পোশাকশিল্পের বাজার ধরে রাখতে দক্ষতায় উন্নতির বিকল্প নেই

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল:

(লেখাটি আরএমজি টাইমস এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যা ও দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকায় গত ১৭/০২/২০১৮ ইং তারিখে প্রকাশিত হয়)

মানুষ পোশাক পরিধান শুরু করে সেই হাজার হাজার বছর আগে। আর সে সময় তা ছিল সম্ভ্রম রক্ষার জন্য; ছিল না কোনো বাহুল্য। সময় যেমন পাল্টেছে, তেমনই মানুষের অন্যান্য চাহিদার পাশাপাশি পোশাকের ক্ষেত্রেও চাহিদা পাল্টেছে। এখন পোশাক শুধু সম্ভ্রমের জন্য নয়, সামাজিক অবস্থানের কিংবা নিজেকে প্রকাশের একটি উপাদানও বটে। শেখ সাদির গল্প নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি আমরা পোশাককেই সম্মানিত করি! আসল কথা হলো পোশাকের চাহিদা দিনে দিনে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকশিল্প কারখানার চাহিদাও বাড়তে থাকে। পোশাকশিল্পের ইতিহাসও এমন  একটি গ্লোব আঙুল দিয়ে ঘোরালে যেমন তা বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে যায়, ঠিক সেভাবে এ শিল্পটাও কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে এর কক্ষপথ পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশ, চীন, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে আজ যেসব উন্নত দেশ পোশাক আমদানি করছে, একসময় তাদের দেশেও বহু কারখানা ছিল। এখনও বেশ কিছু পশ্চিমা দেশ পোশাক রফতানি করে থাকে। পোশাকশিল্পের অবস্থান পরিবর্তনের এই ইতিহাস বহু পুরোনো। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কেন এই শিল্পের একটি বড় অংশ উন্নত দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল দেশে এলো?

এর সবচেয়ে বড় কারণ হিসাবে শ্রমমূল্যকে ধরা যায়। উন্নত দেশগুলোয় শ্রমমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে পোশাক তৈরির খরচ বেড়ে যায়। ফলে ক্রেতারা যেসব দেশে শ্রমমূল্য কম, সেসব দেশে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। এটা স্বাভাবিক এবং তা কারখানার মালিক কিংবা ক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কেউ ব্যবসা করে মুনাফা না করতে পারলে অন্য জায়গায় ব্যবসা করবেন, কিংবা সেই ব্যবসা গুটিয়ে অন্য ব্যবসা শুরু করবেন। এভাবেই ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা এশিয়ায় এলেন। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চীন রফতানিকারকদের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। তাদের মার্কেট শেয়ার ছিল ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ আর বাংলাদেশ দ্বিতীয়, এর মার্কেট শেয়ার ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও ভারতের শেয়ার ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ (সূত্র: ডেইলি স্টার, ১৭ জুলাই ২০১৬)। ওই বছরে চীনের মার্কেট শেয়ার পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় কমে যায়, যার মূল কারণ ছিল সেখানে উৎপাদনের মূল্য বেড়ে যাওয়া। এখন প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে একটু শ্রমমূল্যের তুলনা করা যাক। চীনে সাধারণত প্রদেশভেদে মাসিক সর্বনি¤œ মজুরি ২৩৭ থেকে ২৬৫ ডলার। আমরা যদি কমটাকেই ধরে নিই তবে বাংলাদেশি টাকায় তা হচ্ছে ১৮ হাজার ৯৬০ টাকা। সূত্র: রয়টার্স।

