ক্যারিয়ার প্ল্যানিং করবেন কখন, কীভাবে?

ওয়ালিদুর রহমান :

পড়াশোনা করছেন বা সাবজেক্ট বাঁছাই করবেন, ক্যারিয়ারের জন্য তৈরী হবেন, এমন মানুষদের জন্য পরামর্শ: আমি আমার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে খুব তৃপ্ত নই। তবে ফ্রাস্ট্রেটেডও নই। আমি মনে করি, আমি আরো অনেক কিছু করতে বা হতে পারতাম। আমার ভুল বা বিলম্বিত সিদ্ধান্ত ও আরো কিছু পারিপার্শ্বিক কারনে সেটা হয়নি। সেই পারিপার্শ্বিকতার একটা বড় কারন ক্যারিয়ার প্ল্যানিং। ক্যারিয়ার প্ল্যানিং এর শুরুটা কিন্তু খুব ভাইটাল।

আমরা অনেকেই মনে করি, যেদিন আমার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হবে, সেদিন হতে আমার ক্যারিয়ার প্ল্যানিং শুরু করব। বড় ভুলটা আমরা সেখানেই করি। আমি মনে করি, সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষ তার ক্যারিয়ার প্ল্যান করবে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তির সময়। কারন ওই পড়াশোনা হতেই তার বাকি জীবনের ক্যারিয়ারের সূত্রপাত (খুব বিরল ব্যকিক্রম বাদে)। সাবজেক্ট চয়েস করা হতে শুরু করে জীবনের মোড নির্ধারন করার সবচেয়ে কার্যকর ও উপযুক্ত সময়টা তখন। আমি সেটা পারিনি। তার অন্যতম কারন উপযুক্ত মেনটরের অভাব এবং সমাজ/পারিবারিক বাস্তবতা। আপনাদের যাদের এখনো সেই সুযোগ আছে, তারা ভাবতে পারেন। যাদের সেই পাট চুকে গেছে, কিংবা মাত্রই গ্রাজুয়েশন করলেন, তারাও পড়তে পারেন।

 

কী করবেন?

১. যদি সম্ভব হয়, তবে দেশের জব মার্কেটের একটি নিজস্ব এনালিসিস দাড়া করানকোন সেক্টর, কোন জব, কোন ট্রেড অদূর ভবিষ্যতে দেশকে লিড করবে, কোন জবের বাজার বড় হচ্ছে, কোন সাবজেক্টের চাহিদা বাড়বে আগামী ১০ বছরে তার একটি গ্রাফ নিজেই করে ফেলুনসেই মতো করেই নিজের বিভাগ/সাবজেক্ট বাঁছুন

২. বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সত্যিকারে কত মানুষ বেকার তার সত্যি তথ্য কোথাও নেই। তারপরও কাজ চালানোর জন্য প্রাপ্ত তথ্য হতে বলছি, মোট ৪ কোটি ২০ লক্ষ বেকার যা মোট জনসংখ্যার ২৫% প্রায়। ভয়াবহ। এর মধ্যে ২৬ লক্ষ হল গ্রাজুয়েট বেকার। মানে যারা কমপক্ষে বিএ পাশ আর কোনো প্রথাগত পেশায় নেই। আমার ধারনা, এর মধ্যে প্রায় ৭০% হল বিবিএ হোল্ডার। যাদের প্রায় সবার স্বপ্ন কোট টাই পড়ে, এসি গাড়িতে চড়ে, এসি অফিসরুমে বসে অফিস করবেন। কিন্তু মুশকীল হল, বাংলাদেশ তো কোন ছাড়, আমেরিকার মতো দেশেও বছরে ওই রকম জব সৃষ্টি হয় মোট নতুন জবের মাত্র ১০-১২%। তার মানে কী দাড়ালো? সিস্টেম্যাটিক্যালী আমরা নিজেরাই নিজেদের বেকার করে তুলছি।

৩. বাংলাদেশে হুজুগ মেনে চলার খুব প্রবণতা আছেসবাই যা করছে, আমিও তাই করব-এটা খুব আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত৯০ এর দশকে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ার একটা হিড়িক পড়েছিলপড়ে দেখা দেল, ওই বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশেরই কোনো জব বা কাজের সুযোগ হয়নিহুজুগে না মেতে এনালিসিস করুননিজে না পারেন, মেনটরেরর সহায়তা নিনহ্যা, মেনটর চয়েস যেন বিজ্ঞভাবে করেন

