আপনি কি একজন স্মার্ট বিজনেস এইচ আর ম্যানেজার ?

শিবলী হুসাইন আহমদ 

একটি প্রতিষ্ঠান নানান ধর্মের, বর্ণের, চরিত্রের, গোত্রের, পেশার, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের মানুষের সমন্বয়েই তাহার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও বৈশিষ্ট্য। এইসব বহুমতের ও বহুপথের মানুষের সফল সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে একজন দক্ষ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে যেমন ভিন্নতা রয়েছে, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন এইচআর ম্যানেজারের কাজের ধরনেও ভিন্নতা রয়েছে। একদিকে যেমন এইচআর এর উপর উচ্চতর ডিগ্রীধারি ও আধুনিক এইচআর অনুশীলনকারী মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক রয়েছেন, তেমনি আছেন এইচআর এর উপর উচ্চতর ডিগ্রী ছাড়াই গতানুগতিক ধারার অনুশীলনকারী মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক।একেক প্রতিষ্ঠানে এইচআর বিভাগের ম্যানেজারকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। কোথাও  এইচআর ম্যানেজার, কোথাও পিপলস ম্যানেজার, কোথাও এমপ্লয়ী রিলেশন ম্যানেজার, কোথাও বা এইচআর বিজনেস পার্টনার । যে নামেই এটাকে ডাকা হোক না কেন, এইচআর ম্যানেজারের প্রধান কাজ প্রতিষ্ঠানের মালিক তথা ম্যানেজমেন্ট এবং এমপ্লয়ীদের মধ্যে যোগাযোগ সেতু ও মুখপাত্র হিসাবে কাজ করা। এইচআর ম্যানেজারের মুলকাজ যেমন দক্ষ এমপ্লয়ী নিয়োগ, প্রশিক্ষিতকরন, টার্নওভার কমানো, এমপ্লয়ী  রিটেনশন ও কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা ও আনুগত্য বৃদ্ধি। এছাড়াও সুন্দর কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এইচআর ম্যানেজারকে অবশ্যই তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মনন ও প্রত্যশাগুলো বোঝা, কাজের উৎসাহ ও স্বীকৃতি প্রদান, যেকোন প্রয়োজনে সাড়া দেয়া, কর্মীদের মধ্যে সম্মান ও বিশ্বাসের ভিত মজবুত করা, অংশগ্রহনমূলক সিদ্ধান্তগ্রহন পদ্ধতি এবং পারস্পারিক সুসম্পর্ক ও মূল্যবোধের সংস্কৃতি তৈরি করা।

আধুনিক এইচআর ম্যানেজারকে অবশ্যই নিচের বিষয়গুলোর উপর দক্ষ হতে হবেঃ

  • কোম্পানির ব্যবসা কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে অর্থাৎ বিজনেস অপারেশনটাকে একদম ভিতর থেকে পুরোপুরি বোঝার চেস্টা করা এবং ম্যানেজমেন্টকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহন ও প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠভাবে পরিচালনার ব্যাপারে সরাসরি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করা।
  • গুনগত মানের সাথে ব্যবসায়িক সংখ্যাগত লাভের বিষয় বোঝা ও ম্যানেজমেন্টকে বোঝানো।
  • প্রতিষ্ঠানের উন্নতির কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়া ও সেইগুলো বাস্তবায়নের জন্য কি ধরনের মানবসম্পদ প্রয়োজন ও তাদের সুষ্ঠপরিচালনা পদ্ধতি তৈরি করা।
  • এইচ আর এর নতুন নতুন বিষয়গুলোতে নিজেকে আপডেট রাখা, নিজে নিয়মিত প্রশিক্ষনে অংশগ্রহণ করা ও অন্য সহকর্মীদের জন্যও নিয়মিত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা।
  • আন্তব্যাক্তিক সম্পর্ক তৈরিতে ও বিজনেস কমিউনিকেশনে দক্ষতা অর্জন করা।
  • নিজেকে বস নয়, বরং লিডার হিসাবে তৈরি করা। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা ও কোন কাজ নিজে আগে করে তারপর অন্যদেরকে করতে বলা।
  • প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগের কাজ সম্পর্কে কমপক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ের ধারনা রাখা।
  • সহকর্মীদের নিজের পরিবারের সদস্যদের মত ভাবা, তাদেরকে বোঝা, বোঝানো ও সহযোগিতা করা।
  • নিজেকে মাল্টি টাস্কার অর্থাৎ একাধিক কাজের উপযোগী করে তোলা।
  • সবক্ষেত্রে “হ্যাঁ” সূচক মনোভাব দেখানো ও সেইমত কাজ করা।
  • কাজের এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি নীতি ও নিষ্ঠাবান থাকা, সততা বজায় রাখা।
  • নিজেকে সমস্যার সমাধানকারী ও অসন্তোষ নিরসনকারী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
  • প্রতিষ্ঠানের ও এর কর্মীদের উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি প্রণয়ন ও তার নিয়মিত বাস্তবায়ন নিশিত করা।
  • সর্বশেষ তথ্য প্রযুক্তিগতজ্ঞান আহরণ করা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে নিজেকে পারদর্শী করা, কম্পিউটারের ও মাইক্রোসফট অফিসের সকল ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করা।