যদি ভারতের কথায় আসি তাহলে দেখা যায় বিশ্বের অন্যান্য দেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি থাকলেও ভারতে তা মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠন কর্তৃক যৌথ দর কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় (সূত্র: মিনিমাম ওয়েজ ডট ওআরজি)। ভারতেও প্রদেশভেদে এটি ভিন্ন, যেমন গোয়াতে গার্মেন্ট শিল্পের অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ২৮৪ রুপি, যা ২৬ দিনে মাস ধরলে হয় সাত হাজার ৩৮৪ রুপি, বাংলাদেশি টাকায় ৯ হাজার ২২৯ টাকা, গুজরাটে যা বাংলাদেশি টাকায় ৯ হাজার ৯৩১ টাকা (সূত্র: পে চেক)। এক্ষেত্রে ধরা যায় ভারতের ন্যূনতম মজুরি ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। তাহলে বলা চলে বাংলাদেশে শ্রমমূল্য এখনও অনেক কম। এখন মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, চীনে মজুরি এত বেশি, তবুও চীন কেন এবং কীভাবে বাজারের এত বেশি অংশ দখল করে রেখেছে? (রিসার্চগেট)

পোশাক তৈরির আনুষঙ্গিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা, সেগুলোর বাজারমূল্য, সর্বোপরি শ্রম ও প্রযুক্তির উৎকৃষ্ট ব্যবহার। শ্রমের ও প্রযুক্তির উৎকৃষ্ট ব্যবহার বলতে বোঝানো হচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এককোষী প্রাণী অ্যামিবা যেমন নিজেকে প্রস্তুত করে খাপ খাইয়ে নেয়, ঠিক তেমনি চীন সময়োপযোগী অত্যাধুনিক মেশিন, লিন প্রযুক্তির ব্যবহার প্রভৃতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান আজও টিকিয়ে রেখেছে। সহজ ভাষায় লিনের কিছু উদাহরণ হলোÑম্যান মেশিন রেশিও কমিয়ে আনা, একজন শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একজনকে দিয়ে কয়েকটি প্রসেসের কাজ করানো, বিভিন্ন কার্যকর টুলস প্রয়োগের মাধ্যমে অনুৎপাদনের সময়কাল কমিয়ে আনা, উৎপাদনের ত্রুটি কমিয়ে আনাসহ সর্বোপরি শ্রমশক্তি ও লাইনের দক্ষতা বাড়িয়ে উৎপাদনকে গতিশীল রেখে সঠিক সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। চীনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের বিষয় তারা প্রায় সব ধরনের পোশাক উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়, গত ক’বছরে চীনের কিছু মার্কেট শেয়ার আমাদের দেশে এসেছে। এর কারণ হিসাবে বলা যায়, তারা এখন ইলেকট্রনিক পণ্যসামগ্রীর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এতে লাভও যে বেশি! এখন অনেকে বলতে পারেন এর ফল বাংলাদেশের জন্যই ভালো। আমাদের আর কোনো সমস্যা নেই! যদি বলি আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া! আর বর্তমান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তান তো আছেই।

