কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট: দ্বন্দ্ব সমাসের নতুন ব্যাকরণ

ওয়ালিদুর রহমান

বহুকাল আগে আমার গৃহশিক্ষক একটা সুন্দর গল্প বলতেন আমাদের ভাইবোনদের পড়ানোর সময়ে। অনেক কাল আগে একটি গ্রামে পাশাপাশি দুই বাড়িতে থাকত দু’টি মেয়ে-আকুলিয়া আর মালাশা। তারা দুই সঈ একত্রে রোজ স্কুলে যেত। তো একদিন তারা স্কুলে যেতে যেতে দেখে পথে একস্থানে আগের রাতের বৃষ্টির জল জমে আছে। তারা দু’জন স্কুল বাদ দিয়ে সেখানে বসে সেই পানির মাঝে বাঁধ দিল কাদা দিয়ে। তারপর সেখানে পানি সেঁচার খেলায় লেগে গেল। হঠাৎ আকুলিয়ার ছোড়া পানি মালাশার কাপড়ে পড়ে কাপড় নষ্ট হয়ে গেল। ছোট্ট মালাশা কাপড় নষ্ট হতে দেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিল। সে তারপর দৌড়ে গিয়ে বাড়িতে গিয়ে মা’কে নালিশ করে বসল। মালাশার মা তৎক্ষণাত মেয়েকে ঠাস করে একটা চড় তো লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু তখুনি গিয়ে আবার হাজির হলেন আকুলিয়ার বাড়িতে। আকুলিয়ার মাকে ডেকে নালিশ দিলেন। আকুলিয়া যে একটা পাজির হাড্ডি-সে মতামত ব্যাক্ত করলেন। আকুলিয়াকে পথে পেলে যে ঠ্যাঙ ভেঙে দেবেন-সে প্রত্যয়ও ব্যক্ত করলেন। আর যায় কোথা। আকুলিয়ার মা মালাশার মাকেও শুনিয়ে দিতে গেল দু’কথা। ব্যাস প্রথমে দুই মা, তারপর দুই পরিবার আর তারপর গোটা গ্রাম দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। প্রথমে তর্ক, তারপর ঝগড়া, ধীরে ধীরে সেটা হাতাহাতি এবং পর্যায়ক্রমে সেটা দুই দলের মধ্যে খুনোখুনির উপক্রম করল। যখন দুইপক্ষ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়বে-এমন অবস্থা, তখন একজন ‍বৃদ্ধ ব্যক্তি তাদের নিরস্ত করলেন। তারপর বললেন, দেখো তাকিয়ে। বিবাদমান পুরো গ্রামবাসী তাকিয়ে দেখে, তারা যেই দুই অর্বাচীন বালিকার অধিকার নিয়ে এতক্ষণ প্রায় খুনোখুনিতে লিপ্ত হতে গেছিল, সেই দু’জন কোন ফাঁকে নিজেদের মধ্যে ভাব করে আবার গিয়ে একসাথে সেই পানির কাছে বসে বাঁধ দিয়ে পানি সেঁচের খেলায় মজে গেছে। বৃদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে গ্রামবাসীকে দেখিয়ে দিলেন, দেখো। তোমরা একগ্রাম বড় মানুষ যা পারনি, দু’টো শিশু তা করে দেখিয়েছে। সেটা হল সমঝোতা আর বিবেচনাবোধ।

সুজন পাঠক ইশতিয়াক আর রেশমা আলম কোনো এক অদ্ভূৎ কারনে আমাকে কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে লিখবার জন্য বলেন। টপিক বেঁছে লেখা বা পাঠকের চয়েসে লেখার মতো কাবেল অবশ্য আমি নই। আমার দৌড় খুব অল্প। এমন একটা কাটখোট্টা প্রোফেশনাল বিষয়ে কখনো লিখব তা ভাবিনি। তাছাড়া আমি নিজে যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি তখন এই বিষয়ে আস্ত একটা কোর্স করতে হয়েছে। যেখানে বই ছিল জগদ্বিখ্যাত সব পন্ডিতদের। সেখানে আমি কোন পামর এই বিষয়ে লেখার। তবু পাঠকের অনুরোধ রক্ষা আর নিজের কাবেলিয়াত পরীক্ষা-দু’য়ের টানে লিখলাম। এখানে আপনি কোনো একাডেমিক তত্ত্ব পাবেন না। পাবেন আমার নিজস্ব ধারনা আর কিছু জীবনঘনিষ্ঠ তথ্য।

