একজন কর্পোরেট দাসের জীবনচক্র

মোঃ ওয়ালিদুর রহমান

মিঃ কর্পোরেট। তিনি এই শহরের একজন ৪০ ছুঁই ছুঁই মধ্যবিত্ত (মাসে কত ইনকাম করলে তাকে মধ্যবিত্ত নামক মাকাল ফল বলা যায়?)। শহরের একটি  নামী কর্পোরেশনে তিনি চাকরী (জব) করেন। প্রতিদিন সকালে তিনি ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠেন। ডাক্তার বলেছেন হৃদয়ে কিঞ্চিত প্রতিবন্ধকতা (ব্লক) দেখা দিয়েছে। তাই প্রত্যুষ হন্টন (মর্নিং ওয়াক) করতে হবে। নাহলে যে অকালে মরে ”কর্পোরেশন”কে অকুলে ডুবাবেন। প্রত্যুষ হন্টন শেষে তিনি কুসুম গরম পানিতে চান করেন। (ডাক্তার বলেছে কুসুম গরম পানিতে চান করলে শরীর চাঙ্গা থাকে আর তাতে সারাদিন প্রচুর কাজ করা যায়। তিনি ক্লান্ত হলে ”কর্পোরেশন” যে অকুলে ভাসবে। অতঃপর তিনি একটি সেদ্ধ ডিম (কুসুম বাদে-কারণ ডাক্তার বলেছেন কুসুম খেলে ৪০ ওর্দ্ধরা দ্রুত মরে যায় আর মরলে তার ”কর্পোরেশন” যে অকুলে ভাসবে), ও আটার রুটি সহযোগে নাস্তা সেরে নেন। নাস্তা সারতে সারতে একফাঁকে কোনোমতে সহধর্মীনি কর্তৃক রচীত সংসারের কলা মুলা, আটা, তেল, টয়লেট পেপার, পাতলা পায়খানার ওষূধ, পিঁয়াজের অভাবের ফিরিস্তিনামা শোনেন। ততক্ষণে তার বাতব্যাথা, মাথাঘোরা আক্রান্ত সহধর্মীনি তার ততোধিক ব্যস্ত বাদবাকি পারিবারিক সদস্যদের নাস্তা রেডি করেন। মিঃ কর্পোরেট অতঃপর সারাদিন অফিস, হাজার হাজার ফাইল, কাস্টমার সামলানো, মিটিং, ব্রিফিং, চিটিং, ফেসবুকিং, সোস্যাল স্টাটাসিং, ফাঁকে ফাঁকে কমবয়সী মহিলা কর্মীদের টিজিং, নানাপ্রকার ধান্দার ইচিং বিচিং শেষে সন্ধা নামার অনেক পরে ধুঁকতে ধুঁকতে আবার গৃহে ফেরেন। শুরু হয় আরেক মধ্যবিত্ত ঘ্যানঘেনে সিরিয়াল লাইফ-এককাপ লাল চা, বহু পড়ায় নেতিয়ে পড়া পেপারটা আবার কোনোমতে গেলা, হিন্দুস্থানী রগরগে টিভি সিরিয়ালে চোখ বোলানো, রাতের ভাত খাওয়া (মধ্যবিত্তরা ডিনার করেনা, তারা ভাত খায়, উচ্চবিত্তরা ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার করে), তখনো বাসায় না ফেরা উচ্ছনে যাওয়া ছেলেকে উদ্দেশ্য করে “হারামজাদা রাত করে ফিল্ডিং মার……..ছে” টাইপের গালি দিয়ে, ফেসবুকিং এ ব্যস্ত রোগা মেয়েকে (অনেক ভয়ে ভয়ে) কিঞ্চিত শাসন করে পরের দিনের কর্পোরেট লাইফের জন্য প্রস্তুত হতে বিছানায় যান। (ডাক্তার বলেছেন দ্রুত বিছানায় যেতে না হলে শরীর খারাপ হবে আর শরীর খারাপ হলে ”কর্পোরেশন” যে অকুলে………….)। ব্যস্ত কর্পোরেট লাইফ ক্ষতিগ্রস্ত হবে-এই ভয়ে তিনি সহধর্মীনিকে বিশেষ (!) সঙ্গও দেন না, পাছে রাত জেগে শরীর খারাপ অতঃপর ”কর্পোরেশন”…….অকু…………। মিঃ কর্পোরেটরা এভাবে কর্পোরেশনের উন্নয়নে, তাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে তুলতে নিজেদের জীবন, যেীবন, শক্তি, মেধা, সমাজ, সংসার, সম্ভাবনা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কাম, ক্রোধ সব হাসিমুখে বিসর্জন দেন। ত্রিশ দিবস পার হলে বয়োবৃদ্ধ এ্যকাউন্টেন্ট কিছু ছাপানো কাগজ (কড়ি) হাতে ধরিয়ে দেন। আর ”কর্পোরেশন” মাঝে মাঝে তার পিঠ চাপড়ে দেয়। সাবাস সাবাস বলে তাকে আরো একটু উস্কে দেন। মাঝে মাঝে দুয়েকটা খেলাত টেলাতও জুটে যায়। এমনি করে মিঃ কর্পোরেটরা তাদের জীবন পার করে দেন আর একদিন মিঃ আজরাইল এসে তাকে এই মহান (!!) দায়ীত্ব হতে অব্যাহতি দেন। কর্পোরেশন একটা মেমো রিলিজ করে “অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো………………………….. আমরা অত্যন্ত শোকাহত……………………………… কোনোদিন পূরণ হবেনা………………………………অকালে চলে…………………………… ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর নতুন মিঃ কর্পোরেটের খোঁজে বিজ্ঞাপন আর অচিরেই নতুন ছাগু মিঃ কর্পোরেটের আগমন। আবার নতুন মেমো-”এতদ্বারা ………..নতুন মিঃ কর্পোরেট……..তাকে পেয়ে আমরা ধন্য………………………..নবদিগন্ত উন্মোচিত…………………..আগের কর্পোরেট যে কর্পোরেশনের বারোটা বাজিয়েছিলেন সেখান থেকে আমাদের উদ্ধার…………..করবেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। হায় মিঃ কর্পোরেট, হায় নয়া জামানার লাঠিয়াল, হায় শিল্পিরা্। ধন্য তোমাদের জীবন, ধন্য তোমাদের পিঠ চাপড়ে দেয়া।


