চাকরীর অবসান; আইন ও প্রেক্ষাপট

মোঃ আমিনুল হক

আমাদের মত মানবসম্পদ কর্মীগন প্রতিষ্ঠানে তাদের দায়িত্ব পালনকালে শ্রমিক নিয়োগ ও শ্রমিকের চাকরী পরিসমাপ্তির ক্ষেত্রে নানাবিধ বাধার সম্মুখিন হয়ে থাকি। আমি বাধা শব্দটি উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, আমরা নিয়োগ প্রদানের সময় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে শ্রমিকদের যথাসম্ভব ইতিবাচক দিক গুলি বেশি তুলে ধরি।  নিয়োগকালীন সময়ে প্রদত্ত তথ্য বা ইতিবাচক দিক গুলি শ্রমিকের চাকরী পরিসমাপ্তির সময় বাস্তবে রুপ পায় না। তারপরেও একটি কোম্পানী পরিচালনার জন্য শ্রমিক সংগ্রহও যেমন জরুরী তেমনি শ্রমিকদের সমস্যার  আলোকে তাদের চাকরী পরিসমাপ্তির সুযোগ তৈরি করাটাও জরুরী।

বাংলাদেশের বর্তমান চালচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়; দেশে বর্তমানে মোট কর্মক্ষম জনশক্তি ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে শ্রমশক্তি হচ্ছে ৬ কোটি ৩৬ লাখ। কাজে নিয়োজিত আছেন ৬ কোটি ৮ লাখ। যার মধ্যে বেকার ২৭ লাখ। আর কৃষি খাতে ২ কোটি ৪৬ লাখ, শিল্প খাতে ১ কোটি ২৪ লাখ, সেবা খাতে ২ কোটি ৩৭ লাখ, প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিক ৯১ লাখ, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিক ৫ কোটি ১৭ লাখ।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। কাজের অবস্থানের ভিত্তিতে করা সেই গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৮ সালে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে কাজের অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা এবং কাজের স্থানের নানা রকমের দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে গার্মেন্টসকর্মীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। ওই গবেষণায় পাওয়া ৩৩৪টি কর্মক্ষেত্রকে অস্থিতিশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণায় গার্মেন্টস সেকশন ১২৩ পয়েন্ট পেয়ে অস্থিতিশীলতার শীর্ষে অবস্থান করছে। এরপরেই রয়েছে গণমাধ্যম। গবেষণায় ৪৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অস্থিতিশীল পেশা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সংবাদ ও মিডিয়াকে । আর ৩২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় অবস্থান রয়েছে পরিবহন সেক্টর । ২০১৮ সালের ওই গবেষণায় দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে দাবি আদায় এবং অধিকারের জন্য ১৪৮টি দুর্ঘটনা, পাওনা বেতনের দাবিতে ৯০টি, স্থানের দাবিতে ৩৮টি, চাকরি ছাঁটাইয়ের জন্য ২০টি, ন্যুনতম মজুরির দাবিতে ১৭টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

একটি কোম্পানীর ফেস ভ্যালু কিন্ত অনেকটাই আপনার সহজ সাবলীল কোম্পানীর নীতিমালার উপরে নির্ভরশীল। কিন্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে প্রক্রিয়াতেই শ্রমিকের চাকরীচ্যুত হোক না কেন, তাদেরকে একটা সময় আমরা সু-নজরে দেখতে ব্যর্থ হই আর সে সময়টা হচ্ছে তার চুড়ান্ত পাওনা প্রদানের সময়। ব্যাপারটি এমন যে, চাকরীচ্যুত শ্রমিকটি  চাকরী থেকে চলে গিয়ে বোধয় কোন বড় ধরনের অন্যায় করেছেন। আমরা মানবসম্পদ কর্মীগন অনেক সময়ে বিভিন্ন বাধা বাধ্যকতায় তাদের (চাকরীচ্যুত শ্রমিকদের) সু দৃষ্টিতে দেখতে ব্যর্থ হই যা আমাদের জব রেসপন্সিবিলিটির চরম অবমাননা । আবার নিজেকে ভাল রাখতে আমরা অনেকেই মালিক পক্ষকে তাদের (চাকরিচ্যুতদের) কাছে নেতিবাচক হিসেবে উত্থাপন  করি। আমরা কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই মালিক পক্ষের রোষানল হতে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারি। চাকরিচ্যুত শ্রমিকের বেতন নিয়ে আমি বা কোম্পানী কেন গড়িমসি করবো? আপনার কোম্পানীর মুনাফায় কি এই শ্রমিকের কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না?  যদি থেকে থাকে তো তা ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তির কাছে উত্থাপন করুন, তাদের বোঝান যে, সে তার প্রাপ্য চাচ্ছেন, কোন অনুদান বা অনুকম্পার টাকা তাকে দিতে হবে না।