আধুনিক এইচআরডি এমন একটি জায়গা যেখানে কর্মীরা তাদের চাকুরী কেন্দ্রিক ও ব্যাক্তিগত ভাল-মন্দের অনুভূতিগুলো শেয়ার করে। আমরা যারা চাকুরী করি তাদের আসলে দুটি সংসার। একটি দিনের ও একটি রাতের। দিনেরটি অফিসে সহকর্মীদের সাথে, রাতেরটি পরিবারের সাথে। সকালে ঘুম থেকে যে মানুষটি বাসার সবাইকে ঘুমে রেখেই রওনা হয় অফিসের পানে, সেই মানুষটিই আবার রাতে যখন বাসাই ফেরে তখন আবার সবার ঘুমের সময় হয়ে যায়। তাই দিনের এই চাকুরি কেন্দ্রিক সংসারের গুরুত্ব সীমাহীন। এই সংসারটি কিভাবে সুখের হয় তার পিছনেও অনেক বড় ভূমিকা এইচআর ম্যানেজারের। কারন সুখী কর্মীই শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য উত্তম ফলাফল বয়ে আনতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীরা তাই পরিবারের সদস্যদের মতই গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য একটু মনমালিন্য বা কটু কথা বা ব্যবহার নস্ট করে দিতে পারে কাজের পরিবেশ, করতে পারে প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসায়িক ক্ষতি। সকাল থেকে সন্ধ্যা যে মানুষগুলোর একসাথে সময় কাটে সেই মানুষগুলোকে ভাল রাখা, উন্নত ও আনন্দমুখর কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজের সেরা পারফর্মেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করা, নিজেদের মধ্যে সংহতি, সমন্বয়, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সম্মানের জায়গাগুলোকে মজবুত করাটাও এইচআর ম্যানেজারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একটি ছোট্ট উৎসাহমূলক কথা বা আনন্দদায়ক ঘটনা প্রতিষ্ঠানের সবাইকে ভাল কিছু করার জন্য যেমন একসূত্রে গাঁথতে পারে, তেমনি কারও সাথে বলা সামান্য নেতিবাচক কথা, কিংবা নেতিবাচক কোন আচরন বা ঘটনা ঢেউয়ের মতই ঐ প্রতিষ্ঠানের অন্যদের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে ও কাজের গতিকে নষ্ট করে দিতে পারে।