ছোটবেলায় সায়েন্স বইয়ে আমরা মশার জীবনচক্র সম্পর্কে পড়তাম। আজ আমরা একজন কর্পোরেট দাসের জীবনচক্র সম্পর্কে জানব। কর্পোরেট দাস একপ্রকার মেট্রোপলিটন জীব যারা সাধারনত শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত এলাকায় বাস করে। এরা মুলত শহরের জীব নয়। এদের সিংহভাগ তরুণ বয়সে গ্রাম হতে শহরে জীবিকার সন্ধানে আসে কিন্তু আর তাদের জন্মস্থানে ফেরত যেতে পারে না, এখানেই আটকে জীবনচক্র অতিবাহিত করে। তবে শহরেও এরা জন্ম নেয়। এরা সাধারনত চকচকে লেবাসধারী বাবুয়ানা বিশিষ্ট। উহারা শান্ত শিষ্ট, লেজবিশিষ্ট (তবে লেজটি গলায় ঝোলে ”টাই” নামে)। উহারা নিরীহ, নির্বিবাদী, একঘেয়ে জীবনপ্রিয়, অন্ধকার কোণজীবি, সুবিধাবাদী, কঠোর পরিশ্রমী, পরোপকারী (কারন অন্যের টাকা বাড়ানোর মিশনে সারাজীবন ব্যয় করে)। সুখের নাটকে এরা চমৎকার অভিনয় করতে পাারে। এদের চামড়া গন্ডারের চেয়েও মোটা হলেও ব্যপক ইলাস্টিসিটি থাকায় এদের গায়ে শীত, গরম, গালি, চড়, অপমান সহজে দাঁত বসাতে পারে না। এরা কষ্টসহিষ্ঞু। কখনো মুড়ির টিনে, কখনো এসি কারে, কখনো ভাগের সিএনজিতে এরা চলাচল করতে পারে। এরা সাধারনত লাল রঙের ঠান্ডা রক্তবিশিষ্ট জীব তবে কিছু বিরল প্রজাতির নীল রক্তের কর্পোরেট দাসও আছে। তারা উচ্চপদে লোকাল কিংবা আন্তর্জাতিক কর্পোরেট (কারাগারে) হাউসে আনাগোনা করেন।
এদের জীবনের কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম ধাপে বিদ্যার্জন ও পরবর্তী ধাপসমুহে টিকে থাকার পাঠ গ্রহনে বিভিন্ন কর্পোরেট দাস নির্মাতা (শিক্ষা!) প্রতিষ্ঠানে যায়। সেখানকার (কু)শিক্ষা শেষ হলে কর্পোরেট লাইফে ঢোকার প্রানান্ত প্রচেষ্টায় নামে। এই সময়ে এদের বিভিন্ন কর্পোরেট পুনর্বাসন বা পালনকারি প্রতিষ্ঠানে একটি ডকুমেন্ট ফাইল সহকারে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। এরপর তারা নানান কায়দা কানুন করে শিক্ষানবিস কর্পোরেট হিসেবে একটি কর্পোরেট হাউসে তাদের মুল জীবনচক্রের সুত্রপাত করে। পরবর্তী অনেক বছর তারা এরকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভাত-পানি, জল-হাওয়া (তার সাথে আরো অনেক কিছু) খেয়ে সময়ের পরিক্রমায় একজন পুর্নাঙ্গ কর্পোরেট দাসে পরিণত হয়।