আমাদের দেশের প্রচলিত শ্রম আইন মোতাবেক একজন  শ্রমিক বিভিন্ন কারনে তার চাকরী থেকে বিছিন্ন হতে পারেন, তবে যে সব কারন আমাদের দেশের প্রচলিত শ্রম আইনে উল্লেখ আছে তা হলো যথাক্রমে;  শ্রমিকদের স্বেচ্ছায় চাকরী ত্যাগ, মালিক কর্তৃক চাকরিচ্যুতি, কর্ম দক্ষতা কমে যাওয়া, শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা, শ্রমিকের সংখ্যার হ্রাসকরন, বয়সসীমা অতিক্রম, মৃত্যুজনীত কারন ও শৃঙ্খলা বিরোধী কাজের জন্য। এসব কারনে একজন শ্রমিক কোম্পানী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন।  আইনানুযায়ী সু নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে যে কোন একজন শ্রমিক কোম্পানী থেকে বের হতে পারেন। কিন্তু শ্রমিক এর পক্ষ থেকে কোন প্রকার সমস্যা না থাকলেও বা এসব নিয়ম কানুনের সব অনুসরণ করার পরেও দেখা যায় তারা তাদের প্রাপ্য সময় মত পান না।

আসুন আমরা আমাদের জব সেপারেশন এর ধাপগুলি ব্যাখ্যা করি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা অন্ধত্বের পরিচয় দিই তা পর্যালোচনা করি। আমি বলছি না যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ কারখানায় এ সকল নন-কমপ্লায়েন্স প্র্যাক্টিস চলছে, তবে যে পরিমাণ আইনের অবহেলা বা অপব্যবহার চলছে তা নেহাতই কম নয়।

১.১ পদত্যাগ (Resignation) ধারা –২৭: চাকরী পরিসমাপ্তির যে প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে একজন শ্রমিক স্বেচ্ছায় প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি ছেড়ে প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে সে প্রক্রিয়াকে পদত্যাগ বলে। আমাদের দেশের শ্রম আইনানুযায়ী পদত্যাগী শ্রমিকের চুড়ান্ত পাওনা নিষ্পত্তির জন্য আমরা তাদের তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করতে পারি। যা যথাক্রমে;

ক) ৫ বছরের কম বয়সি শ্রমিক।

খ) ৫ বছরের বেশি কিন্তু দশ বছরের কম বয়সি শ্রমিক। এবং

গ) যে সকল শ্রমিকগন অবিছিন্নভাবে ১০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন।

প্রচলিত আইনানুযায়ী পদত্যাগীদের প্রাপ্য;

বছরের কম বয়সি শ্রমিক:

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শর্তানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

বছরের বেশি কিন্তু দশ বছরের কম বয়সি শ্রমিক:

  • এক্ষেত্রে উপরিউক্ত প্রাপ্যর থেকে শুধু মাত্র শ্রমিকের প্রত্যেক সম্পূর্ন বছরের জন্য ক্ষতিপুরণ বাবদ ১৪ দিন হারে মজুরী (মজুরী বলতে মুল বেতন বা বেসিককে বোঝানো হয়েছে) অথবা গ্রাচ্যুইটি যদি থাকে যেটা বেশি সেটা প্রদান করতে হবে।

১০ বছর বা তারও অধিক বয়সী শ্রমিক:

  • এক্ষেত্রে উপরিউক্ত প্রাপ্যর থেকে শুধু মাত্র শ্রমিকের প্রত্যেক সম্পূর্ন বছরের জন্য ক্ষতিপুরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী (মজুরী বলতে মুল বেতন বা বেসিককে বোঝানো হয়েছে) অথবা গ্রাচ্যুইটি যদি থাকে যেটা বেশি সেটা প্রদান করতে হবে।

১.২ বরখাস্ত  (Dismissal) ধারা –২৩():

বরখাস্তের অর্থ হচ্ছে অসাদাচরণের কারনে মালিক কর্তৃক কোন শ্রমিকের চাকরীর অবসান। যার সুস্পষ্ট সঙ্গা বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২ এর উপধারা ৩৯ এ বিদ্যমান।

এখন আমাদের জানা প্রয়োজন অসাদাচরণ কি?   এবং শ্রমিকদেরও নানা ভাবে এসকল অসাদাচরণ এর ব্যপারে জানা থাকতে হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী অসাদাচরণ বলতে সাধারণত নিচের কাজ গুলিকে বোঝায়;

