স্টোর বিভাগ হতে পারে শিক্ষিত বেকারদের উপযুক্ত ক্যারিয়ার

মুহাম্মদ জসীম উদ্দীন

স্টোর নিয়ে প্রবন্ধ বা ফিচার লেখা কিছুটা কঠিন বৈকি কারন এটি সাধারণতই একটু অবহেলিত বিভাগ। তবুও কারও উপকারে আসবে এই ভেবে লেখাটি লিখছি। সাধারণত আমরা সবাই ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত বা ব্যস্ত। যে কারনেই হোক বর্তমান প্রজন্ম এই বিষয়ে যে আমাদের চেয়ে যে বেশী চিন্তিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। বিশেষ করে যে দেশে শিক্ষিত আর কর্মক্ষম লোকের প্রায় অর্ধেকই বেকার সে দেশের শিক্ষিত বেকাররা যে কি পরিমান হতাশ তাদের ক্যারিয়ার নিয়ে তা শুধু ভুক্তভোগিরাই বলতে পারেন।

কেন এই হতাশা? শিক্ষিত যুবকদের হতাশা কেন, কি কারনে, কি প্রেক্ষিতে তা পাঠক মাত্রই এই অধমের চেয়ে বেশী জ্ঞাত। নিয়োগ বাণিজ্য, রাজনীতিকরণ, দলীয়করণ ছাড়াও আরো অনেক কারণে সরকারী চাকরিতে ক্যারিয়ার করা এক দিকে যেমন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার অন্যদিকে যে কোন মূল্যে একটা সরকারী চাকরী সেটি যে পজিশনেই হোকনা কেন তা পেতে যে কোন রকমের ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতাও এক ধরনের জাতীয় মহামারি হয়ে দাড়িয়েছে। এর কোনটিই একটি আধুনিক ও সভ্য জাতির জন্য কতটুকু প্রযোজ্য তা বিজ্ঞগণই ভাল বলতে পারবেন। অন্যদিকে শুধুমাত্র বিসিএস নির্ভর একটা জাতি যে ধীরে ধীরে ফার্ম হাউজের পাখিদের মত আমাদের ক্যারিয়ার গড়ার কারখানাগুলো যে বিকলাংগ হয়ে যাচ্ছে সে কথা না হয় নাই উল্লেখ করলাম।

ক্যারিয়ার কি? যে অবস্থায়তেই থাকিনা কেন সুনির্দিষ্ট ভাবে ক্যারিয়ার কি তা অনেকটাই ধারণাবশতই জেনে থাকি। নবম/দশম শ্রেনীর বইতে এই সংক্রান্ত একটা ছোট্ট সংজ্ঞা পাওয়া যায় যা নিম্নরূপঃ “কোনো কাজ, পেশা, বৃত্তি, চাকরি করে জীবন (বাস্তব) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জীবনকে প্রতিষ্ঠা করাকে ক্যারিয়ার বলে” ৷ এই সংজ্ঞা থেকে মোটামোটি অপেক্ষাকৃত পরিস্কার ধারণা আমরা পেতে পারি যা ক্যারিয়ার সম্পর্কে আমাদের অস্পষ্ট ধারনাকে কিছুটা হলেও স্পষ্ট করবে। ক্যারিয়ার সম্পর্কে সাধারণ সুপষ্ট ধারনা পাওয়া উচিত নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় কিন্তু বিস্তারিত জ্ঞান পাওয়া উচিত উচ্চ মাধ্যমিকে। কিন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদেরকে সেই শিক্ষা কতটুকু দিচ্ছে তা আমাদের আদৌ বোধগম্য নয়। আবার ক্যারিয়ার গড়ার আগে আমাদের যে প্রকৃত মানুষ হতে হবে এবং সেই মানুষ হতে হলে কি কি মানবিক গুনাবলী থাকা দরকার তাও আমরা জানতে পারি না। আমার মতে ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম পূর্ব শর্ত হল ভাল মানুষ হওয়া। কারণ ভাল মানুষ না হলে অনেক ভাল ক্যারিয়ারও খড়ের কুড়োর মত ভেসে যেতে পারে আবার মানবিক গুন সম্পন্ন একজন অপেক্ষাকৃত নিম্ন ক্যাটাগরীর ক্যারিয়ার নিয়েও সফল হতে পারেন। তাই শুধু মাত্র হাই প্রোফাইল ক্যারিয়ার বা কাংক্ষিত ক্যারিয়ার করতেই হবে তা কিন্তু নয় তবে অবশ্যই ক্যারিয়ারকে টার্গেট করে প্রস্তুতি নিতে হবে সফল ক্যারিয়ারের জন্য। মনে রাখতে হবে, ক্যারিয়ার কোন চাকরি বা ব্যবসার নাম নয় এটি সামগ্রিক জীবন যাপনের সাথে জড়িত।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ক্যারিয়ারঃ এটি অত্যন্ত পরিষ্কার বিষয় যে আমাদের মানুষ গড়ার কারখানা মানে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদেরকে একদিকে দক্ষ ও সুন্দর ক্যারিয়ার গড়তে কি কি করণীয় তা শিখাতে ব্যর্থ (কিছু ব্যতিক্রম আছে হয়ত) অন্যদিকে আদর্শ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে ব্যর্থ। একটা সার্টিফিকেট নির্ভর সিলেবাস ও এন্টারটেইনমেন্ট নির্ভর প্রশাসন দিয়ে চলছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখান থেকে বের হবার পর কথা ছিল জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যাবে বীর যোদ্ধার মত এবং বিজয়ী বেশে ফিরে আসবে। কিন্তু আমরা দেখি তার ঠিক বিপরীত চিত্র যা একটা জাতির জন্য, জাতির আগামী বিনির্মানের সৈনিকদের জন্য চরম হতাশার, লজ্জার ও বেদনার। এর কারণ ও করণীয় উল্লেখ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আজকের উদ্দেশ্য এই গন্ডির ভেতর দিয়ে বের হওয়া শিক্ষিত বেকারদের জন্য যারা হতাশার পরিবর্তে দেখবে আশা, অন্ধকারের পরিবর্তে দেখবে আলো, মুচড়ে পড়ার পরিবর্তে শক্ত হাতে লাগাম ধরবে ভেংগে পড়া ক্যারিয়ারকে জোড়া লাগাতে।

