গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারিংঃ কোয়ালিটি প্যারাডক্স

রানা ফরহাদ

মাঝে মধ্যে এক আধটু কবিতা লেখার চেষ্টা করলেও আমি আসলে গল্পের লোক। কিন্তু প্রবন্ধ পর্যন্ত আমার কোন যাতায়াত নেই। চঞ্চল ভাই যখন একটা লেখার জন্য অনুরোধ করলেন, বেমক্কা রাজী না হয়ে উপায় ছিল না। তাই লেখাটা অনেকটা গল্পের ঢঙেই লিখে ফেলেছি।

সম্প্রতি আমার কর্ম জীবনে কিছু আমূল পরিবর্তন এসেছে। কন্সাল্টেন্সির ভূত তো কর্মজীবনের শুরুতেই মাথায় ছিলো, গত চার বছর আগে সেটা থেকে চারা গজিয়েছিলো আর সাত মাস আগে ডাল পালা ছড়িয়ে একেবারে যা তা অবস্থা। কর্মজীবনের শুরুটা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দিয়ে শুরু করা এরপর বিভিন্ন বিভাগে কাজ করতে করতে এ পর্যায়ে এক তুমুল উপলব্ধি হয়েছে। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, এদেশের গার্মেন্টস সেক্টর এডভান্স হতে যেয়ে যেন ব্যাসিকটাই ভুলতে বসেছে। আমার আজকের লেখার বিষয় হচ্ছে কোয়ালিটি আর এ উপলব্ধির একটা বড় ক্ষেত্র হচ্ছে গার্মেন্ট কোয়ালিটি।

খুব সম্প্রতি আমি দেশের একটি স্বনামধন্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর সাথে কাজ শেষ করলাম, এর আগে প্রায় ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষন প্রদান করেছি। এ সকল প্রতিষ্ঠানের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা করছেন, কিছু খুবই সাম্প্রতিক সময়ের। আবার কেউ কেউ সারা বছর স্বনামধন্য বায়ারের সাথে সরাসরি কাজ করছেন, কেউ কেউ বছরের অনেকটা সময় সাব-কন্ট্রাক্ট কাজ করছেন। কারো কারো লিড প্লাটিনাম ভবণ আছে, কারো কারো ফ্যাক্টরীতে ফায়ার এসেম্বলীর জন্য পর্যাপ্ত স্থান পর্যন্ত নেই। কোন কোন ফ্যাক্টরী খুবই ফ্যাশনেবল প্রোডাক্ট বানাচ্ছেন, কেউ কেউ খুবই বেসিক প্রোডাক্ট বানাচ্ছেন। কথাচ্ছলে এভাবেও বলা যায় যে, কেউ কেউ লাখ লাখ পোশাক বানিয়ে হাজার হাজার ডলার আয় করছেন আবার কেউ কেউ হাজার হাজার পোশাক বানিয়ে লাখ লাখ ডলায় আয় করছেন। এধরণের বিভিন্ন মানের ফ্যাক্টরীতে কাজ করতে গিয়ে কতিপয় বিষয় সব ক্ষেত্রেই যে বিদ্যমান তা উপলদ্ধি করেছি।

গার্মেন্টস সেক্টরের যারা এ লেখার এ পর্যন্ত পড়ে ভ্রু কুচকে আছেন তারা এই মুহূর্তে ফ্যাক্টরীতে খোঁজ নেন তো ফেব্রিক ও সুতার সাথে সমন্বয় করে কোন নিডেল ব্যবহার হবে এর কোন চার্ট সেখানে বিদ্যমান আছে কিনা? নাকি তথাকথিত অভিজ্ঞতার আলোকে একই পোশাকের ক্ষেত্রে একেক লাইনে একেক ধরণের নিডেল ব্যবহার হচ্ছে? কিংবা কোন কাউন্টের সুতার জন্য কোন সাইজের নিডেল? কোন সাইজের নিডেলের জন্য কোন সাইজের থ্রোট প্লেট? কি ধরণের ফেব্রিকের জন্য কি ধরণের ফিড ডগ? এ সকল বিষয়গুলির কোন স্ট্যান্ডার্ড সেট করা আছে কিনা একবার খোঁজ নিন তো। এগুলো কিন্তু খুব ব্যাসিক ব্যাপার। সেলাই জনিত যে সকল ডিফেক্ট হয় তার পেছনে এ সকল বিষয়গুলি যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

সিঙ্গেল নিডেল লক স্টিচ মেশিনের খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্ট থ্রোট প্লেট। অনেক ফ্যাক্টরীতে হয়তো খরচ বাঁচাতে গিয়ে লোকাল মার্কেট থেকে এমন মানের থ্রোট প্লেট কেনা হচ্ছে যে, ১১ আর ১৩ নাম্বারের মাঝেই কোন পার্থক্য থাকছে না। আবার হয়তো ১১ নাম্বারের প্লেট-ই কেনা হচ্ছে না! আবার এটাও খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন যে ১৩ নাম্বার থ্রোট প্লেটের নামে যেটা কেনা হচ্ছে আসলেই তার মান কত?