(ক) উপরস্থের কোন আইনসংগত বা যুক্তিসংগত আদেশ মানার ক্ষেত্রে এককভাবে বা অন্যের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হইয়া ইচ্ছাকৃতভাবে অবাধ্যতা;
(খ) মালিকের ব্যবসা বা সম্পত্তি সম্পর্কে চুরি, প্রতারণা বা অসাধুতা;
(গ) মালিকের অধীন তাঁহার বা অন্য কোন শ্রমিকের চাকুরী সংক্রান্ত ব্যাপারে ঘুষ গ্রহণ বা প্রদান;
(ঘ) বিনা ছুটিতে অভ্যাসগত অনুপস্থিতি অথবা ছুটি না নিয়া এক সঙ্গে দশ দিনের অধিক সময় অনুপস্থিতি;
(ঙ) অভ্যাসগত বিলম্বে উপস্থিতি;
(চ) প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য কোন আইন, বিধি বা প্রবিধানের অভ্যাসগত লঙ্ঘন;
(ছ) প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃংখলতা, দাংগা-হাংগামা, অগ্নিসংযোগ বা ভাংচুর;
(জ) কাজে-কর্মে অভ্যাসগত গাফিলতি;
(ঝ) প্রধান পরিদর্শক কর্তৃক অনুমোদিত চাকুরী সংক্রান্ত, শৃঙ্খলা বা আচরণসহ, যে কোন বিধির অভ্যাসগত লঙ্ঘন;
(ঞ) মালিকের অফিসিয়াল রেকর্ডের রদবদল, জালকরণ, অন্যায় পরিবর্তন, উহার ক্ষতিকরণ বা উহা হারাইয়া ফেলা।

 

কোন শ্রমিক কে নিয়োগ প্রদানের পরে আমাদে অবশ্যই তাদের এসকল মিসকন্ডাক্ট গুলির সমন্বয়ে একটি কর্মশালা করতে হবে।  কোন একজনকে নিয়োগ প্রদান করেই তাকে আপনি কিছু দিন পরে কোম্পানী থেকে অসাদাচরণের দায়ে বের করে দিলে সেখানে আপনার ব্যর্থতা একটি বড় প্রশ্ন হয় দাঁড়াবে।  তবে হ্যা আপনি যদি এসব অসাদচরণের বিষয় নিয়ে কোন  প্রয়োজনীয় আলোচনা, সেমিনার বা ওরিয়েন্টেশন করে থাকেন, আর শ্রমিক যদি এ আইন অমান্য করেন তবেই আপনি এ আইন শ্রমিকের প্রতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

প্রচলিত আইনানুযায়ী বরখাস্তকারী শ্রমিকদের  প্রাপ্য ;

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শর্তানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • বরখাস্তকারী শ্রমিকের চাকরীর বয়স ন্যুনতম এক বছর হলে প্রত্যেক সম্পূর্ন বছরের জন্য ক্ষতিপুরণ বাবদ ১৪ দিন হারে মজুরী (মজুরী বলতে মুল বেতন বা বেসিককে বোঝানো হয়েছে) অথবা গ্রাচ্যুইটি যদি থাকে যেটা বেশি সেটা প্রদান করতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, মালিকের ব্যবসা বা সম্পত্তি সম্পর্কে চুরি, প্রতারণা বা অসাধুতার দায়ে বরখাস্ত হলে শ্রমিক কোন ক্ষতিপূরণ পাবেন না।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

১.৩  অপসারণ  (Removal) ধারা –২৩ ()ক:

অপসারণ অর্থ অসদাচরণের কারনে মালিক কর্তৃক লঘু শাস্তির আওতায় কোন শ্রমিকের চাকরীর পরিসমাপ্তি (বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২৩ )।

অপসারণ বরখাস্তের থেকে সামান্য শব্দগত পার্থক্য ও সামাজিক সন্মান গত র্পাথক্য ছাড়া আর কিছুই না। আমরা শুধুমাত্র তাদেরকেই অপসারণের আওতায় আনতে পারব, যে শ্রমিকের বিরুদ্ধে লিখিত আকারে অভিযোগ উত্থাপিত হবে এবং যাকে অভিযোগের জবাব প্রদানের জন্য নু্ন্যতম ৭ কর্মদিবস সময় দেয়া হবে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের শুনানীর ব্যবস্থা করতে হবে। অভিযুক্ত শ্রমিক তার বিরুদ্ধে  আনীত অভিযোগের কোন জবাব প্রদান না করলেও বা তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ / দোষ স্বীকার না করলেও তাকে অপসারণের বা কাজে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।  অভিযোগ পত্রে আনীত অভিযোগের সত্যতা নিরুপণ করতে হবে। তদন্ত কমিটির নিরুপিত রির্পোটে সত্যতার ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি স্বরুপ অপসারন করা যেতে পারে।

প্রচলিত আইনানুযায়ী অপসারীত শ্রমিকদের  প্রাপ্য;