ক্যারিয়ার নিয়ে আশার দিকঃ কোন এক সময় ক্যারিয়ার মানেই ছিল সরকারী দপ্তরে চাকরি ও শিক্ষকতা। কিন্তু ৮০ এর দশকের পর থেকে পরিবর্তন আসতে থাকে ক্যারিয়ার গঠন ও বাছাইয়ে। মুলত প্রাইভেটাইজেশনের ফলে বিপুল সংখ্যক ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এই দশকের শুরু হতে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি, সিমেন্ট, ঔষধ, সিরামিক, চামড়া সহ নানা রকম নতুন নতুন শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত বেকারদের একটি বড় অংশ প্রাইভেট সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পায়। বর্তমানে বাংলাদেশ নামক ৫৫৫৯৮ বর্গ মাইলের এই সবুজ শ্যামল দেশটি মানচিত্রে টিকে আছে শুধুমাত্র বেসরকারী খাতের উপর ভর করে। যেখানে সরকারী সকল কারখানা আর প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত লোকশান দিয়ে এক সময় লক আউট হয়ে গেছে বা যাচ্ছে সেখানে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলো নতুন নতুন কারখানা স্থাপন করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে সাথে বেকার সমস্যা সমাধানেও গুরুত্তপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। নব্বই এর দশকের দিকে ঔষধ শিল্পকে কেন্দ্রে করে, এর পর বীমা ব্যবসায়, অতঃপর গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল শিল্পের পাশা পাশি প্রযুক্তি ব্যবসায়েও ধীরে ধীরে চাকরির বাজার প্রস্তুত হতে থাকে। এক পর্যায়ে আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে আরো বিভিন্ন ছোট ছোট শিল্প গড়ে উঠতে থাকে এবং ক্রমেই শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং অশিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান বাড়তে থাকে যা এক পর্যায়ে বহুজাতিক কোম্পানীতে ক্যারিয়ার গড়তেও সহায়ক ভুমিকা রাখতে শুরু করে।

