কর্মীর মনস্তাত্ত্বিক উন্নতিতেও ভূমিকা রাখেন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক

জনাব কাজী রাকিব উদ্দিন আহমেদ এর সাক্ষাতকার যা ২৭ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে শেয়ার বিজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

 

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান কাজী রাকিব উদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

কাজী রাকিব উদ্দিন আহমেদ আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবসম্পদের ওপর বিবিএ এবং পরে মার্কেটিংয়ে এমবিএ সম্পন্ন করেন। তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) লাইফ ফেলো, সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি ও বর্তমান ইসি মেম্বার

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

কাজী রাকিব উদ্দিন আহমেদ: যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি কলেজ অব বিজনেসে বিজনেস কমিউনিকেশন বিষয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করি। দেশে এসে ১৯৯৮ সালে ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরুর আগে এক বছর আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশে (এআইইউবি) ক্লাস নিয়েছি। পরে ইউনিলিভার (বাংলাদেশ) লিমিটেডে এইচআর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার ও সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করি। তারপর ২০০৫ সালে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ডিরেক্টর অব হিউম্যান রিসোর্সেস হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। সর্বশেষ ২০১৫ সালে আনোয়ার গ্রুপের প্রধান মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ডিবিএল গ্রুপে এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর-গ্রুপ এইচআর হিসেবে কাজ করেছি। সম্প্রতি আমার নিজস্ব সূত্র অনুযায়ী গড়া ‘রাকিব’স রিক্রুটমেন্ট রুল’ বা ‘আরথ্রি’ বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশে তো বটেই, গোটা বিশ্বে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে এ ধরনের সূত্র এটিই প্রথম। কিছুদিন আগে মুম্বাইয়ে ওয়ার্ল্ড এইচআরডি কংগ্রেসের ‘হানড্রেড মোস্ট ইনফ্লুয়েন্সিয়াল গ্লোবাল এইচআর প্রফেশনালস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে কেন বেছে নিলেন?

রাকিব উদ্দিন: নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে যুক্তরাষ্ট্রে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাই। তিন বছর পড়ার পর উপলব্ধি করি ইঞ্জিনিয়ারিংরের সঙ্গে আমার ব্যক্তিত্বের মিল হচ্ছে না। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে তেমন মজাও পাচ্ছিলাম না। তাই এ বিষয়টি ছেড়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিবিএ শুরু করি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন কলাকৌশলের পার্থক্য লক্ষ করতাম। দেখতে পাই, তারা মানবসম্পদ উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর ‘মোটিভেশনাল ফ্যাক্টর’ নিয়ে অনেক গবেষণা করে, যা কর্মীদের উন্নত হতে সাহায্য করে। ফলে তারা কাজকে নিজের মনে করে, ভালোবাসে। কাজকে সম্মান করে। এসব কারণে কাজটি নিখুঁত ও সুন্দর হয়। আর এভাবেই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত সফলতার মুখ দেখে। কেবল অর্থ দিয়ে সবকিছু সম্ভব নয়। টাকার চেয়ে আচার-ব্যবহারের গুরুত্বও কম নয়। ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কাউকে অভিনন্দন জানালে বা ধন্যবাদ দিলে তিনি খুশি হন। তাছাড়া প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই প্রতিভা রয়েছে। প্রতিভা জাগিয়ে তুলে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে প্রতিষ্ঠান দ্রুত সফল হয়। ব্যাপারগুলো আমাকে ভীষণ নাড়া দিতো তখন। ঘটনাক্রমে সেই সময় লি আয়াকোকার আত্মজীবনী পড়েছিলাম। তিনি প্রকৌশলী থেকে একটি কোম্পানির সিইও হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানে

মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমেই তিনি সফল সিইও হয়েছিলেন। বিষয়টি আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। একই সময় মানবসম্পদবিষয়ক বই পড়া শুরু করি। সবকিছু ভেবেই একদিন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই।

 

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের ভূমিকা কতটুকু?

রাকিব উদ্দিন: মানবদেহে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। হৃৎপিণ্ড যদি প্রতিষ্ঠানের সেলসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে ওই হৃৎপিণ্ডকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করবে ফুসফুস। ঠিকমতো অক্সিজেন না পেলে হৃৎপিণ্ড কাজ করতে পারবে না। এই ফুসফুসই একটা প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ। এজন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সঠিক সময় সঠিক পদে নিয়োগ দেওয়া ও তাদের দক্ষ করে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদি চিন্তা করে সময়ে সময়ে তাদের উন্নত করে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন একজন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জরয়েছে?