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শতানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • বরখাস্তকারী শ্রমিকের চাকরীর বয়স ন্যুনতম এক বছর হলে প্রত্যেক সম্পূর্ন বছরের জন্য ক্ষতিপুরণ বাবদ ১৪ দিন হারে মজুরী (মজুরী বলতে মুল বেতন বা বেসিককে বোঝানো হয়েছে) অথবা গ্রাচ্যুইটি যদি থাকে যেটা বেশি সেটা প্রদান করতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, মালিকের ব্যবসা বা সম্পত্তি সম্পর্কে চুরি, প্রতারণা বা অসাধুতার দায়ে বরখাস্ত হলে শ্রমিক কোন ক্ষতিপূরণ পাবেন না।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

 

১.৪  অবসান  (Termination) ধারা –২৬:

প্রতিষ্ঠান থেকে মালিক কোন কারন বা ব্যাখ্যা ছাড়া যদি কোন  শ্রমিকের চাকরীচ্যুত বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করান তবে তাকে অবসান বলা হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে অবসান কোন শাস্তি নয়, এর জন্য শ্রমিকের বিরুদ্ধে কোন প্রকার অভিযোগ উত্থ্যাপন করা যাবে না।  অবসান শুধু মাত্র মালিকের একক আইনগত সিদ্ধান্ত। অবসানের বিপক্ষে শ্রমিক শ্রম আদালতে কোন প্রকার মামলা দায়ের করতে পারেন না। তবে হ্যা, শ্রমিকের চাকরীর অবসান যদি ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত কোন ইংগিতে (শ্রমিক যদি মনে করেন) বা  তিনি চাকরী হতে অবসানের প্রাপ্ত সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়েছেন মনে করেন তবে তিনি মামলা দায়ের করতে পারবেন।

 

প্রচলিত আইনানুযায়ী অবসানকৃত শ্রমিকদের  প্রাপ্য;

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শতানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • মাসিক মজুরীর ভিত্তিতে নিয়োজিত স্থায়ী শ্রমিককে ১২০ দিনের বা দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরীর ভিত্তিতে ৬০ দিনের, আবার অস্থায়ী শ্রমিক কিন্তু মাসিক মজুরীর ভিত্তিতে ৩০ দিন অথবা অস্থায়ী দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরীর ক্ষেত্রে ১৪ দিনের সময় দিয়ে কর্তৃপক্ষ লিখিত নোটিশ প্রদান করবেন। যদি মালিক বিনা নোটিশে শ্রমিককের চাকুরীর অবসান করতে চান সে ক্ষেত্রে নোটিশের পরিবর্তে নোটিশ মেয়াদের মজুরীর সমপরিমান অর্থ প্রদান করবেন।
  • প্রত্যেক সম্পূর্ন বছর চাকরীর জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী যা বেসিক বা মূল মজুরী বা গ্রাচ্যুইটি যদি প্রদেয় হয়, এদের মধ্যে যেটা অধিক হবে সেটা প্রদান করা। এ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র স্থায়ীদের জন্য প্রযোজ্য হবে।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

 

১.৫  ছাঁটাই (Retrenchment) ধারা -২০:

ছাটাই অর্থ অপ্রয়োজনীয়তার কারনে মালিক কর্তৃক শ্রমিকের চাকরীর অবসান (বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২ এর উপধারা ৩৯)। ছাঁটাই কোন অপরাধ জনিত কারন হতে সৃষ্ট শাস্তি নয়। সাধারণত কোন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের সংখ্যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে সম সাময়িক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য মালিক আর্থিক সুবিধা প্রদান করে অতিরিক্ত শ্রমিককে বা শ্রমিকদের চাকরীচ্যুত করতে পারেন। অবসানের মতো এটা কোন শাস্তি নয় বা এ আইনে কাউকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করতে হলে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপিত হবে না। উপরন্তু; শ্রমিককে দেয়া ছাঁটাই পত্রে অবশ্যই ছাঁটাই য়ের কারন উল্লেখ করতে হবে। ছাঁটাই করতে হলে অবশ্যই কিছু বিষইয় সম্পর্কে সবার জানা জরুরী। যেমন; ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিয়োগ প্রাপ্ত শ্রমিককে প্রথম ছাঁটাই করতে হবে। অথবা; শ্রমিকের চাকরী মেয়াদের পরিসীমার ভিত্তিতে ছাঁটাই করতে হবে। ছাঁটাই এর নোটিশের একটি কপি প্রধান পরিদর্শক বরাবর পাঠাতে হবে। ছাঁটাই করা পদে এক বছরের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগ দিতে হলে, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের মধ্য থেকে শ্রমিকদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করতে হবে।

 

প্রচলিত আইনানুযায়ী ছাটাইকৃত শ্রমিকদের  প্রাপ্য;

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শতানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • ন্যুনতম যে সকল শ্রমিকদের কাজের বয়স ১ বছর পূর্ণ হয়েছে সে সকল শ্রমিকদের ১ মাসের লিখিত নোটিশ প্রদান বা নোটিশের পরিবর্তে ১ মাসের মজুরী প্রদান।
  • ন্যুনতম যে সকল শ্রমিকদের কাজের বয়স ১ বছর পূর্ণ হয়েছে তাদের প্রতি বছর চাকরীর জন্য ক্ষতি পূরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী বা গ্রাচ্যুইটি যদি প্রদেয় হয়, এদের মধ্যে যেটা অধিক হবে সেটা প্রদান করতে হবে।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

