প্রচলিত আইন নিয়ে কিছু দ্বিধা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মোহাম্মদ মঈনুল হক ঠাকুর

(উল্লেখ্য আরএমজি জার্নালে প্রকাশিত সকল লেখা সম্পূর্ণরূপে লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত)

একজন ইউরোপিয়ান ক্রেতা মজার ছলে আমাকে বলেছিলেন যে তোমাদের দেশে স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে এত আইনের প্রচলন রয়েছে যে তা আমাদের দ্বিধান্নিত করে”।

দেশের প্রচলিত আইনের কিছু বিষয় নিয়ে আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাই, ধরে নিন যে এগুলোর বিষয়ে আমি সঠিক হিসেব মেলাতে পারিনা।

১.সাপ্তাহিক ছুটি সরকারি চাকুরিজীবি এবং ব্যাংক কর্মজীবীগণ পান দুইদিন, আর গার্মেন্টস কর্মীগণ পান একদিন।

২.সকল সরকারি চাকুরিজীবিগণ সরকার নির্ধারিত সকল ছুটি ভোগ করবার অধিকার রাখে, কিন্তু গার্মেন্টস এর ক্ষেত্রে তা ১১ দিন কেন?

৩.মার্তৃত্বকালীন ছুটি সরকারি চাকুরিজীবিদের ক্ষেত্রে ৬ মাস আর গার্মেন্টস কর্মীদের ক্ষেত্রে ১১২ দিন।

৪.সরকারি চাকুরিজীবীগণ বছরে তিনটি উৎসব বোনাস পান, আর গার্মেন্টেসে কর্মরতরা পান দুইটি- এর কারন কি?

৫.সরকারি চাকুরিজীবিদের বোনাস এর ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে, কিন্তু গার্মেন্টস এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এমন নিয়ম দেখা যায় না কেন?

৬.সরকারি চাকুরিজীবিদের প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক রয়েছে, গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য তা বাধ্যতামূলক নয় কেন?

আমরা সকলেই জানি যে, গামের্ন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে যখন মনে প্রশ্ন আসে, স্বাভাবিকভাবেই তখন চিন্তা হয় আসলেই কি গার্মেন্টসে কর্মরতরা দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশী অবদান রাখছে, নাকি অন্যরা? (আমি অবশ্যই অন্যদের অবদানকে অবমূল্যায়ন করছিনা, বরং সবার জন্য সমান শ্রদ্ধা রেখেই বলছি) গার্মেন্টসকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার বিষয়ে সরকার এবং মালিক পক্ষের একধরনের উদাসীনতা ক্রেতাদের ভাবিয়ে তুলেছে- এটা যেমন সত্য তেমনি, গার্মেন্টসে কর্মরতরা নিজেদের অবহেলিত মনে করেন। রাষ্ট্রিয়ভাবে যে পক্ষপাত গার্মেন্টস কর্মীদের উপর করা হচ্ছে তার ফল স্বরূপ গার্মেন্টস কর্মীগণ আজ সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও  অবমূল্যায়িত।

সরকার গার্মেন্টস মালিকদের নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার, কিন্ত সরকারকে অবশ্যই গার্মেন্টসে কর্মরত সকল শ্রেনীকে (শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মর্কতা) নিয়ে ভাবতে হবে। পিঠ সোজা রাখতে মেরুদন্ডের যত নেয়া যেমন জরুরী, তেমনি অর্থনীতি সচল রাখতে গার্মেন্টস কর্মীদেরও যত্ন নিতে হবে।

আমি ধিক্কার জানাই সেই সকল গার্মেন্টস কর্মকর্তাদের যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মালিকদের বা যেসব মালিকরা শ্রমিকদের জন্য ভাল/আইন মোতাবেক কিছু করতে চায়, তাদের ভুল বুঝিয়ে কর্মীদের নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছেন শুধু মাত্র মালিকদের কাছে ”ভাল” মূল্যায়ন পাওয়ার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, যদি সরকার এবং মালিকগণ আইনে উল্লেখিত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন তাহলে কোন অবস্থাতেই কর্মী অসন্তোষ তৈরী হবেনা। যেমনঃ

ক) অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কর্মীগণ সাপ্তাহিক ছুটিতো পানই না, বরং সাপ্তাহিক বন্ধে কাজ করলে যে সুবিধা/ক্ষতিপূরণের কথা আইনে বলা আছে সেটাও দেয়া হয় না।

খ) অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও আছে যারা মার্তৃত্বকালিন সুবিধা প্রদান করেন না বা আংশিক প্রদান করেন। অনেকে আবার সেটা শুধু অডিট পাশ করার জন্য নকল দলিল তৈরী করেন। আর নিয়োগকালীন গর্ভাবস্থা পরীক্ষার  কথাতো বহুল প্রচলিত নিয়মিত অনিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ) আমার পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান, যারা দাবি করে যে তারা ১০০% বার্ষিক ছুটি প্রদান করেন। আসল কথা হল, তারা শ্রমিকদের জোরপূর্বক (শ্রমিক স্বেচ্ছায় আবেদন করেনা) ছুটি প্রদান করেন যাতে ছুটির টাকা প্রদান করতে না হয়।

ঘ) আমাদের এই গার্মেন্টস শিল্পের অন্যতম প্রধান সমস্যা হল ”চাকুরির অনিশ্চয়তা”। যখন তখন মালিক পক্ষ যৌক্তিক বা অযৌক্তিক কারনে নিয়ম না মেনে কর্মী বিদায় করে দেন। অবশ্যই মালিক কর্মী বাদ দেয়ার অধিকার রাখেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই তার প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করা উচিত।