জীবনচক্রের এর পরের পর্যায়ে এরা পরবর্তী কর্পোরেট প্রজন্মের আগমন নিশ্চিত করতে বিয়ে নামক আরেকটি বিশেষ ধরনের কর্পোরেট সম্পর্কের সুত্রপাত করে। কিছু কিছু (কু)বুদ্ধিমান কর্পোরেট দাস আবার ”কর্পোরেট দাসী”দের জীবনসঙ্গি হিসেবে বেছে নেন। কিছু চাল্লু কর্পোরেট দাস চিকনা বুদ্ধির কল্যানে একটি ফ্ল্যাট নামক মুরগীর খোপ কিনে ফেলতে সক্ষম হন। তবে অধিকাংশই সে পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে না। তারা কোনোমতে পরের প্রজন্মের কর্পোরেটের ধরাগমন (জন্ম আর কি), লালনপালন, (কু)শিক্ষায় শিক্ষিত করা, কর্পোরেট হবার দৌড়ে পৌছে দিয়ে তারা পরপারে যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এদের জীবন কাল মোটামুুটি ৪৫ থেকে ৫৫ বছর তবে কিছু কিছু নীল রক্তের ভাগ্যবান অবশ্য তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কর্পোরেট বংশধরের দয়ায় তার অতিকষ্টে অর্জিত যৎসামান্য কর্পোরেট মুদ্রায় কিছুকাল জীবন টেনে নেবার সুযোগ পান। কর্পোরেট দাসদের জীবন অবসান হলে অন্য একদল কর্পোরেট দ্রুত তার সৎকার করে তাকে মাটির নীচে বা জলে ভাসানোর বন্দবস্ত করেন। শেষকৃত্যের প্রস্তুতিকালে তারা নিজের বাসায় বাচ্চা ঘুমালো কিনা তার খোজ নেন, পরের দিন যে ডেলিভারীগুলো আছে তার ফলো-আপ করেন, গলার মাফলার না দেয়ায় তার ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে-বাসার বউকে এজন্য ফোনে ধমকান, ফেসবুকে প্রয়াত কর্পোরেটের মৃত্যুর স্ট্যাটাস দেন, ফাঁকে ফাঁকে মৃত কর্পোরেটের জন্য নিয়ম করে আহা উহু করেন, একফাঁকে আবার অনেক দিন পরে দেখা হওয়া কোনো কর্পোরেটের সাথে হেসে হেসে কুশল বিনিময় করেন, কে কোথায় (মুরগীর খোপ)ফ্ল্যাট কিনলেন তার খোজ নেন, জোর করে ভিজা ভিজা চোখ করে মৃতের বউকে সান্তনা দেন, আবার “এই না না না! দরকার নেই! এই সময়ে! আমি পারব না” বলতে বলতে হালকা নাস্তা পানিও করে নেন। (এইটা আমি দেখেছি আমার আব্বাজানের মৃত্যুর পর। আমার আত্মীয়রা জর্দা দিয়ে পান খাচ্ছিলেন আর আব্বার জন্য হা পিত্যেষ করছিলেন) । একপর্যায়ে সদ্যমৃত কর্পোরেটকে জানাজা দিয়ে তাকে সমাহিত করা হয় আর শেষ হয় একজন কর্পোরেট দাস নামক সস্তা জীব এর জীবনচক্র।
কর্পোরেট দাস তথা এক্সিকিউটিভদের সত্যিকার অবস্থা জানেন? এরা হল দুগ্ধবতী গাভির মতো। খামার বা ফার্মের মালিক তারে সুস্বাদু খাদ্য, ভাল বাসস্থান, তাজা ঘাস, বার্ষিক বিনোদন, বেড়ানো, মাথায় হাত বুলানো, আদর যত্ন দেয়। বেশি দুধ দিলে পিঠ চাপড়ে দেয়। আর গাভি মনে করে তারে কত যত্নে রাখে, কত পেয়ার করে। ফার্ম মালিক গাভিকে ইচ্ছেমতো দুইয়ে নেয়। এরপর যেদিন আর দুধ দিতে পারেনা, সেদিন কষাইর কাছে বেঁচে দেয়। কর্পোরেট দাসরা মিলিয়ে নিতে পারেন। গাভির ফার্ম টু বিজনেস ফার্ম টু স্লটারিং ফার্ম। সাধু সাধু।
