গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারিংঃ লীন প্যারাডক্স (পর্ব-২)

রানা ফরহাদ

( আরএমজি জার্নাল এ যারা অপরের কল্যাণে লিখছেন তাদের মাঝে লেখক অন্যতম। লীন নিয়ে তার এই ধারাবাহিক লেখাটি গত ০২/০২/২০১৮ ইং তারিখে থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। আমরা লেখকের লেখনীকে তার মত করেই উপস্থাপন করতে পছন্দ করি তাই কোন প্রকার এডিটিং ব্যতিরেকে লেখাটি হুবুহু প্রকাশিত হবে। মজাদার এ লেখার মাধ্যমে আশাকরি অনেকে অনেক কিছু জানতে পারবেন।)

প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর দেখি হই হই কান্ড, রই রই ব্যাপার। অনেকের কাছ থেকে জোর করে অনুরোধ আদায় করিতে বেশ কষ্ট হইলেও, কতিপয় সন্মানিত ব্যক্তিবর্গ বলিয়াছিলেন যে তাহারা পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকবেন। তাঈচি ঊনো বলিয়া গিয়াছেন যে ‘অপেক্ষা’ ভয়ংকর অপচয়। যদিও এই আবহমানকাল বাংলায় প্রচলিত কথাটি তার বিপরীত, “সবুরে মেওয়া ফলে”। অপেক্ষা আর সবুরের মাঝে কোন পার্থক্য আছে কিনা জানি না। তবে ইদানিংকার বাইচ্চা পুলাপান বলে যে “অধিক সবুরে মেওয়া পঁচিয়াও যায়”। তাই অপেক্ষাকাল দীর্ঘায়িত না করিয়া, লীন করিয়ালচি। মানে লেখা ধরিয়ালচি।

যদিও আমি ঠিক এই মূহুর্তে যা করিতেছি তার নাম ‘অপেক্ষা’। একজন সম্ভাব্য ক্লায়েন্ট-এর অফিসে বসিয়া আছি। যেহেতু আমি একজন ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার তাই অপেক্ষাকে নন ভ্যালু থেকে ভ্যালু এডেড-এ রুপান্তরিত করতেছি। কি করিতেছি বলেন তো? ঠিক ধরছেন, সিঙ্গারা খাচ্ছি। নাস্তা হিসাবে সিঙ্গারা আসা মানে আরো কিছুটা দেরী হবে। এই যে একটা সিগনাল, এইটারে কিন্তু দারূন ভাবে এনডন সিস্টেম হিসাবে চালানো যায়।

যা হোক, এবার গত পর্বের শেষ থেকে শুরু করি। তাঈচি ঊনো যে দুইটি দিকে কড়া নজর রাখতে বলে গেছেন তার প্রথমটা হচ্ছে ইফিসিয়েন্সির উন্নতির সাথে সাথে খরচ কমানোর দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। ইফিসিয়েন্সির উন্নতি তখনই গুরুত্ব বহন করে যখন তা খরচ কমানোর সাথে অতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। আর এটা করতে গেলে বায়ারের যা চাহিদা তা-ই উৎপাদন করতে হবে যথাসম্ভব কম সম্পদ ব্যবহার করে। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে প্রথমে প্রত্যেক কর্মীর ইফিসিয়েন্সি ও লাইনের ইফিসিয়েন্সি দেখতে হবে। তা যেন একই সাথে উন্নত হয়। এরপর কর্মীদেরকে একটা গ্রুপ হিসাবে দেখতে হবে এবং এরপরে সম্পুর্ণ ফ্যাক্টরী। প্রত্যেকটি একক স্তরে ইফিসিয়েন্সি বাড়তে হবে এবং একই সময়ে বাড়তে হবে।

যারা কি না গোল্ডরাট-এর ‘গোল’ বইটা পড়েছেন তারা নিশ্চয় ভালোভাবেই জানেন যে সেখানে কি সুন্দর করেই না প্রতিষ্ঠানের ‘গোল’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জানি অধিকাংশ লোকই পড়েননি তাই সংক্ষেপে ব্যাখা করি।

“একটি প্রতিষ্ঠানের ‘গোল’ অবশ্যই ‘টাকা’ বানানো (টু মেক মানি, তার মানে টাকা ছাপানো না, টাকা কামানো আই মিন মাথা কামানোর মত না, টাকা আয় করা আর কি)।

যা হোক, গোল হচ্ছে টাকা বানানো একই সাথে নেট প্রফিট বাড়ানো, একই সাথে রিটার্ণ অন ইনভেষ্টমেন্ট বাড়ানো, একই সাথে ক্যাশ ফ্লো বাড়ানো”।

এবার মিল করে দেখেন তাঈচি ঊনোর সাথে এই লেখকের কথাকে। এরপর এক কাপ চা নিয়া বসে পড়েন হিসাব নিকাশ মেলানোর জন্য। ইফিসিয়েন্সি বাড়ানো ছাড়া আরো অনেক কাজ পড়ে আছে, তাই না?