তৈরী পোশাক শিল্পে ক্যারিয়ারঃ বর্তমানে বাংলাদেশের যে মধ্যেবিত্ত শ্রেনীটি টিকে আছে এবং নতুন কিছু মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্তি হয়েছে তার পুরো অবদানটাই তৈরী পোশাক শিল্পের। এখাতে এখন শুধু দেশী দক্ষ নয় বিদেশী দক্ষরাও কাজ করে যাচ্ছে যা দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ মর্যাদায় উন্নিত করছে। মাত্র বছর বিশেক আগেও অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক এই সেক্টরে কাজ করতে চাইতেন না কোন এক বিশেষ বা অজ্ঞাত কারণে। এখন এই সেক্টরকে টার্গেট করে শুধু ক্যারিয়ার প্রস্তুতিই নয় বরং বিভিন্ন ফেকাল্টিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারী বেসরকারী নাম করা ভার্সিটিগুলোতে। এখানে উৎপাদন বিভাগ ছাড়াও আছে এইচ আর, কমপ্লায়েন্স, প্রশাসন, কল্যান বিভাগ, মার্চেন্ডাইজিং, মার্কেটিং, সোর্সিং, লজিস্টিক এন্ড সাপ্লাই চেইন, স্টোর, কোয়ালিটি, ফায়ার সেফটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল, ইউটিলিটি, সিকিউরিটি সহ বিভিন্ন রকমের উচ্চ মধ্য ও নিম্ন স্তরের ক্যারিয়ার বা চাকরি। এ ছাড়াও এর সাথে আছে আরো অসংখ্য লিঙ্কেজ ব্যবসা যেখানেও আছে অনেক সুন্দর ক্যারিয়ার বা চাকরি বাজার। যেমনঃ ক্যামিক্যাল, প্রিন্টিং, স্টেশনারী, প্যাকেজিং, আবাসন, ওয়ারহাউজিং ইত্যাদি ইত্যাদি। এই শিল্পের মাধ্যমেই এই দেশের মানুষ দেখেছে সবচেয়ে উচু পদের ক্যারিয়ার অর্থাৎ সিইও, সিএফও, সিওও সহ এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, জিএম ইত্যাদি।

স্টোর বিভাগে ক্যারিয়ারঃ শুরুতেই উল্লেখ করেছিশুধুমাত্র স্টোর বিভাগ নিয়ে ক্যারিয়ার বিষয়ক একটি প্রবন্ধ লেখা কিছুটা অপ্রস্তুত বা বিচলিত হবার বিষয় কারণ এটি এখনও কোথাও কোথাও একটি অনাকাংখিত বিভাগ হিসেবে বিবেচিত। তবে এর পরিবর্তনের মাত্রা এতটাই যে আলহামদুলিল্লাহ বিগত দশকে তা রীতিমত চমক দেখানোর মতই। এক সময় বাধ্য হয়ে কেউ গার্মেন্টস বা পোশাক খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আসলেও স্টোরের ধারে কাছে আসতে চাইতেন না। আসুন জেনে নিই আপনি কেন স্টোরে জব করবেন?

