ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ডাইভারসিফিকেশন নিয়ে অপ্রচলিত কথা

ওয়ালিদুর রহমান :

ট্যালেন্ট একুইজিশন, ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ট্যালেন্ট রিটেনশন নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয় আজকাল।

ভারি ভারি থিওরীও রয়েছে এই তিনটি বিষয়কে বুঝতে, এপ্লাই করতে। একটা ভিডিও দেখলাম কাজি আইটির অফিসের। আরেকটা দেখেছি আরেকটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে যেখানে কর্মীরা ভর অফিস আওয়ারে দল বেঁধে মিউজিকের সাথে নাচের একটা স্লট করছে আর বাকিরা দাড়িয়ে মজা করছে।

স্রেফ কাজের ফাঁকে একটু ফান। হয়তো বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খুব অভাবনীয় তবে অসম্ভব নয়।

ট্যালেন্টদের আকৃষ্ট করতে, তাদের সেরাটা আদায় করতে, তাদের ধরে রাখতে, প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের জান লড়িয়ে দেয়া উদ্যম নিংড়ে নিতে কী চাই?

টাকা?

প্রেশার, প্রমোশনের মুলা বা বন্ড?

মর্মবাণী, নাকি অন্যকিছু?

আমার শ্রদ্ধেয় কনসালট্যান্ট, বিশেষজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ক্যারিয়ার এক্সপার্টরা ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তাত্ত্বিক ও মেথোডিকাল জ্ঞান দিতে পারবেন। আমি পারব না কারন আমার ওই লাইনে কোনো বিদ্যা একদমই নেই।

অতি সাধারন পড়াশোনা করে গার্মেন্টসে ঢুকে পড়েছি। সারাক্ষন গার্মেন্টস নিয়েই থাকি। তবে মানুষ ঠেকেও তো শেখে। আমিও একটা জিনিস শিখেছি ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও রিটেনশন নিয়ে।

তা হল, ট্যালেন্ট চিনতে শেখা, কোন প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের ট্যালেন্ট দরকার সেটা ঠিক করে নেয়া, সেই ট্যালেন্টদের মেন্টালিটিকে বুঝতে শেখা ও বোঝার চেষ্টা করা। তবে সব থেকে যা বেশি দরকার তা হল, কর্মীকে মানুষ হিসেবে ট্রিট করতে শেখা, যন্ত্র বা স্রেফ কর্মচারী হিসেবে না। কর্মীকে কোন চোখে দেখা হয়-তার ভিত্তিতেই তাদের সাথে বিহ্যাভিয়র প্যাটার্ন গড়ে ওঠে। কর্মীকে আপন করে নিতে শিখলে, তাকে ওন করতে দিলে সেই নিজের প্রাণের টানে থেকে যায় আর প্রতিষ্ঠানের জন্য জান লড়িয়ে দেয়।

আগে কর্মীকে পার্টনার ভাবুন, কর্মচারী নয়, আপন ভাবুন, আপন করুন, স্রেফ পেইড ওয়ার্কার নয়। ভালবাসার চেয়ে আকর্ষণ বা বড় বাঁধন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। কি ব্যক্তি জীবনে, কি কর্পোরেট এরেনায়।

 

নদীভাঙ্গন এলাকায় কিছু টাউট থাকে যারা ভাঙনের শিকার অসহায় মানুষের ভিটেমাটিসহ সব জিনিসপত্র পানির দরে কেনার ধান্দায় থাকে। তো এক টাউট একবার টাউটারি করে একজন সম্ভ্রান্ত লোকের বাড়ির সব কিনল চাপে ফেলে পানির দামে। সব ভেঙেচুরে তার নিজের ঘরে এনে হাজির করল। রাতে ঘুমাতে গিয়ে দেখে তার ঘুমানোর ঘরে তিনটা কোবরা সাপের ঝাঁপি আর প্রত্যেকটাতে সেইরাম এক সাপ। ওগুলা আগের মালিকের বাড়িতে ছিল। তারে দেখেই ফোস ফোস করতে লাগল। ……অতঃপর……..