৪. যদিও এই দেশে কোনো অথেনটিক ডাটা নেই, তাই কথা বলা খুব মুশকীল। তবু ধারনা ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলব, বাংলাদেশে এই মুহুর্তে সাবজেক্ট চয়েজ নিয়ে যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে, তবে আমি কাউকে অন্তত আগামী ১০ বছর বিবিএ, সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের কোনো সাবজেক্ট পারতপক্ষে করতে না করব (ওই অনুষদের লোকেরা আবার মানহানির মামলা করে বসবেন না। আমি ওই সাবজেক্টগুলোর বিরোধী বা অসম্মান করি না। আমি বাস্তবতার কথা বলছি। হ্যা, সব সাবজেক্টেরই দরকার আছে। তবে সেটার পরিমান জানতে হবে)। তার বদলে ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনিক্যাল সাবজেক্টে পড়তে বলব। কনভেনশনাল ডাক্তার বা উকিলদেরও কাজের ক্ষেত্র কমে গেছে। সবাই কী পড়ছে বা বেশিরভাগ কী পড়ছে-সেটার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নয়, কোনটা খুব শিগগীরই মার্কেটে বেশি দামী হবে বা হতে পারে-সেটাকে গেস করে পড়ুন।

৫. তবে, বাংলাদেশে সাবজেক্ট বেসড চাকরী পাবার হার অত্যন্ত কমকারন আছে অনেকতার মধ্যে আমাদের সিস্টেম প্রধানত দায়ীআমাদের যে মোট লক্ষ গ্রাজুয়েশন সীট আছে, তার সাবজেক্টওয়াইজ বন্টন দেশের চাকরীর বাজার এনালাইজ করে কোটা নির্ধারন হয়নিমানে হল, কতটি বিবিএ’সিট থাকবে, কতটি এপ্লাইড ফিজিক্সের, কতটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারের তার কোনেরকম নিয়ন্ত্রন নেইযেই বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে পারছে, সেইভাবে কোর্স কারিকুল্যাম বিক্রী করছেতাই আপনি বাধ্যতামূলক বেকারত্বের দিকে এগোচ্ছেনতার মানে আমি বলছি না, সাবজেক্ট চয়েস নিয়ে মাথা না ঘামাতেতবুও অবশ্যই ঘামাবেনকারন মোটে রেডি না থাকার চেয়ে রেডি হয়ে যুদ্ধজয়ের চেষ্টা কি ভাল না?

৬. বলবেন, চান্স পাওয়াই যেখানে বড় কথা, সেখানে সাবজেক্ট চয়েস? হ্যা, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু ও পালিত না পড়ে জেলার কলেজে বা ঢাকার কোনো কলেজে স্ট্যাটিসটিকস, ফার্মেসি, টেক্সটাইল পড়াও ভাল।

৭. শুধু একাডেমিক সাবজেক্ট রেজাল্ট দিয়ে বৈতরনী পার হয়ে যাবেন, এমনটা ভাবলে আপনি শেষতাই একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি আপনি তৈরী হতে থাকবেন যে বিষয়গুলোতে তা হল: ক) ইংরেজি, খ)কম্পিউটার-ওয়ার্ড/এক্সেল/ডাটা ম্যানেজমেন্ট/পাওয়ার পয়েন্ট/ইলাস্ট্রেটর/মেইলিং/ইন্টারনেট ইউজিং, গ) নেটওয়ার্ক/লিংক সৃষ্টি, ঘ) সেল্ফ প্রেজেন্টেশন, ঙ) ইন্টারপারসনাল স্কীল চ.ম্যাথ ছ.রাইটিং জ.ইন্টারভিউ ফেসিং

৮. একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো কোর্স করবেন কিনা-সেই প্রশ্ন প্রায়ই অনেকে করেন। আমি এর বিস্তারিত উত্তর এক লেখায় দিয়েছি। তবু বলব, যদি যেই বিষয়ে পড়ছেন সেই বিষয়জনিত জব ছাড়া কিছুই করবেন না বলে ডিটারমাইন্ড থাকেন, তবে ওই বিষয়ের সাথে জড়িত ট্রেনিং/পিজিডি করতে পারেন। আর তা যদি না হয় কিংবা মনে করেন, চাকরী করবেন অন্য বিষয়ে, তবে চাকরী হবার আগে কোনো সাবজেক্ট ভিত্তিক ট্রেনীং বা কোর্স নয়। হ্যা, সফট স্কীল বা সাইড স্কীল ট্রেনিঙ করুন। তবে কোনোভাবেই এলোমেলোভাবে কোনো কোর্স করবেন না।

৯. কখনোই, শুধু চাকরী’জন্য নিজেকে রেডি না করে নিজের কিছু করবেন-এমন প্রস্ততি নিয়ে এগোনতাহলে দুটো দিকই খোলা থাকবে

১০. নতুনদের জন্য আমার সবসময় একটাই সার কথা: নিজেকে স্মার্ট করুন, রেডি রাখুন। আর কানেকটেড রাখুন। শুধু ছবি আপলোড আর মুভি না দেখে ফেসবুক ও ইউটিউবকে নিজের গ্রূমীং এর কাজে ব্যবহার করুন।

লেখক : এইচআর/এডমিন পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সিলর, লেখক

1 Comment

  1. স্যার আমি সবে মাত্র HSC এক্সাম দিয়েছি। এই মাসেই রেজাল্ট দিবে। আমার ইচ্ছা আমি একজন এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার হব। এই সেক্টরে চাকরি পাওয়ার বা এটির চাহিদা কতটুকু? যদি জানাতেন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*