ছোটবেলায় আমরা বাংলা ব্যকরনে সমাস নামে একটা বিদ্যা শিখতাম যার একটি ধরন ছিল দ্বন্দ্ব সমাস। দ্বন্দ্বকে আমরা যেভাবে চিনি, মানে সংঘাত, তার বিপরীতে দ্বন্দ্ব সমাসে সংযোগেরও একটা দিক ছিল। বুঝতাম না, দ্বন্দ্ব কী করে আবার সংযোগও ঘটায়। কনফ্লিক্ট কতরকম হতে পারে? তাত্ত্বিকরা অনেক রকম বলতে পারবেন। মূলত দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট জিনিসটার প্রায় পুরোটাই হল মানসিক। মানসিক দূরত্ব, মতপার্থক্য ও স্বচ্ছতার অভাবই বেশিরভাগ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটায়। মতপার্থক্য খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় আর সেটা হেলদি প্রাকটিসও বটে। তবে মতপার্থক্য যখন মতবিরোধে দাড়ায় তখন সেটা এক পর্যায়ে দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। আমার দৃষ্টিতে, কয়েকটা মোটা দাগে কনফ্লিক্ট আমরা দেখে থাকি যেমন:-
১.সাইকোলজিক্যাল কনফ্লিক্ট: দু’জন বা অনেকজন মানুষের মধ্যে চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ও তার অনমনীয় প্রয়োগের ফলে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব।
২.ফাইন্যান্সিয়াল কনফ্লিক্ট: দু’টি প্রতিযোগী পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ আর্থিক বিরোধ।
৩.ইনটারেস্ট কনফ্লিক্ট: বাইলেটারাল বা মাল্টিলেটারাল স্বার্থ ও তার প্রবল একমুখী বা বহুমুখী কর্মকান্ডের ফলে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব।
৪.ইনটেলেকচুয়াল কনফ্লিক্ট: দু’জন বা বহুজনের জ্ঞান, ধারনা, কালচারের ব্যবধান হতে সৃষ্ট বিরোধ।
৫.কনফ্লিক্ট ইন বিলিফ: দু’টি ভিন্ন গোষ্ঠির মধ্যে বিশ্বাস, নীতি, প্রথা, ঐতিহ্যের ব্যবধান হতে সৃষ্ট বিরোধ।
৬.রিলিজিয়াস কনফ্লিক্ট: ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য তো যুগে যুগেই ছিল, এখনো আছে। তবে পার্থক্য হতে সৃষ্ট বিরোধ তথা দ্বন্দ্ব বিশ্বের ইতিহাসের প্রাচীনতম কনফ্লিক্টের অন্যতম। বিরাট বিরাট যুদ্ধে পর্যন্ত রূপ নিয়েছে এই কনফ্লিক্ট। এমনকি রিলিজিয়াস কনফ্লিক্ট ইন্টারন্যাশনাল ও মাল্টিন্যাশনাল কনফ্লিক্টেও গড়াতে পারে।
৭.ইন্টারন্যাশনাল ও ট্রান্সন্যাশনাল কনফ্লিক্ট: বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের কনফ্লিক্ট আমরা দেখতে পাব। যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গোটা বিশ্বের অবস্থানের বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উল্টোযাত্রা হতে পারে এর প্রকৃষ্ট উদাহরন। উত্তর কোরিয়া ইস্যূও একক দেশ হতে সৃষ্ট হলেও সেটি আন্তর্জাতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে বহু আগে। আবার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যূ তাদের নিজেদের আভ্যন্তরীন সমস্যা হওয়া স্বত্ত্বেও এটি এখন এশিয়ার অনেকগুলো দেশেরই সমস্যায় দাড়িয়েছে। এটিকে আমরা মাল্টিন্যাশনাল কনফ্লিক্ট হিসেবে দেখতে পারি।
৮.পলিটিক্যাল কনফ্লিক্ট: সোজা কথায় রাজনৈতিক বিশ্বাস ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব যা মূলত ক্ষমতায় আরোহনের দ্বন্দ্ব।
৯.ইনহেরিটেড/ইমপোজড কনফ্লিক্ট: রোহিঙ্গা ইস্যূটি বাংলাদেশের জন্য একটি আরোপিত দ্বন্দ্ব যার অন্যপক্ষ মিয়ানমার। আবার ভারত-বাংলাদেশের পানি সমস্যা একটি ইনহেরিটেড কনফ্লিক্ট যা আমরা স্বাধীনতার সূত্রে প্রাক্তন পাকিস্তান হতে পেয়েছি।
১০.বাইলেটারাল, মাল্টিলেটারাল কনফ্লিক্ট: দু’জন মানুষ বা পক্ষের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হল বাইলেটারাল দ্বন্দ্ব। আবার বহুপক্ষের মধ্যেও ওই একই বিরোধ হতে পারে। বাইলেটারাল কনফ্লিক্টও সময়মতো এটেন্ড না করায় সেটি মাল্টিলেটারাল কনফ্লিক্ট এ রূপ নেয়।
১১.অর্গানাইজেশনাল কনফ্লিক্ট: ফর্মাল বা ইনফর্মাল প্রতিষ্ঠানের ভিতরে বা বাইরে নানারকম দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানের ভিতরে বিভিন্ন গ্রূপের মধ্যে কিংবা মালিক-শ্রমিকের মধ্যে, মালিকদের মধ্যে, বিভিন্ন প্রেশার গ্রূপের মধ্যে, প্রতিষ্ঠানের সাথে তার অন্যান্য স্টেকহোল্ডার বা সার্ভিস রিসিভার/প্রোভাইডারদের বিরোধ থাকতে পারে।
১২.সোস্যাল কনফ্লিক্ট: সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নানামুখী দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। মাদক গ্রহন, মাদক পাঁচার ও মাদক নির্মূলে কাজ করে যাওয়া সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কনফ্লিক্ট হতে পারে এর একটি উদাহরন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সেক্যুলার নাকি ধর্মভিত্তিক হবে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সৃজনশীল নাকি মাল্টিপল লেভেলের হবে-সেই নিয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেনীর মধ্যে মতের পার্থক্য ও তা থেকে সৃষ্ট মতবিরোধ হতে পারে এর একটি উদাহরন।
১৩.ওয়ানওয়ে কনফ্লিক্ট ও কমপ্লেক্স কনফ্লিক্ট: সরাসরি যখন কনফ্লিক্টটি একপক্ষ থেকে হয় সেটা ওয়ান ওয়ে। যেমন: আপনি ক্লাসে ফার্ষ্ট হলেন। আপনার থার্ড বয় মনে মনে আপনাকে হিংসা করতে শুরু করলেন। তিনি আপনার যেকোনো রকম ক্ষতি করার সংকল্প করলেন মনে মনে। অথচ আপনি এর কিছুই জানেন না। এটি বড্ড একপেশে কনফ্লিক্ট। আবার মনে করুন, আপনার এলাকায় একজন দুর্ধর্ষ ডাকাত ধরা পড়ল। আপনি পুলিশ হিসেবে চাইবেন তাকে বাঁচিয়ে রেখে আইনের হাতে সোপর্দ করতে। পাবলিক চাইবে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে। আবার ওই ডাকাতের পরিবার চাইবে তাকে যেকোনো প্রকারে বাঁচিয়ে নিয়ে যেতে। এমন একটি কাল্পনিক পরিস্থিতিতে দেখা দেয় কমপ্লেক্ট কনফ্লিক্ট। অথবা ভাবুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি শিক্ষানীতি হল। একদল শিক্ষার্থী সেটিকে তাদের জন্য ক্ষতিকর মনে করে তার বিরোধীতা করা শুরু করল, আন্দোলনে নেমে গেল। সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠন যারা এই নীতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে তারা কনফিউজড। তাদের একাংশ আন্দোলনে সমর্থন দিল। একদল আবার মনে মনে সমর্থন দিলেও প্রকাশ্যে আন্দোলন দমনে কাজ করতে গেল। একদল অন্ধের মতো সরকারের সমর্থনে পথে নেমে আন্দোলনরত ছাত্রদের দমনে লেগে গেল। পুলিশ পথে নেমে ছাত্রদের পেটাতে লাগল। তাদের পিটুনিতে একজন সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন নেতা মারা গেল। ফলে ওই ছাত্র সংগঠন আবার উল্টো আন্দোলনে নেমে গেল। এমন একটি জটিলাকার দ্বন্দ্ব বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি।
১৪.ভিজিবল ও এ্যাবস্ট্রাক্ট কনফ্লিক্ট: কিছু কনফ্লিক্ট আছে যার প্রকাশ বা ফলাফল সরাসরি দৃশ্যমান। তবে কিছু কনফ্লিক্ট আছে যা সরাসরি দেখা যায় না বা যার অস্তিত্ব সাদা চোখে দৃষ্ট হয় না। অথচ তার অস্তিত্ব আছে। এই দেশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ মুখে উচ্চারন না করলেও বর্তমানে মনে মনে চায় পাকিস্তান ফিরে আসুক অথচ যেটি ঘটবার কোনোরকম সম্ভাবনা নেই। ফলে তারা সবসময়ই বাংলাদেশের যেকোনো অর্জন, যেকোনো ভাল কিছুতে মানসিকভাবে ক্রূদ্ধ ও বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে। অথচ সেটি কখনোই প্রকাশ্যে সে আনবেনা। কিন্তু সুযোগ পেলেই সে বাংলাদেশের বিপক্ষে যাবে-এমন কিছুতে কাঁধ দেবে। এটি খুব মোটা দাগে এ্যাবস্ট্রাক্ট কনফ্লিক্ট।

