প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয়হীনতা পরিহারে করনীয়

আমিনুল হক

এক ভয়ঙ্কর অসুখে ভুগছে এখন সারা বিশ্ব, করোনা ভাইরাস ছাড় দেয়নি প্রায় কোন দেশকেই, মানুষের কাছে মৃত্যু বিভীষিকা এখন । গত ডিসেম্বর চিনের উহান থেকে এই মরণ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। এই মুহূর্তে করোনার কবলে  মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে 247503 জন। পৃথিবী জুড়ে এখন এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে 3588773 চেয়ওে বেশি মানুষ। সামনের দিনে দেশ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আসছে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম থেমে গেছে। একই সঙ্গে পরিবহন, পর্যটন, হোটেল, মোটেল, বিশ্ব চিত্রজগৎ, বিনোদন কেন্দ্রসহ সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। বিপুল লোকসানের মুখে পড়ে বহু কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপ নেওয়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কতটা দীর্ঘায়িত হবে তার ওপর নির্ভর করছে অর্থনীতির ক্ষতির বিষয়টাও।

উন্নত দেশের চেয়ে অধিকগুনে অথর্নৈতিক সংকটে পড়বে  বাংলাদেশ । পোশাক শিল্পের বাজার ধরে রাখতে না পারলে চরম মুল্য দিতে হবে এদেশের সরকারকে । ইতিমধ্যে  করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কাঁচামাল সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো ৷ দেখা দিয়েছে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার শঙ্কাও ৷ পরিস্থিতি উন্নতি না হলে মারাত্নক বিপাকে পড়বে তৈরি পোশাক শিল্প এটা সু নিশ্চিত ৷

পোশাক কারখানা খোলা-বন্ধ নিয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের সিদ্ধান্তহীনতায় বিপাকে পড়েছেন লাখ লাখ পোশাক শিল্প শ্রমিক । অন্যদিকে প্রেশাসনের নানা তালবাহানায় মালিক পক্ষের মধ্যেও চলছে নানা বিভ্রান্তি।   সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সরকার সহ নানা অংগ সংগঠনেও চলছে সমন্বয়হীনতা । কেউ কারো নির্দেশনার তোয়াক্কা করছেন না এত করে সমাজে নানা ধরনের  প্রতিবন্ধকতা তৈরী হচ্ছে । আমাদের এ সমস্যা থেকে নিজেদের স্বার্থেই বের হয়ে আসতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয়হীনতা পরিহারে করনীয়ঃ

জরুরী অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক র্পযায়ে অবস্থান করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার উপায় তাঁদের জন্য জানা বেশি প্রয়োজন, যাদের প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয় । বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াতে কমবেশি সিদ্ধান্তহীনতা থাকেই, আর সিদ্ধান্তহীনতা মানেই সমন্বয়হীনতার সূত্রপাত ।  আমরা সবাই কোন না কোন সময়ে এই সমস্যায় পড়েছি বা আগামীতে পড়বো ।  কেউ হয়তো কম, কেউ হয়তো বেশি । নিজের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস না থাকা এবং যে কোনও বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল বিষয়গুলো না জানার কারণে অনেকে সিদ্ধান্ত হীনতায় ভোগেন অথবা প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেন । বিশেষ করে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ে এই সমস্যাগুলো বেশি হয় । আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল উপায় ও সিদ্ধান্তহীনাতা থেকে মুক্তির পদ্ধতিগুলো জানার চেষ্টা করবো । তবে তার আগে চলুন জেনে নেয়া যাক, কোন ধরনের মানুষ বেশিরভাগ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় ।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ভুল সিদ্ধান্ত মূলত কারা নিয়ে থাকেনঃ

প্রাতিষ্ঠানিক পযায়ে কমকর্তাগনের মধ্যে মূলত দুই ধরনের কর্মীরা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন । এক নম্বর দলের কর্মীগণ হলো যারা যে কোনও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান ।  খুব বেশি চিন্তা করে করে নিজের মাথা খারাপ করে ফেলেন, কিন্তু এত চিন্তা করেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে আসতে তারা ভয় পান ।  তারপর যখন সময় একদম কাছে চলে আসে, তখন কোনরকমে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করেন- যেটা বেশিরভাগ সময়েই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ।

