বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নারীবান্ধব পুরুষতান্ত্রিক

এম. মাহবুব আলম 

(উল্লেখ্য আরএমজি জার্নালে প্রকাশিত সকল লেখা সম্পূর্ণরূপে লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত)

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন – “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর” চিরন্তন সত্য এই বাণী, নারী পুরুষ মিলেই পৃথিবী এ যেন স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এভাবে নারী পুরুষের সমন্বয়ে এগিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে নারীর অবদান যে অনেক বেশী সে কথাও অনস্বীকার্য, তাই এক্ষেত্রে হওয়া উচিৎ এমন “এই পোশাক শিল্পের যা কিছু উন্নতি যা কিছু উত্তরণ, অনেকটা তার করিয়াছে নারী কিছুটা তার নর”। সত্যি তাই, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িত যার মধ্যে কমপক্ষে ২৬/২৭ লক্ষ নারী এটাই তার প্রমাণ। আদিকাল থেকেই চলে আসছে কাপড় সুই সুতা আর সেলাই মানেই নারী, পোশাক শিল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৯/৮০ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু এই পোশাক খাতের রপ্তানির, শুরু থেকেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সম্পৃক্ত হয়েছে এই অভিযাত্রায় এবং বাংলাদেশের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পিছনে এই পোশাক খাতের অবদান যে অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। একটি দেশের রপ্তানি আয়ের শতকরা আশি ভাগ আসে যে খাত থেকে সেই খাতের গুরুত্ব বুঝতে যেমন বিশেষজ্ঞ হতে হয়না তেমনি সেই খাতে যদি ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ  নারীরা কাজ করে তাহলে সেই খাতের অগ্রগতি উন্নতি তথা দেশের এগিয়ে যাওয়ার পিছনেও যে রয়েছে এই নারীদের স্মরণীয় অবদান তাও অস্বীকার করা যায়না, হয়তো কেউ করেওনা, তাইতো তারা পেয়েছে “সেলাই দিদিমণির” মর্যাদা। আবার এই পোশাক শিল্প নারীর সম্মানও বৃদ্ধি করেছে একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় সংগঠন বিজিএমইএ র সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান স্যার এর একটি কথা মনে পরে যায়, বেশ অনেকদিন আগে ওনার একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম পত্রিকায়, উনি বলেছিলেন যে নারায়ণগঞ্জ ওনার কারখানার আশেপাশে পতিতা বৃত্তির সাথে জড়িত কিছু মেয়ে ঘোরাঘুরি করতো, একসময় সেই মেয়েরা তাদের এই পেশা ছেড়ে দিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করতে চাইলো এবং উনি তাদেরকে সেই সুযোগ করে দিলেন, শুরুতে একটু সমস্যা হলেও বেশকিছুদিন পরে সবকিছু ঠিক হয়ে গেলো, তারা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করতে লাগলো আর ফিরে আসলো স্বাভাবিক জীবনে, এটি একটি উদাহরণ মাত্র, এরকম আরো বহু উদাহরণ রয়েছে নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এই পোশাক খাতের। তেমনি নারীদেরও রয়েছে সমান ভূমিকা,অংশগ্রহণ ও অবদান পোশাক খাতের এই অগ্রগতিতে তবে সবকিছুই যে মসৃণভাবে এগিয়ে যায় তা কিন্তু নয়, পোশাক খাতে কাজ করার ক্ষেত্রে নারীকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় অনেক ক্ষেত্রে শুধু নারী বলেই আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের দুর্বলতার কারণেও, এই যেমন পোশাক খাতে প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত ৪০ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে যদি  ২৬/২৭ লক্ষ নারী শ্রমিক হয় তারমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কতজন আছে? এর বাইরেও কারখানায় যাকে স্টাফ বলা হয় সেই সুপারভাইজার থেকে জিএম পর্যন্ত কতজন আছে কারো কাছে সে তথ্য আছে কি? হিসেবে সেটা খুবই নগণ্য, এর কারণ কি? কারণ অনেক, বড়, কারণ হচ্ছে নারী দায়িত্ব নিতে চায়না তাকে টার্গেট দিয়ে প্রোডাকশন করতে বললে সে সঠিকভাবেই করতে পারে কিন্তু দায়িত্ব দিলে অপারগতা প্রকাশ করে যেন এটা অনেক কঠিন কাজ, অনেক শক্তি ক্ষয়ের কাজ, আসলে কি তাই? অল্প কিছুদিন আগে এ বিষয়ে জরিপ করছে এমন একটি সংস্থার সাথে বসার সুযোগ হয়েছিল যেকোন একটি প্রতিষ্ঠানে, কথা বলেছিলাম প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপক, উৎপাদন ব্যবস্থাপক, কোয়ালিটি ব্যবস্থাপক ও কয়েকজন শ্রমিকের সাথে, বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিক অপারেটরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই প্রতিষ্ঠানে যে নারী  স্টাফ বা কর্মকর্তা অনেক কম তার কারণ কি? কেন আপনারা স্টাফ হতে চাচ্ছেন না? বেশীরভাগই বললো , একজন অপারেটর শুধু তার অপারেটিং মেশিনটির টার্গেট পূরণ করে বুঝিয়ে দিতে পারলেই হয় কিন্তু সুপারভাইজার হলেই তার কমপক্ষে ২০/২৫ টা মেশিনের নির্দিষ্ট টার্গেট বুঝিয়ে দিতে হয় যেটা কিছুটা বেশী কষ্টসাধ্য একজন নারীর জন্য। এই মেশিনগুলোর নির্দিষ্ট টার্গেট বের করার জন্য কখনো কখনো উচ্চস্বরে কথা বলতে হয় কারো সাথে রাগান্বিত হতে হয় যা একজন নারীর জন্য কিছুটা কঠিন। কেউ কেউ বললেন একজন নারীকে কারখানার কাজ শেষ করে বাসায় গিয়ে রান্না করতে হয় স্বামী সন্তান পরিবারের লোকদের সময় দিতে হয়। যদি সে সুপারভাইজার/লাইনচীফ হয় তাহলে নির্দিষ্ট কাজের পরেও অনেক সময় ধরে কারখানায় থাকতে হয় হিসেব বুঝিয়ে দেয়া নেয়ার জন্য, যে সময়টা তারা দিতে পারেন না। তাদের কাছে প্রশ্ন ছিলো, “যেহেতু কারখানায় নারী শ্রমিক বেশী তাই তারা যদি সুপারভাইজার/লাইনচীফ হন তাহলে তো সুবিধাই বেশী কেননা একজন নারীই পারেন তাদের সুবিধা অসুবিধা বুঝে নির্দিষ্ট প্রডাকশন বের করতে” কিন্তু প্রত্যুত্তরে তার উল্টো বললেন, “নারীরা নারী নেতৃত্ব মানতে পারেন না, তাদের কথা শুনতে চান না”, কেউ কেউ আবার বললেন কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব দিতে চান না কিংবা তারা ভাবেন তিনি পারবেন না। এর মধ্যে এমনও শ্রমিক ছিলেন যার স্বামী সুপারভাইজার/লাইনচীফ তাদের কাছে প্রশ্ন ছিলো, “আপনার স্বামী পারলে আপনি কেন পারবেন না?”। তাদের উত্তরটা ছিল এমন, একজন স্ত্রীকে সংসারের যত কিছু দেখতে হয় একজন স্বামীকে ততকিছু দেখতে হয়না। এই লেখার উপজীব্য পেতে কথা বলেছিলাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কল্যাণ কর্মকর্তার সাথে, তারা জানালেন তারাও বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে আলাপ করেছেন বেশীরভাগের মতামত এক হলেও কেউ কেউ ভিন্ন মতও প্রকাশ করেছেন যেমন একজন নাকি বলে ফেলেছেন “জানেন ম্যাডাম? সকালে রান্না করে খেয়ে সবার খাবার রেডি করে সারাদিন অফিসে কাজ করে রাতে গিয়ে আবার রান্না করে সবাইকে খাওয়াই আবার ছেলের মাস্টারের নালিশ তাও আমাকেই শুনতে হয়!”। তবে এ বিষয়ে উৎপাদন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের তরফ থেকে তেমন কোন প্রতিবন্ধকতা নেই, তারা পদোন্নতি বা পদায়নের ক্ষেত্রে কখনোই নারীপুরুষ হিসেব করেন না, এটা একটা ভালো দিক।

