ফ্যাক্টরীতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ক্ষেত্রে বাঁধাসমূহ ও অতিক্রমের সম্ভাব্য উপায়

মোঃ রহমতউল্লাহ

বিভিন্ন বিষয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে বা তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই তা আমাদের সকলের জানা। তবে বাস্তবিক অর্থে এই প্রশিক্ষণ এর গুরুত্ব জানা থাকলেও নানা কারণে তা বাঁধাগ্রস্ত হয়। আর ভুক্তভোগী হয় সে কোম্পানীর এইচআর-কমপ্লায়েন্স বিভাগ। কারণ অডিটের জন্য হলেও তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি পোশাক শিল্প কারখানায় প্রশিক্ষণ প্রদানে কি ধরণের বাধা মোকাবিলা করতে হয় এবং তার সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে কিছু ধারণা নিম্নে প্রদান করা হল।

ফ্যাক্টরীতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ক্ষেত্রে বাঁধাসমূহঃ

১. ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনিহাঃ কিছু কিছু ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মনে করেন যে,  প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে শ্রমিকদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষীত করে তুলে তাদেরকে মালিকদের বিপক্ষে কথা বলার জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

২. প্রশিক্ষণকে বাড়তি ঝামেলা মনে করাঃ যেহেতু প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয় তাই এর জন্য দরকার শ্রমিকদেরকে একত্রিত করে  তার ব্যবস্থা করা। একত্রে ৩০/৪০ কিংবা তার অধিক শ্রমিকের জমায়েত টাকে  ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ  কখনো অত্যন্ত ঝামেলা মনে করেন।

৩. প্রশিক্ষণ কক্ষের ব্যবস্থা না থাকাঃ ১ ও ২ নং কারনের জন্য কোথাও কোথাও  প্রশিক্ষণ কক্ষের ব্যবস্থা থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক।  যদিও কমপ্লায়েন্স বিভাগ  মালিকদের সম্মতিতে প্রশিক্ষণটি    যে কোন জায়গাতেই সম্পাদন করিয়ে নিতে পারে। যেমন dining room,  conference room এমনকি ছাদেও। কিন্তু তা কতটা কার্যকর হয় সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

৪. মিড ম্যানেজমেন্ট এর অদক্ষতাঃ অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া শক্তিশালী না হওয়ার কারণে দক্ষ জনবল নিয়োগ হয় না। আর অনেক ক্ষেত্রে খরচ বাঁচাতে বিভিন্ন বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করা লোকদের দিয়েই একরকম জোড়াতালি দিয়ে বিভাগসমুহকে কে চালানোর ব্যার্থ চেষ্টা করা হয়। এ ধরণের কর্মীরা প্রশিক্ষণ এর গুরুত্ব বুঝবে না এটাই স্বাভাবিক। এমনকি অনেক সময় তারা নিজেরাও নিজের উন্নতি চায় না তাই প্রশিক্ষণের প্রতি কেমন একটা অনীহা থাকে।

৫. উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতাঃ  উৎপাদন বিভাগের কিছু কিছু কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের কারণে উৎপাদন বাঁধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন। দীর্ঘ মেয়াদী লাভ এর চেয়ে তাদের কাছে স্বল্প মেয়াদী ক্ষতি অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ!

৬. শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে সমস্যা সৃষ্টি হবে এই ভয়ঃ দক্ষ শ্রমশক্তি দ্বারা কোম্পানীর যে মুনাফা হবে তা না দেখে অনেকেই মনে করেন যে, প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে এরা শ্রম আইনের খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে জেনে গেলে মালিকদের কাছে তাদের বিভিন্ন ন্যায্য পাওনাদীর জন্য চাপ সৃস্টি করবে এবং আদায় করার চেষ্টা করবে।

৭. শ্রমিকদের প্রশিক্ষনের এর প্রতি অনীহাঃ কিছু শ্রমিকের অক্ষর জ্ঞান না থাকার জন্য, কিছু শ্রমিক তাদেরকে দেয়া উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য, কিছু শ্রমিক তাদের ঊর্ধ্বতনের অনীহার কারণে নিজেরাও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে।