আর দুই নম্বর দলের কর্মীগণ অতি সাহসী বা অতি অস্থির।  এনারা কোনও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার দরকার হলে বলতে গেলে কোনও চিন্তাই করেন না ।  অনেকটা ‘যা আছে কপালে’ টাইপ । ছোট বা বড় যে কোনও কাজই এনাদের অতিরিক্ত তাড়াতাড়ি সেরে নিতে চান । এদের কথা হলো, “আগে তো কাজ করি, যা হয় পরে দেখা যাবে“। এই মনোভাব যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন কিন্তু এটা অতিরিক্ত হয়ে গেলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয় । আর যে সকল কর্মীগণ একেবারেই কম চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেন বেশিরভাগ সময়েই তাদের সিদ্ধান্ত ভুল হয় । মূলত এই দুই ধরনের কর্মীরাই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বেশিরভাগ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন । খুব ভালো করে ভেবে দেখা দরকার – আমাদের মাঝে এই দু’টির কোনটি আছে কি না?  জরুরী অবস্থা থেকে সফল হতে হলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার উপায় অবশ্যই জানা থাকা আবশ্যক ।

সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সিদ্ধান্তহীনতা থেকে মুক্তির কিছু উপায়

প্রথমে আপনাকে যে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে । কোনও একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ে মানুষের মনে একটি উদ্দেশ্য অবশ্য থাকে কিন্ত যেটা পরিস্কার নয় । অনেকেই আছেন ঠিক কোন লক্ষ্যটি পূরণ করতে হবে – তা ভালোভাবে বিবেচনা না করেই কাজ শুরু করে দেন । এরকম হলে সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায় । এজন্য লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য যথেষ্ঠ পরিস্কার হওয়াটা জরুরী । সু-স্পষ্ট লক্ষ্য কিভাবে স্থির করবেন?  মনে করেন আপনি এই কোম্পানীতে জয়েন করেছেন একটি ভাল চাকরী ও বেতনকে লক্ষ্য স্থির করে । এখন আপনি  কি মনে করেন, আপনার লক্ষ্য কি সঠিক?   আমার মনে হয় না এটা সঠিক সিদ্ধান্ত । কারন আপনি ভাল বেতন ও চাকরী আপনার যোগ্যতার বাইরেও পেতে পারেন, তবে সেটা কিন্তু সাসটেইন করবে না । যোগ্যতানুযায়ী কাজ না করলে অবশ্যই কোম্পানী আপনাকে রাখবেন না । তাই লক্ষ্য স্থির করার সময় আপনাকে এটাও ভাবা উচিত ছিল যে, এ চাকরীটা আপনি টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি না? এটার পাশাপাশি আপনার আরো যে সব বিষয় ভাবা উচিত ছিল: আপনি আসলে কি চাকরি করতে চান, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের কোন পদে কাজ করতে চান, চাকরি থেকে আপনি আসলে কি শিখতে চান, এবং সেখান থেকে ঠিক কত টাকা আয় করতে চান – এগুলো যদি বিবেচনা করতেনতাহলে আপনাকে পরে গিয়ে বিপদে পড়তে হত না এবং অনায়েসে আপনি চাকরিটা করে যেতে পারতেন । কাজেই আপনি যে বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেন না কেন, সেটা কি উদ্দেশ্যে নিচ্ছেন  তা খুব ভালো ভাবে প্রতিটি খুঁটনাটি সহ ঠিক করুন । তাহলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত যে কোন মেজর সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আনুসঙ্গিক বিষয়গুলো আপনাকে নোট করতে হবে।  লক্ষ্য রাখবেন যে আমরা খেয়াল না করলেও, আমাদের পুরো দিনটা আসলে ছোট-বড় নানান সিদ্ধান্ত নিয়ে কাটে । অপসোনাল বিষয়গুলি নিয়ে না ভাবলে বা গুরুত্ব না দিলেও চলবে তবে মেজর সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে আপনাকে অবশ্যই বেশি সময় দিতে হবে।  যখন কোনও বড় সিদ্ধান্ত – যেমন, আপনি আপনার কোম্পানীর মালিককে  ফ্যাক্টরী লে-অফ করার জন্য সুপারিশ করবেন না সাধারণ ছুটির আওতায় কোম্পানী চালানোর সুপারিশ করবেন । লে অফ করলে আপনাকে যে বিষয়গুলি ভাবতে হবে; আপনার কোম্পানীর  বর্তমান অর্ডার এর কি অবস্থা, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে লে অফ করা কতটা যৌক্তিক, লেফ করার জন্য আপনার উত্থাপিত কারন গুলি শ্রম আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কি না, লে অফ বেনিফিট দিতে আপনার মালিক সচ্ছল কিনা, আপনার কোম্পানীর সাধারন শ্রমিকদের চাকরীর মেয়াদকাল কেমন, লে অফ পরবর্তিকালীন সময়ে নতুন শ্রমিকের পর্যাপ্ততা কেমন হবে ইত্যাদি । এখানে গভীর ও গোছানো চিন্তা ভাবনার অবশ্যই দরকার আছে ।  আর গোছানো চিন্তাভাবনার জন্য সিদ্ধান্তটির সাথে জড়িত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো লিখে রাখা অতীব প্রয়োজন । কিন্তু সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে আমরা অনেকেই এই কাজগুলি অপ্রয়োজনীয় ভেবে করি নাই । যার কারনে আমাদের নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং সময়ে সময়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করা হয়েছে ।  আর এ থেকেই সমন্বয়হীনতার সূত্রপাত।  কিন্তু যদি এই কাজটি আমরা করতাম , তবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা অনেটাই বেড়ে যেত কমে যেত সমন্বয়হীনতা ।

সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আপনি  সাধারনত কি কি নোট করবেনঃ

আগেই বলেছি, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সেখান থেকে আপনি ঠিক কি চান, মানে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খুব ভালো ভাবে জানা থাকতে হবে । আপনি যদি একটি পৃষ্ঠায় সিদ্ধান্তের ফলে কি লক্ষ্য আপনি পূরণ করতে চান সেগুলো লেখেন তাহলে এমনিতেই ব্যাপারটা অনেক বিস্তারিত স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

খারাপ ভালো দিক, যে কোনও সিদ্ধান্ত থেকেই কিছু ভালো আর কিছু খারাপ ফলাফল বের হয়ে আসবে । স্বাভাবিক ভাবেই আপনি যদি আপনার বর্তমান চাকরি ছেড়ে নতুন একটি চাকরিতে যান তবে নতুন চাকরি থেকে কিছু সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি, বর্তমান চাকরির কিছু সুযোগ সুবিধা আপনি হারাবেন । নতুন চাকরির অফার পাওয়ার পর আগেরটায় থাকা ভালো হবে, না নতুনটায় জয়েন করা ভালো হবে এই সিদ্ধান্ত সঠিক ভাবে নিতে হলে অবশ্যই আপনাকে এই ধরনের একটা লিস্ট করতে হবে ।

তৃতীয়ত আপনার গৃহিত সিদ্ধান্ত সুদূরপ্রসারী হতে হবে ।  সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত অন্যান্য বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের কথা মাথায় রাখতে হবে । মনে রাখবেন  একটি সিদ্ধান্ত অনেক কিছুকে প্রভাবিত করবে ।  সেই সাথে স্বল্প মেয়াদে যেটাকে ভালো মনে হচ্ছে, দীর্ঘ মেয়াদে তা না-ও হতে পারে । আপনার ভাল বেতনের চাকরির ব্যপারটায় ফিরে গেলে আমরা বুঝতে পারবো ।  আপনি যখন প্রথমে আপনার চাকরিটি নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন আপনার মাথায় জব স্যাটিসফ্যাকশন বা পেশাগত সন্তুষ্টির ব্যাপারটা ছিল না । এই কারণে আপনি কিন্তু চাকরীতে সাসটেইন না করতে পেরে বিপদে পড়ে ছিলেন । আপনি চাকরিতে জয়েন করার সময়ে ভেবে দেখেননি যে এই কাজটি করতে আপনার ভালো লাগবে কি খারাপ লাগবে । অথবা এখান থেকে আপনি এমন কিছু শিখতে পারবেন কিনা, যা আপনার ক্যারিয়ারকে সামনে এগিয়ে নেবে । চাকরির সাথে সম্পর্কিত এই বিষয়গুলো আপনি বিবেচনা করেনি বলেই আপনি পরে গিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন । আমরা অনেকেই ঝোঁকের বশে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে গিয়ে ঝামেলায় পড়ি । সিন্ধান্ত নেয়ার সময়ে শুধু মূল ব্যাপারটি ছাড়াও অন্যান্য ব্যাপারও বিবেচনা করা প্রয়োজন । দরকার হলে এগুলোও গুছিয়ে লিখে ফেলতে পারেন । লিখে রাখার একটি বড় সুবিধা হল, লিখতে বসলে এমন অনেক কিছুই মনে আসে, যা এমনিতে চিন্তা করতে গেলে মাথায় আসে না। মূল লক্ষ্যের সাথে জড়িত বিষয়গুলো ছাড়াও যে কোনও সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলও বিবেচনা করতে হবে ।  আজ যেটা ভালো সিদ্ধান্ত, কাল সেটার ফলাফল খারাপ হতে পারে ।  কাজেই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলো ছাড়াও সিদ্ধান্তটির দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলও চিন্তা করে দেখতে হবে । আপনি যদি চাকরিতে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কয়েক বছর পরে বিয়ে ও বাচ্চার কথা চিন্তা করতেন, তাহলে হয়তো অন্য কোনও সম্ভাবনাময় চাকরি খুঁজতেন । যেখানে ক্যারিয়ার ও আর্থিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হওয়ার সুযোগ থাকত ।  এভাবে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা না করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে অনেকেই এভাবে বিপদে পড়ে আটকে গেছে ।