আচ্ছা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘আন্ডারস্টান্ড’ তাকে বাংলায় কি বলা যায়? ‘বোঝা’ তাই না? এই বোঝা-এর আরেকটা অর্থ আছে না বাংলায়? আসলেই ‘আন্ডারস্টান্ড” বোঝা আর ‘লোড’ বোঝা আমার কাছে প্রায় কাছাকাছি বলে মনে হয়। ঠিক মত বুঝতে পারাটা কিন্তু কম বোঝা নয়। তাঈচি ঊনো আও বলেছেন, “ আন্ডারস্টান্ড আমার খুব পছন্দের শব্দ। আমি বিশ্বাস করি এ শব্দটির একটি গূঢ় অর্থ আছে। কোন উদ্দেশ্য পজেটিভলি উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে এবং তার ধরণ বোঝার ক্ষেত্রে। প্রোডাকশন ফ্লোর সতর্ক পর্যবেক্ষন করলে অপচয় নজরে আসে এবং উন্নতির সুযোগ পাওয়া যায়। ফ্লোরে কেবল মাত্র ঘুরে ঘুরে দেখলেই কারো পক্ষে ম্যানুফ্যাকচারিং বোঝা সম্ভব না। আমাদেরকে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকটি বিষয়ের ভূমিকা ও ফাংশন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে”।

সাধারনভাবে কী নিদারূণ কঠিন বিষয় বলে গেছেন। ‘Understand’ শব্দটাকে বাংলায় ‘বোঝা’-র চেয়ে ‘অনুধাবন’ বললে সঠিকভাবে প্রকাশিত হয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে আমার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্গানোগ্রামের নীচের দিকের সদস্যদের কোন প্রস্তাব বা পরিকল্পনাকে ‘অনুধাবন’ করার উদ্যোগ খুব কম রয়েছে। ‘নতুন কোন পরিকল্পনা’ প্রস্তাব আসার পর, ‘করে দেখি’ -এর চেয়ে ‘করে দেখো’ কথাটি বেশি শোনা যায়, তার চেয়ে বেশী শোনা যায় ‘যদি না হয়?” এই প্রশ্ন। এই দেশের গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানে মাঝে মাঝে একটা ঢেউ ওঠে। উদাহরণ হিসাবে যদি বলি যে একটা সময় এসেছিলো ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার ঢেউ। প্রতিষ্ঠানের আই-ই-রা নিয়োগ পেলেন ধুন্দুমার। আমি নিজেও সেই সময়ে মার্কেটে আসি। আমার মনে আছে যে একটা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব দেয়ার কথা হয়েছিলো এবং ৬ মাসে প্রোডাকশন দ্বিগুন করবো কিভাবে সেই আইডিয়া চাওয়া হয়েছিলো। আফছোছ! কেউ অনুধাবন করেনি যে একজন সদ্য পাশ করা লোককে চাইলেই একটা বিভাগের ‘ম্যানেজার’ করা যায় না। একজন ম্যানেজার হতে হলে তার ‘প্রজ্ঞা’, ‘স্তিতি’ ও ‘সম্যক জ্ঞান’ এর সাথে সাথে ‘মানুষ গড়ার’ আকাঙ্খাটাও প্রবল থাকতে হয়। যে ছেলেটার নিজের গড়ে ওঠার সময়, তাকে যদি অন্যকে গড়ার দায়িত্ব দিয়ে দেয়া হয়, তবে সেটা প্রহসনের নামান্তর।

এরপর উঠেছিলো যে হেল্পার কমাও ঢেউ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম গনহারে হেল্পার কমে যাচ্ছে। আর আজ শুনি যে ২৫% কর্মীর ঘাটতি এই সেক্টরে। ভাই, ইনপুট না হলে আউটপুট কিভাবে হয়?