দ্বন্দ্ব’র প্রেক্ষিত হতে পারে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, ব্যক্তির সাথে সমাজের, সমাজের সাথে অন্য সমাজের, প্রতিষ্ঠানের সাথে এর সদস্যের, প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে, রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের। ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে কেন দেখা দেয় দ্বন্দ্ব? বুঝে নিই এর উৎস কোথায়। আমার মতে প্রধান উৎস মানুষের অবিবেচক, অসহিষ্ণু, অনমনীয়তা আর অতি ব্যক্তিত্ব। তারপরও যদি একটু গুছিয়ে বলি, তবে দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্টের কারন হতে পারে-
১.মানসিক দূরত্ব
২.স্বার্থের সংঘাত
৩.অনমনীয়তা
৪.সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গি
৫.অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা
৬.অসৎ উদ্দেশ্য
৭.ইনহেরিট্যান্স
৮.ঐতিহাসিক
৯.দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যবধান
১০.অযৌক্তিক ধারনা
১১.যুক্তিহীনতা
১২.স্বেচ্ছাচারিতা
১৩.অগণতান্ত্রিক আচরণ
১৪.শোষণ
১৫.বঞ্চনাবোধ
১৬.তথ্যপ্রবাহে বাঁধা
১৭.সত্যগোপন
১৮.স্বচ্ছতার অভাব
১৯.অতিব্যক্তিত্ব
২০.আপেক্ষিতা বুঝতে পারার ব্যর্থতা
২১.জাজমেন্টাল দৃষ্টিভঙ্গি

