গ্রীন ফ্যাক্টরীর সংক্ষেপে আদ্যপান্তঃ কী,  কেন,  কোথায়, কিভাবে?

ইউসুফ আহমেদ শুভ্র

বিশ্ব পরিবেশ যখন প্রতিনিয়তই উন্নত বিশ্ব দ্বারা দূষিত হচ্ছে তখন গার্মেন্টস শিল্পের ক্রেতারা চাইছে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কারখানাগুলো পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে উঠুক, পরিবেশে খারাপ প্রভাব বন্ধ হোক এবং সবুজায়নের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখুক। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের  United States Green Building Council (USGBC) নামক একটি সর্বজনগ্রীহিত প্রতিষ্ঠান  কোন স্থাপনা বা ভবনের পরিবেশগত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে LEED বা Leadership in energy and Environmental Design নামক একটি সার্টিফিকেশন পদ্ধতি প্রবর্তন করে।  স্থাপনাগুলোকে আরও পরিবেশবান্ধব করে তোলা এবং ভবনের নকশার ক্ষেত্রে টেকসই চিন্তাভাবনার প্রসারের লক্ষ্যেই এই LEED Certification এর প্রবর্তন।

এই শতাব্দীর শুরু থেকে গার্মেন্টসে আগুন, বয়লার বিস্ফোরন, গার্মেন্টসের ভবন তৈরীর সময় ধ্বসসহ বিভিন্ন দূর্ঘটনা লেগেই ছিলো এবং তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের নভেম্বরে তাজরীন ও ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধ্বসের পর দেশের তৈরি পোশাক খাতের কারখানা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী প্রচণ্ড রকমের খারাপ ধারণা তৈরি হয়, মার্কেটে বাংলাদেশী পন্য বয়কট হয়, ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে আর তখনই শুরু হয় “সবুজ বিপ্লব” যা বাংলাদেশকে নতুনভাবে চিনিয়েছে , ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের গ্রহনযোগ্যতা !

পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, LEED সার্টিফাইড এইসব কারখানাই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করছে। নেতিবাচক ধারণা দূর করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রাখছে আরও শক্তিশালী ভূমিকা। এখন দেশের রফতানি আয়ের ৭৬ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসেবে, এ পর্যন্ত ৬৭টি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা ‘গ্রীন ফ্যাক্টরী’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিবিসির স্বীকৃতি পেয়েছে। আরও ২২৭টি কারখানা পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে গড়ে উঠছে। এগুলো আগামী দুই বছরের মধ্যে এ সনদ পাবে।

পরিবেশবান্ধব স্থাপনার শর্ত প্রতিপালন বিবেচনায় মোট চারটি ক্যাটাগরিতে সনদ প্রদান করে  USGBC আর তা হলোঃ

ক। সার্টিফাইডঃ ৪০-৪৯ পয়েন্ট

খ। সিলভারঃ ৫০-৫৯ পয়েন্ট

গ। গোল্ডঃ ৬০-৬৯ পয়েন্ট

ঘ। প্লাটিনামঃ ৮০+ পয়েন্ট।

 

মোট ১১০ পয়েন্টকে সাতটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে এই সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়।

এবার জেনে নেওয়া যাক ক্যাটাগরিগুলো কী কীঃ

১। জমির ভৌগোলিক অবস্থানঃ ২৬ পয়েন্ট

২। পানি সাশ্রয়ঃ  ১০ পয়েন্ট

৩। প্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহারঃ ৩৫ পয়েন্ট

৪। পরিবেশ বান্ধব নির্মাণসামগ্রীঃ ১৪ পয়েন্ট

৫। অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত অবস্থাঃ ১৫ পয়েন্ট

৬। অতি সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত যন্ত্রের ব্যবহারঃ ৬ পয়েন্ট

৭। এলাকাভিত্তিক প্রাধ্যান্যতাঃ  ৪ পয়েন্ট

 

নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরন করে ক্যাটাগরি ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট অর্জন সাপেক্ষে ইউএসজিবিসি থেকে পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যায়,  যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় তা হলঃ

 

