গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারিংঃ আই ই প্যারাডক্স

রানা ফরহাদ

“যদি খরচ কমানো ও লাভ বৃদ্ধিতে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং কোন ভূমিকা না রাখে, তবে আমি মনে করি তা অর্থহীন”!… না, কথাটা আমার নয়, কথাটি তাঈচি ঊনো বলেছেন। এখন আপনি আপনার ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিরারিং টিমের সদস্যদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন তো তাঈচি ঊনোর কথা তারা জানে কিনা? মোটামুটি ৩০ ভাগ বলবে ‘নাম জানি’। যদি জিজ্ঞাসা করেন তিনি কে ছিলেন বা কোথায় এবং কি চাকরি করতেন? ১০ ভাগের বেশী সদস্য সদুত্তোর দিতে পারবে কি না সে বিষয়ে আমি সন্দিহান ।

আসলে সমস্যাটা কোথায়? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করি। তার আগে আরেক কাপ চা দেয়ার জন্য অনন্তকে অনুরোধ করে নেই। আমি আবার হালকা আদা মেশানো গরম পানিতে চিনি ব্যতিত হালকা লিকারে লাল চা খাই। বিষয়টা মনে রাখবেন। যদি কখনো দেখা হয়ে যায়, তবে বুঝেনই তো!

চা আসছে তার আগে ফ্রুট কেক নাস্তা হিসাবে। কেক-এর দুই কোনায় চেরীর ক্ষুদ্র দু টুকরা ‘ফ্রুট কেক’ এর নামকরণের সার্থকতা প্রমান করে চলেছে। সে যাক কোথায় ছিলাম যেন? ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। আচ্ছা আপনার প্রতিষ্ঠানের আই-ই বিভাগে যারা কাজ করছেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি? এদেশে বাংলা বিভাগ থেকে অনার্স মাষ্টার্স থেকে শুরু করে হালকা ডানে চেপে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে হালকা বামে কেটে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে প্লাষ্টিক প্লাষ্টিক চিৎকার করতে করতে কম্পিউটার সায়েন্স-এর লোকজনও পাওয়া যাবে। কি বিচিত্র এই বিভাগ!!!

না আমার আজকের কথা এই সকল বৈচিত্র নিয়ে নয়। বৈচিত্র যাদের আছে তারা বড়ই বিচিত্র। আমি বরং একটু চা-এর টঙে দাঁড়াই।

একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার আই-ই বিভাগে চাকরি নেয়ার পর তাকে তার ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা কাজে লাগাতে খুব একটা দেখিনি। তার ইঞ্জিনিয়ারিং জীবন ঐ স্টপ ওয়াচে স্টপ হয়ে যেতেই দেখেছি। স্টোরে কোন ফেব্রিকে হাত দিয়ে বলতে দেখিনি, “ওহ! এটাতো ডবি ফেব্রিক! এখানে ওয়াশিং-এর সময় শ্রিঙ্কেজ এর বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।” কিংবা এপারেল ম্যানুফেকচারিং টেকনোলজি গ্রাজুয়েটকে আই-ই বিভাগে কাজ করতে এসে বলতে শুনিনি, “এটা টুল ফেব্রিক, এখানে এসপিআই ৮ লাগে। কেন এখানে ৯ হলো বা এখানে কেন ৭ দেয়া হচ্ছে?”

কিন্তু অনেকেই বলেন এটা রঙ চা কেন? ‘রাইট চা” না কেন? স্যরি, বেলাইনে চলে এলাম আবার… চা এর শেষে আদাতে হাল্কা কামড় দিয়ে মনে হলো, আমি আমার লাইনেই যাই বরং। ছিলাম আইপিই নিয়ে, আমার পড়াশোনা ঐ বিভাগেই তাই সেখানে বেশী মনোনিবেশ করি।

ধরুন আপনি আইপিই গ্রাজুয়েট একজনকে চাকরি দিলেন। আচ্ছা তাদের সিলেবাস নিয়ে কি একবারও ভেবেছেন? তারা শিক্ষা জীবনে কি কি পড়েছে আর কি কি তারা আপনার প্রতিষ্ঠানে এপ্লাই করতে পারবে, এই নিয়ে কেউ কি ভেবেছে, নাকি আমরা তার হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি সব? আইপিই বিভাগের সিলেবাস দেখলে অনেকেই শিউরে উঠবেন। কত কি চমৎকার বিষয় পড়ানো হচ্ছে। সেগুলা নিয়ে আপনার প্রতিষ্ঠানে কত কি করার সম্ভাবনা আছে…

