমাদের কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা কি শুধু টাকার জন্য চাকরি করি? সম্মানেরও প্রয়োজন আছে। মানুষ হিসেবে শ্রমিকদের চাহিদাও একই, তারাও সম্মান নিয়ে কাজ করতে চায়। আমাদের মতো তাদের কাছেও টাকা সবসময় মুখ্য নয়। যদি টাকাই মূল বিষয় হতো, তাহলে যেসব কারখানা মালিক শ্রমিকদের অপেক্ষাকৃত বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন, অনেক ধরনের ইনসেনটিভ ভাতা চালু রেখেছেন, যেখানে শ্রমিকরা আশপাশের অন্য শ্রমিকদের চেয়ে বেশি আয় করছেন, সে কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ থাকবে কেন? বাইরে থেকে কারও ইন্ধনÑসবক্ষেত্রে এটা সত্য নয় বা সত্য ভাবাও ঠিক নয়। তা-ই ধরে নিলে, আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে মিল না থাকলে তৃতীয় পক্ষ কেউ আসতেই পারে। তাকে আটকাতে পারবেন না। আমি না আনি, আমার ভাই ডেকে আনবেন। এটাই বর্তমান প্রেক্ষাপট, যেখানে মধ্যস্থতাকারী থাকবেই। এখন আমি যদি তৃতীয় কাউকে অপছন্দ করি, সেক্ষেত্রে নিজের ঘর আগে সামলাতে হবে। ঠিক নয় কি? এখন ঘরের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আমরা সমস্যা সবসময় ওপর থেকে দেখি, যা উপসর্গ মাত্র। এর গভীরে যে অসন্তুষ্টি লুকিয়ে আছে, তা কোথা থেকে এলো আমরা কি কখনও চিন্তা করেছি? সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে, এর পেছনে শ্রমিকদের চাহিদা লুকিয়ে আছে। চাহিদা কি শুধু অর্থের! এর আগে আমাদের নিজেদের চাহিদা নিয়ে বলেছি। শ্রমিকদের চাহিদাও তা-ই। সে চাহিদার জিনিস অথবা বিষয়গুলো পূরণ হওয়া না হওয়া থেকে আসছে দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা থেকে আসছে অসন্তুষ্টি। শ্রমিকদের চারপাশ ও কর্মকাণ্ড চিন্তা করলে দুশ্চিন্তাগুলো আসে। টার্গেট, দক্ষতা, সম্মান, কর্মপরিবেশ, বেতন বৃদ্ধি, পরিবারের সমস্যা, দুর্ঘটনা, স্বজনের মৃত্যু, স্বাস্থ্যগত সমস্যাসহ আরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনেক সমস্যার মধ্যে বেতন বৃদ্ধি না হওয়া একটি সমস্যা মাত্র। এর বাইরেও অনেক সমস্যা আছে। এখন এ দুশ্চিন্তাগুলো কীভাবে খুঁজে বের করা হবে? এক্ষেত্রে কারখানায় একটি শক্ত যোগাযোগ মাধ্যম থাকা জরুরি। এখন সেই যোগাযোগ মাধ্যম কীভাবে শক্ত হবে আর কারাই বা থাকবে? একটি যোগাযোগ মাধ্যম তখনই শক্ত হবে, কোনো কারখানায় সবার সমন্বয়ে একটি সুন্দর কর্মপরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে মাধ্যমগুলো নিজ দায়িত্ব বুঝবে ও অন্যকে সম্মান দিতে জানবে। এ যোগাযোগ মাধ্যমে যারা আছে, তাদের সঙ্গে শ্রমিকের সম্পর্ক কেমন, এটা জানাও জরুরি। সম্পর্ক ভালো না থাকলে ভালো কিছু আশা করা বাতুলতা।

মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখছি। ধরা যাক, একটি কারখানায় সুপারভাইজার একজন শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেনÑসেটি তার অসন্তুষ্টির কারণ। অন্যদিকে কল্যাণ কর্মকর্তার সঙ্গে একজন শ্রমিক কথা বলতে চাইলেন, তিনি পাত্তা দিলেন নাÑএটি আরেকজনের অসন্তুষ্টি। শ্রমিক ছুটি না পেয়ে অভিযোগ জানাতে এলেন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে; তিনি আমলে নিলেন না। টার্গেট পূরণ না হওয়ায় সকালে প্রোডাকশন ম্যানেজারের রুমে প্রতিদিন কয়েকজন কর্মী বকুনি খাচ্ছেন; এটি তাদের অসন্তুষ্টি। এবার ওই কারখানার ৫০ জন শ্রমিকের সম্মিলিত দাবি, দুপুরে তাদের বিনা পয়সায় খাবার দিতে হবে। খাবারের অর্থ সেই কারখানা বেতনের সঙ্গে দিচ্ছে জেনেও তারা এ আবদার করে বসলেন। সেক্ষেত্রে অন্য যে শ্রমিকরা বিভিন্ন কারণে অসন্তুষ্ট, তারাও এদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হবে। এটাই স্বাভাবিক। পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একদিন বড় ধরনের ঝড় বয়ে আনবে, তার উদাহরণ বহু রয়েছে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? উপায় হলো নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা। শ্রমিকরা কখন বুঝবে, কারখানা কর্তৃপক্ষ স্বচ্ছ? কারখানায় অভিযোগ সংগ্রহের পদ্ধতি থাকবে, যা প্রতিটি সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখে। এসবের পরও সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কারখানা মালিক শ্রমিকের সন্তুষ্টির জরিপ করেন কি না। আর যদি করে থাকেন, তা কতটা কার্যকর! মোটকথা, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার শ্রমিকদের চাহিদা বোঝেন কি না? চাহিদা না বুঝলে সন্তুষ্টি জরিপের মানদণ্ড কী হবে?

কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে একজন শ্রমিক কী চায়। শ্রমিকদের মূল চাহিদা তিনটি, সব মানুষের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য। এগুলো হলো এক. নিয়মিত আয়, যা বৃহৎ অর্থে ধরলে নিয়মিত কাজ, নিরাপদ জীবন এবং ন্যায় ও যুক্তিসংগত মজুরি। দুই. সম্মান ও স্বীকৃতি তথা মতপ্রকাশের সুযোগ থাকা এবং তার মতামতের প্রতি অন্যের শ্রদ্ধা। তিন. পরিবারের ভবিষ্যৎ, যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য সুযোগ, দক্ষতা বৃদ্ধি, পদোন্নতি, কর্মজীবন ও ব্যক্তি-জীবনের ভারসাম্য।

উপরিউক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সন্তুষ্টি জরিপ পরিচালনা করা হলে সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের চাহিদা, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিষয় জানা যাবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। আবার বলছি, পোশাকশিল্পকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে হলে শ্রমিকদের ভালো রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

(যুক্তরাজ্যভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্সি সংস্থা ‘ইমপ্যাক্ট লিমিটেড’ ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১২৮টি পোশাক কারখানার দুই হাজারের বেশি শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে। এ নিবন্ধে শ্রমিকদের ওই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে)

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকদের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি

পোশাকশিল্প শ্রমিকদের চাহিদা সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি

Manab Zamin

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*