সাম্প্রতিককালের বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠান এক্সেঞ্চারকে দেখে আমাদের ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট শেখা উচিৎ। যেসব এইচআর এক্সেঞ্চারের বিপদে পড়া, ঘরভাঙা কিন্তু সুপারস্কিলড প্রোফেশনালদের পানির দরে কেনার চেষ্টা চরিত্র করেছেন তাদের বিশেষভাবে ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট পড়া উচিৎ।

হ্যা, কোয়ালিটি মানুষতো হয়তো পাবেন পানির দরে, তবে ওই কোবরাদেরও সাথে সাথে পাবেন বাই ডিফল্ট। কলা কিনলে খোসাটাও ওই দামেই একসাথে কিনতে হয়। এইচআর ও এমপ্লয়াররা: বছরের পর বছর ডেডিকেটেডলী কাজ করার পর, অন্য সেক্টরে কাজের দক্ষতা হারানো পর, আপনার জন্য রক্ত পানি করে দেবার পর, বুড়া বয়সে যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছেন সেটার কলুষতা হতেই ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্টের পুরো একটা কোর্সের শিক্ষা নিয়ে নেয়া যায়। এরপর ঢ্যাড়া পিটিয়েও বা রশি দিয়ে বেঁধেও আপনার কর্মীদের দীর্ঘকাল আপনার প্রতিষ্ঠানে কাজ করাতে পারবেন না।

“Grow with us and be with us for ever” এই চটকদার বিজ্ঞাপন কেউ খাবে না আর। শুধু “ফেলো কড়ি মাখো তেল” পলিসি হবে।

কেন ভাল চাকুরীজীবীরা অন্যত্র চলে যায়? আপনি যদি ভাল লোক হারাতে থাকেন তাহলে ওই লোক গুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিকে খেয়াল করুন। তার নিকটস্থ কর্মকর্তারাই এর পিছনের বড় কারন।

মার্কস ব্যাকিংহ্যাম এবং ক্যার্ট কফম্যানের মতে, “মানুষ তাদের ব্যবস্থাপককেই ত্যাগ করে কোম্পানি কে নয়।“

বহুকাল আগে একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারকে এইচআর ট্রেইনী হিসেবে নিয়োগ করেছিলাম।

আমার ইচ্ছে ছিল ১০ সদস্যের একটি এইচআর টীম হলে সেখানে যাতে টেক্সটাইলস, মার্চেন্ডাইজ, একাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, ফাইন্যান্স, আইন, এইচআরএম, ইকোনমিকস-অর্থাৎ সবরকমের শিক্ষাগত যোগ্যতার লোকজন থাকেন।

মূল লক্ষ্যটি ছিল, এইচআরকে সবরকম জ্ঞানের একটি কেন্দ্রে পরিনত করা। এইচআরের অন্যতম কাজ ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট, পারফর্ম্যান্স ম্যানেজমেন্ট, স্ট্রাটেজিক ম্যানেজমেন্ট-এগুলো করার জন্য এইচআরে সবরকম মানুষের কম্বিনেশন থাকাটা জরুরী।

মূলত এইচআরকে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যসিক, এথিক্যাল, বিজনেস,  স্ট্রাটেজিক ডিসকোর্স নির্ধারন নিয়ে ম্যানেজমেন্ট ও এক্সিকিউটিভ বডির মধ্যে কাজ করতে হয়।

তো তাদের যদি শুধুমাত্র এইচআরএম এমবিএ বাদে অন্যকোনো বিদ্যার লোক না থাকে বা ওই বিষয়ে ন্যুনতম কোনো ডিপ্লোমাও না থাকে সেক্ষেত্রে তারা হয় আন্দাজে কাজ করবেন কিংবা অন্যদের সাহায্য নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হবেন যেটা তাদের কাজের কোয়ালিটি নষ্ট করবে এবং তাদের বানানো স্ট্রাটেজি হবে বায়াজড।

যদিও আমার সেই প্ল্যান বা ড্রিম অচীরেই বাতিল হয়ে যায় বিভিন্ন কারনে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল ওই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারের ক্যারিয়ার প্ল্যানের ভুল, রং চয়েস, দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর collective disagreement।

