ভবিষ্যৎ আপনাকে ডাকছে! শুনতে পাচ্ছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ

আজ থেকে ১৫ বছর আগে হয়ত অনেকেই ভাবতেও পারেননি যে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার’ নামেও কোন চাকরি হতে পারে! এমনকি এই ৮-১০ বছর আগেও অনেকেই স্বপ্নও দেখেননি যে ‘এসইও এক্সপার্ট’ এর এত দরকার হতে পারে। গতিশীল ও সদা পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে যেমন অনেক কাজের সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমনি নতুন নতুন কাজ ও তৈরি হচ্ছে। এটাই চিরন্তন সুত্র যে নতুনরা পুরাতনদের স্থলাভিষিক্ত হবে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হল, আগে চাকরি গুলোতে যে সংখ্যক লোকবল লাগত, নতুন কাজগুলোতে সেই সংখ্যক লোকবল লাগেনা। কারন ওই প্রযুক্তি আর কার্য সম্পাদনের স্বয়ংক্রিয় ব্যাবস্থাপনা বা জব অটোমেশন। ডেইলি স্টার এর একটি প্রতিবেদন বলছে, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে ২০১৩ থেকে ২০১৬-১৭ সালে কাজের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১.৬ পার্সেন্ট! যেটাকে সংখ্যায় নিয়ে আসলে দাঁড়ায় প্রায় ০.৭৭ মিলিয়ন! যেখানে বাংলাদেশ এই সেক্টরে টোটাল চাকরি সংখ্যা ছিল প্রায় ৯.৫৩ মিলিয়ন। যেটা এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮.৭৬ মিলিয়নে।

এর সত্যতা আমি বুঝতে পারি আমার নিজের প্রতিষ্ঠানের দিকে লক্ষ্য করলে। আমাদের কারখানাগুলোতে প্রতিটি প্রোডাকশন লাইনে আগে যেখানে ২২-২৪ জন লোক লাগত সেখানে এখন লাগে সর্বোচ্চ ২০ জন। অর্থাৎ যদি আমাদের প্রোডাকশনের লাইন সংখ্যা ১০০ হয় তবে ১০০ টি চাকরি কমেছে এবং কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ৪০০ জন লোকের। যদিও এই ব্যাবস্থাপনা ও প্রক্রিয়া সম্পাদন চার-পাঁচ বছর ধরে হয়েছে।

বর্ধমান বিশ্বে যেখানে প্রতিদিন আমাদের চাকরির ক্ষেত্র বেড়ে যাবার কথা সেখানে প্রতিনিয়ত চাকরির সংখ্যা কমছে। আমার চোখে এর মূলত দুইটা কারন; এক- সামগ্রিকভাবে মানব সম্পদের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বেড়েছে, দুই- নিত্য-নতুন প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন কাজে সংযুক্ত হয়েছে। বড় কথা হল, এই ধারাটার (ট্রেন্ড) পেছনে যাবার কোন পথ নেই। অর্থাৎ দিন যত যাবে, তত প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীলতা বাড়বে এবং চাকরির সংখ্যা কমতে থাকবে।

এখন ‘বুঝলে বুঝলাম আর না বুঝলে মুড়ি খাইলাম’ এই অবস্থায় আর থাকা যাবেনা। কারন আরেকটা আশঙ্কাজনক তথ্য, ডেইলি স্টার-এর সেই প্রতিবেদন বলছে, “২০১৬-১৭ তে যতগুলো চাকরির সৃষ্টি হয়েছে তার ৮৫ ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং সেগুলোকে ঠিক সেই অর্থে গুণগত মান সম্পন্ন চাকরি বলে বিবেচনা করা যায়না”। এবার একটু চিন্তা করুন, এমনিতেই চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছেনা, আবার যেগুলো হচ্ছে সেগুলো আমাদের দেশে তৈরি হওয়া গ্র্যাজুয়েটদের জন্য নয় বরং সেগুলো অনেকটাই ‘অড জবস’ বা এটা-ওটা কাজ অর্থাৎ সেগুলো সেই অর্থে চাকরি বলে বিবেচিত হয়না। একদিকে জব মার্কেট বলছে, আমরা লোক পাচ্ছিনা আর অন্যদিকে সবাই বলছে চাকরি হচ্ছেনা, বেকার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর কারন কি? শুধুই কি জিপিএ ফাইভ সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সনদ সর্বস্ব শিক্ষা ব্যাবস্থা আর অতি সম্প্রতি প্রশ্ন ফাঁস সহ শিক্ষা ব্যাবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা? আমাদের নিজেদের কি কোনও দোষ নেই? নতুন কিছু শিখবার জন্য আমরা কি পর্যাপ্ত সময় দেই? আসলেই কি আমরা বুঝতে চেষ্টা করছি, এই বর্তমান বা ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে কি চায়?