১. কারখানা নির্মাণে কী ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে;

২. কারখানায় সূর্যের আলোর কী পরিমাণ ব্যবহার হয়;

৩. সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার করা হয় কিনা;

৪. কারখানার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে শ্রমিকদের বাসস্থান আছে কিনা;

৫. স্কুল, বাজার করার ব্যবস্থা বা বাসস্ট্যান্ড রয়েছে কিনা;

৬. সূর্যের আলো ব্যবহার করার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুত ব্যবহার এবং বিদ্যুতসাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করা হয় কিনা;

৭. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা হয় কিনা;

৮. কারখানা নির্মাণে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা হয়েছে কিনা;

৯. অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কিনা;

১০. বৈদ্যুতিক ফিটিংস স্থাপন ছাড়াও অগ্নি দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে কিনা ইত্যাদি।

এবার আমরা জেনে নেই লীড সার্টিফিকেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে কী কী প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়। LEED Certification-এর জন্য পাঁচটি ধাপ রয়েছেঃ

১। নির্ধারন করাঃ  প্রথমে আপনাকে নির্ধারন করতে হবে আসলে কোন ধরনের সার্টিফিকেশনের জন্য আপনি আবেদন করতে যাচ্ছেন। LEED Certification এর অনেকগুলো ভাগ আছে আবেদন করার জন্য। আপনি সেখান থেকে আপনার যেই ভাগটিতে আবেদন করতে সুবিধা হয় সেই ভাগটিতেই আবেদন করবেন বা করার প্রস্তুতি নিবেন।

২। রেজিস্ট্রেশনঃ LEED Certification টির প্রক্রিয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে শুরু হয়। যখন আপনি আপনার প্রকল্পটির জন্য রেজিস্ট্রেশন করে প্রয়োজনীয় ফী প্রদান করবেন, তখনি আপনার প্রকল্পটি LEED Online-এ দেখা যাবে। এখান থেকেই আপনি আপনার প্রকল্পের দল তৈরি করে আপনার আবেদন প্রক্রিয়াটি চালু করতে পারেন।

৩। আবেদনপত্র জমা দেওয়াঃ LEED অনলাইনের মাধ্যমে আপনার আবেদনটি জমা দেয়ার দায়িত্ব আপনার LEED প্রকল্পের প্রশাসকের এবং যদিও প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে তবুও তারা সার্টিফিকেশনের জন্য পর্যালোচনা ফী অন্তর্ভুক্ত করবে। সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য প্রকল্পের দলটিকে প্রত্যয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তাদি, ক্রেডিট এবং সম্পূর্ণ প্রকল্পের সাধারণ তথ্যাদিসমৃদ্ধ ফর্ম পূরন করে জমা দিতে হবে।

৪। পর্যালোচনা প্রক্রিয়াঃ আবেদন পর্যালোচনার বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন স্থাপনার জন্য ভিন্ন হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা দেবার পরই আবেদন পর্যালোচনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই পর্যালোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে চূড়ান্ত নির্মাণ ও চূড়ান্ত নকশা পর্যালোচনার পূর্বে ক্রেডিট সংক্রান্ত পুনঃমূল্যায়নের জন্য প্রকল্পের দলটি আবেদন করতে পারবে।

৫। সার্টিফিকেশনঃ  সার্টিফাই হবার মাধ্যমেই LEED Certification এর সকল কাজ শেষ হয়। চূড়ান্ত পর্যালোচনা শেষে প্রকল্পর দলটিকে সিদ্ধান্ত জানান হয়।

সার্টিফিকেশন অর্জনই আসলে শেষ কথা নয়। অর্জিত সার্টিফিকেটের নির্ধারিত মানদণ্ড ধরে রাখাটাই মূখ্য। আশাকরি আমাদের সার্টিফাইড গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো তাঁদের মানদণ্ড ধরে রাখবে, নতুন নতুন গ্রীন ফ্যাক্টরী গড়ে উঠবে, সবুজে ভরপুর হবে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প।

লেখকঃ কমপ্লায়েন্স পেশাজীবী

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*