যেকোন লেখা লিখতে গেলেই নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা চলে আসাই স্বাভাবিক তেমনি কিছু অভিজ্ঞতা, বেশ কিছুদিন আগে একটি কারখানায় একজন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা এবং আমার সাথে পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাকে অনুরোধ করলেন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন লোক দেয়ার জন্য। আমি অনেকের মধ্যে একজনকে সিলেক্ট করে পাঠালাম ইন্টার্ভিউর জন্য এবং বলে দিলাম সমস্যা হলে আমি দেখবো, যাই হোক ইন্টার্ভিউ ভালো হলো বেতনেও সামঞ্জস্য আছে কিন্তু বাধ সাধলেন এমডি সাহেব, তিনি বললেন নারী কর্মকর্তা নিলে সমস্যা হবে অনেকসময় বায়ারের সাথে মিটিং এ যেতে হয় বিভিন্ন বায়িং হাউজে সেটি আমার জন্য একটু সমস্যার এবং অতঃপর আরোও কিছু সমস্যার কথা  বললেন যা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।

অল্প কিছুদিন আগে কয়েকটি এনজিও বা সংস্থা একটা জরীপ প্রকাশ করেছিলো যে, বাংলাদেশে পোশাক খাতে নিয়োজিত ৮০% নারী যৌন/মানসিক হয়রানির স্বীকার, এটি প্রকাশিত হওয়ার পরে বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিবাদ ও নিন্দা করা হয়েছে, আমি নিজেও এর তীব্র প্রতিবাদ করেছি এবং এটা প্রতিবাদ করার বিষয়, প্রতিবাদ করাই উচিৎ কেননা তারা যেভাবে প্রতিবেদন করেছে এবং ফলাও করে প্রচার করেছে সেটা সঠিক হয়নি মর্মে অনেকেই মনে করেন কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেউ কি বলতে পারবেন এ ধরণের ঘটনা বা এই যৌন নির্যাতনের ঘটনা একদমই ঘটছেনা? অন্তত ১০%ও ঘটছেনা?