  • স্টোর বিভাগে কাজ করতে হলে আপনাকে বিশেষ কোন ডিগ্রী অর্জন করতে হবে না। তবে বাণিজ্য বিভাগের অভিজ্ঞতা থাকলে কিছুটা সহায়ক হয় বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। এ ছাড়া তেমন কোন নামি দামি প্রতিষ্ঠানে না পড়েও আপনি স্টোর বিভাগে কাজ করতে পারেন এবং তা অন্য যে কোন বিভাগের সাথে সমান পাল্লায় কিংবা কখনো বেশি মাত্রায় ক্যারিয়ারকে উজ্জ্বল করতে পারেন।
  • কিছু কিছু বিভাগে চাকরি পেতে হলে অনেক বেশি কম্পিটিশনের মাধ্যমে পেতে হয়। বিশেষ করে মার্চেন্ডাইজিং, এইচ আর-কমপ্লায়েন্স ইত্যাদিতে তো কথাই নেই। কিন্তু স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাশ বেকাররা অপেক্ষাকৃত কম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্টোর সহকারী বা স্টোর সুপারভাইজার হিসেবে ১০০০০/১২০০০ টাকায় চাকুরিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
  • এক জন এইচএসসি বা গ্রেজুয়েট করা ছেলে মাইক্রোসফট অফিস বিশেষ করে এক্সেল সম্পর্কে ভাল আইডিয়া থাকলে স্টোরে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর বা ট্রেইনি এম আই এস অথবা ট্রেইনি ডাটা এন্ট্রি অফিসার হিসেবে খুব সহজেই স্টোরে চাকরির সুযোগ পেতে পারে। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে স্টোরের সর্বোচ্চ পদে নিজের ক্যারিয়ার করতে পারে যা অন্য বিভাগের চেয়ে অনেক সহজ ও কম প্রতিযোগিতামূলক। এছাড়া স্টোর সহকারী, স্টোর সুপারভাইজার, সহকারী স্টোর কিপার ইত্যাদি পদেও ফ্রেশারদের নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে এবং এই সব পদের যে কোন একটিতে জয়েন করেও যোগ্যতা ও পরিশ্রম করলে ৭/৮ বছরের ব্যবধানে ম্যানেজার পদে নিজেকে উন্নিত করা খুব একটা চ্যালেঞ্জিং বিষয় না।
  • বর্তমানে স্টোরে ডিপার্টমেন্টের বিস্তার অনেক ব্যাপক। একটি মাঝারি মানের কম্পোজিট ফ্যাক্টরিতে প্রায় ২০ জনের অধিক স্টোর অফিসার এবং একাধিক ম্যানেজার-এসিস্টেন্ট ম্যানেজার থাকে। যা অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্য লোকের অভাবে ফ্যাক্টরির সবচেয়ে খারাপ পারফর্মারদেরকে দিয়ে পরিচালিত করা হয় যেটি মোটেই কাম্য নয়। তাই শিক্ষিত বেকরগণ পরিকল্পিতভাবে সুস্পস্ট লক্ষ্য নিয়ে এই সেক্টরে কাজ করলে সফলতা নিশ্চিত তা হলফ করেই বলা যায়।
  • এই বিভাগের চাকুরীর স্থায়িত্ব তুলনামূলক ভাবে অন্য বিভাগের চেয়ে বেশি। কারণ মালিক সাধারণত অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য স্টোর কর্মকর্তাদেরকে ছাড়তে চাননা। এ ছাড়া একটা ফ্যাক্টরী লক আউট হয়ে গেলেও স্টোরে এক দুই জনের চাকরী সর্বশেষ সময় পর্যন্ত থাকে তার স্থায়ী সম্পত্তির দেখভাল করার জন্য।
  • একজন ভাল কাজ জানা ও পরিশ্রমি ব্যক্তি প্রতি দুই বছর অন্তর একটি করে প্রমোশন পেতে পারে এই বিভাগে। সে ক্ষেত্রে তাকে নির্দিষ্ট কিছু কাজে খুবই দক্ষ হতে হবে এবং নিজেকে সেই ভাবে উপস্থাপন করতে পারলে ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ছয় ডিজিট সেলারী ও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ফেসিলিটি সহ সর্বোচ্চ পদে নিজে প্রতিষ্ঠিত করা একেবারেই কঠিন কিছু নয়।

কি কি বিশেষ যোগ্যতা স্টোর বিভাগে আপনার ক্যারিয়ারকে দ্রুত ও নিরাপদ করবে? আসুন জেনে নিই সংক্ষেপে সেই সব যোগ্যতাগুলিঃ

১। কর্মঠঃ স্টোর এমন একটি স্থান যেখানে কাজই ধর্ম কাজই কর্ম। দৈনিক সাধারণ শ্রমঘন্টা ছাড়াও এই বিভাগে কিছু অতিরিক্ত সময় দিতে হয়। বিশেষ করে শিপম্যান্ট বা সর্বরাহের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া বিভিন্ন মালামাল গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাধারণ অফিস সময়ের বাইরেও অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার মানসিকতা থাকাতে হবে স্টোরে ক্যারিয়ার আলোকিত করতে হলে। আর যেটুকু সময় অফিসে থাকবে তার সবটুকুকে কাজে লাগাতে হবে যাতে সময়টা অপচয় না হয়।

২। ইতিবাচক মনোভাবঃ যে কোন কর্মক্ষেত্রেই ইতিবাচক মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্তপূর্ণ তাতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু স্টোরে এটি আরো বেশী গুরুত্তপূর্ণ। যে সব স্টোর কর্মকর্তা দীর্ঘদিন কাজ করেও প্রমোশন পাচ্ছেন না খোজ নিয়ে দেখলে জানা যাবে তাদের প্রথম সমস্যা হল নেতিবাচক মনোবৃত্তি। তাই স্টোরে ক্যারিয়ার করতে হলে নিজেকে সবসময় ইতিবাচক হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে।

