আজব এই দেশে মেধার মূল্যায়নের আজব পদ্ধতি: ওয়ালিদ

ওয়ালিদুর রহমান :

[লেখাতে আমার নিজের ব্যক্তিগত কয়েকটি জিজ্ঞাসা স্থান পেয়েছে। শুরুতেই বলে রাখি, আমার ধারনা ১০০ ভাগ সঠিক নাও হতে পারে। আর যেসব উদাহরন টানা হয়েছে, সেগুলো স্রেফ উদাহরন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রিজুডিসড নই।]

এক;
আমার এক আঙ্কেল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি কলেজ হতে টেনেটুনে কোনমতে ডিগ্রী ও পরে এমএ পাশ করেন। তাও বোধহয় দু’বারের চেষ্টায় ডিগ্রী। অতঃপর দীর্ঘকাল রাজধানীতে পশার জমাতে না পেরে গ্রামের এক বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতার চাকরী। ঘটনাক্রমে কলেজটি সরকারীকরন হয়। আজ ১২ বছর পরে তিন ওই কলেজের প্রিন্সিপাল আর একজন ফার্স্টক্লাস অফিসার। প্রজাতন্ত্রের সবথেকে প্রেস্টিজিয়াস সোস্যাল স্ট্যাটাসে আছেন। তার সাক্ষর ও সীল দেবার অথরিটি আছে। তিনি পেনশন পাবেন, ঠ্যাং ভেঙে বা কাউকে ল্যাঙ মেরে বসলেও দীর্ঘকাল ছুটিতে থাকবেন, বেতন পাবেন, উৎসবে বোনাস পাবেন। তাকে কেউ চোখ রাঙালে সরকার তার হয়ে মাস্তানী করবেন। তিনি পরের বউ ভাগিয়ে নিলেও তার বিরুদ্ধে মামলা করতে সরকারের অনুমতি লাগবে। সব মিলিয়ে কলেজ হতে দু’বারের চেষ্টায় গ্রাজুয়েট হওয়া এবং ঢাকায় একটি সামান্যতম বেসরকারী চাকরীও বাগাতে না পারার মতো ব্যক্তিটি আজ প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। সমাজের হোমরাচোমরা-সেটাও তার প্রতিভার বদৌলতে না, ত্রূটিপূর্ন সরকারী সিস্টেমের ফেরেবে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রথম শ্রেনীর মাস্টার্স করে সততা ও কষ্টসাধ্য প্রয়াসে জীবনে আমি একজন বেসরকারী চাকুরীজীবি। বাসের হেলপারও পোঁছে না। রাষ্ট্রের বোধহয় ৪র্থ শ্রেনীর নাগরিক। তো সরকার কর্তৃক এই অন্যায্য পদায়ন ও সরকারীকরন করে তার যোগ্য নাগরিককে অবনমন আর হঠাৎ করে কারো কপালের ফেরে উর্দ্ধগমনের নীতি কেন? একটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যখন সরকারী করা হবে, তখন তার বিদ্যমান স্টাফরা বিদ্যমান সরকারী শিক্ষকদের মতো সমান যোগ্যতার কিনা-সেটা মূল্যায়নের কোনো পদ্ধতি কি রাখা হয়েছে? নাকি প্রতিষ্ঠান সরকারী মানে বাই ডিফল্ট তার সব সনাতন স্টাফ ও শিক্ষক সরকারী শিক্ষক মানে ফারস্ট ক্লাস? কী মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকল তাহলে শিক্ষার? সবচেয়ে বড় কথা, দেশে কয়েক লক্ষ বেসরকারী কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাদের শিক্ষকদের প্রমোশন, মানে, শিক্ষক হতে সিনিয়র শিক্ষক, লেকচারার হতে প্রফেসর হবার কোনো পদ্ধতি, মূল্যায়ন ভিত্তিক প্রক্রিয়া আছে কি? (যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা, যদিও আজকাল তার ধারও কেউ ধারে না।)

দুই;
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (স্রেফ উদাহরন) হতে আপনি মাস্টার্স করলেন, মনে করুন ইংরেজি সাহিত্যে। খুব কষ্টসাধ্য ও অধ্যবসায় লাগে ইংরেজিতে ভাল রেজাল্ট করতে। আরেকজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কলেজ হতে একই বিষয়ে মাস্টার্স করলেন। আরেকজন নরমাল ডিগ্রী পাশ করলেন ৩ বছরে। এই তিনজনই বিসিএস দিলেন। কোয়ালিফাই করলেন। চাকরী পেলেন একই ক্যাডারে। সবাই খুশি। কিন্তু আমি খুশি হতে পারছি না। দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় হতে কষ্টকর ও পরিশ্রমসাধ্য উপায়ে ভাল রেজাল্ট করলাম। আর কোনো অখ্যাত বা গ্রামের কলেজে সহজসাধ্য পথে ৩ বছরের বিএ পাশ করলেন-দু’জনই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একই যোগ্যতার মানে ন্যুনতম যোগ্যতার। লিখিত ও ভাইভায় যদি সমানে সমানে পাল্লা না দিতে পারি, তবে আমার ওই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাসের আলাদা কোনো মূল্য নেই, বিএ পাশ ক্যান্ডিডেটের বিপরীতে। নরমাল বিএ পাশেরও যেই দাম, আমার ৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সও তা। তিনিও যেই পয়েন্ট, আমিও তা। বাহ, শিক্ষার কত মূল্য?

