শ্রমিকের মজুরী ও আমাদের দৈন্যতা।

রানা ফরহাদ

শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে কেউ কেউ পজেটিভ মন্তব্য করছেন আর কেউ কেউ বিরুপ প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছেন। কেউ বলছেন এ বেতন কিছুই না, আবার কেউ বলছেন এই বেতনে ফ্যাক্টরী লাটে উঠবে।
প্রথমেই কথা বলি যারা বলছেন এই বেতন কিছুই না, তাদের জন্যঃ
ন্যুনতম বেতন ৮০০০। মানে একজন অদক্ষ শ্রমিক গার্মেন্ট ফ্যাক্টরীতে কাজ পেলেই মাস শেষে বেতন হিসাবে ৮০০০ টাকা পাবেন। বর্তমান হিসাবে এই টাকার ৫১.২৫ % হবে বেসিক বেতন। তাহলে সেই শ্রমিকের ওভারটাইম রেট হবে ৩৯ টাকা ৪২ পয়সা। এখন এই দেশে সবচেয়ে কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরীতে দিনে অন্তত ২ ঘন্টা ওভার টাইম হয়। ৩০ দিনে মাস হিসাব করলে, ২৬ দিনে ওভার টাইম হয় ৫২ ঘন্টা। তাহলে তার ওভারটাইমে আয় দাড়াচ্ছে ২০৪৯ টাকা ৮৪ পয়সা। আবার মোটামুটি সব ফ্যাক্টরিতেই হাজিরা বোনাস সিস্টেম চালু আছে যার পরিমান ন্যুনতম ২০০ টাকা (১০০০ টাকা হাজিরা বোনাস দেয়া ফ্যাক্টরীও আছে)। তাহলে মোটামুটি তার আয় দাড়াচ্ছে প্রতি মাসে ১০২৪৯ টাকা ৮৪ পয়সা। (যা কিনা বর্তমানে শ্রমিকদের মাসিক গড় আয়)।
এখন ফ্যাক্টরী যদি ততটা কমপ্ল্যায়েন্ট না হয়, হয়তোবা হাজিরা বোনাস সিস্টেম পাবে না কিন্তু ওভারটাইম বেশী হওয়ায় হয়তো তার আয় আরো বাড়বে। আবার কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরীতে ওভারটাইম কম হলেও, হাজিরা বোনাস ও প্রোডাকশন ইনসেন্টিভ সিস্টেম থাকায় এই আয় বাড়তেও পারে।
একজন অদক্ষ শ্রমিক যে কিনা মোটামুটি সংখ্যা চিনতে পারে, নিজের নাম লিখতে পারে এবং বয়স ন্যুনতম ১৮ বছর, তার মাসের আয় হবে এখন ১০২৪৯ টাকা ৮৪ পয়সা। আপনি এই সেক্টরকে গালি দিতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু আর একটা সেক্টর দেখান যেখানে ১৮ বছর বয়সে শুধু মাত্র নাম স্বাক্ষর করতে পারা একজন শ্রমিক এত টাকা আয় করছেন। আমি জাষ্টিফাই করছি না, যারা শুধু সমালোচনা করছেন, তাদেরকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করছি, “জনাব আপনার অফিসের পিয়নের বেতন কত? তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কি?” দেখুন বেতন বৃদ্ধির এই ধারা এখানেই শেষ নয়, হুট করে বিশাল অঙ্কের বৃদ্ধি কোন সেক্টরই বহন করতে পারবে না। তাই অন্তত ন্যুনতম বেতনের ৫০% বৃদ্ধিকে সাধুবাদ জানাই।
দেখুন, শ্রমিকের বেতন বাড়লে কাদের লাভ হয় সবচেয়ে বেশি জানেন কি? তার বাড়ির মালিকের। আরিফ জেবতিক ভাই দারূন একটা কথা বলেছেন। বনানীর কোন ফ্লাটের পার স্কয়ারফিট-এর তুলনায় আশুলিয়ার একটা ঝুপড়ি ঘরের পার স্কয়ারফিট ভাড়া বেশি। অন্তত আমি মিরপুর ডিওএইচএস-এ যে ফ্লাটে ভাড়া থাকি তার চেয়ে বেশী…… অনেক বেশী।
যা হোক, আলাপ অন্যদিকে না নিয়ে এবার আসি যারা বলছেন এই বেতনে ফ্যাক্টরী লাটে উঠবেঃ