 

১.৬  ডিসচার্জ (Discharge) ধারা –২২:

ডিসচার্জ অর্থ শারিরীক বা মানসিক অক্ষমতার বা ভগ্ন স্বাস্থের কারনে মালিক কর্তৃক কোন শ্রমিকের চাকরীর অবসান। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২ এর উপধারা-১৭)। মনে রাখতে হবে আমরা সাধারণত সে সকল শ্রমিকদের ডিসচার্জ করতে পারব যাদের অসুস্থতার বা ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক কর্তৃক প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করা হয়েছে।  এটা কোন অপরাধ না এবং এজন্য শ্রমিককে কোন প্রকার নোটিশ বা নোটিশের পরিবর্তে কোন আর্থিক সুবিধা প্রদান করতে হবে না।

প্রচলিত আইনানুযায়ী ডিসচার্জপ্রাপ্ত শ্রমিকদের প্রাপ্য;

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শতানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • ন্যুনতম যে সকল শ্রমিকদের কাজের বয়স ১ বছর পূর্ণ হয়েছে তাদের প্রতি বছর চাকরীর জন্য ক্ষতি পূরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী বা গ্রাচ্যুইটি যদি প্রদেয় হয়, এদের মধ্যে যেটা অধিক হবে সেটা প্রদান করতে হবে।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

 

১.৭  মৃত্যুজনিত (Death) ধারা –১৯:

চাকরী সমাপ্তির যে প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অবস্থায় একজন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করলে প্রতিষ্ঠানের সাথে তার সর্ম্পক ছিন্ন হয়, এ প্রক্রিয়াকে মৃত্যুজনিত চাকরীর পরিসমাপ্তি বলে। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের মনোনীত ব্যক্তি বা তার অনুপস্থিতিতে তার আইনানুগ পোষ্যদেরকে মৃত শ্রমিকদের প্রাপ্য যাবতীয় আর্থিক বা অন্য কোন সুবিধা সমূহ প্রদান করতে হবে। এছাড়াও এ প্রক্রিয়া সুন্দর ও সাবলীলভাবে সমাধান করতে অত্যন্ত জরুরী কিছু পদক্ষেপ তাৎক্ষনিক ভাবে নিতে হবে। যেমন;

১. শ্রমিকের মৃত্যুর সংবাদ যথা শীঘ্র ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিকট পৌছাতে হবে।

২. রেজিষ্টার্ড চিকিৎসক দিয়ে মৃত শ্রমিকের মৃত্যুর কারন বিশদাকারে বর্ণনা পূর্বক মৃত্যুর প্রত্যয়ন পত্র সংগ্রহ করতে হবে।

৩. শ্রমিক অবশ্যই বীমা স্কীমের অন্তর্ভক্ত আর তার বীমা দাবি  আদায়ের জন্য বীমা কর্তৃপক্ষের চাহিদানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদান করতে হবে।

 

প্রচলিত আইনানুযায়ী মৃত শ্রমিকদের  প্রাপ্য;

  • প্রথমত তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শতানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • প্রত্যেক সম্পূর্ন বছর চাকরীর জন্য ক্ষতিপুরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী প্রদান করতে হবে।
  • নূন্যতম যাদের চাকরীর বয়স অবিছিন্নভাবে তিন বছর সম্পন্ন হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে প্রতি পূর্ণ বছর বা ৬ মাসের অধিক সময়ের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী বা গ্রাচ্যুইটি যদি প্রদেয় হয়, এদের মধ্যে যেটা অধিক হবে সেটা প্রদান করতে হবে।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।

 

১.৮ অবসর (Retirement) ধারা –২৮:

অবসর গ্রহণ বলতে একজন শ্রমিকের ৬০ বছর র্পূণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠান থেকে বিছিন্ন হওয়াকে বোঝায়। আমাদের দেশে কোন প্রতিষ্ঠানে যদি কউ ২৫ বছর চাকরি র্পূণ করে তাকেও সাধারনত অবসরে পাঠানো হয় (বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২ এর উপধারা-১) । স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রমিককে ২৫ বছর চাকরীর্পূণ সংশ্লিষ্ট তথ্য দিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন পত্র জমা দিতে হবে। বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের সার্ভিস বইয়ে উল্লেখিত জন্ম তারিখ উপযুক্ত প্রমান হিসেবে গন্য হবে। মনে রাখতে হবে যদি ৬০ বছর মোট বয়স বা ২৫ বছর চাকরীর বয়সের পরেও কর্মীকে দিয়ে কাজ করাতে চাইলে অবশ্যই পরবর্তিতে তাকে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।