৩। মাইক্রোসফট এক্সেল জানাঃ স্টোরে ক্যারিয়ার গড়ার মূল কারিগর বলা যায় এই এক্সেলকে। শুধু তাই নয় এডভান্স লেভেলে এক্সেল জানা একজন স্টোর অফিসার খুব সহজেই অন্য বিভাগের উপরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারে সহজেই যেটি তার সামগ্রিক পারফরমেন্সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করে থাকে। এছাড়াও এটি একজনের কাজকে অতি অল্পসময়ে বিভিন্ন রকম রিপোর্ট তৈরীর মাধ্যমে সময় বাচাতেও সহায়ক ভুমিকা রাখে।

৪। সৃষ্টিশীল চিন্তাধারাঃ নতুন কিছু করা যাদের অভ্যাস বা মানসিকতা আছে তারা স্টোরে ভাল ক্যারিয়ার করতে পারে। কারণ দিন দিন নতুন নতুন কলা কৌশল আবিষ্কার হচ্ছে যা বিভিন্ন বিভাগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। স্টোরেও দৈনন্দিন কার্যপ্রণালীতে বৈচিত্র আনতে এবং কাজের সহজিকরণ করতে বিভিন্ন কৌশল আবিষ্কার করতে পারলে নিজেকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

৫। শেখার আগ্রহঃ শেখার আগ্রহ থাকতে হবে সবসময়। চাকরি পাইছি এখন আর পড়া লেখা করবনা এই মানসিকতা থাকলে স্টোর ক্যারিয়ারে অনেক পিছিয়ে থাকতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন অনেককে চিনি যারা শুধুমাত্র শেখার অভাবেই একই পদে একই সেলারিতে পড়ে আছে বছরের পর বছর। এর কিছু দিন পর কোম্পানীর বোঝা হয়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে একসময় গোল্ডেন হ্যান্ডশেক। কি কি বিষয়ের উপর জ্ঞানার্জন করলে স্টোর ক্যারিয়ারের জন্য সহায়ক তারও একটু ইঙ্গিত দেয়া হল। এক্সেল ছাড়াও আরো যে সব বিষয়ে একজন স্টোরে অফিসারের জ্ঞান থাকা দরকার তা হলঃ

ক) পর্যাপ্ত কম্পিউটার জ্ঞান বিশেষ করে এডভান্স এক্সেল, ওয়ার্ড এবং পাওয়ার পয়েন্ট।

খ) স্ট্যান্ডার্ড ই-মেইলিং।

গ) আমদানী-রপ্তানী প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞান। যেমনঃ এল সি, পি আই, কাস্টম বন্ড, ইনকো টার্মস ইত্যাদি।

ঘ) সাপ্লাই চেইন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা।

ঙ) সাধারণ গণিতে ভাল হওয়া।

চ) ইনভেন্টরী ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ভাল জ্ঞান থাকা। বিশেষ করে এবিসি ক্যাটাগরী, ফার্স্ট ইন ফার্স্ট আউট (ফিফো) সিস্টেম, হাউজকিপিং সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞান ইত্যাদি।

৬। সততাঃ সততা হল স্টোরে জবের প্রধান স্তম্ব। এটি না থাকলে তার স্টোরে ক্যারিয়ার করার চিন্তা না করাই উচিত। তবে সময়ের ব্যবধানে এবং সততার অবমূল্যায়ণের কারনে অনেক সৎ লোকও সময়ের প্রেক্ষিতে অসৎ হয়ে যায় এবং তখনই তার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়।

৭। কোম্পানীকে নিজের মনে করাঃ স্টোরে যারা কাজ করে তাদেরকে নিজের কোম্পানী মনে করতে হবে। অর্থাৎ নিজের সম্পদ রক্ষায় যেভাবে ভুমিকা রাখতে অভ্যস্থ ঠিক সেই ভুমিকা রাখতে হবে। অন্যথায় স্টোরের ইনভেন্টরি কন্ট্রোল করা সম্ভব হবেনা এবং পারফর্মেন্স করা যাবেনা।