ফলাফল: অবশ্যম্ভাবিভাবেই নেগেটিভলী-
১.আর্থিক ক্ষতি
২.মানসিক ক্ষতি
৩.সামাজিক ক্ষতি
৪.নৈতিকতার ঘাটতি
৫.মোটিভেশনের কমতি
৬.টীম ওয়ার্কের অবনতি
৭.ঐক্যের অবনতি
৮.সহিংসতার উৎপত্তি
৯.সম্প্রিতীর ঘাটতি
১০.প্রাণহানি
১১.সংহতি ও শান্তি বিনষ্ট
১২.সময়, সুযোগ ও সম্ভাবনার অপচয়

কনফ্লিক্টের পজিটিভ ইমপ্যাক্টও কিছু ঘটে। অবাক হলেন? দেখুন, কনফ্লিক্ট হতে কী পজিটিভ ঘটতে পারে-
১.বহুমতের উদ্ভব
২.চেঞ্জ বা পরিবর্তন
৩.ডায়নামিজম
৪.কষ্ট ইফেকটিভনেস
৫.কালেকটিভ বেনেফিট
৬.নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রবাহ
৭.গণতন্ত্র
৮.চেক এ্যান্ড ব্যালেন্স সৃষ্টি হয়।
৯.আর পরিবারে জায়া ও পতির দ্বন্দ্বের মধুর পরিণতির কথা কে না জানে?