আপনি ফিডডগ খুঁজতে গিয়ে বেশ অবাক হতে পারেন এই দেখে যে, সিঙ্গেল নিডেল লক স্টিচের মেশিনে মোটামুটি তিন ক্যাটাগরীর ফিডডগ থাকলেও, চেইন স্টিচ কোন মেশিনেই মিডিয়াম ফিডডগ ছাড়া আর কোন ফিডডগ আছে কি না? এমনকি লোকাল মার্কেটেও এর সাপ্লাই আছে কি না? (এক ফ্যাক্টরীতে আমার চাহিদার প্রেক্ষিতে সেখানকার মেইন্টেনেন্স ম্যানেজার প্রায় মাস খানেক খুঁজে সিঙ্গেল নিডেল চেইন স্টিচ মেশিনের এক খানা লাইট ফিডডগ ম্যানেজ করতে পেরেছিলেন) অথচ আপনি বিভিন্ন মেশিন কোম্পানীর ম্যানুয়াল ঘাটলে ফিডডগের বিভিন্নতা ও ব্যবহার দেখে অবাক হবেন। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, বর্হিবিশ্বে কোন ডিজাইনার যখন ডিজাইন করেন কিংবা একটা স্যাম্পল বানান, তার কাছে কিন্তু এসকল ইকুইপমেন্ট থাকে। আর আমরা যখন বানাতে যাই তখন কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে গিয়ে হিমশিম খাই! কেন ভেবে দেখেছেন কি?

এগুলো তো বললামই এখন বলা যাক সুইং মেশিনের নিডেলের আশপাশের কথা। আসুন এবার একটু ব্যাসিক ম্যানেজমেন্টের দিকে নজর দেই। লেখাটা যেহেতু পড়ছেন, এই পর্যায়ে খোঁজ নেয়া যাক এই মুহুর্তে ফ্যাক্টরীতে কোন প্রিপ্রোডাকশন মিটিং চলছে কিনা? যদি চলে থাকে তাহলে দেখা যাক সেখানে কি আলোচনা হচ্ছে? প্রিপ্রোডাকশান মিটিং-এর একটি গুরুক্তপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নতুন প্রোডাক্টে কি কি ডিফেক্ট ও ডিফিকাল্টি হতে পারে তার আগাম আলোচনা ও সম্ভাব্য সমাধানের পরিকল্পনা করা। প্রিপ্রোডাকশান মিটিং-এর খাতাটা চেক করলেন তো? সব ঠিক ঠাক আছে তাই না? কিন্তু খেয়াল করে দেখেন বেশীর ভাগ মিটিং এমন সময় হয় যে, বাল্ক প্রোডাকশনে যাওয়ার আগে ঐ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় থাকে না! বাল্ক প্রোডাকশনে যাওয়ার ঠিক কত সময় আগে প্রিপ্রোডাকশান মিটিং করা উচিত সেটা আমরা জানলেও তা পালন করতে পারি কি?

অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবেন যে একটা সময় ছিলো যখন সাইজসেট স্যাম্পল বলে কোন আলাদা সেকশন ছিলো না। যে লাইনে প্রোডাক্টটা ইনপুট হবে সে লাইনের সুপারভাইজার বা লাইন চিফকে দিয়েই সাইজসেট স্যাম্পল বানানো হতো। যার ফলে নতুন প্রোডাক্ট সম্পর্কে আগাম ধারণা তৈরী হয়ে যেত। নতুন প্রোডাকশনের শুরুতে ডিফেক্টের মাত্রা থাকতো কম। খুবই ব্যাসিক ম্যানেজমেন্ট। আর এখন, প্রোডাকশনের ক্ষতি হবে এই চিন্তা করেই কি আমরা এই ম্যানেজমেন্ট থেকে সরে এসেছি? তাতে ঠিক কতটা সুফল পাচ্ছি বলবেন কি? আইপিসি ইন্সপেকশনের রেজাল্ট কেমন আসছে? আচ্ছা, সকল সুপারভাইজারকে একটা স্পেক-শিট দিয়ে স্যাম্পল বানাতে বলে দেখুন তো তারা কেমন প্রোডাক্ট বানায়। (অনেকেই হয়তো বলতে পারেন যে ভালো সুপারভাইজার হওয়ার জন্য গার্মেন্ট বানাতে পারাটা অত্যাবশ্যকীয় নয়। তাদের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এমন যদি মনে করেন তবে লেখা থেকে এই প্যারাটাকে গুরুত্ব না দিলেও চলবে।)