রাকিব উদ্দিন: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের প্রতিটি কাজের মধ্যেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমে রয়েছে যোগ্য কর্মী নির্বাচন। এরপর তার মধ্যে থাকা সম্ভাবনাটুকু সঠিকভাবে কাজে লাগানো। অনেক সময় কর্মীদের জন্য সঠিক পরিবেশ নির্বাচন করাটাও বেশ চ্যালেঞ্জের। যেমন একজন কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফল পাওয়ার জন্য কর্মপরিবেশ, কর্মীদের বিভিন্ন চাওয়া ও প্রত্যাশার দিকটিতে গুরুত্ব দিয়ে তার প্রেষণের দিকটি নিশ্চিত করতে হয়।

 শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের এইচআর প্র্যাকটিস সম্পর্কে বলুন

রাকিব উদ্দিন: দেশে এইচআর প্র্যাকটিসের বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরি রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে এইচআর প্র্যাকটিস করছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই

মানবসম্পদ উন্নয়নের সর্বশেষ ধারণা বা মতবাদ নিয়ে কাজ করছে। আবার দেশি অনেক প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়টি কিছুটা অনুপস্থিত। তবে একটু দেরিতে হলেও দেশি অনেক প্রতিষ্ঠান মানবসম্পদ বিভাগের গুরুত্ব উপলব্ধি করছে। তারা মানবসম্পদ উন্নয়নের নানা বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগ রয়েছে; কিন্তু সত্যিকারের এইচআর প্র্যাকটিস কি তারা করছে? যে প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো রীতিনীতি থেকে বের হয়ে নতুনকে উপযোগী করে তুলছে, তারাই সফল হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী দ্বিতীয় প্রজšে§র অর্থাৎ বাবার পর ছেলে অথবা মেয়েকে পরিচালনায় এনেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাবা অভিজ্ঞ কিন্তু সন্তানের অভিজ্ঞতা নেই। তিনি নতুন চিন্তাধারা কাজে লাগাতে চাইছেন। ফলে বাবা ও ছেলের মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে।

অনেক সময় মালিকপক্ষ পেশাজীবীদের বিশ্বাস করতে চান না। এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। আরেকটি ব্যাপারে দেখা যায়, মালিকপক্ষের বংশধররা হয়তো দেশের বাইরে থেকে পড়ালেখা করে আসছেন। কিন্তু তারা হয়তো একদিনের জন্যও কারখানায় যাননি, ফাইন্যান্সের সঙ্গে বসেননি, সেলসম্যানের সঙ্গে কথা বলেননি; হঠাৎ একদিন তাদের একটি উচ্চপদে বসিয়ে দেওয়া হয়। এমন উত্তরাধিকারীকে বোঝানো হয়, তোমার মর্যাদা অনেক ওপরে। তুমি কারও সঙ্গে হেসে কথা বলবে না, সবার সঙ্গে মেশার দরকার নেই। নতুবা তোমাকে পেয়ে বসবে এবং সুযোগ  নেবে। তারা সব সময় কর্তৃত্ব দেখাতে চান। কিন্তু আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এ বিষয়গুলো অকেজো। বিশ্বের সফল প্রতিষ্ঠানগুলোয় এমন চর্চা নেই। তারা হাসিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে না। কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে থাকে। আমাদের এখানে গঠনমূলক সমালোচনা যেমন হয় না, তেমনি সমালোচনা থেকে শেখার মানসিকতাও গড়ে ওঠেনি। এর বাইরে আরও এক ধরনের দেশি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ব্যবসায় নতুন। তারা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বোঝে। ফলে তাদের মধ্যে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো তেমন সমস্যা হচ্ছে না। এটা আশাব্যঞ্জক।

শেয়ার বিজ: লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার পর নিয়োগ দেওয়াÑবিষয়টি কতটা যৌক্তিক?

রাকিব উদ্দিন: এর একটি ভালো দিক আছে। দেশের বাইরেও এমন হয়। সেখানে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে এইচআর ম্যানেজারের গুরুত্ব অপরিসীম। আমেরিকায় এইচআর ম্যানেজার হতে হলে তাকে অবশ্যই মনোবিদ্যার ওপর কোর্স করতে হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপারগুলোকে লক্ষ করে। দেশি কোম্পানিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এ চর্চা নেই বললেই চলে।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

রাকিব উদ্দিন: এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। দেশের সব প্রতিষ্ঠানেই মানবসম্পদের দরকার আছে, তাদের উন্নয়নও প্রয়োজন। সুতরাং পেশাটির অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। ক্যারিয়ার গড়তে ইচ্ছুকদের স্বাগত জানাই।

শেয়ার বিজ: সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে আপনার পরামর্শ কী?

রাকিব উদ্দিন: শিক্ষাগত যোগ্যতা ভালো হতে হবে। ব্যবসা সম্পর্কে জানতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন ট্রেনিং বা শিক্ষামূলক সেমিনারে অংশ নিতে হবে। আপডেট থাকতে হবে। সৎ হতে হবে। যোগাযোগ দক্ষতা অনেক ভালো হতে হবে। নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি থাকতে হবে। মানুষকে সত্যিকারভাবে অন্তর থেকে ভালোবাসতে হবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*