গুজবঃ পোষাক শিল্পের এক ভয়ানক মহামারী

মীর আলতাফ হোসেন সিপন

গুজব ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে এর পরিণাম এত ব্যাপক ও ভয়াবহ হয় যা কল্পনাও করা যায়না। আর এ শব্দটির মোক্ষম প্রয়োগ যদি বাংলাদেশের তৈরী পোষাক শিল্পে করা যায় তাহলে যেন এর ষোলকলাই পূর্ণ হয়।

 

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নিজ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য পরাজিত মানুষগুলো এটির আশ্রয় নিয়ে থাকে আবার কেউ কেউ দুষ্টুমীর ছলে এটিকে রং মাখিয়ে উপস্থাপন করে এবং সমষ্ঠিগতভাবে এটি শুরু হয় এবং ভয়ানক পরিণতিতে তা শেষ হয়।

 

আমরা প্রায়ই পত্রিকা, টিভি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গুজবের ঘটনাগুলো দেখি, পড়ি এবং এর পরিণাম সম্বন্ধেও অবগত হই, আবার ভুলে যাই। কিন্তু এ ব্যাপারে নিজেরা সচেতন হইনা বা কাউকে সচেতন করিনা, আর তাইতো চিলে কান নেওয়ার ঘটনা বারবার ঘটে।

 

গত ০৮/১১/২০১৮ ইং তারিখে চট্টগ্রামের কেইপিজেডের সনামধন্য ও শতভাগ কমপ্লায়েন্ট একটি পোষাক কারখানায় সামান্য একটি ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে কারখানা ভাংচুর থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চাকুরী হারানো এবং সে কারখানার দীর্ঘদিনের সুনাম এক মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল।

কারখানাটিতে গুজব ছড়ানো হয় যে, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কারখানার কয়েকজন শ্রমিককে মেরে ফেলেছে, যদিও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ন বিপরীত ।

একদিন এক গুজব শুনে খোদ আমিও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হই! চট্টগ্রামের একটি কারখানা থেকে খবর আসে কালুরঘাট ব্রীজ করার সময় সেখানে বেশ কিছু মানুষের মাথা লাগবে এবং সরকার বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের মাথা দেওয়ার জন্য কারখানার মালিকদের সাথে গোপনে চুক্তি করেছে! এই অভিযোগে শ্রমিকরা আতংকগ্রস্ত হয়ে কেউ কেউ কারখানাটি থেকে চাকুরী ছেড়ে চলে যাচ্ছে আর কেউবা কারখানায় আসছেনা, বিষয়টি মূহুর্তেই আশেপাশের কারখানাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়লে সবগুলো কারখানা কয়েকদিন বন্ধ করে রাখতে হয়।

অন্য আরেকটি কারখানায় এক শ্রমিক টয়লেট থেকে ফ্লোরে এসে ভুত/জ্বীন বা অশরীরী আত্মা দেখেছে বলে অজ্ঞান হয়ে যায়, ব্যস মুহুর্তেই বাতাসের থেকেও দ্রুত খবরটি ছড়িয়ে গেলে জরুরী শিপমেন্ট এর মালামাল ফ্লোরে রেখে সবাই কারখানা ছাড়তে থাকে, পরে মালিক-বিজিএমইএ ও অন্যান্যদের মধ্যস্থতায় কয়েকদিন পরে মিলাদ পড়িয়ে কারখানাটি চালু হলেও এখন শ্রমিকরা কারখানাটি অন্যের কাছে পরিচয় করান “ভুতে ধরা গার্মেন্টস” বলে।

অথচ প্রতি মাসে বেতনের বিনিময়ে কাজ করা শ্রমিকরা মালিকের জরুরী শিপমেন্ট বা তার আর্থিক ক্ষতির কথা এক মূহুর্তও চিন্তা করার সময় পাননি!সব শ্রমিকতো এমন মানসিকতার অধিকারী নন!

পোষাক কারখানা গুলোতে যেহেতু শ্রমিকের সংখ্যা অন্যান্য যে কোন সেক্টর থেকে বেশী তাই এ সেক্টরে স্বার্থান্বেষী মহল গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লোটার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে তাই শ্রমিকদের সজাগ থাকতে হবে যে, তিনি প্রতিদিন যে কারখানাকে ভালবেসে দিনের পুরোটা সময় কাজে মশগুল থাকেন, ছোট্ট একটি গুজবে যেন সে কারখানাটির ক্ষতি সাধিত না হয়! যে কোন বিষয় যাচাই না করে গুজবে যেন আমরা বিশ্বাস না করি।

পোষাক মালিক ও দায়িত্বরত কর্মকর্তাদেরও সচেতন থেকে এ ধরনের বিষয়গুলো সঠিকভাবে সমাধান করার জন্য আগাম ব্যবস্থা নিয়ে রাখতে হবে, কারণ দেশী বিদেশী হায়েনা চক্র এ দেশের পোষাক শিল্পকে আগেও যেমন ধ্বংস করতে চেয়েছিল এখনও তারা শিল্পটিকে ধ্বংস করতে ওঁৎপেতে সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

লেখকঃ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক, স্টীচটোন এ্যাপারেলস লিঃ, চট্টগ্রাম।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*