এখন আলোচনা করা যাক, বাংলাদেশের উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বাধাগুলো কী কী? পত্র-পত্রিকার কিংবা ক্রেতাদের এর আগে দেওয়া বিবৃতির বরাত দিয়ে বলা যেতে পারে শ্রম পরিবেশ ও নিরাপত্তার কথা। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, গত ক’বছরে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কারখানা শ্রম পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিক থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, তাই সেটাকে বড় বাধা হিসেবে মনে করছি না। এখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতা! আগামী ক’বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মজুরি পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা (যা ওভারটাইমসহ দাঁড়ায় প্রায় সাত কিংবা সাড়ে সাত হাজার টাকা) থেকে লাফ দিয়ে যে সাত-আট হাজার হবে না, এর কী কোনো নিশ্চয়তা আছে? অবশ্য ইতোমধ্যে নতুন ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে সমান্তরালভাবে কি শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ছে? সর্বোপরি ত্রুটিমুক্ত উৎপাদনের শতকরা হার কি আসলেই বেতনকাঠামোর সমান্তরালে বাড়ে? যদি তা না হয়, সে ক্ষেত্রে মালিকদের লভ্যাংশ কমবে কি না? আর যখন লভ্যাংশ কমবে তখন মালিক বা বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষাকৃত লাভজনক ব্যবসা খোঁজার দিকে মনোনিবেশ করবে, তা-ই স্বাভাবিক। এখন সময় এসেছে আমাদের করণীয় নিয়ে ভাববার।  কেউ বলতে পারেন, আমরা তো অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছি। আরে ভাই, শুধু দক্ষতা অর্জনই বড় কিছু নয়, তার প্রয়োগ, ধারাবাহিকতা রক্ষা কিংবা দক্ষ জনবলকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মতো দক্ষতা কি আমাদের সুপারভাইজার, লাইন চিফ, ইনচার্জ কিংবা পিএম’দের রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার কথা ধরা যাক। দেশটির পোশাক কারখানায় যারা পিএম, লাইন চিফ, জিএম ছিলেন তারা এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন কারখানায় জিএম, সিইও, পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। কারণ তারা ম্যানেজমেন্ট ভালো বোঝেন আর নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। অন্যদিকে আজও বহু ফ্যাক্টরিতে আইই বিভাগকে দিয়ে আমরা লাইন ব্যালান্সিং কিংবা লাইন লে আউট করিয়ে থাকি। এটা কি আসলে আইই বিভাগের কাজ? আমার লাইন যে চালাচ্ছে, তার যদি এই ন্যূনতম দক্ষতা না থাকে, তার মধ্যে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা না থাকে, তবে দক্ষ জনবল থাকলেই বা কী যায়-আসে! বলবেন, আমরা ট্রেনিং দিচ্ছি। কিন্তু কীসের ওপর ট্রেনিং দিচ্ছেন, তাতে প্রতিষ্ঠানের লাভ কী? ট্রেনিং দেওয়ার পর তার কার্যকারিতার ক্ষেত্রে ফলোআপ! এসব কী করা হচ্ছে? আমরা ক’জন নিড আসেসম্যান্ট করে তারপর ট্রেনিং দিচ্ছি? উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে ওই গৎবাঁধা ঢালাও ট্রেনিং! আমার সুপারভাইজারকে পলিসি থেকে শুরু করে প্রোডাকশনের কোন জিনিসটা না জানলেও চলবে বলতে পারেন? আর স্পেশাল কিংবা টেকনিক্যাল ট্রেনিংয়ের জন্য ট্রেইনার হতে যে ধরনের দক্ষতা আমার দরকার, সে দক্ষতা আমার  ট্রেইনারের আছে কি না; তা কখনও ভাবি? একজন এইচআর ম্যানেজার দক্ষ ট্রেইনার হবেন, এর কোনো গ্যারান্টি দিতে পারবেন? আপনি এইচআর ম্যানেজার হয়েছেন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য, কিন্তু নিজেকেই যে প্রশিক্ষকের আসনে বসতে হবে এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। অনেক কারখানায় দেখেছি, কোনো প্রতিষ্ঠান স্পেশালাইজড কোনো ট্রেনিংয়ের অফার দিলে মালিক যখন তাদের জিজ্ঞেস করেন, তখন এইচআর ম্যানেজার কিংবা জিএম বেঁকে বসেন! হয়তো তারা ভাবেন এ আর কী ট্রেনিং! কয়টা স্লাইড বানানো আর লেকচার দেওয়া, এ তো আমিও পারি। আবার কেউ কেউ এটাও ভাবতে পারেন হয়তো মালিক ভাবেন যে আপনার যোগ্যতা নেই, তাই বাইরের কোনো সংস্থাকে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য সায় দিচ্ছেন! বাস্তববাদী হোন, ট্রেনিং একটা আর্ট, এই কলা সবাই রপ্ত করতে পারে না। আর আপনি যে উদ্দেশ্যে ট্রেনিং দিতে চাচ্ছেন, সেই কাক্সিক্ষত ফল যদি আপনি না-ই পেলেন, তাহলে ট্রেনিংয়ের কোনো মূল্য থাকল? দুঃখিত, একটু ভিন্ন কথা বলেছি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমাদের চিন্তা করার সময় চলে এসেছে। আমাদের স্বীকার করতেই হবে পোশাকশিল্প কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের আরও দক্ষতাসম্পন্ন হতে হবে, আর সেজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ছোট থেকে বড় সবার দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া। দেশের উন্নয়ন এগিয়ে নিতে পোশাকশিল্পকে দীর্ঘজীবী করতে হবে এবং তা করতে হবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

লেখকঃ মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*