এখনও অনেক অনেক গার্মেন্টস আছে যাদের ”কমপ্লায়েন্স” কার্যক্রম শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এখনও অনেক কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তিদের বলতে শুনি ”অডিটের সময় সব ঠিক করে রাখা হবে”।

আমরা অনেকেই এ্যাকর্ড ও এলায়েন্স এর কার্যক্রম বিরোধি। হ্যাঁ, আমি মানছি এর পেছনে এ্যাকর্ড ও এলায়েন্স এর কিছু অপতৎপরতাই দায়ি। কিন্তু এখন একটু লক্ষ্য করুন গার্মেন্টস কারখানাগুলোর দিকে- এ্যাকর্ড ও এলায়েন্স এর কার্যক্রম প্রায় বন্ধের পর্যায়ে থাকার সুযোগ নিচ্ছি আমরা প্রায় অনেকেই। নিরাপত্তার যে নির্দেশনা এ্যাকর্ড ও এলায়েন্স এর কাছ থেকে পেয়ে আমরা পালন করছিলাম যেগুলো নানান অযুহাতে প্রায় স্থবির অনেক কারখানাতেই। এই কথাগুলো চিন্তা করলে আবারও ”রানা প্লাজা”র চিত্র চোখের সামনে চলে আসে। সেই সাথে এ্যাকর্ড ও এলায়েন্স এর প্রয়োজনীতার কথা তা মনে করিয়ে দেয়।

প্রতি ৪/৫ বছর পর পর নতুন মজুরি নির্ধারন যেমন জরুরি, তেমনিভাবে সরকারকে দ্রব্যমূল্য ও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রনে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা লক্ষ্য করি যে, মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দ্রব্যমূল্য ও বাড়িভাড়া লাগামহীনভাবে র্উদ্ধমূখী হয়। এতে করে বর্ধিত মজুরি কর্মীদের জন্য আরও মাথা ব্যাথার কারন হয়ে দাড়াঁয়। মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো যত আন্দোলন করেন তার ছিঁটেফোঁটাও যদি তারা দ্রব্যমূল্য ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে করতেন তাহলে হয়ত কিছুটা উপকৃত হত আমাদের কর্মীবাহিনী।

দেশে অনেক গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান আছে যারা শ্রমিক ইউনিয়নের রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকে প্রায় বন্ধের পর্যায়ে, আবার অনেকে আবার ইউনিয়নের জাঁতাকলে ভুগছেন। একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে অনেকগুলো কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া। কেমন হবে যদি একের পর এক যদি কারখানা বন্ধ হতে থাকে, কারখানাগুলো যদি কর্মী ছাঁটাই শুরু করেন, নতুন নিয়োগ যদি বন্ধ হতে থাকে? পাশাপাশি কোন শ্রমিক ইউনিয়নকে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস এর বাইরে অন্য কোন শিল্পের (মটর কারখানা, ষ্টিল মিল, গ্লাস/সিরামিক কারখানা, শিপ কারখানা) অনিয়ম নিয়ে কোন আন্দোলন করতে দেখিনা। না-কি শ্রম আইন শুধু রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস এর জন্য প্রযোজ্য? দেশে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার আছেন, অনেক উচ্চশিক্ষিত আছেন যারা সর্বসাকুল্যে বেতন পান ১০ হাজার টাকা। আমি নিশ্চিত নই, তবে শুনেছি যে বেশীরভাগ শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাই নাকি কর্মজীবনে শ্রমিক ছিলেন না। যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলেতো তারা শ্রমিকদের না জেনেই বা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে শুধু যে শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে তা নয় দেশকেও বরন করতে হবে এক ভয়াবহ পরিণতি। শ্রমিকদেরও এগুলো বুঝতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সকল সমস্যার সমাধানই করা সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস।

এত কিছুর পরেও যে আমরা পিছিয়ে আছি সেটা বলা যাবেনা। বরং অনেক ভালভাবেই আমাদের এই শিল্প সুনামের সাথে বিশ্বের দরবারে টিকে আছে। আমাদের দেশেই আছে সর্বোচ্চ সংখ্যক পরিবেশ বান্ধব কারখানা, এ্যাকর্ড ও এলায়েন্স এর তথ্য মোতাবেক আমাদের কারখানাগুলো বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ কারখানা। আমাদের গার্মেন্টস মালিকগনরাই প্রডাকশন কম হবে জেনেও কর্মীদের উন্নয়নে নানন পদক্ষেপ নেন- যেমনঃ স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মশালা, নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মশালা। আমাদের গার্মেন্টস মালিকগনরাই শ্রমিকদের আইনের বাইরেও বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করেন।

সর্বশেষে আমি একটি কথাই বলতে চাই, আমাদের অর্থনীতির এই মূল চালিকা শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার ও মালিকপক্ষকে কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে সচেতন হতে হবে, অন্যদিকে শ্রমিক ইউনিয়ন ও শ্রমিকদেরও বিভিন্ন অনিশ্চয়তার বিষয়ে ভাবতে হবে।

লেখকঃ ম্যানেজার, এডমিন এন্ড কমপ্লায়েন্স, টেড বার্ণহার্জ ইন্ডাষ্ট্রী লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*