 

প্রচলিত আইনানুযায়ী অবসরকৃত শ্রমিকদের  প্রাপ্য;

  • প্রথমত তাকে তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • তাকে তার চলতি মাসের যাবতীয় ওভারটাইমের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।
  • নিয়োগের শতানুযায়ী কোন প্রকার বোনাস বা অন্য কোন পাওনা যদি প্রাপ্য থাকে তবে তা পরিশোধ করতে হবে।
  • বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • এক্ষেত্রে উপরিউক্ত প্রাপ্যর থেকে শুধু মাত্র শ্রমিকের প্রত্যেক সম্পূর্ন বছরের জন্য ক্ষতিপুরণ বাবদ ৩০ দিন হারে মজুরী (মজুরী বলতে মুল বেতন বা বেসিককে বোঝানো হয়েছে) অথবা গ্রাচ্যুইটি যদি থাকে যেটা বেশি সেটা প্রদান করতে হবে।
  • প্রফিডেন্ট ফান্ড বা তার ভবিষ্যত তহবীলের প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে।
  • গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্য (যদি কোম্পানীতে এ নীতি প্রচলিত থাকে) পরিশোধ করতে হবে ।
  • তাকে তার সার্ভিস বই ফেরত দিতে হবে।
  • শ্রমিককে একটি জব সার্টিফিকেট বা প্যত্যয়ন পত্র প্রদান করতে হবে।

প্রচলিত আইনের অপ-ব্যবহার এবং বকেয়া প্রদানে বিলম্ব:

যেহেতু চাকরিচ্যুত কর্মী আইনের সকল পন্থা বা নিয়ম কানুন অনুসরন করেই তার পদত্যাগ পত্র বা অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, সেহেতু সে অবশ্যই তার চলতি মাসের বকেয়া বেতন রেগুলার স্যালারী ডেটেই প্রাপ্য হবেন! বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১২৩ ধারায় এ সংক্রান্ত ব্যাপারে স্পষ্ট বলা আছে যে,  চাকরি পরিসমাপ্তির ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে মজুরী ও ওভারটাইম প্রদান করতে হবে।  কিন্তু আমাদের দেশের কতিপয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক সে বৈধতাকে উপেক্ষা করে তার রেগুলার (চলতি সম্পূর্ণ মাসের বেতন সহ অন্যান্য প্রাপ্য বা চুড়ান্ত পাওনা) ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধের চেষ্টা করেন। আর আমরা মানবসম্পদ কর্মীগণ এই ৩০ দিনের দোহাই দিয়ে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের চলতি সম্পূর্ণ মাসের বেতন সহ বকেয়া ওই মেয়াদে দিয়ে থাকি। এমন এমন কিছু কোম্পানী আমাদের এই সেক্টরে আছে যারা এই বকেয়া পরিশোধের মেয়াদ কিভাবে আরো বাড়ানো যায় তা নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগীতা শুরু করেন। এ প্রক্রিয়াকে সে সব কোম্পানীর মানবসম্পদ কর্মীরা নিজেদের পারফরমেন্স এর ইতিবাচক দিক মনে করেন। আমাদের এ ধরনের অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

কোন কোন ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন এবং ওভারটাইমের প্রাপ্য পৃথক পৃথক দিনে প্রদানের অলিখিত নীতি চালু আছে। সে ক্ষেত্রে আরেক দফা চাকরীচ্যুত শ্রমিককে কোম্পানীর সরনাপন্ন হতে হয়। বাৎসরিক ছুটির, প্রফিডেন্ট ফান্ড এর টাকাও একই নিয়মে প্রদান করার প্র্যাক্টিসও আমাদের আরএমজি  সেক্টরে প্রচলিত রয়েছে।