চতুর্থত মেজর কোন ডিসিশন নিতে  আমাদের অবশ্যই কিছু জিনিস পরিহার করতে হবে যেমন;   আবেগ অভিমান, অনুরোধ বা অনুযোগ । আবেগী সিদ্ধান্ত বেশি নিলে অবশ্যই পস্তাতে হবে আর এটা প্রমানীত ।  আবেগী সিদ্ধান্ত গ্রহনকারীরা আসলে বেশিরভাগ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন । তবে  আবেগ খারাপ জিনিস নয় । আবেগের মধ্যে অনেক অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়, আবার আনন্দ, ভালোবাসা, মায়া, উচ্চাকাঙ্খা, আত্মবিশ্বাস এইসব আবেগ মানুষকে অনেক বড় করে এটাও প্রমানীত । তবে আবেগকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ সময়েই ভুল হয় । আমরা অনেক সময়েই আবেগের বশে জীবনের অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি – যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের পস্তাতে হয় । ব্যক্তিগত জবিনে আপনি আবেগকে যত বেশি পারেন প্রশ্রয় দিন ক্ষতি নাই, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে আপনি  কোন মতেই আবেগের বশিবর্তী হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাখেন না । কর্মস্থলে বা কমর্পরিবেশে শ্রমিকদের উপরে রাগ করে আমরা অনেক সময় নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। কিন্ত কোন এক সময়  লক্ষ্য করবেন যে অবশ্যই রাগের মাথায় নেয়া  সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে ।  কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না ।  মনে রাখতে হবে শ্রমিকরা বা অধস্তনরা ভুল করবেই, তাদের শুধরানোর জন্যই কোম্পানী আমাকে আপনাকে নিয়োগ দিয়েছেন । তাই শ্রমিকরা বা অধস্তনরা কোন ধরনের ভুল করে ফেললে টেকনিক্যালি সমস্যার সমাধান করতে হবে ।  এইসব ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে এবং এত সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে । আবেগে অন্ধ হয়ে গেলে আপনি শুধু যে দিকটি দেখতে চাইছেন সেটিই চোখে পড়ে ।  অন্যদিকে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলে যে কোনও বিষয়ের ভালো এবং খারাপ উভয় দিক দেখতে পাবেন ।  ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে ।

জটিল সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আবেগ কন্ট্রোল করার জন্য কিছু নিযম অনুসরণ করা যেতে পারে ।

১। কোনও সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে যদি দেখেন যে সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে আবেগ বেশি কাজ করছে, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সেই সময়ের জন্য বন্ধ করুন ।  একটু বিরতি দিলে আবেগের প্রভাব কমে যাবে এবং আপনি ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন ।