এইচআর বিভাগ এমন একটি জায়গা যেখানে সবারই অনেক ব্যাক্তিগত ও গোপনীয় অনেক তথ্য থাকে। একজন এইচআর ম্যানেজারকে অবশ্যই সেই তথ্যের নিরাপত্তার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ও সংবেদনশীল হতে হবে। এইচআরের কাছ থেকে কর্মীর ব্যাক্তিগত গোপনীয় তথ্য যেন কোনভাবেই অন্যদের কাছে প্রকাশিত না হয় সে বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে । ঐ প্রতিষ্ঠানে চাকুরিরত অবস্থায় প্রতিটি সহকর্মীর নতুন কোন শিক্ষাগত ডিগ্রী প্রাপ্তি, প্রশিক্ষন, পেশাদারি সার্টিফিকেট বা অন্যান্য পেশাদারি অর্জন থাকলে তা নিয়মিত তার ব্যাক্তিগত ফাইলে আপডেট করা ও এর জন্য তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। তার পেশাদারি ও পারিবারিক স্বাস্থ্যের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখানোও আধুনিক এইচআর ম্যানেজারের কাজ। কর্মীদের যেকোনো সচেতনতামূলক খবর, দিক নির্দেশনা, ভাল কোন সুযোগ বা সংবাদ যা তাদের কাজে লাগতে পারে তা শেয়ার করা। যার ফলে কর্মীরা নিজেদের উক্ত প্রতিষ্ঠান তথা পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবে ভাবতে উৎসাহ পায় ।

প্রতিষ্ঠানের ব্যাবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে মানবসম্পদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার কৌশলগত নীতিমালা প্রণয়ন ও সুচারুরুপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা এবং সেটা নিয়মিতভাবে মানা হচ্ছে কিনা তার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রন করাটা এইচআর ম্যানেজারেরই দায়িত্ব।

এইচআর ম্যানেজারের রোল হচ্ছে অনেকটা পরিবারের মায়ের মত। প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হচ্ছে বাবার মত। মা যেমন বাবার সাথে আলোচনা করে সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচালনা, উন্নয়ন ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে। কিসে তাদের ভাল হবে, তারা যেন সফলভাবে বেড়ে উঠে, সংসারের যেন নিয়মিত উন্নতি হয় সে লক্ষ্যে বাবার সাথে বাকিদের সংযোগ সেতু হিসাবে কাজ করে। মা যেমন বাচ্চারা ঠিকমত খাচ্ছে কিনা, পড়াশোনা করছে কিনা, খেলাধুলা করছে কিনা, ঘুমাচ্ছে কিনা, সৎসঙ্গে মিশছে কিনা দেখেন, তেমনি তাদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠার জন্য হাতে ধরে ধরে সবকিছুর প্রশিক্ষণ দেন বা অন্যকে দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যব ব্যবস্থা করেন। ঠিক তেমনি এইচআর ম্যানেজারকেও একই ভাবে প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের ভালমন্দের খোঁজ নেওয়া ও ভাল কাজের জন্য উৎসাহিত করা, কাজের সুষ্ঠ ও আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করা ও সহ-তদারকি করা, উন্নয়নের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সময়মত তাদের কাজের পাওনা ও পুরস্কার নিশ্চিত করা। সবাইকে একসূত্রে গেঁথে রাখা যেন কাজের ছন্দপতন না হয়।

এই একবিংশ শতাব্দিতে এই কাজটিই সুচারুভাবে করতে গিয়ে  নতুন নতুন এইচআর মতবাদ, পন্থার আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু করতে হয়েছে মানব সম্পদ ব্যাবস্থাপনায়। কারন বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষ ও সুশিক্ষিত। তাই তারা অনেক বেশি সচেতন তাদের কাজ ও ক্যারিয়ার নিয়ে। এইচআর ম্যানেজারের এর কাছে তাদের প্রত্যাশার পারদটাও তাই অনেক বেশি ।  এই প্রত্যাশা মেটাতে না পারলে আপনি আপনার পেশাগত উন্নতি যেমন করতে পারবেন না তেমনি প্রতিষ্ঠানেরও উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবেন না।

তাই নিজেকে শুধু স্মার্ট করলেই চলবে না, কোম্পানীর বিজনেস নেচার বুঝে এইচআরের কাজগুলোও স্মার্টলি করতে হবে।

লেখকঃ জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক, মানব সম্পদ বিভাগ, ডেকো ফুডস লিমিটেড, বাংলাদেশ।

লেখকের আরোও লেখা পড়তে ভিসিট করুনঃ http://shiblis.blogspot.com/

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*