চাকরীচ্যুত শ্রমিকদের প্রতি তাদের চুড়ান্ত বকেয়া পরিশোধের পূর্বে  নানা ভাবে বৈষম্য নীতি  অবলম্বন করার হাজারো ইতিহাস বা প্রমান আমাদের আরএমজি সেক্টরে দেখা যায়। হাসির কথা হচ্ছে এসব বৈষম্যনীতি গুলি কর্মী কোম্পানী থেকে বিছিন্ন হওয়ার পরে থেকেই উজ্জীবিত হয়। এসবের  মধ্যে কিছু আছে যা মোটেই গ্রহনযোগ্য নয় যেমন; চুড়ান্ত পাওনার হিসেব করার সময় আমরা প্রায়ই কিছু অপ্রাসংগিক টাকা কর্তনের বিষয় এখানে উল্লেখ করে থাকি। কর্মীকে দেওয়া ইউনিফর্মের টাকা কর্তন, কর্মীকে লকার চাবি ফেরৎ না দেয়ায় টাকা কর্তন, ফ্লোরে ব্যবহারের জন্য চটি বা জুতা ফেরৎ না দেয়ায় টাকা কর্তন, আইডি কার্ড ফেরৎ না দেয়ায় টাকা কর্তন, মেশিনারীজ নষ্টের জন্য টাকা কর্তন, ইত্যাদি। এসকল কর্তনের  ক্ষেত্রে আমার কোন আপত্তি নাই, আমার আপত্তি অন্য জায়গায়। আমি মনে করি  এ সকল কর্তনের আগে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে এসব জিনিস ব্যবহারে আপনার নীতিটা কেমন ছিল। সেখানে  আপনি কতটা সফল? খোজ নিলে দেখা যাবে যে সব নীতিমালার আওতায় আপনি এসব কর্তন করছেন তা আপনার কারখানায় ফাংশনাল নাই। আপনি ইউনিফর্ম এর জন্য টাকা কাটছেন খোজ নিয়ে দেখেন আপনার ফ্লোরে কতজন শ্রমিক ইউনিফর্ম পড়ছে, কতজন আইডি কার্ড ব্যবহার করছেন, কতজনের লকারের চাবি আছে, আপনাদের দেয়া জুতা কতজন শ্রমিক ব্যবহার করতছে? মোটামুটি আপনার নীতিটি রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে বিলুপ্ত। এ কাহিনী শুধু তাদের জন্য যারা এমন কতর্নে বিশ্বাসী।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যপার হচ্ছে আপনি নিজেই জানেন না যে আপনি কোন আইনের দোহাই দিয়ে এসব কর্তন করছেন! প্রচলিত শ্রম আইনে তো এসব কর্তনের কোন উল্লেখ নাই। হ্যা আপনি এসব কর্তন তখনই করতে  পারবেন যখন আপনি কলকারখানা অধিদপ্তরের আইজি কর্তৃক  এসব সার্ভিস রুলস অনুমোদন নিবেন। এবার খোজ নিয়ে দেখেন এসব রুলস কি আপনি আই জি কর্তৃক অনুমতি নিয়ে করেছেন। বেশিরভাগ সময়ে উত্তর হবে, না। তাহলে আপনার এসব কর্তননের আইনি বৈধতা নেই। আপনি মালিক কে খুশি করার জন্য এ ধরনের অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করেছেন। আপনাকে আমাকে সবাইকে এসব অনিয়ম থেকে বের হয়ে আসতে হবে, আর তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

এখন যদি প্রশ্ন করি ,এত অনিয়মের পরেও প্রতিষ্ঠানের অডিট কিভাবে পাশ হয়? অনেকের মনে এ প্রশ্ন উকি দিতে পারে কিনা? তার জবাবে বলা যায়; আমাদের দেশের কতিপয় র্থাড পার্টি অডিট র্ফাম গুলি ইদানিং লিয়াজো মেইনটেইন করে ক্লায়েন্ট খোঁজেন। র্থাড পার্টিকে ক্লায়েন্ট জোগাড় করে দেয়ার  দায়িত্বে নিয়োজিত এক ধরনের প্রতিষ্ঠান কাজ করেন এসব র্ফামগুলিকে কন্সালটেন্সি র্ফাম বলা হয়। আমি আবারোও বলছি এ ধরনের ফার্ম খুব বেশী নয়। এরা যেকোন অডিট এর আগে প্রতিষ্ঠানে আসেন, মালিক পক্ষকে কিছু সহজ সরল যুক্তি দেন, সব কিছুকে তারা  নিজ দায়িত্বে সমাধান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।  আবার এমন কিছু কন্সালটেন্সি র্ফাম আছে যারা মালিক পক্ষের সামনে আগেই মুলা ঝুলিয়ে রাখেন। মোদ্দাকথা, তারাই সিলেক্ট করেন কোন র্ফাম দিয়ে অডিট করানো হবে। তাদের সিলেকশনে যেহেতু অডিট র্ফাম নির্বাচিত হয় সেহেতু এসব কন্সালটেন্সি র্ফাম এর সাথে অডিট র্ফাম এর সর্ম্পক বুঝতে আশা করি কারো কষ্ট  হবে না! আর এসব সর্ম্পকের কারনে অনেকেই ফাকা মাঠে গোল করছেন, হাজারো ফাইন্ডিংস থাকা সত্বেও এ সকল দিক গুলি কখনো আইন মোতাবেক সমাধান করা সম্ভব হয় না।