অবশ্যই ঘটছে,তাহলে এটি এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় আছে কি? এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন ঘটছে? কথা স্পষ্ট শুধু পুরুষের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, পুরুষতান্ত্রিক আচরণ এবং নারীকে দুর্বল ভাবাই এর কারণ। লেখাটি লিখতে গিয়ে অনেকের সাথেই কথা বলেছি বিশেষ করে বেশ কয়েকজন কল্যাণ কর্মকর্তা এবং নারী কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি, একজন সেদিন বললো “স্যার জানেন? যেদিন একটু পরিপাটি হয়ে আসি বা সেজেগুজে আসি সেদিনতো ওমুক ম্যানেজার ওমুক জিএম রুমের সামনেই মনে হয় দাঁড়িয়ে থাকে – শুধুই হাসি”, এই লেখার মধ্যেই একজন নারী কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা চাকরীর জন্য ফোন দিলো “স্যার হঠাৎ করে চাকরী চলে গিয়েছে চাকরী দরকার” বললাম চেষ্টা করবো, দুয়েক জায়গায় পাঠালাম ইন্টার্ভিউর জন্য, কয়েকদিন যোগাযোগ নেই হঠাৎ একদিন ফোন দিলো “স্যার কিছু করলেন না?” বললাম আমিতো ভেবেছি আপনি কোথাও যোগদান করেছেন, বললো “স্যার যোগদান করেছিলাম কিন্তু সমস্যা আছে” কি সমস্যা জিজ্ঞেস করায় উত্তর শুনে শুধুই মনঃক্ষুণ্ণ হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিলোনা, প্রশ্ন একটাই কেন আমরা এই আমাদের এহেন অধঃপতন? তবে সেই নারী কর্মকর্তার একটি কথা শুনে খুবই আশ্চর্য ও হতবিহব্বল হয়েছিলাম, বহুবার ভেবেছি কেন আমরা এমন? কথাটি ছিলো “স্যার একজন পুরুষ কাজ করলেই চলে কিন্তু একজন নারী শুধু কাজ করলেই চলেনা!!!”, সুকান্ত ভট্রাচার্যের বাংলাদেশ নামে কবিতার একটি পঙতি ছিলো এমন “সাবাস বাংলাদেশ, পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়”।  পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয় বাংলাদেশকে দেখে আর আমরা অবাক তাকিয়ে থাকি এসব ঘটনা আর কাহিনী শুনে। কোন কোন বড় বড় কর্মকর্তার আবার চাকরী দেয়ার নামে অনৈতিক প্রস্তাবের কথাও শোনা যায়।

এসবের সাথে জড়িতরা সংখ্যায় একেবারেই নগণ্য কিন্তু তাদের কারণেই প্রশ্ন জেগেছে আজ কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তার, প্রশ্ন জেগেছে পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার, শুধুই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে আপনিওতো কোন না কোন মায়ের সন্তান, আপনিওতো কোন না কোন মেয়ের ভাই, আপনিওতো কারো না কারো স্বামী, আপনিওতো কোন মেয়ের পিতা তাহলে আপনি কেন ভাবতে পারছেন না ঐ নারী কর্মীও আপনার বোন আপনার মেয়ে, সেকথা না হয় বাদই দিলাম কেন আপনি তাকে ভাবছেন সে একজন নারী! কেন আপনি ভাবছেন না সে আপনার সহকর্মী শুধুই সহকর্মী।

তাই পরিশেষে শুধু নারীদেরকে বলবো আপনাদের কেউ জোর করে দায়িত্ব দিবে সেই চিন্তা আপনি বাদ দেন, আপনি দূর্বল আপনি পারবেন না সেকথাও আপনি ভুলে যান,গাড়ির আসনে আপনার জন্য আলাদা আসন থাকতে হবে, ব্যাংকের লাইনে আপনার জন্য আলাদা সারি থাকতে হবে, সর্বত্র আপনার জন্য আলাদা কোটা থাকতে হবে, এই চিন্তাচেতনা ভুলে যান। যতদিন এই  মনোবৃত্তি আপনার থাকবে ক্ষমতায়ন তো দূরে থাক এগিয়ে যাওয়া তো ভালো আপনি শুধু পিছিয়েই থাকবেন আর পিছিয়েই যাবেন।

আর সবাইকে বলবো কর্মক্ষেত্রে নারীকে নারী না ভেবে সহকর্মী ভাবুন, আর নারী বলে পারবেনা কথাটি ভুলে যান। আমাদের সরকার প্রধান থেকে শুরু করে অনেক উচ্চ পর্যায়ে নারীরা রয়েছেন। তারা প্রমান করেছেন তাদের সক্ষমতা। স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদেরকে একত্রে কাজ করতে হবে, নারীর প্রতি মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাদের ক্ষমতায়নে সহযোগী হতে হবে।

লেখক –  ম্যানেজার ( মানব সম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগ) ইউনিফর্ম টেক্সটাইল লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*