প্রার্থী ও চাকরিদাতা: নিয়োগ প্রক্রিয়াতে চাই প্রফেশনালিজম

মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ

নিয়োগ শাখায় নেতৃত্ব দিচ্ছি দু বছর এর বেশী সময় এবং এই পদে আমার মৌলিক কাজ হলো, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়মতান্ত্রিক, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ রাখতে আমার টীমকে গঠনমুলকভাবে নেতৃত্ব দেয়া,  সংশ্লিষ্ট সকল কেপিআই ইতিবাচক রাখা ও ব্যাবসার প্রয়োজন বুঝে কৌশল নির্ধারন করা ও পদক্ষেপ নেয়া যাতে সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় নিশ্চিত করা যায়। এই কাজগুলো নিয়োগ শাখায় কর্মরত যেকোনো টীম লিডার করে থাকেন। প্রত্যেক টীম লিডার এই  কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন প্রতিনিয়ত। কখনওবা খুব ভালো আবার কখনো খুব খারাপ। মাঝে মাঝে পীড়াদায়ক ও বটে। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। হাজারও ঘটনার মধ্য দিয়ে, ভালোলাগা আর মন্দ-লাগা মিলিয়ে কাজ করে যেতে হয়।

এরকম কাজের মাঝে একবার হঠাৎ খেয়াল করলাম, চাকরি প্রার্থীদের বিশেষ করে ফ্রেশারদের ভাইভাতে উপস্থিত হবার হার আশংকাজনক হারে কম। এমনকি, অভিজ্ঞ প্রফেশনালরাও এই সমস্যা করছেন। বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করবার জন্য, আমি টিম নিয়ে বসলাম এবং পুরা টেলি-ইন্টারভিউ প্রসেস এবং ইনভিটেইশন স্টাইলটা রিভিউ করলাম এবং দীর্ঘ আলোচনা শেষে, টীমকে নতুন কিছু গাইডলাইন দিলাম; সাথে সাথে ‘ক্যান্ডিডেট এটেন্ড্যান্স রেট’ (ইন্টার্ভিউতে আমন্ত্রিত প্রার্থী ও উপস্থিত প্রার্থীর হার) বলে নতুন একটা কেপিআই ও দিলাম। এটা ইল্ড রেশিও (প্রত্যেক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ও সফল প্রার্থীর অনুপাত) থেকে একটু আলাদা করে দিলাম, যাতে স্পেসিফিক্যালি সমস্যা ধরতে পারা যায়।

আশ্চর্যজনকভাবে, খুব একটা উন্নতি দেখলাম না। আমার টীম এর একজন সদস্য পরের দিন খুব মন খারাপ করে বসে আছে দেখলাম। কাছে গিয়ে কিছু না বলতেই, সে বলল, “ভাইয়া, মাই কেপিআই ইজ এগেইন ঠু ব্যাড। প্লিজ হেল্প মি”। আমি বললাম, ওকে, ডোন্ট ওরি, লেট’স ডু সামথিং টুগেদার।

পরের দিন, যারা আসেননি, তাদের কল করা শুরু করলাম এবং সবিনয়ে না আসবার কারন জানতে চাইলাম। কেউ বললেন, “আগ্রহী নই”, কেউ বললেন, “জরুরী কাজে আটকে পড়েছি”, কেউ বললেন, “ছুটি ম্যানেজ করতে পারিনি”। কিছু ফ্রেশার বললেন, “সরি, ঘুম ভাংগেনি, আবার কি চান্স দেয়া যায়?” কেউ বললেন, “খুব সিক হয়ে গেছি হঠাৎ”। তবে, ৯০/৯৫ ভাগ ফোন ধরেন নি। কোনো খুদেবার্তার ছোট উত্তর দেবার খুদে বোধটুকু দেখান নি।

এবার বুঝলাম, সমস্যা প্রক্রিয়াগত নয়, সমস্যা আসলে সংস্কৃতিগত বা মানসিকতাগত।

আমার কথা হলো, আপনার ভাইভাতে উপস্থিত না হবার অধিকার শতবার আছে। কিন্তু, যাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন, মেইলে কনফার্ম করেছেন, তারপরও যদি না আসেন এবং না অবগত করেন, আবার পরে ফোন না ধরেন বা ধরে সেসব খোঁড়া যুক্তি দেখান, তবে আমাদের প্রফেশনালিজম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, আমরা কিভাবে ডিফেন্ড করব?