সেদিন কোন একটা পেজে দেখলাম একজন হিসাব করে দেখিয়েছেন যে বর্ধিত বেতনে ১২ টাকা উৎপাদন খরচে যে পন্যের তা বেড়ে গিয়ে দাড়বে ১৮ টাকায়। হাস্যকর হিসাব। এই দেশে এখনো বেশীর ভাগ ফ্যাক্টরী ম্যানেজমেন্ট এসএমভি নির্ভর কস্টিং সিস্টেমটাই গ্রহন করতে পারেননি। আমি আলাপের সুবিধার্থে ‘কস্ট পার মিনিট’ বা ‘প্রতি মিনিট খরচ’ (লেবার মিনিট নয়) নিয়ে আলাপ করি। আপনি যদি সঠিক ভাবে হিসাব করেন, দেখবেন বর্তমান হিসাবে আপনার ফ্যাক্টরীর প্রতি মিনিটে খরচ আছে মোটামুটি ২ দশমিক ৪ সেন্ট মত। এটা বাংলাদেশের গড় চিত্র। কারো হয়তো ২ দশমিক ৮ সেন্ট আবার কারো ২ দশমিক ২ সেন্ট। এই খরচের মাঝে মোটামুটি দুইটা ভাগ আছে। শ্রমিকের মজুরী ও ম্যানুফ্যাকচারিং ওভারহেড। নতুন বেতন কাঠামোতে সরাসরি প্রভাব পড়বে মজুরী ভাগে। কিছুটা প্রভাব পড়বে ম্যানেজমেন্ট লোকজনের বেতনে। কিন্তু ইউটিলিটি, ইনভেন্টোরি, ট্রান্সপোর্ট, মেডিকেল, ডেপ্রিসিয়েশন বা অন্যান্য খাতে প্রভাব পড়বে না।
এখন দেখি এই প্রতি মিনিট খরচের কত পার্সেন্ট এই শ্রমিক মজুরি। বর্তমান সময়ে প্রেক্ষিতে থাম্ব রুল বলে যে, একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরীতে যে টাকা আপনি শ্রমিকের মজুরী হিসাবে দেন, সেই পরিমান বা একটু বেশী খরচ হয় বাকী খাতে। তার মানে, বর্তমানে হিসাবে এই ২ দশমিক ৪ সেন্টের অর্ধেক অর্থ্যাত ১ দশমিক ২ সেন্ট হচ্ছে মজুরিগত খরচ।
বর্তমান একজন গার্মেন্ট শ্রমিকের মাসিক গড় আয় ১০৫০০ টাকা। নতুন কাঠামোতে সেই অনুপাতে মাসিক গড় আয় দাড়তে পারে আনুমানিক ১৫৮৫০ টাকা অর্থাৎ ১.৫ গুন। তাহলে গড়ে প্রতি মিনিট খরচে শ্রমিকের মজুরীগত অংশ দাঁড়াবে ১ দশমিক ৮ সেন্ট। যদি ম্যানেজমেন্ট বেতনে তার ১০% প্রভাব পড়ে তাহলেও প্রতিমিনিট খরচ দাড়াবে ৩ দশমিক শুন্য ৬ সেন্ট। অর্থাৎ ২৭ দশমিক ৫ % বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারমানে, যদিও ন্যুনতম মজুরী বেড়েছে প্রায় ৫১% কিন্তু আপনার ফ্যাক্টরীর খরচ বৃদ্ধি পাবে ২৭ দশমিক ৫%।
এখন ধরুন কোন একটি টি-শার্ট এর এসএমভি ৬। আপনার ফ্যাক্টরীর ইফিসিয়েন্সি ৫০% এবং প্রতি মিনিটের খরচ ২ দশমিক ৪ সেন্ট। তাহলে টি শার্ট প্রতি আপনার খরচ পড়ছে ২৮ দশমিক ৮ সেন্ট। যদি আপনার ইফিসিয়েন্সি একই থাকে তবে নতুন হিসাবে তার খরচ পড়বে ৩৬ দশমিক ৭২ সেন্ট।
(হিসাবের সুত্রঃ প্রতি মিনিটের খরচ গুনন এসএমভি ভাগ ইফিসিয়েন্সি)
স্বভাবতই আমরা আশা করতে পারি না যে বায়ার এই অতিরিক্ত খরচ আমাদেরকে দিবে। সেক্ষত্রে যদি ইফিসিয়েন্সি ৫০ % থেকে ৬৪ দশমিক ৫ এ তুলতে পারি, তাহলে প্রতি মিনিট খরচ একই থাকে।
তাই আমি চিন্তিত হওয়ার কিছু দেখি না আপাতত।
(পুনশ্চঃ যদি কেউ হিসাব না বুঝে থাকেন, বোঝার জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।)

লেখকঃ ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট (লীন ম্যানুফেকচারিং)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*