 

আশ্চর্য লাগে যখন উপলব্ধি করি, আমাদের দেশে ফেসবুক ব্যবহার কারীর সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি কিন্তু এদের ৯৫% জানেনা ফেসবুক দিয়ে শুধুমাত্র সেলফি, চেক ইন আর বিভিন্ন ছ্যাব্লামু পোস্ট দেয়া ছাড়া আর কি করা যায়। ইংলিশ মুভি দেখবার জন্য অবিশ্বাস্য লম্বা লাইন লেগে যায়, কিন্তু এদের ৯০ ভাগ কোনও চাকরির পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় স্থানে নিজেদের ইংলিশে উপস্থাপন করতে পারেনা। মোটিভেশনাল স্পীচ শুনবার জন্য ইনডোর স্টেডিয়াম ভাড়া করতে হয় কিন্তু এইসব মোটিভেইটেড লোকজন নিজের দক্ষতা অর্জনের জন্য কোনও প্রশিক্ষনে উপস্থিত হবার জন্য সকাল ১০.০০ টায় ও ঘুম থেকে উঠতে পারেনা। কি অদ্ভুত, নাহ!!!

পুরাতন হলেও একথা ঠিক যে, ঘুম থেকে জাগতে হবে এখনি। নইলে চাকরিহীনতার জগদ্দল পাথর আরও শক্ত করে আমাদের বুকে চেপে বসবে। যারা এখনও ক্যারিয়ার শুরু করেননি তাদের কে অবশ্যয়ই ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ভবিষ্যতের নিরিখেই করতে হবে। এজন্য চাই, ভবিষ্যতের প্রয়োজন সম্পর্কে নির্মোহ গবেষণা ও গভীর বিশ্লেষণ। আজকের প্রত্যেকটি কাজ যেন ভবিষ্যৎ ভেবেই হয়। যারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তারা যদি আজকে কি কি লাগবে এই চিন্তা করে প্রস্তুতি নেন তবে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে অনেক বেশী। কারন আজকে যা দরকার কালকে সেটা দরকার নাও হতে পারে। তবে অসংখ্য গবেষণা এবং বিশ্লেষণ বলছে, কোলাবোরেশন, এনালাইটিকস, ডিজাইন থিংকিং, ডাটা সায়েন্স, প্রবলেম সল্ভিং এন্ড ডিসিশন মেকিং আর ইফেক্টিভ কমিউনিকেশন উপর দক্ষতা অর্জন করতে পারলে, ভবিষ্যৎ হবে আপনার মুঠোয়।

আর যারা ইতোমধ্যে চাকরি করছেন এবং অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, তাদের নিজেকে এখন প্রশ্ন করা শুরু করতে হবে,

  • আমি যে কাজ টা করছি সেটা শুধু র’ ডাটা দিয়ে দিলেই যেকোনো মেশিন করে ফেলতে পারবে?
  • আমি যে কাজটা করছি সেটা কি অন্য কোনও কাজের সাথে মিলে যেতে পারে এবং আমার কাজটা কি হারিয়ে যেতে পারে?
  • আমি কি খুব বেশী মেশিন নির্ভর কাজ করি? যেমন কম্পিউটার অপারেটর।
  • আমার করা কাজগুলো কি আরও অনেক কম খরচে শ্রম এবং শ্রমিক দিয়ে করিয়ে নেয়া সম্ভব?
  • আমার দৈনন্দিন কাজগুলো কি একই রকম এবং গৎবাঁধা?

এসব প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে এখনি সময় পদক্ষেপ নিতে হবে। যে পদক্ষেপ গুলো হতে হবে, খুব সুচিন্তিত, কৌশলী এবং ভবিষ্যৎ কেন্দ্রিক। এরকম পদক্ষেপ নেয়ার আগে অবশ্যয় গভীর গবেষণা করুন এবং আজকেই কাজে নেমে পড়ুন। এক কথায়, দক্ষতা অর্জন বা অর্জন করবার পরিকল্পনা হোক ভবিষ্যৎ নির্ভর। তবেই কেবল ভবিষ্যৎকে আলিংগন করা যাবে বিজয়ীর বেশে।

যখন-তখন এবং যেখানে সেখানে ট্রেনিং বা কনফারেন্সে গিয়ে সেলফি দিয়ে, অনেক কিছু শিখে ফেলার তৃপ্তির ঢেকুর তুলার দিন শেষ। শিখুন এমন কিছু যা আপনাকে এবং আপনার ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করবে। আমাদের সবার ভবিষ্যৎ হোক সুন্দর, নিরাপদ ও শান্তিময়।

আর হ্যাঁ, ভবিষ্যৎ আপনাকেই ডাকছে কিন্তু! শুনতে পাচ্ছেন?

লেখকঃ এসপিএইচআরআই, মানব সম্পদ প্রফেশনাল, একটি কানাডিয়ান বহুজাতিক কোম্পানিতে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরত।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*