তিন;
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ডাক্তারি পেশার ক্ষেত্রে উপরের পদে প্রমোশন পাবার কিছু সিস্টেম আছে। তার ভিতরে শিক্ষকদের জন্য আছে, লেকচারার দিয়ে শুরু করার পরে তার নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষনা, প্রকাশনা, লেকচার আওয়ার, ভিজিটসহ আরো কিছু নর্মস অর্জন করলে তাকে আস্তে আস্তে এ্যাসিসট্যান্ট, তারপর এ্যাসোসিয়েট ও তারও পরে প্রফেসর প্রমোশন দেয়ার ব্যবস্থা। ডাক্তারদেরও যতটা জানি, এফসিপিএস, এফআরসিএসসহ ওই একই রকম গবেষনা, প্রকাশনা, প্রাকটিস আওয়ার এর মতো বেশকিছু নর্মস অর্জন সাপেক্ষে উপরের সিনিয়র পদে যাবার ব্যবস্থা। এখন কনসেপচুয়ালী প্রোফেসর, ডাক্তাররা আমাদের খুব সম্মানিত (আমার মতে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী) পজিশনের পেশাজীবি। তাদের এত এত জটিল ও কঠিন পদ্ধতিতে মূল্যায়িত হয়ে তারপর কোয়ালিফাই করে সিনিয়র হতে হয়। সরকারী প্রশাসনে যারা প্রথম শ্রেনী বা দ্বিতীয় শ্রেনীর জব করেন, তাদের উপরের পদে প্রমোশন পেতে কোনো নর্মস লাগে কি? নাকি স্রেফ বছর পার করতে পারাই একমাত্র যোগ্যতা-আমার জানা নেই। যাহোক, আমার লক্ষ্য শুধু শিক্ষকরা। প্রফেসররা। সরকারী কলেজের একজন লেকচারার হতে প্রফেসর হতে গেলে তাকে ওই নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষনা, প্রকাশনা, লেকচার আওয়ার, ভিজিটসহ আরো কিছু নর্মস অর্জনের কোনো বাধ্যবাধকতা বা পরীক্ষা দিতে হয় কি? আমার জানামতে না। নির্দিষ্ট বছর চাকরী করলেই হয়। তাহলে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষকরা কঠিন পরীক্ষা দিয়ে প্রফেসর হতে হবে, আর কলেজের শিক্ষকরা বছর পার করতে পারলে প্রফেসর হবেন-মানে আলটিমেট এ্যাচিভমেন্ট সমান হবে, একই স্ট্যাটাসে থাকবেন, এ কেমন বিচার? মেধাকে মূল্যায়নের সিস্টেমই তো আমরা রাখিনি।

চার;
সকলেই আমরা জানি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা প্রায় বিনামূল্যে। মানে প্রায় সিংহভাগটাই সাবসিডাইজড। রাষ্ট্র তার নিজস্ব দায় ও প্রয়োজন (রাষ্ট্র’র জন্য উচ্চমানের নাগরিক ও কর্মী সৃষ্টির লক্ষ্যে) হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবসিডি দিয়ে কয়েকশত সাবজেক্টে শিক্ষার্থীদের গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স করায়। উদ্দেশ্য বিভিন্ন সাবজেক্টে জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তি সৃষ্টি করা। তা হতে পারে সাহিত্য হতে বায়োমেকানিকস। সুতরাং এটাতো কাম্য, রাষ্ট্রের অত্যন্ত মূল্যবান অর্থ যা গরীব জনগনের ট্যাক্সের টাকায় অর্জিত হয়, তা যখন এভাবে অকাতরে আমরা ব্যয় করি, তার উদ্দেশ্য থাকে, রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যানে বিভিন্ন সাবজেক্ট ও টপিকে দেশকে এক্সপার্ট উপহার দেয়া। কিন্তু এই খরচ ও শ্রমের বিনিময়ে সৃষ্ট মেধাবীদের একটা বড় অংশ বিসিএস ও অন্যান্য সরকারী চাকরীতে ইন্টারভিউ দেবার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে যায়। উদ্দেশ্য যেকোনো একটা সরকারী চাকরী বাগানো। তাদের খুব সামান্য সংখ্যকই সেটা পায়। তো যারা পান, তাদের প্রায় ৯৯%ই তাদের সাবজেক্ট রিলেটেড কোনো জবে ঢোকেন না। দেখা যায়, বায়োমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সে চাকরী করতে ঢুকল কাস্টমসে। আবার বিবিএর ছাত্র। সে চাকরীতে ঢুকল পুলিশে। তাহলে এই যে বিগত ৫ বছর রাষ্ট্র তার পেছনে বিবিএ পড়াতে অর্থ লগ্নি করল, তার কী মূল্যায়ন হল? রাষ্ট্র নিজেই কি তার অর্থ জলে ঢালার আর মেধাকে অবমূল্যায়িত করার ব্যবস্থা করেনি?

আবারও বলছি, আমার ভুলও হতে পারে। বোদ্ধারা সঠিক তথ্য দিতে পারবেন। কেউ কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারবেন, আমি ঠিক বলছি কিনা? আর যদি ভুল বলে থাকি, তবে সঠিক তথ্যটিও দেবেন?

 

লেখক : এইচআর/এডমিন পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সিলর, লেখক

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*