চাকরি বদলঃ সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিন

মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ

একবার আমার এক সহকর্মী, যিনি আমার খুব প্রিয়, আমাকে হঠাৎ করে বললেন, “ভাই, ভাবছি এই জবটা চেইঞ্জ করব। আর ভালো লাগছেনা। আমার বস আমার সাথে খুব উল্টা-পাল্টা আচরণ করেন”। আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি কাজ শেখান কেমন বা কাজ সম্পর্কিত জ্ঞান কেমন?  উনি বললেন, “ভাই, এইদিক থেকে উনি অন্যরকম। বেশ জানেন এবং বুঝেন। কিন্তু উনার ব্যবহারটা কেমন জানি। এত কাজের চাপে রাখেন, যে বলার বাইরে”। আমি পরের প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা, এর পরে যেখানে যাবেন, সেখানেও বস যদি এমন হয়?” উনার সাধাসিদে উত্তর, “পরের টা পরে দেখা যাব”। উনাকে কিছু বুঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

এরপর উনি জবটা ছাড়লেন এবং যাওয়ার দুই মাস পর থেকে ফোন দেয়া শুরু করলেন এবং বলা শুরু করলেন, “ভাই, কই থেকে কই আসলাম? এখানে বস বেশ সুইট আর মোলায়েম কিন্তু কিচ্ছু পারেন না। কাজ নিয়ে কিছু বুঝতে গেলে, কেমন জানি অসহায়ের মত হাসি দেয় আর বলেন, একটু পরে আসেন দেখি কি করা যায়। তারপর বাকিটুকু ইতিহাস হয়ে থাকে”। এবং খুব নরম আর লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, “ভাই, জবটা তো আবার চেইঞ্জ করতেই হবে, এখানে থাকলে আমি আগামী এক বছরে ভোঁতা ছুরিতে পরিণত হব। খুব আশা নিয়ে চেইঞ্জ করেছিলাম কিন্তু কাজের কাজ হয়নি”।

এমন গল্প আমাদের কর্পোরেট জীবনে খুব বেশী আনকমন নয়, তাই না?  এমনটা আমরা অনেকেই করি। অফিসে কিছু একটা পছন্দ না হলেই, চাকরি খোঁজা শুরু করে দেই।  হা-হুতাশ করি। নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করা শুরু করি। ভাবতে শুরু করি, এই পৃথিবীতে ‘আমি’ ছাড়া সবাই সুখী। অন্য সবার বস কত ভালো! প্রতিদিন কফি শপে গিয়ে সেলফি দেয়।  কোনও এক পর্যায়ে ভাবতে শুরু করি, ‘আহ, আমার বস এমন না হয়ে, এমন হলে মনে অনেক কিছু করতে পারতাম’ বা  ‘উমুক বসের সাথে কাজ করতে পারলে মনে হয় আমি বিশাল তালগাছ হয়ে যেতাম’।

আসলে, বাস্তবতা কি তাই? মোটেই না! ১০০ ভাগ বলে কোনও কথা কর্পোরেট জগতে নেই। সমস্যা সবখানেই আছে। সব চাকরিতেই ঝামেলা আছে। শুধু ধরনটা একটার থেকে আরেকটা আলাদা। এই যা! এক যায়গায় বস ভালো, কিন্তু আরেক যায়গায় অন্যরা সমস্যা। এক জায়গায় বেতন বেশী কিন্তু নিজের কোনও লাইফ নেই। এক জায়গা হয়ত খুব চকচকে কিন্তু কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তাই চিন্তার জায়গাটা বড় না করলে, উন্নতিটাও বড় হবেনা। সিদ্ধান্তের মান তখনি ভালো হবে যখন আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার আগে বিশ্লেষণ করবার পয়েন্ট গুলো সত্যিকার অর্থে অর্থপূর্ণ হবে ও যৌক্তিক হবে। কারন, আমাদের জীবনের গুণগত মান, আমাদের চিন্তার মানের সাথে খুব বেশী সম্পর্কিত।

এইসব বিষয় নিয়ে আমার দর্শন হল, একটা ঘরে আমার কষ্ট হচ্ছে এজন্য ওই ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাবো, এটা ঠিক নয়। বরং আমাকে একটা আরও উন্নত ও সুন্দর জায়গায় যেতে হবে এজন্যই এই জায়গাটা ছেড়ে যাব। এজন্য আমি মনে করি, অন্যের সমস্যা নিয়ে ভাবার চাইতে, নিজের উন্নয়নের পথ খোঁজা বেশী জরুরী। যদি নিজের উন্নয়নের পথ খুঁজে পাই, তবে চাকরি বদলের জন্য বসের দোষ দেয়া বা অফিসের ভালোমন্দ খোঁজা লাগবেনা বা খোঁজা উচিৎও নয়। তাই চাকরি বদল করার আগে নীচের বিষয়গুলি নিশ্চিত হওয়া উচিৎ, নিজেকে প্রশ্ন করুন;

 

  • আমার কি শেখার সুযোগ বাড়বে?
  • আমি কি নতুন কোনও প্রযুক্তি ও কাজের টুল সম্পর্কে জানতে পারব?
  • আমি কি ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে আরও শানিত করে গড়ে তুলতে পারব?
  • আমি নিজেকে বৈশ্বিক জায়গায় উপস্থাপন করার সুযোগ পাবো?
  • আমার কাজের পরিধি কি বাড়বে বা নতুন নতুন কাজ করবার সুযোগ পাবো?
  • আমি কি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারব?
  • আমি কি পুরো মার্কেটে নিজেকে পরিচিত করবার জন্য বেশী বেশী সুযোগ পাবো অর্থাৎ নেটওয়ার্ক বাড়বে ?
  • আমার কি অর্থ উপার্জন বিবেচ্য হারে বাড়বে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে, চাকরি বদল করার সিদ্ধান্ত খুব যৌক্তিকতার সাথে নেয়া যায়। আবেগ আর খামখেয়ালীপনা দিয়ে  জীবন চালালে, লং-টার্মে জীবনে বেশ ভুগতে হয়। হয়ত আবেগ জীবনকে সুন্দর করে, কিন্তু যুক্তি জীবনকে অর্থবহ করে। আমার মতে, যে জীবন অর্থবহ নয়, সে জীবন প্রকৃতার্থে সুন্দর নয়। অর্থবহ জীবন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, সফলতার উদাহরণ হিসেবে, যুগ যুগ ধরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এর চেয়ে সুন্দর আর কি হতে পারে, বলুন!

সবার জন্য শুভ কামনা!

লেখকঃ এসপিএইচআরআই, মানবসম্পদ পেশাজীবী

2 Comments

    • সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। অনুগ্রহপূর্বক আরএমজি জার্নালের সাথে থাকুন। আপনাকে আমাদের লেখা পড়ার ও সম্ভব হলে লেখার অনুরোধ জানাচ্ছি । ভাল থাকবেন। শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*