২। আবেগ ভালো হোক আর খারাপ, কোনও আবেগকেই সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রধান উপাদান বানানো যাবে না ।  ভালো আবেগ সিদ্ধান্তের খারাপ দিকগুলোকে আড়াল করে, আর খারাপ আবেগ ভালো দিকগুলোকে দেখতে দেয় না ।  কাজেই ভালো আবেগ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে গেলেও একটু সময় নিন ।  আবেগের মাত্রা কমে গেলে তারপর ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন।

পঞ্চমত মনে রাখতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক কোন সিদ্ধান্ত আপনি এককভাবে নিতে পারবেন না । আপনি বিভাগীয় প্রধান হলেও আপনার অনুচরদের (টিম মেম্বার) নিয়ে অবশ্যই আপনাকে বসতে হবে । সঠিক লোকের পরামর্শ নিতে হবে এবং অবশ্যই নিজেকে  আপনার কাজের গবেষণা করতে হবে।  সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া সব সময়েই একটি ভালো উপায় ।  যে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ে যদি এমন কাউকে পান  যে আগে সেই একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে  তাহলে অবশ্যই তার কাছে পরামর্শ চান । তবে এক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, আপনি যার কাছে পরামর্শ চাচ্ছেন তিনি আপনার সত্যিকার ভালো চান, এবং তার সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার সত্যিকার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে । আপনার সিদ্ধান্ত বা বিষয়ভিত্তিক নলেজ নাই শুধুমাত্র বয়সে বড় এধরনের ব্যক্তিদেরও পরামর্শ নেবেন না । এক্ষেত্রে সে যদি আপনাকে কোনও পরামর্শ দেয় – এবং আপনি সেই পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন তবে সেটা ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি । কাজেই পরামর্শ নেয়ার জন্য সঠিক লোক বেছে নেয়াটা খুব জরুরী ।  এক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখবেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যের পরামর্শের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করবেন না । তাহলে সিদ্ধান্তে ভুল হলে পরামর্শ দেয়া লোকটির ওপরে দোষ চাপবে এবং সম্পর্ক নষ্ট হবে । কাজেই, যতই পরামর্শ নিন না কেন, সিদ্ধান্ত নিজ দায়িত্বে নিন । অভিজ্ঞ ও ভালো চান এমন মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া ছাড়াও, যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন, সেই বিষয়ে নিজেও কিছু গবেষণা করুন । বইপত্র ঘাঁটুন, পত্রিকা ঘাঁটুন অর্থা‌ৎ সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত বিষয়ে যতটা পারেন জ্ঞান নিয়ে নিন এতে করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে ।

পরিশেষে বলা যায় আপনি যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পদ্ধতিগুলো জানেন এবং এগুলো ব্যবহার করে বেশিরভাগ সময়েই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তবে সিদ্ধান্তহীনতার অভিশাপ থেকে এমনিতেই মুক্ত হয়ে যাবেন ।  আপনার নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার প্রতি একটা আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবে।  আসলে এই বিশ্বাসের অভাবই মানুষকে সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে । আমরা বলছি না যে এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলেই আপনি সব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন ।  কিন্তু চিন্তা না করে বা অতিরিক্ত চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার বদলে এই প্রক্রিয়ায় আপনার সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে ।  আপনি যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, একটি গোছানো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনি সিদ্ধান্তটি নিতে পারবেন । ফলাফলে সেই সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা পাবেন ।  প্রতিটি ধাপ কিভাবে পার করবেন, এবং কোনটি কাজটি করা প্রয়োজন আর কোনটি অপ্রয়োজনীয় – এসবই আপনি অনেক ভালো করে বুঝতে পারবেন । জীবনের যে কোন স্থানে সফল হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সঠিক হওয়া জরুরী । আর সেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যেন আপনার জন্য সহজ হয় সেই উদ্দেশ্যেই এই লেখা উত্থাপিত হলো । সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে যদি এই লেখাটি আপনাকে সামান্য সাহায্যও করে তাহলেই আমার উদ্দেশ্য সফল বলে মনে করা হবে ।

ধন্যবাদ সবাইকে, ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন । সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখুন ।

তথ্যসূত্রঃ বাস্তব নীরিক্ষণ, ইন্টারনেট, প্রবন্ধ ।

লেখকঃ Manager, HR Admin & Compliance, DK Global Fashion Wear Ltd

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*