অতীতে অহরহ কিন্তু এখনও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান তার সুবিধা মোতাবেক সময়ে চাকরীচ্যুত শ্রমিকদের বেতন বা সুবিধা বা প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করেন। একজন শ্রমিককে তার পাওনা গ্রহণ করতে বহুবার উপেক্ষিত হতে হয়। এমনও আছে যে, অনেকেই কোন এক সময় তাদের এসব প্রাপ্য টাকা আদায়ের আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আবার এমনও আছে যে, বাধ্য হয়ে টাকা আদায়ের জন্য কিছু কিছু শ্রমিক আইনী সহায়তা নেন বা ফেডারেশন এর দারস্থ হন। দেশে বিভিন্ন সময়ে গড়ে ওঠা নামে বেনামে বহু ফেডারেশন বা শ্রমিক সংগঠন আছে যাদের কাজ তিলকে তাল করা। র্অথাৎ ব্যপারটা এমন যে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত পোহায়। চাকরীচ্যুত শ্রমিক আরেক দফা সমস্যার সম্মুখীন হন এসব শ্রমিক সংগঠনের কাছে।  তবে হ্যা কিছু কিছু শ্রমিক সংগঠন আছে যারা মানবতার কল্যানে কাজ করেন। এসব শ্রমিক সংগঠন দিয়ে কাজ হয় না তেমন না। কথিত আছে মুলতঃ এসব সংগঠনের বেশিরভাগই শ্রমিকের সাথে অলিখিত চুক্তি করেন, টাকা আদায়ের পর বিশেষ একটা অংশ এসব শ্রমিক ফেডারেশন দাবি করে থাকেন। বিনিময়ে ফেডারেশন শ্রমিকের পক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে তিলকে তাল বানিয়ে একটি মামলা দাযের করেন। যেখানে প্রাপ্য টাকার চেয়েও কয়েকগুন বেশি অংক দেখানো হয়। কোন এক পর্যায়ে এ মামলায় প্রতিষ্ঠান পক্ষের আইনজীবিরা শুনানীতে অবস্থান করলেও মালিক পক্ষ অনুপস্থিত থাকেন। মূলতঃ মালিক পক্ষের হয়ে আইনজীবিগণ একটা লম্বা সময় মহামান্য আদালত থেকে প্রেয়ার এর মাধ্যমে নেন এবং ততদিনে শ্রমিকের এ টাকার আশা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এখানে আমাদের মত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকেরা কিছুটা আশান্বিত হন বা শ্রমিক অতঃপর প্রতিষ্ঠানের যে কোন মধ্যস্ততাকারীর স্মরনাপন্ন হয় প্রাপ্য টাকা গ্রহনের জন্য। অনেকসময় তারা একপ্রকার মুচলেকা দিয়ে প্রাপ্য টাকা সংগ্রহ করেন।

আশার কথা হলো অতিসম্প্রতি কলকারখানা অধিদপ্তর কর্তৃক এ সমস্যা নিরসনে একটি অভিযোগ কেন্দ্র চালু হয়েছে, কিন্ত প্রচার সংকটে এটার র্কাযকারিতা সম্পর্কে শ্রমিকরা তেমন অবগত নন। শ্রমিকরা এখন অব্দি কলকারখানা অধিদপ্তর এ অবস্থিত সহায়তা কেন্দ্রে যেতেও এই ধরনের তথাকথিত শ্রমিক সংগঠনের স্মরনাপন্ন হচ্ছেন।

সর্বপরি বলা যায় উৎপাদন শিল্প ও গনতন্ত্র রক্ষার স্বর্থেই শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা অতি জরুরী । দেশে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বহু কথা হয়। এ বিষয়ে আইনও রয়েছে। মে দিবস আসলে বিভিন্ন সভা সেমিনার, মিছিল মিটিং হয়। কিন্তু আদৌ কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শ্রমিকদের অধিকার তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।  কর্পোরেট থেকে শুরু করে দিনমজুর সবাই একটি মহল কর্তৃক নিগৃহীত। সে মহলের হাতেই শ্রমিকের ভবিষ্যৎ। সামান্য দোষেও চাকরি হারিয়ে বেকার হতে হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম ১৯১৯ সালে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিক কিছু নীতিমালা গৃহীত হয়। আইএলও কর্তৃক গৃহীত কনভেনশনগুলোর বেশ কিছু বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করলেও সে অনুযায়ী দেশের শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা হয়ে ওঠেনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন থাকলেও তা কার্যকর হয় না। এটার কারণ সরকার আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলা। সবশেষে গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহাম্মেদ এর একটি মন্তব্য দিয়ে শেষ করবো; “শ্রমিক অধিকার কোন দয়া বা করুণা না। এটা একজন শ্রমিকের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার।“ কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। আমাদের বেশিরভাগ মানুষই তাদের অধিকার সম্পর্কে অবগত নন। জানেই না, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের কাছে তার কী অধিকার আছে। সে সম্পর্কে আগে সচেতন হতে হবে। এরপর ন্যায্য অধিকার পাওয়া যাবে, নতুবা নয়।

লেখকঃ ব্যবস্থাপক, মানব সম্পদ, ডিকে গ্লোবাল ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড

https://www.facebook.com/Chandrobindoo

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*