এখন প্রশ্ন হল, তবে আমরা কিভাবে দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্টের মোকাবেলা বা সমাধান করব? সহজ। আমরা যদি জানি যে, দ্বন্দ্বের উৎস কোথায় তবে তো সমাধান খুব সোজা-ওই উৎসটিকে বন্ধ করা। এটা বোধহয় খুব সরলীকরন হয়ে গেল। একটু ব্যখ্যা করে যদি বলি, তবে বলব, আমাদের দৈনন্দিন ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত জীবনের অধিকাংশ কনফ্লিক্টেরই সমাধান খুব সহজেই করে ফেলা যায়। যদি আমরা মনে করি যে, দ্বন্দ্বের পরিণতি কারো জন্যই পজিটিভ রেজাল্ট বয়ে আনে না। আমরা যদি মনে রাখি যে, প্রায় প্রতিটি দ্বন্দ্বমূলক বিষয়ের পিছনে একটি আপেক্ষিক সত্যি আছে আর এবসলুট বলে কিছু নেই-তাহলেই বিরোধ অনেকটা কমে যায়। তবুও দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় নিয়ে বলতে গেলে কিছু পথ বাতলে দেয়া যায়:-
১.ওপেন ডায়লগ পলিসী অনুসরন করা যেখানে যেকোনো কনফিউশন নিয়ে মুক্ত মতের আলোচনা হয়।
২.যেকোনো কর্মপ্রক্রিয়াতে ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিৎ করা
৩.যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা প্লাটফরমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিৎ করা
৪.দ্রূত দ্বন্দ্বের কারন নিরূপন আর সমাধানের উদ্যোগ নেয়া
৫.দ্বন্দ্ব জিইয়ে না রেখে যেকোনো রকমই হোক, সমাধান করা
৬.দ্বন্দ্বের প্রকৃত কারন-ভিজিবল বা ভেস্টেড, তার স্বরূপ জানার চেষ্টা করা
৭.শুধুমাত্র একটিমাত্র উপায় নিয়ে না থেকে সমাধানের একাধিক বিকল্প হাতে নিয়ে কাজ করা
৮.উইন-উইন সিচুয়েশন রক্ষার চেষ্টা করা
৯.সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে কালেকটিভ ডিসিশন নেবার সংস্কৃতি চালু করা
১০.যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ডিসিপ্লিন ও হাইয়ারারকিসহ স্প্যান অব কন্ট্রোল নিশ্চিৎ করা
১১.যেকোনো সমস্যা ও সমস্যার অভিযোগকারীকে গুরুত্ব দিয়ে হ্যান্ডেল করা
১২.যেকোনো বক্তব্য, কাজ, উদ্যোগ, সিদ্ধান্ত নেবার আগে সেটির আপেক্ষিকতা, নিরপেক্ষতা এবং যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে নেয়া
১৩.আমি যা ভাবছি বা আমি যেটা জানি/ভাবি-সেটাই একমাত্র সঠিক/সত্যি-এমন ভুল ধারনা থেকে বের হয়ে আসা
১৪.গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তগ্রহন প্রক্রিয়া অনুসরন করা
১৫.সমস্যা/সংশয়/দ্বন্দ্ব’র শুরুতেই সেটিকে এটেন্ড করা
১৬.জুনিয়রদের মতামত ও আইডিয়াকে মূল্যায়ন করা
১৭.রিজিড/স্ট্যাটিক ও কনভেনশনাল এ্রপ্রোচ ও এটিচুড নয় বরং ডাইনামিক, মডার্নাইজড ও ফ্লেক্সিবল পলিসী অনুসরন করা
১৮.দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিকট নিরসনে কাজ শুরু করার সময় কোনো প্রিজুডিসড/বায়াজড/প্রিসেট মেন্টালিটি বা প্রি-এজাম্পশন নিয়ে শুরু না করা
১৯.কনফ্লিক্ট সৃষ্টি হবার পর তার রিএ্যাকটিভ সমাধানের চেয়ে প্রি-এজিউম ও ফোরকাস্টিং এর মাধ্যমে এবং বিভিন্ন মেথড অনুসরন করে কনফ্লিক্ট উদ্ভব হতে না দেয়া মানে প্রতিরোধ করাটাই সবচেয়ে ভাল সমাধান।

কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমি সবসময় আমার চারপাশের লোকদের একটি গল্প বলি। আমার মনে হয় মেন্টালিটি, এটিচুড আর এপ্রোচই হল কনফ্লিক্ট ক্রিয়েশন আর সমাধানের মূলমন্ত্র। এই তিনের সুষ্ঠূ ম্যানেজমেন্টই হল কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের সূত্র। গল্পটি পড়ুন। এতেই আপনি সবচেয়ে ভাল গাইডলাইনটি পেয়ে যাবেন। আকলমান্দকে লিয়ে ইশারাই কাফি।

একবার এক পশ্চিমা শহরে। দুই দিকে দুটি পাহাড়। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তি পাদদেশে একটি Pub। তো একদিন সেই দুই পাহাড় হতে দু’জন ঘোড়সওয়ার পাহাড় হতে নেমে Pubটির কাছাকাছি এলেন। একজন পাবের ডানদিক হতে আরেকজন বাম হতে। বামের ঘোড়সওয়ার বললেন, “কী সুন্দর এই রুপালী সেলুনটি”। কিন্তু ডানের ঘোড়সওয়ার বললেন, “এই স্বর্নালী সেলুনটি অত্যন্ত সুন্দর”। প্রথম ঘোড়সওয়ার দ্বিতীয় জনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ওহে ভাই, ওই সাইনবোর্ডে পরিষ্কার লেখা আছে এটা সিলভার সেলুন। তুমি কেন এটাকে গোল্ডেন বলছ? দ্বিতীয়জন বলল, কই, আমি তো পরিষ্কার লেখা দেখছি গোল্ডেন সেলুনে স্বাগত। ব্যাস আস্তে ধীরে এই নিয়ে তর্কে জড়াল দু’জন। সেলুনের নাম সিলভার সেলুন নাকি গোল্ডেন সেলুন। দু’জনের ঝগড়া এক পর্যায়ে বন্দুক যুদ্ধের উপক্রম করল। এমন সময় সেলুনের ব্যাটউউংডোর ঠেলে এক বৃদ্ধ বের হলেন। তিনি দু’জন ঘোড়সওয়ারকে প্রায় যুদ্ধোদ্যত দেখে তাদের ঝগড়ার কারন জানতে চাইলে দু’জনে বিচার দিলেন দ্বিতীয়জনের ভুলের ব্যাপারে। বৃদ্ধ একটু হেসে বামের ঘোড়সওয়ারকে ডানে নিয়ে গেলেন আর ডানের লোকটাকে বামে। এবার পড়তে বললেন সাইনবোর্ড। তারা দু’জনেই দু’জনের ভুল বুঝতে পারল। আসলে সেলুনের মালিক মজা করার জন্য সেলুনের সাইনবোর্ডের দু’পাশে দু’রকম নাম দিয়েছে-গোল্ডেন ও সিলভার। তার মানে দাড়াল কেউই ভুল না। শুধুমাত্র আপেক্ষিকভাবে তাদের দু’জনের ধারনা ভুল আবার সঠিক দুটোই। আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এমনি হাজারো আপেক্ষিক সত্য-মিথ্যা বিদ্যমান। শুধু প্রয়োজন সমঝোতা, সহমর্মিতা, আপোষকামীতা, র‌্যাশনাল চিন্তাধারা আর গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। এতটুুকু মেনে চললে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অর্ধেক কনফ্লিক্টের উদ্ভবই হত না।

লেখকঃ মানবসম্পদ পেশাজীবী 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*