ব্লু করার জব ও হোয়াইট কলার জব নামক দুটি অধরা বস্তু আছে। দুটির জন্যই সদ্য পাশ করা টগবগে স্নাতক হতে শুরু করে রানিং কর্পোরেট দাস সবাই লালায়িত। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে আবার দুই কলারের মালিকরা ক্লাস মেিনটেইন করে তফাতে থাকেন। সবকিছুতে একটা প্রকাশ থাকে যে তারা হোয়াইট। বুলু (ব্লু) আর হোয়াইট তো আর এক কাতারের নাগরিক বা মানুষ না। ব্লু আর হোয়াইট তো আর এক কাতারের নাগরিক বা মানুষ না। ভাল কথা! আপনি যদি একজন ওল্ড ”কমরেড “ স্যরি ”কর্পোরেট” হন বা অন্য গোত্রের প্রাণী হন এবং যদি আপনার সন্তানকে চিড়িয়াখানার একঘেয়ে পশুপাখি দেখিয়ে আর তাদের আনন্দ না দিতে পারেন তাহলে তাদের নতুনত্বের স্বাদ দিতে কোনো এক অফিস ডে’তে ”কর্পোরেট দাস” দেখাতে তাদের কর্পোরেট সাফারিতে নিয়ে যেতে পারেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ আজকাল বড় বড় কর্পোরেট শহরের ব্যস্ত অফিস পাড়াতে গড়ে ওঠা কর্পোরেট সাফারি পার্কগুলোতে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। আপনার পয়সা উসুল হবার গ্যারান্টি দিচ্ছি। তবে মনে রাখবেন, অফিস ডে ছাড়া এদের দেখতে চাইলৈও তা সম্ভব তবে একটু কষ্ট করতে হবে। ছুটির দিনগুলোতে আপনি সকালের দিকে কর্পোরেট দাসদেরকে দেখতে পাবেন বিভিন্ন (কিচেন মার্কেটে) খাস বাংলায় তরকারীর বাজারে হাটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে, বাজারের ব্যাগ ডানহাতে আর দুইটা দেশী মুরগী বামহাতে নিয়ে কাদা জল মাড়িয়ে পরিবারের ঘানি টানতে বাজার করছে। তবে ওইযে বললাম কষ্ট করতে হবে তাদের দেখতে তার কারণ হল ওই সময় তাদের চিনে নিতে একটু কষ্ট করতে হয় কারণ এরকম স্থানে তাদের সাথে ”বাবুসাহেব”রাও মিলেমিশে একাকার হয়ে বাজার করেন বলে তাদের আলাদা করা একটিু কঠিন হয়। তবে আপনি এক্সপার্ট হলে তেমন কষ্ট করতে হবে না।

লেখকঃ ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার-এইচআর, অনন্ত গ্রুপ

2 Comments

  1. Its simply Dilli ka laddu… kew kheye postay abar kew na kheye… I agree with all of your satire on Corporate Slave but please make another satire on what is ‘Bangla Management’ and how employers ( so called Malik!) act on during management practices?

    • Dear Mohammad Abdur Rahim; thanks for your precious comments. your suggestion has noted with many thanks. Will pass this to author. Stay well

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*