যেমন ধরুণ, তার শুরুতেই ওয়ার্কশপে কাজ করে এসেছে। লেদ মেশিন, মিলিং মেশিন, শেপার মেশিন, ওয়েল্ডিং কত কি মেশিন। (হ্যাঁ জানি, ওয়ার্কশপে আমরা অনেকেই ফাঁকি দেই, কিন্তু বেসিক কিন্তু মাথায় থাকে)। এখন দেখুন গার্মেন্টে মোল্ড বানাতে হয়, ফোল্ডার বানাতে হয়। এই দুইটা বিভাগ কিন্তু দারুনভাবে ক্রিয়েটিভ লোকের জন্য। আইপিই থেকে আসা কর্মীটি কিন্তু এখানে অবদান রাখতে পারে।

আবার দেখুন, তারা হিউম্যান ফ্যাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং বা আর্গোনোমিক্স পড়ে এসেছেন সেই প্রথম বর্ষে বা দেড় বর্ষে। আপনার ফ্যাক্টরিরে ওয়ার্ক ফ্যাটিগ কমানোতে তারা ভূমিকা রাখতে পারে দারুনভাবে।

টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, অপারেশন ম্যানেজমেন্ট, প্রোডাক্ট ডিজাইন এন্ড ডেভেলপমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং ইকোনোমি, কস্ট একাউন্টিং, অর্গানাইজেশনাল বিহেভিয়ার এমন কত কি সাবজেক্ট। যদি সদ্য চাকরি প্রাপ্ত কর্মীকে এ সকল বিষয়ের চর্চায় উৎসাহিত করা যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠান দারুনভাবে লাভবান হবে এবং ঐ কর্মীর ভবিষ্যৎ আরও দারুনভাবে উজ্জল হওয়ার কথা।

দেখুন, ক্যারিয়ার গাইডিং খুব গুরুক্তপূর্ণ বিষয়। আজ যে মেয়েটা বা ছেলেটা আইপিই থেকে পাশ করে বের হলো, তার কাছে আমরা কোন মতেই আশা করতে পারি না যে প্রতিষ্ঠানে অবস্থা যাচাই করে সেভাবেই তার কার্যপদ্ধতি ঠিক করতে পারবে। তার প্রাথমিক কার্যপদ্ধতি ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। আর এ পদ্ধতি এমনভাবে করা উচিত যেন সে একজন ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার হয়েই বেড়ে উঠতে পারে।

আমার প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে আমি আইই-দেরকে প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, মেইনটেনেন্স সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর জোর দেই। খুব অবাক লাগে যে অনেকেই টাইম স্টাডি, মেথড স্টাডি কিংবা লাইন ব্যালান্সিং এর বাইরে কোন কিছুই ভাবতে চায় না। একবার তো এক সেশনে একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করেই বসেছিলো, “আমরা আইই-রা যদি কোয়ালিটি, মেইনটেনেন্স, সুপারভাইজর এর কাজ সহ সব করি তাহলে তাদের কাজ কি?” বিশ্বাস করুন, আমি সেদিন একটুর জন্য সাংসদ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম (থুক্কু, একটু বে লাইনে কথা বলে ফেললাম, সরি)।

এ প্রশ্নের জবাবে একটা কথাই বলি, “একজন জেনারেল ম্যানেজারকে কিন্তু মোটামুটি সব বিষয়ে ধারণা থাকতে হয়। একজন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরকেও। এদেশে অলরাউন্ডারদের বেশ অভাব। (এই পর্যায়ে আমার চোখে ভেসে ওঠে শ্রদ্ধ্যেয় ছোট ভাই শাহীন এর মুখ। বয়সে আমার ৩ বছরের ছোট কিন্তু বছর দুই আগেই একজন এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর হয়ে বসে আছে স্বনাম ধন্য একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরীতে।) আপনারা কেউ কি একজন এক্সিকিউটিভ হওয়ার প্লান করছেন না?”

এই জায়গায় এসে লেখাটা পড়ে দেখি যে হাল আমলের প্রভূত অনলাইন নিউজ টাইপ লেখা হয়েছে। এই জন্য সরি বলে লাভ নেই। তাই আইই এর বেসিক পারপাস বলে শেষ করি। এখন একটু মাধ্যমটা ইংরেজীতে নিয়ে যাই, ইংরেজীতে বললে নাকি ভাব বাড়ে!

The Basic purpose of Industrial Engineering is ECRS.

E – Eliminate

C- Combine

R- Re-arrange

S- Simplify

জাস্ট খেয়াল করে দেখুন, এই বেসিক পারপাস দিয়েই আপনার প্রতিষ্ঠানের আইই বিভাগের বেসিকটা শুরু হচ্ছে কি না।

হ্যাপী ইঞ্জিনিয়ারিং…

লেখকঃ ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট (লীন ম্যানুফেকচারিং)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*