এবার একটু কাটিং ডিপার্টমেন্ট থেকে ঘুরে আসা যাক। বিশেষ করে যারা শার্ট বা প্যান্ট বানাচ্ছেন। কাটিং সেকশনে লে থেকে কাটার পর যে কোন পার্ট-এর একদম নীচের প্যানেল, মাঝের প্যানেল ও একদম উপরের প্যানেলটা হার্ড প্যাটার্নে ফেলে কাটিং শেপ চেক করাটা একেবারেই ব্যাসিক ব্যাপার। একটু দেখুন তো খরচ বাঁচাতে গিয়ে হার্ড প্যাটার্ণের বদলে মার্কার পেপারে প্রিন্ট করা প্যাটার্ণ দিয়ে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে নাকি? আরেকটা দিকে নজর দিতে পারেন, লে-এর একেবারে নীচের দিকের পিসগুলো সাধারণত কাটিং ব্লেডের মাথার দিকের সাথে বাড়ি খায় এতে কোনার অংশগুলো ফ্রেইং হয়ে যায়। এটা রোধ করার জন্য লে-শুরুর আগে টেবিলের উপর বটম পেপার দেয়া হয় কিনা। এটাও দেখে নিন যে খরচ বাঁচাতে গিয়ে বটম পেপার দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে কি না?

ওয়েল স্পট সম্ভবত গার্মেন্টের গুটি বসন্ত। প্রতিটি প্রোডাক্টের জীবনে একবার হবেই। মেশিনে ওয়েল আসছে কিনা এটা বোঝার জন্য দিন শেষে মেশিনের নিডেলের নীচে কাগজ দিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ সেই দেশ গার্মেন্টস-এর আমল থেকে শুরু বলে আমার ধারণা। কিন্তু প্রতিটা দিন কি সঠিক ভাবে সব মেশিনের নীচে দেয়া হচ্ছে আর হলেও কি দিনের শুরুতে মেশিনের সঠিক পরিচর্যা হচ্ছে? নাকি তেল আসছে বলে তেলের লাইনটাই বন্ধ করে দিচ্ছি? (হ্যাঁ অনেক ফ্যাক্টরীতে ড্রাই হেড বা সেমি ড্রাই মেশিন আনা হচ্ছে ইদানিং।)

দুপুর থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে আজ। দুপুরে খেয়ে কিঞ্চিত সিয়েস্তা শেষে লিখতে বসেছিলাম। ক’ঘন্টা পেরিয়ে এখন প্রায় বিকাল। ভাবছি কিছুটা চাল কতিপয় রসুন কোয়া সমেত ভেজে বৃষ্টিটা উপভোগ করা যাক এবার। লেখাটা আদৌ কিছু হলো কি না কিংবা হলেও সেটার আকার আকৃতি কেমন হলো সেটা ভেবেই থামার চিন্তাটাও মাথায় উঁকি দিচ্ছে। এটাও বুঝতে পারছি, কাজের চেয়ে আলাপ বেশী হচ্ছে। তাই শেষ করছি এবারের মত। যাওয়ার আগে আরেকটা ব্যাসিক বেপার বলে যাই, সাদা বা হালকা রঙের পোশাক তৈরীর সময় কর্মীদেরকে বিশেষ গ্লাভস পরানোটা বহু আগের ম্যানেজমেন্ট। দেখুন তো খরচ বাঁচানোর জন্য সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে কি না? যদি বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে তবে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন যে স্পট উঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য মাসে গড়ে কত টাকা খরচ হচ্ছে আর স্পট জনিত কারনে কি পরিমান গার্মেন্ট রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না!

গিন্নী রসুনের কোয়া সমেত চাল ভেজে ফেলেছেন। রসুন খেলে হৃদয় ভালো থাকে। হ্যাপী গার্মেন্ট এক্সপোর্টিং!

লেখকঃ ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট (লীন ম্যানুফেকচারিং)

2 Comments

  1. অত্যন্ত সাদাসিধে ভাবে জটিল বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে।

    • সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। অনুগ্রহপূর্বক আরএমজি জার্নালের সাথে থাকুন। আপনাকে আমাদের লেখা পড়ার ও সম্ভব হলে লেখার অনুরোধ জানাচ্ছি ।
      ইমেইলঃ chanchal@musician.org
      sms on facebook page: https://www.facebook.com/rmgjournal/
      ভাল থাকবেন। শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*