কখন শুরু করবেন? সাফল্যের সুনির্দিষ্ট বয়স না থাকলেও ক্যারিয়ার শুরুর সুনির্দিষ্ট বয়স সময় থাকা চাই। সাধারণ ভাবে যিনি যত দেরীতে ক্যারিয়ার শুরু করবেন তিনি তত দেরীতে সফল হবেন। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে আর সেটা আপনার ক্ষেত্রে নাও ঘটতে পারে। তাই আপনি যদি সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তা হলে আপনি অনেকটা এগিয়ে থাকবেন। এই ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত হল, এস এস সি পরীক্ষার পর কম্পিউটার সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করুন এবং এডভান্স এক্সেলটা রপ্ত করুন। এরপর এইচএসসি পরীক্ষার পর ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেল ভর্তি কোচিং না থাকলে কোন একটা ফ্যাক্টরীতে ইন্টার্ন করার সুযোগ খুজতে পারেন। বিশেষ করে স্টোরে ১ মাসের ইন্টার্ন করতে পারলে আপনি সুপারভাইজার বা স্টোর সহকারী হিসেবে খুব সহজেই কাজে যোগদান করতে পারবেন। (যদিও আমাদের দেশে স্টোর ইন্টার্ন এখনও শুরু কেউ করেছে বলে মনে হয় না, তবে আপনি চাইলে বিনা বেতনে কোন রেফারেন্সের মাধ্যমে এটা করতে পারেন এবং সেখানে আপনার শেখা এক্সেল জ্ঞানটা কাজে লাগাতে পারেন। এতে করে উক্ত প্রতিষ্ঠানেই আপানার চাকরি হবার সম্ভাবনা ৯০% হয়ে যাবে। তাহলে চিন্তা করে দেখুন বছরের পর বছর চাকরি না খুজে এক মাস বিনা বেতনে চাকরি করে যদি চাকরি হয় এটা আপনার জন্য ভাল নয় কি? এর পর খুব ভাল রেজাল্ট হলে ভাল বিষয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন অন্যথায় চাকরি কন্টিনিউ করে সাধারন পাশ কোর্সে গ্রেজুয়েশন করলে খুব একটা মন্দ হয় না।

তবে শুধু স্নাতক পাশ করেই শিক্ষার ইতি টানাটা ঠিক হবেনা। স্নাতকের পর ম্যানেজমেন্ট এমবিএ অথবা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এ পোস্ট গ্রেজুয়েট করে নিলে স্টোরে ক্যারিয়ারের জন্য খুবই সোনাই সোহাগা হয়। তাই এই দিকটাকে খেয়াল রেখে ক্যারিয়ারের পাশা পাশি পড়া লেখাটা চালিয়ে যাওয়া উত্তম।

একটি আলোকিত স্টোর ক্যারিয়ারের জন্য খুবই সহায়ক কিছু ট্রেনিং করে নিতে পারেন। জবের পাশাপাশি এই ট্রেনিং গুলো আপনার মনোবল বৃদ্ধির পাশা পাশি নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে সহায়ক ভুমিকা রাখবে। কি কি ট্রেনিং নেবেন সেটি আপনার কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে। তবে সাধারভাবে নিম্নোক্ত বিষয়েগুলোর উপরে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।

ক) ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট (১ বা ২/৩ দিনের)।

খ) ফাইভ এস (হাউজকিপিং টুলস)।

গ) কানবান (পুল সিস্টেম)।

ঘ) ক্যামিক্যাল মেনেজম্যান্ট (টেক্সটাইলের জন্য)।

ঙ) ইকুইপম্যান্ট হেন্ডেলিং (যদি প্রযোজ্য)।

চ) পিপিই (পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপম্যান্ট) ব্যবহার সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ।

এই লেখনি স্টোরের ক্যারিয়ার সম্পর্কিত একটা ধারনা মাত্র। স্টোর একটি বিশাল পরিসর। একটা উৎপাদন কারখানার ৭০%-৮০% চলিত মূলধন থাকে এই স্টোরের অধীনে। তাই এই খানে কাজ করা শুধুমাত্র একটি কাজই নয় বরং একটি প্রেস্টিজিয়াস বিষয়ও জড়িত। চেষ্টা করা হয়েছে ভাল কিছু দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য জানিনা কতটুকু হয়েছে। পাঠকই বলতে পারবে নতুন কোন আশার আলো এখান থেকে কেউ পেতে পারে কিনা।

লেখকঃ হেড অব স্টোর, আরকে নীট ডাইং মিলস লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*