আমার যেহেতু সুপন্ডিতদের মতো বড় বড় ডিগ্রি নেই এইচআরে, তাই আমিও বাধ্য ধরে নিয়েছিলাম হয়তো আমারই ভুল যদিও মন হতে ওই স্বপ্নকে কখনোই মুছতে পারিনি। আমি ভাবতে বাধ্য হই, হয়তো এইচআরে সব এইচআরএম ডিগ্রীধারি থাকাটাই বেটার।

কিন্তু সম্প্রতি গুগলের এইচআর প্রধানের একটি ইন্টারভিউ দেখে সেই পুরোনো দুঃখ আবার তাজা হল।

গুগলের এইচআর প্রধান যদি যথেষ্ট কাবেল মানুষ বলে মনে করেন তবে তার বক্তব্যটা হল,

তিনি গুগলের এইচআরে সবরকম শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ডের সমাবেশ করেছেন। যাতে সকল কর্মীদের নিয়ন্ত্রক, ভাগ্য নির্নায়ক, স্ট্রাটেজি প্ল্যানার ও গ্রোথ পার্টনার হিসেবে এইচআর কর্মীরা তাদের সকল ধরনের বিভাগ ও তার কর্মীদের সত্যিকারের পার্টনারিং করতে পারেন।

তো একজন ফাইন্যান্স কর্মীকে সবচেয়ে ভাল কে বুঝবে? আরেকজন ফাইন্যান্স ব্যাক এইচআরই তো? নাকি?

তাছাড়া আরো একটি লজিক আছে এর পেছনে।

প্রতিটি কর্মী যারা মোটামুটি অফিসার লেভেল হতে ম্যানেজার লেভেলে প্রবেশ করেছেন, তাদেরকে তাদের নিজস্ব ডেস্কওয়ার্ক বা এসাইনমেন্ট কমপ্লিট করার পাশাপাশি ম্যানেজারিয়াল রোল পালন করতে হয়। ম্যানেজারিয়াল রোলে তাকে প্রতি পদে পদে নিজের টেকনিক্যাল নলেজকে তার টীমের কাছে কনভার্টিবল জ্ঞানে পরিণত করতে হয়।

আবার প্রতিষ্ঠানের SOP কে কর্মীদের কাছে কনভার্টিবল নলেজে পরিণত করতে হয়। পাশাপাশি তাকে তার অধঃস্তন কর্মীদের জন্য এইচআরের প্রাথমিক কাজগুলোরও প্রতিনিধিত্ব করতে হয় যেমন:-

PMS, স্ট্রাটেজিক প্লানিং, ম্যানপাওয়ার প্লানিং ইত্যাদি।

এখন দেখা যায় প্রায়ই তিনি তার নিজের বা বিভাগের টেকনিক্যাল নলেজের সাথে এইচআর পারসপেকটিভকে লিংক করার যে ম্যানেজারিয়াল স্কিল বা ম্যানপাওয়ার ম্যানেজমেন্ট স্কিল-সেটা করতে পারেন না।

এইজন্যই এইচআরে যদি সবরকম জ্ঞানের সমাবেশ থাকে তখন তাকে দিয়ে খুব সহজেই ওই ম্যানেজার বা লিডারের টেকনিক্যাল নলেজের সাথে প্রতিষ্ঠানের এইচআর পারসপেকটিভকে লিংকিং এর কাজটি খুব সহজে করা যায় কারন তিনি নিজেও ওই টেকনিক্যাল বিষয়ের এক্সপার্ট আর পাশাপাশি তিনি এইচআর এক্সপার্ট যেটা ওই ম্যানেজার সাহেবের ঘাটতি আছে।

তাছাড়া এইচআরে সবরকম মেধার লোক থাকলে এইচআরকে যেকোনো বিভাগ বা কর্মপ্রক্রিয়ার টেকনিক্যাল আসপেক্ট সম্পর্কে জানার বা কিছু করার দরকার হলে তাকে অন্ধের মতো বিভাগীয় প্রধানদের উপর নির্ভর করতে হয় না।

অন্তত বিভাগীয় প্রধানদের ব্যস্ততার সময়ে বা তাদের অসহযোগীতা কিংবা অসৎ উদ্দেশ্য’র কাছে এইচআরকে ব্লাইন্ডলী ভালনারেবল হতে হয় না।

লেখক : এইচআর/এডমিন পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সিলর, লেখক

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*