বাঁধাসমূহ অতিক্রম করার উপায়ঃ

১. প্রশিক্ষণ শ্রমিকের অধিকার এই ধারনায় বিশ্বাস রেখে দক্ষ অদক্ষ সকল শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার নিমিত্তে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের  ধারনা পরিবর্তন করতে হবে। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের  ধারনা পরিবর্তনে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। বুঝাতে হবে যে একজন অদক্ষ শ্রমিক যখন দক্ষ হবে তখন তার সমস্ত কার্যক্রম কর্মস্থলের ভালোর জন্যই হবে। কি করলে কর্মস্থলের পরিবেশ উন্নত হবে, কোন কোন কার্যকলাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে তা তাকে একমাত্র প্রশিক্ষণের এর মাধ্যমেই জানানো সম্ভব। আর এই প্রশিক্ষনের মাধ্যমে যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে  মালিক পক্ষই লাভবান হন তা বুঝিয়ে শুনিয়ে অনিহা দূর করা।

২. যখন কোন শ্রমিক তার কর্মস্থলের নিয়ম কানুনগুলো সম্পর্কে যেমন;  পিপিই, নিয়োগ, কর্ম ঘন্টা, ছুটি, অতিরিক্ত কর্মঘন্টা, কর্ম পরিবেশ ইত্যাদি সম্পর্কে দক্ষ হবে তখন তার সমস্ত কার্যকলাপে এর প্রভাব পরবে। আর এতে লাভবান হবে মালিক পক্ষই। তাই বিষয়টিকে ঝামেলা মনে না করে দায়িত্ব বলে মনে করা।

৩. প্রশিক্ষণ এর জন্য স্থান নির্দিষ্ট করন। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ কমন জায়গায় কোন প্রশিক্ষণ দিলে তা বিভিন্নভাবে বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না।

৪. উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভ্রান্ত ধারনা পরিবর্তন করতে হবে। তাদেরকে বুঝাতে হবে যে যখন একজন হেলপার, অপারেটর বা কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর  তার দ্বারা সম্পাদিত কাজ বা  প্রোসেস টি কিভাবে করলে সহজে এবং অল্প সময়ে অধিক পরিমাণ উৎপাদন করা যাবে এই ধারনায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে তখন উৎপাদনের পরিমান বাড়বে, কমবে না। যখন সে কোম্পানির অন্যান্য নিয়ম কানুন সম্পর্কেও দক্ষ হবে তখন তাদের সমস্ত কার্যকলাপ হবে প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক। আর এক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখাতে হবে।

৫. যে সকল মালিকপক্ষ শ্রমিকদের অধিকার কে শ্রদ্ধা করেন না, শ্রমিকদের কে শুধুমাত্র শ্রমিক মনে করেন তাদেরকে এই মিথ্যা ভয়ের ধারণা থেকে নিজেদেরকে বের করে নিয়ে আসতে হবে আর বিশ্বাস রাখতে হবে যে শ্রমিক দক্ষ হলে  সম্পদে পরিনত হয়। তাদের কে বোঝানো যে, যখন শ্রমিক তার নিয়োগকর্তার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করবে, যখন নিয়োগকর্তার কার্যকলাপে  শ্রমিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।

পরিশেষে বলা যায় যে, যখন শ্রমিকরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ পায় এবং তার অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে। তখন আরো জানার আগ্রহ থেকেই শ্রমিক প্রশিক্ষণের এর প্রতি আগ্রহী হয়। আর যখন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সেই প্রশিক্ষণের পর শ্রমিকের কাজ ও ব্যবহারে এর প্রতিফলন দেখতে পান তখন তারাও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে ইতিবাচক সারা দিবেন।

লেখকঃ ম্যানেজার, এইচআর, এডমিন এন্ড কমপ্লায়েন্স, আফতাবুন্নেসা গার্মেন্টস লিঃ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*