এই হেল্পার কমাও আগুনের জ্বালানী ছিলো ইউবিটি মেশিন যাকে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ বলেন অটোমেশিন আর শ্রমিকরা বলেন কম্পিউটার মেশিন। ইউবিটি মেশিন ব্যবহার করলে সুতা থাকে না, আর সুতা না থাকলে সুতা কাটার লোকও লাগে না। হায়রে মার্কেটিং আর হায়রে আমাদের অনুধাবন!

সে যাক ছিলাম টয়োটাতে, টয়োটার প্রোডাকশন কন্ট্রোল সিস্টেম বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছিলো ক্রমাগত উন্নয়ন (কন্টিনুয়াস ইম্প্রুভমেন্ট) চিন্তার উপর ভিত্তি করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো, “কাষ্টোমারের অর্ডারের প্রেক্ষিতে দ্রুত গতিতে ও সর্বোচ্চ দক্ষতায় গাড়ি তৈরী করা যেন যত দ্রুত সম্ভব তা ডেলিভারী দেয়া যায়”।

এই কাজে করতে গিয়ে দুইটা বিষয় বেড়ে উঠেছিলো টয়োটা প্লান্টে। ‘হাউজ অফ টিপিএস’ যদি জানা থাকে দেখতে পারবেন যে পিলার হিসাবে আছে ‘জিডোকা’। জিডোকাকে অনেকেই অনেক ভাবে ব্যাখা করছেন। কেউ বলছেন ‘পাস অনলি উইথ রাইট কোয়ালিটি’ মানে শুধুমাত্র কোয়ালিটি সম্পন্ন মালামাল তৈরী করুন। অনেকেই বলেন ‘অটোমেশন উইথ হিউম্যান টাচ (অটোনোমেশন)’ মানে মানুষ ও অটোমেশনের মিশ্রণ। যারা ‘দ্য মেশিন দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইটা পড়েছেন তারা জানেন যে এই অটোনোমেশন বিষয়টা কি।

চেনা জগতের উদাহরণ দেই, আপনার প্রতিষ্ঠানের এমব্রয়ডারি মেশীনটি চলতে চলতে সুতা কেটে গেলে যে অফ হয়ে যায়। মেশিন নিজে নিজের সুতা পড়াতে পারে না। কোন মানুষকেই সুতা পড়াতে হয়। কিন্তু সুতা কেটে গেলে মেশিন বুঝতে পারে এবং সে অফ হয় যায়। এটাই অটোনোমেশন।

এই অটোনোমেশনের যে কি সম্ভাবনাময় খাত! এই দেশে কোন প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কিছুই করছে না। আমরা নির্ভর করে আছি অন্যদের উপর। আমার খুব আফছোছ লাগে যে এদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন সংযোগ নেই। বাইরের দেশে গেলে দেখবেন তাদের এই সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী। এদেশের গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অটোনোমেশন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষনা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফান্ডিং করে, অনেক কিছুই হতে পারে। এটা নিয়ে পরে হয়তো একটি স্বতন্ত্র লেখা হতে পারে। হয়তো লিখবো, হয়তো না!

দ্বিতীয় পিলারটি হচ্ছে বহুল আলোচিত “জাষ্ট ইন টাইম”। এটা নিয়ে আসলে আলোচনার তেমন কিছু নাই। ক্রেতা যে মানের পণ্য বা সেবা চায়, সেই মান নিশ্চিতকরণ, যে পরিমানে চায় সে পরিমানে (বেশীও না কমও না) এবং যখন চায় তখন (আগেও নয় পরেও নয়)। (এক কথায় সেরে দিলুম দাদা, পারলে করে দেখেন… হা হা হা… বুঝেনই তো কনসালটেন্ট বলে কথা)।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপিই বিভাগে আমার অত্যন্ত “অপ্রিয়” (আমার ছাত্র জীবনে) কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী (বর্তমানে) শিক্ষক জনাব আবু হায়াৎ মিঠু গত লেখাকে অনেক বড় বলেছেন, তাই,  এখন একটা ছোট্ট প্রশ্ন করে ২য় পর্ব শেষ করছি, একজন শ্রমিকের দায়িত্ব কি (জব ডেসক্রিপশন)?

(কমেন্টে উত্তর লিখুন। যাদের উত্তর পছন্দ হবে তাদেরকে ১০ টাকা করে মোবাইল রিচার্জ দিতে পারি যদি আমার বর্তমান ক্লায়েন্ট এই মাসে পেন্ডিং বিল পরিশোধ করে!)

লেখকঃ ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট (লীন ম্যানুফেকচারিং)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*