কিছুদিন আগে, একজন সিনিয়র প্রফেশনালকে ফোন করলাম। উদ্দেশ্য অবশ্যই হেড হান্টিং। উনার সাথে অনেক লম্বা কথা হল। উনি পজিশন সম্পর্কিত অনেক প্রশ্ন করলেন, আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। উনি বললেন, দেখুন আপনার এই পজিশনটি আমার জন্য একটু ছোট হয়ে যায়, আমি একটু ভেবে জানাবো। আধাঘণ্টার মধ্যে উনি খুদে বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করলেন যে উনি আসবেন।  মজার বিষয় হল, উনি নির্ধারিত সময়ের ১৫/২০ মিনিট আগেই এসেছেন। এবার উনার সাথে বসলাম, আলোচনা শুরু হল, উনি খুব স্মার্ট আর প্রফেশনালি কথা বলছেন। উনাকে সত্যি মনে হল উনি সঠিক ব্যক্তি এবং উনি আমাদের এখানে আসলে আমাদের বেশ ভালো হবে। কিন্তু উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “মি. জাহিদ, আই হ্যাভ নট কাম ফর দ্য জব; আই হ্যাভ কাম জাস্ট টু কীপ মাই ওয়ার্ডস।” আলোচনার এক পর্যায়ে জানতে পেরেছিলাম উনি আগের দিন অফিসের কাজে সিলেটে ছিলেন এবং উনি রাতে জার্নি করে সকালে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। উনার প্রতি শ্রদ্ধাবনত হলাম। উনি চাইলেই কিন্তু আরেকটা খুদে বার্তা দিয়ে ‘আসতে পারবেন না’ জানাতে পারতেন। আমি খুব সহজভাবেই নিতাম ব্যপারটা।  কিন্তু উনার খুব স্বাভাবিক একটা কাজ আমার কাছে খুব অস্বাভাবিকভাবে সুন্দর লাগলো। স্বাভাবিকতা এত সুন্দর হয়!

এত গেল চাকরিপ্রার্থীদের কথা।

আসলে আমরা মানে এইচ আর এর লোকজন কতটুকু স্বাভাবিক কাজ করি? আমরা কি প্রার্থীদের সাথে প্রফেশনাল থাকতে পারি? দেখুন তো নিচের সমস্যাগুলো পরিচিত কিনা;

১। প্রার্থীকে লম্বা সময় অপেক্ষা করানো অর্থাৎ সময়মত প্রক্রিয়া শুরু না করা

২। প্রার্থীকে খুব কম সময় দিয়ে ইন্টার্ভিউতে আসতে বলা

৩। প্রার্থীর সাথে ভালোভাবে কথা না বলা, বিরক্তির স্বরে কথা বলা

৪। প্রার্থীকে একটু চা-পানি খেতে না দেয়া

৫। প্রার্থীর চাকরি না হলে, তাকে বিনয়ের সাথে না জানানো

৬। প্রার্থীকে অপ্রাসঙ্গিক/ অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে বিব্রত করা

৭। প্রার্থীর সামনে নিজেকে খুব ক্ষমতাবান হিসেবে প্রদর্শন করতে চেষ্টা করা

প্রার্থীকে একটু লম্বা অপেক্ষা করতে হতেই পারে, কারন যিনি ইন্টার্ভিউ টা নেবেন উনি হঠাৎ কোনও জরুরী কিছুতে আটকা পড়তেই পারেন। কিন্তু প্রার্থীর সাথে যথাযথভাবে কথা বলে, একটু সরি বলে নিলে তো কোনও সমস্যা নেই, তাই না! একই ভাবে, ধরুন মাসে আপনি একশ জন প্রার্থীকে আমন্ত্রণ জানান। একশ কাপ চায়ের দাম কত? এটুকু তো করা যায়!

একটা পজিশনের জন্য আমরা দশ জন প্রার্থী দেখি। প্রার্থী নিজেও জানেন উনি নির্বাচিত নাও হতে পারেন। অর্থাৎ উনি কিন্তু চাকরি না হবার ব্যপারে মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকেন। এমতাবস্থায়, যদি কেউ নির্বাচিত না হন, তবে ছোট একটা ইমেইল দিলে কি খুব বেশী সময় নষ্ট হবে? মনে করলে হবে কিন্তু বাস্তবে নয়। বাস্তবিক অর্থে, এটা খুবই চমৎকার একটা চর্চা। এটুকু তো করা যেতেই পারে। এসব কি আমরা কি করি?

জানিনা কে কি উত্তর দেবেন কিন্তু ওই অভিযোগ গুলি ১০০ ভাগ সত্য, হয়ত সবার ক্ষেত্রে নয়। তবে, অনেকে ভালো বলে, আমার সহকর্মী যারা এমন করে থাকেন তাদের দোষ এড়াতে পারবনা। আমি জানি, আমার অনেক সহকর্মী বা ফেলো আছেন, যারা সত্যিকারের প্রফেশনালিজম দেখাতে ব্যর্থ হন।

সেই ব্যর্থতা বা উন্নতির জায়গা আছে এটা মেনে নিয়েই যে আবেদনটি করতে চাই, সেটি হল, সবাই সবার নিজ নিজ জায়গা থেকে ইতিবাচকভাবে বদলাতে শুরু করলে, শুভদিন আসতে কি খুব দেরি হবে? আসলে, একেকজন ‘আমি’ মানেই কিন্তু সমষ্টিগতভাবে ‘সবাই’। তাই ‘আমি’ বদলালে ‘সবাই’ বদলাবে।

আসুন না, সবাই প্রফেশনাল হই; বদলাই একট-আধটু করে!!

লেখকঃ এসপিএইচআরআই, মানব সম্পদ প্রফেশনাল, একটি কানাডিয়ান বহুজাতিক কোম্পানিতে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরত।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*